কদরুদ্দীন শিশির

মুখে লাল কিংবা সাদা রুমাল প্যাঁচানো যুবক। হাতে উঁচিয়ে ধরে আছেন চকচকে লম্বা তলোয়ার। সামনে পিছমোড়া করে বাঁধা সাদা চামড়ার এক আদম সন্তান। হাঁটু গেড়ে বসানো মানুষটির ঘাড় সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করে গর্দানে কোপ বসানোর অপেক্ষায় তলোয়ারওয়ালা যুবকটি। এমন সময় ‘গ্রাফিক ইমেজ’ সিগন্যাল দিয়ে স্ক্রিন ঝাপসা হয়ে গেল।

ইউটিউবে এমন ‘নৃশংস’ ভিডিওর অভাব নেই। অথবা কোনো গাড়িবোমা বিস্ফোরণের দৃশ্য। জঙ্গি হামলা যাকে বলে। এগুলো দেখে মানুষ ভয় পায়। যারা এসব ঘটাচ্ছে, তাদের প্রতি সমীহ তৈরি হয়। এত দিন আমরা জানতাম এমন সব ভিডিওর একক ‘স্বত্বাধিকার’ কথিত ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলোর। যাদের প্রায় সবগুলোই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। আল-কায়েদা, আইএস ইত্যাদি। এরা প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতি ছড়ানোর জন্য নিজেদের নৃশংসতা রেকর্ড করে প্রচার করে থাকে।
কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান দ্য ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (টিবিআইযে) সম্প্রতি আমাদের জানাল ভিন্ন কথা। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ঘটনা সব সময় এভাবে ঘটেনি। ‘আল-কায়েদাগিরি’ বা জঙ্গিপনার প্রোপাগান্ডা ভিডিওগুলো সব আল-কায়েদা বা আইএসের নয়। দুনিয়াজুড়ে মানবতা ও মানবাধিকার বিলি করে বেড়ানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিভাগ পেন্টাগনও ‘আল-কায়েদাগিরি’তে জড়িত রয়েছে। অর্থাৎ আল-কায়েদার নামে ছড়ানো অনেক ভিডিও আসলে পেন্টাগনের তৈরি!

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর সেখানে ইসলামপন্থী জঙ্গি সংগঠন, বিশেষত আল-কায়েদার কর্মকা-ের ভয়াবহতা অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরতে বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট হাতে নেয় পেন্টাগন। এবং জঙ্গিদের ‘অনুসরণ’ করার সুবিধার্থে শত শত ভুয়া ভিডিও বানিয়ে আল-কায়েদার নামে অনলাইনে ছাড়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। ব্রিটিশ জনসংযোগ ফার্ম বেল পোটিঞ্জার পেন্টারগনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এসব কাজ করে দিয়েছে। ফার্মটির একাধিক সাবেক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এবং নথিপত্রের ভিত্তিতে টিবিআইজে প্রোপাগান্ডা প্রজেক্ট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার সঙ্গে মিলে গত ২ অক্টোবর এ-সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে টিবিআইজে। তাতে দেখা যায়, আল-কায়েদার নামে ভুয়া ভিডিও তৈরি করার পেছনে পেন্টাগন খরচ করেছে অর্ধবিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি (৫৪০ মিলিয়ন) অর্থ। টাকার অঙ্কে তা সাড়ে চার হাজার কোটির মতো! পোটিঞ্জারকে ২০০৭-১১ সাল পর্যন্ত এই ব্যাপক অর্থের জোগান দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান লর্ড টিম বেল সানডে টাইমসকে প্রজেক্টের সত্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদও (এনএসসি) এ কাজের সহযোগী ছিল। ভিডিও তৈরির জন্য পোটিঞ্জারের কর্মকর্তারা ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবস্থান করতেন। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কাজে জড়িত ছিলেন মার্কিন সেনাসদস্য মার্টিন ওয়েলস। পুরো বিষয়টি অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কাছে তিনিই প্রকাশ করেছেন।

ইরাকে নিজেদের আগ্রাসনের পেছনে এবং একপর্যায়ে তা গুটিয়ে নিতে বছরের পর বছর দেরি করে দেশটিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের বাহানা ছিল ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। সেই যুদ্ধের অন্যতম ‘সন্ত্রাসী পক্ষ’ হিসেবে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয় আল-কায়েদার কথা। বিশেষ করে সংগঠনটির নৃশংসতার কথা। এ অবস্থায় যদি প্রমাণসমেত দেখা যায় যে, ঘোষিত সেই যুদ্ধের অন্যতম পক্ষটির বর্ণিত নৃশংসতাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছিল হামলাকারী পক্ষের দিক থেকেই। ভুয়া ভিডিও দ্বারা যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করার পক্ষে জনমতকে প্রভাবিত করা হয়েছিল, তাহলে তা অবশ্যই বড় খবর হিসেবে গণ্য হবে। বিশেষ করে, বিশাল সামরিক অর্থায়নে একটি পক্ষের বিরুদ্ধে ভুয়া ডকুমেন্ট তৈরি করে প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন চালানোর খবর তো খুবই স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ। এমন বিষয় নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের জন্য সংবাদমাধ্যমগুলো সাধারণত মুখিয়ে থাকে। কিন্তু একটি মুসলিম দেশে নিজেদের আগ্রাসন জায়েজ করার নীতিগর্হিত ও নিন্দনীয় মার্কিন কাজটির তথ্য ফাঁস হওয়ার পরও সে ব্যাপারে পশ্চিমা মিডিয়া একেবারে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকল! ২ অক্টোবর টিবিআইজে এবং সানডে টাইমস-এ বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর উল্লেখ করার মতো মাত্র তিন থেকে চারটি পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম খবরটি ‘পিক’ করেছে। মূলধারার বাকি বাঘা বাঘা সব সংবাদমাধ্যম আমেরিকান কায়েমি শক্তির স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ না করাটাকেই দায়িত্ব মনে করেছে।

২ অক্টোবর অনুসন্ধানকারী বিটিআইজের ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল : ‘Fake News and False Flags : How the Pentagon paid a British PR firm $500 million for top secret Iraq propaganda’। এরপর অনুসন্ধানে সহযোগী হিসেবে কাজ করা সানডে টাইমসও একই রিপোর্ট প্রকাশ করে। এর বাইরে জনপ্রিয় ডেইলি বিস্ট সংবাদটি প্রকাশ করে ‘Pentagon Paid for Fake “Al-Qaeda” Videos’ শিরোনামে। একই দিন ব্রিটেনের দ্য টাইমস ও ডেইলি মেইল রিপোর্ট করে কেলেঙ্কারিটি নিয়ে। দ্য টাইমস-এর শিরোনাম : ‘Thatcher’s PR guru eran Iraq propaganda for Pentagon’। বোধগম্য কারণে রাশিয়া টুডেসহ কয়েকটি রুশ সংবাদমাধ্যম সরব ছিল। কিন্তু বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, এএফপি, এপি, নিউইয়র্ক টাইমস ইত্যাদিসহ মূলধারার পশ্চিমা অনেক সংবাদমাধ্যম পেন্টাগনের ‘আল-কায়েদাগিরি’ নিয়ে একটি অক্ষরও প্রকাশ করেনি। অথচ একাধিক আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান টিবিআইজের সঙ্গে মিলে এসব সংবাদমাধ্যমই নিকট-অতীতে বহু কেলেঙ্কারি প্রকাশে একসঙ্গে কাজ করেছে। মার্কিন সরকার ও সেনাবাহিনীর গুরুতর অপকর্মকে এভাবে সারা দুনিয়ায় ব্ল্যাকআউট করে দেওয়া থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে মিডিয়া কায়েমি শক্তিগুলোর স্বার্থ রক্ষায়ও কাজ করে থাকে।

সূত্র: সাম্প্রতিক দেশকাল

Advertisements