কিউ এস আব্দুল্লাহ

প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারসহ বাংলাদেশের বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমের মৌলিক এজেন্ডাগুলো মধ্যে ইসলামবিদ্বেষ অন্যতম। কিছু ক্ষেত্রে বিদ্বেষ পর্যন্ত না গেলে ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতিকে নিরুৎসাহিত করার প্রবণতা লক্ষণীয়।

এর প্রধান কারণ এই দেশে যারা সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক জগতের অগ্রভাগে বিগত অর্ধ শতাব্দিরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় আছেন তাদের প্রায় সবাই হিন্দু ব্রাহ্মন্যবাদী মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতির পরিবেশে গড়ে ওঠা এবং প্রভাবিত। আবার এই লোকগুলো সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্বের চেয়ে আদর্শিক পছন্দ-অপছন্দকে বেশি প্রাধান্য দেয়ায় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে।

অন্যদিকে দূরদর্শীতার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় গোড়ামির কারণে ইসলামপন্থী মানুষজন সাংবাদিকতা এবং সাংস্কৃতিক অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে রেখেছে। এতে ইসলামবিদ্বেষী আদর্শিক ব্যক্তিবর্গের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের মিডিয়া জগত।

২০০১ সাল থেকে মিডিয়া বিষয়ে কিছু সচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে ইসলামপন্থী অথবা ‘ইসলামবিদ্বেষী নয় এমন সেকুলার’ অংশের রাজনীতি সচেতন মানুষদের মধ্যে।

কিন্তু বিগত প্রায় এক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার সুবাদে ইসলামবিদ্বেষী কথিত সেকুলাররা মিডিয়ায় তাদের অবস্থান আরো অবাধ করার পাশাপাশি ইসলামের প্রতি নম্র মনোভাব পোষণকারীদেরকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলেছে। ইসলামের প্রতি সহানুভূতিশীল একাধিক পত্রিকা, টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনলাইনেও এমন একাধিক পোর্টালকে অঘোষিতভাবে ব্যান করা হয়েছে। বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম থেকে এই পন্থীদেরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এবং নতুন চাকরির ক্ষেত্রে এদেরকে খুবই সচেতনভাবে এড়িয়ে চলা হয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পত্রিকায়ই জীবনের কোনো পর্যায়ে মাদ্রাসার সার্টিফিকেট থাকা ব্যক্তিদের চাকরি দেয়া হয় না। এটি একটি অঘোষিত নিয়ম!

এটা বাংলাদেশের মিডিয়ার সার্বিকভাবে ইসলামবিদ্বেষী চরিত্রের একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র।

বিশেষায়িতভাবে ট্রান্সকম গ্রুপের মালিকানাধীন প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের কথা বলতে গেলে অবস্থা আরো খারাপ। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত সমাজকে টার্গেট করে প্রতিষ্ঠিত দুটি পত্রিকা। ইসলামবিদ্বেষ এবং ইসলামবিদ্বেষী সেকুলারাইজেশন দুটি পত্রিকা অন্যতম এজেন্ডা। না, শুধু জামায়াতে ইসলামী বা এরকম কোনো বিশেষ দলের প্রতি বিদ্বেষ নয়, পত্রিকা দুটি পুরোপুরো ইসলামবিদ্বেষী মানসিকতা লালন করে এব্ং সেটাকেই প্রচার করে নানা পন্থায়।

দুয়েকটি বড় উদাহরণ দিলেই পরিস্কার হবে।

২০০৬ সালে প্রথম আলো মহানবী (স) কে নিয়ে কৌতুক ছাপিয়েছিল। যার জের ধরে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠলে বায়তুল মোকাররমের তৎকালীন খতিব মাওলানা উবায়দুল হকের কাছে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান হাতজোড় করে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে এমনটি না করার মুচলেকা দেন।

বছর খানেক আগে (২০১৫ সালের ১০ মে) ‘আমার মা’ শিরোনামে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালামের একটি নিবন্ধ তার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট থেকে বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করে প্রথম আলো। পুরো লেখাটি হুবহু অনুবাদ করলেও একদম শেষের গিয়ে আবদুল কালাম যে জায়গাটিতে তার প্রতিদিন সকালে ফজরের নামাজ জামাতে পড়তে যাওয়ার এবং কুরআন তেলাওয়াতের কথা লিখেছেন সেই অংশটুকুকে বাদ দিয়ে দেয় প্রথম আলো! পরে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ মূল ওয়েবসাইটের টেক্সটি পড়ে নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াত নিয়ে প্রথম আলোর এলার্জিটা ধরে ফেলেন। এ নিয়ে অনেক সমালোচনাও হয় তখন।

সর্বশেষ, গুলশান হামলার পর জাকির নায়েককে নিয়ে ডেইলি স্টার পত্রিকা একটি অতিরঞ্জিত রিপোর্ট প্রকাশ করে এবং সেটিকে ভিত্তি করে পিস টিভি বন্ধ করে দেয়া হয় বাংলাদেশে। জাকির নায়েককে নিয়ে আগে থেকেই বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও তার পিসটিভি বন্ধ করে দেয়াকে অনেকে ভারতের হিন্দুত্ববাদী আরএসএস এবং শিব সেনার দাবিকে বাস্তবায়ন করার অংশ হিসেবেই দেখছেন। জাকির নায়েককে সমর্থন করেন না এমন অনেকেই পিসটিভি বন্ধের সমালোচনা এবং এই বন্ধের পেছনে ভূমিকা রাখায় ডেইলি স্টারের দূরবিসন্ধিমূলক আচরণের কঠোর বিরোধীতা করছেন।

আগের ইসলামবিদ্বেষী ইতিহাস এবং সর্বশেষ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ১৩ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজারো মানুষ প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কপি পুড়িয়ে প্রতিবাদ করছেন, ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

কিন্তু এই পত্রিকা পোড়ানো বা ক্ষণিকের প্রতিবাদ আসলে কতটুকু কার্যকর? এই প্রশ্নটা অনেকে তুলছেন। আর যদি কার্যকর না হয়ে থাকে তাহলে এ ধরনের ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়ার বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিবাদ করা হবে?

মিডিয়া যেহেতু ব্যবসায়িক একেকটি প্রজেক্ট, ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা তাদের প্রথম লক্ষ্য থাকে। আপনি যদি তাদের ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন তাহলে তারা আপনাকে আমলে নেবেই। গ্রাহকদের ওপর নির্ভর করেই মিডিয়াগুলো তাদের ব্যবসা করে থাকে। আপনি পত্রিকা কেনেন, ওয়েবসাইটে ক্লিক করেন, টিভি দেখেন বলেই তারা ব্যবসা করে।

মিডিয়াকে সাবধান করার একমাত্র সহজ, সুন্দর ও গণতান্ত্রিক পথ হচ্ছে বর্জন করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় বড় অনেক সংবাদমাধ্যমে জনগনের বর্জনের মুখে নত হতে বাধ্য হয়েছে। অথবা পতিত হয়েছে। এমন বহু উদাহরণ আছে।

বাংলাদেশে যেহেতু বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম সরকারের পদলেহী হয়ে চলছে, ফলে এখন মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এমনিতেই মানুষের আস্থা নেই। আর আস্থা না থাকা একটি জিনিসকে এত পাত্তা না দিলে তেমন ক্ষতি হওয়ার কিছু নেই। এর মানে এটা নয় যে, সংবাদ পড়া বাদ দিয়ে দিতে হবে। বরং বিকল্প খুঁজে নিতে হবে। সবদিক চিন্তায় অপেক্ষাকৃত ভাল বিকল্প।

নিচের বিষয়গুলো খেয়াল করতে পারেন:

প্রথমত, আাপনার ঘরে প্রথম আলো ডেইলি স্টার বর্জন করুন।

আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে যারা আছেন ইসলামকে ভালবাসেন তাদেরকে বুঝিয়ে বর্জনে উৎসাহিত করুন।

যারা একটু বেশি সিরিয়াস আছেন তারা কয়েকজন মিলে কিছু টাকা উঠিয়ে বর্জনের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে ছোট ছোট স্টিকার ছাপিয়ে বিভিন্ন লোকসমাগম স্থলে সেঁটে ক্যাম্পেইন করতে পারেন। এভাবে অনলাইনে, অফলাইনে নানাভাবে যৌক্তিক ক্যাম্পেইন অব্যাহত রাখুন।

একান্ত পড়তেই হলে অনলাইনে পত্রিকাগুলো একনজর দেখে নিন। সব সময় তাদের ওয়েবসাইট কম্পিউটারে খুলে রাখার প্রয়োজন নেই।

শুধু বর্জন করলেই হবে না। নিজের জন্য এবং মানুষকেও বিকল্প কী বাছাই করবে বলে দিন।

ইংরেজি পত্রিকা হিসেবে ডেইলি স্টারের বিকল্প হিসেবে New Age পত্রিকাটি নেয়া যেতে পারে।

বাংলায় বিকল্প হিসেবে বণিকবার্তা পত্রিকাটি উত্তম হবে। এর বাইরে মানবজমিন, নয়া দিগন্ত, ইনকিলাব ইত্যাদি নিতে পারেন। অবশ্য এ তিনটি পত্রিকা মানের দিক থেকে খুব সুবিধাজনক নয়। তবু আপনার উদ্যেশ্যের জন্য মন্দের ভাল। এছাড়া যুগান্তরকেও একটি আপাত বিকল্প হিসেবে নেয়া যায়।

প্রথম আলোসহ অন্যান্য ইসলামবিদ্বষী পত্রিকাগুলোর সংবাদ তাদের ওয়েবসাইটে না গিয়েও পড়ার একটা ভাল সুযোগ আছে। যেমন bdtoday.net (যেটিকে সরকার কর্তৃক বার বার অঘোষিতভাবে বন্ধ করে দেয়ার কারণে কিছুদিন পর পর ডোমেইন পরিবর্তন করতে হয়) ওয়েবসাইট বড় পত্রিকাগুলোর প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো সংশ্লিষ্ট পত্রিকার কার্টেসি সহ কপি করে প্রকাশ করে থাকে। এখানে দেখে নিলে আপনার ক্লিকের হিটটি ওইসব পত্রিকায় কাউন্ট হবে না।

একদিনেই কোনো বর্জন সফল হয়ে যাবে না। আস্তে আস্তে চেষ্টা করতে থাকলে ৬ মাস পর দেখা যাবে প্রথম আলো ডেইলি স্টারের প্রচার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমা সম্ভব। শাহবাগের ইসলামবিদ্বেষী আন্দোলনের সময়য়ে যেভাবে হয়েছিল। এবং সেই ধাক্কা সামলাতে প্রথম আলো শেষমেশ শাহবাগের অপকর্মকে গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছিল।

সত্যিকারভাবে বর্জন করুন। এবং লক্ষ্য অর্জন করুন!

সূত্র: বিডিটুডে

Advertisements