তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার নেপথ্য কারণ নিয়ে চলছে বিভিন্ন বিশ্লেষণ,  দেখা মিলছে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের। তুরস্ক প্রশ্নে বৈশ্বিক রাজনীতির পাটাতনে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দেশের। স্বাভাবিক সেই কারণেই দেশটির আভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ভিন্নতাগুলো চোখে পড়ে। ভিন্ন ভিন্ন ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পাটাতনে ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় এরদোয়ানের নিজের সংশ্লিষ্টতার সম্ভ্যাবতার পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে মাকিন গোয়েন্দা সংস্থা  সিআইএর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন। মধ্যপ্রাচ্য, ন্যাটো ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির আলোকে সিআইএর সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন বিচার করেছেন বিশ্লেষকরা।

অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সিআইএ’র সংশ্লিষ্টতা বিচার

শুক্রবার সন্ধ্যায় তুরস্কে যে অভ্যুত্থান চেষ্টা হয় তার আগে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার সঙ্গে তুরস্ক সরাসরি জড়িত ছিল। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরে তুরস্কের মিত্র রাষ্ট্রগুলোও জড়িত ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক ঘটনা ছিল, রুশ বিমান ভুপাতিত ও পাইলটের মৃত্যুর ঘটনায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের আনুষ্ঠানিক দুঃখপ্রকাশ। এরপর পুতিন তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। এ ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রতি তুরস্কের ঝোঁক কমার ইঙ্গিত বহন করে। রাশিয়া ও তুরস্ক গ্যাস পাইপ লাইন স্থাপনের চুক্তির পর থেকেই ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্র এরদোয়ানকে চাপে রেখেছিল। ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকদের ধারণা, সেই চাপের পরিসর বিস্তৃত করতেই  অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তরফ থেকে!

সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার পাটাতনে তুরস্কের প্রধান মাথা ব্যাথা হয়ে দাঁড়ায় সিরিয়ান কুর্দিরা। তারা স্বাধীন কুর্দিস্থান দখল করলে তা পশ্চিমা শক্তির স্বার্থে দ্বিতীয় ইসরায়েলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে বলে ধারণা জন্মায় এরদোয়ানের মনে। তাই সিরিয়ার উত্তরপূর্বাঞ্চলে কুর্দিস্তান গঠন বন্ধ করতে কুর্দিস পিপলস ডিফেন্স ইউনিট- ওয়াইপিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন এরদোয়ান, কেননা এই সংগঠনকে তিনি পিকেকের শাখা বলেই মনে করেন। শত্রু সিরিয়া যেন নিজের ভূখন্ড সুরক্ষিত করতে পারে, স্বাধীন কুর্দিস্থান গঠন বন্ধ করতে গিয়ে এমনকী তার পক্ষেও কৌশলগত অবস্থান নেয় তুরস্ক। আর এতে তুরস্ক-রাশিয়ার সম্পর্কে স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠার জমিন তৈরী হয়। এর কিছুদিন আগেই আগের প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে নিজের অনুগত বিনালি ইলদিরিমকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন এরদোয়ান। এ সময়েই একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আইএসবিরোধী লড়াইয়ে কুর্দি বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা যেমন করছিল তেমনি তুরস্কের ঘাঁটি ব্যবহার করে আইএস অধ্যুষিত অঞ্চলে বোমা ফেলছিল। কুর্দি বিদ্রোহীদের অস্ত্র সহযোগিতা করায় বেশ কয়েকবার নিজেদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে তুরস্ক। দীর্ঘদিন শিথিল সম্পর্কের পর এ বছরই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয় তুরস্ক। অভ্যুত্থান চেষ্টার কিছুদিন আগেই আভ্যন্তরীন সন্ত্রাসীদের হত্যার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সদস্যদের দায়মুক্তি আইন পাস করা হয়। সবমিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পররাষ্ট্রনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় সিআইএ’র সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার পেছনে তুরস্কের পররাষ্ট্রনৈতিক অবস্থানের এই পরিবর্তনকে কারণ ভাবা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে এরদোয়ানের এ নীতিগত পরিবর্তনের কারণেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ তাকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এ প্রেক্ষিতেই সংঘটিত হয় ব্যর্থ অভ্যুত্থান।

যেভাবে আলোচনায় আসছে সিআইএর সংশ্লিষ্টতা

তেল ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ক সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের লেখক ও প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রভাষক এ.উইলিয়াম এঙ্গদাহিল অভ্যুত্থান চেষ্টায় সরাসরি সিআইএ জড়িত বলে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, অভ্যুত্থান চেষ্টাটি ছিল এরদোয়ানের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তুরস্কে সিআইএ-এর সমর্থকদের দ্বারাই এ অভ্যুত্থান চেষ্টা হয়েছে। যদিও তা ছিলো একটি বেপরোয়া ও দুর্বল পদক্ষেপ।

অভ্যুত্থানের নেপথ্য কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, অভ্যুত্থানে জড়িত সেনা কর্মকর্তারা ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারী। আর গুলেন সিআইএ দ্বারা শতভাগ পরিচালিত। নির্বাসিত হওয়ার পর থেকেই গুলেন পেনসিলভানিয়াতে নিরাপদে বসবাস করছেন। সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা গ্রাহাম ফুলার ও আঙ্কারার সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডও পেয়েছেন গুলেন।

উইলিয়ামের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই সিআইএ তুরস্কের শাসন ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক ইসলামকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে ইস্তানবুলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সময়েই গুলেন তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে এরদোয়ানের সমালোচনা করেন। গুলেন নিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যম জামান-এ অভিযান চালিয়ে তা বন্ধ করে দেয় সরকার। এ ঘটনাটি ছিল তুরস্কের আভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ।

উইলিয়াম মনে করেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী এরদোয়ানের পররাষ্ট্র নীতি কেমন তা হবে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার ও আলোচনা শুরু, গ্রিস সীমান্তে গ্যাস পাইপ লাইন স্থাপন, একই সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে পুনঃসম্পর্ক স্থাপন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে উৎখাতে নিজেদের ভূমিকা কমিয়ে আনছে তুরস্ক। এটা ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ওবামা প্রশাসনের পরাজয়। জর্জ বুশ ও বিল ক্লিনটনের সময়কালের চেয়েও এটা বড় পরাজয়।

অভ্যুত্থানের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও ছিল অভ্যুত্থানের পক্ষে। অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পরই তুরস্কে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এক ‘তুর্কি বিদ্রোহ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি ওই সময় মস্কোতে সিরিয়া নিয়ে আলোচনায় ছিলেন। ন্যাটোও ছিল চুপ। যখন অভ্যুত্থান দমিয়ে এরদোয়ান নিজের অবস্থান জানান দেন তখনই যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও এর অন্তর্ভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলো ‘গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সমর্থণ’ জানায়।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিষয়ক সাংবাদিক আফশিন রাত্তানসি অভ্যুত্থান চেষ্টার সময় ন্যাটো ও এ জোটের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর ভূমিকা সামনে এনেছেন। ন্যাটোভুক্ত দেশ হওয়া স্বত্বেও অভ্যুত্থানের সময় এরদোয়ানের সমর্থনে ন্যাটোর সহযোগিতায় এগিয়ে না আসায় অবাক হওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। আফসিন লিখেছেন, কয়েক বছর আগেই এরদোয়ান সরকারকে সমর্থন জানায় ন্যাটো। এমনকি গত নভেম্বরে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার পর এরদোয়ানের পক্ষে ন্যাটো কথা বলেছিল। কিন্তু এবার কিছুই বলেনি তারা।

তার মতে, মস্কো সফরে থাকা জন কেরি তাৎক্ষণিক সহযোগিতার ঘোষণা না দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষনের ঘোষণায় অবাক হওয়ার মতো অনেক কিছুই ছিল। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ও ন্যাটোর উপস্থিতির ক্ষেত্রে তুরস্ক  গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র এ ভূমিকা নিয়েছে।

তিনি জানান, ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়িয়ে আরবের নায়কের পরিণত হওয়ার পর যেমন এরদোয়ানে ভোল পাল্টে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ান এবং সিরিয়ার আসাদ সরকারকে উৎখাত করতে আইএস ও আল কায়েদার মতো জঙ্গি সংগঠনকে সহযোগিতা করেন। ঠিক সেভাবেই আবারও নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায় নিয়ে গেছেন এরদোয়ান।

আফশিন জানান, ন্যাটোভুক্ত দেশ হওয়ার কারণেই সেনাবাহিনীর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের হাতে ছিল না। সেনা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণক্ষমতার অনেকাংশ ন্যাটোর হাতে ছিল। আর ন্যাটো ওয়াশিংটনের নির্দেশ মেনে চলে। ফলে অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিনপন্থীরা খবর আগেই পেয়ে গিয়েছিল। সামরিক বাহিনীর মার্কিনপন্থীরা বুঝতে পেরেছিল এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যত সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করছেন।

অভ্যুত্থান দমনের পর তুরস্ক যে আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাতেও যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার বিষয়টি একভাবে সামনে আসে। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম তুর্কি ইসলামি চিন্তাবিদ ফেতুল্লাহ গুলেনকে ফিরিয়ে আনার পথে কোনও দেশ বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন। স্পষ্টতই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কথা ইঙ্গিত করেছেন। কারণ সবাই জানে, যুক্তরাষ্ট্র ও সিআইএ গুলেনকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে আসছে।

তুর্কি প্রধানমন্ত্রীর পর দেশটির শ্রম মন্ত্রী সুলেইমান সয়লু একেবারে সরাসরি অভ্যুত্থান চেষ্টার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন।

সিআইএ কেন অভ্যুত্থান চেয়েছিল

তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র জোটবদ্ধ হলেও পরস্পরের প্রতি আস্থা হারাচ্ছিল কিছুদিন ধরেই।  কাউন্টার পাঞ্চ এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেপে এসকোবার লিখেছেন, এরদোয়ানের সাম্প্রতিক কৌশল পরিবর্তনের কারণে সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে তারা একদিকে গুলেনকে আশ্রয় দিচ্ছিল এবং ওয়াইপিজিকে সহযোগিতা করছিল। এরদোয়ান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তুরস্কের স্বার্থের জন্যই রাশিয়া ও ইসরায়েলের সহযোগিতা দরকার। পারমাণবিক কেন্দ্র গড়ে তোলাটা তুরস্কের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

তুরস্কের রাশিয়ার নিকটবর্তী হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় মধ্যপ্রাচ্যের আরেক ইরান যখন তুরস্কের পারমাণবিক কেন্দ্র গড়ে তোলাকে স্বাগতম জানায়। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি পাল্টে যায়। ইউরেশিয়া আরও ঘনীভুত হয় এবং তুরস্ক নতুন সিল্করুটে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে। যা ছিল স্পষ্টতই মার্কিন স্বার্থবিরোধী। ফলে এরদোয়ান হয়ে পড়েন যুক্তরাষ্ট্রের ‘অস্থির ও অনির্ভরযোগ মিত্র’। যা আতঙ্ক আকারে দেখা দেয় সিআইএর মধ্যে। কারণ সিআইএ-এর নিয়ন্ত্রণে তুরস্ককে পরিচালিত করার যে পরিকল্পনা তারা করে আসছিলো তা ব্যর্থ হতে চলেছে। ফলে তারা এরদোয়ানকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য অভ্যুত্থানের পথ নেয়।

 

সূত্র: কাউন্টার পাঞ্চ, আরটি, গ্লোবাল রিসার্চ, নিউ ইস্টার্ন আউটলুক, স্পুটনিক নিউজ, দ্য মিলেনিয়াম রিপোর্ট, বাংলাট্রিবিউন

Advertisements