নিউইয়র্কে স্বেচ্ছা নির্বাসিত জীবন যাপনকারী এক এগারোর খননায়ক জেনারেল মঈন এখন নিঃসঙ্গ-অবাঞ্ছিত। তার পাশে কেউ নেই। কোথাও কোন সভা সমিতি বা সামাজিকতায় দেখা যায় না তাকে। যার দাপটে এক সময় টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত প্রকম্পিত হতো সেই চার তারকা জেনারের এখন অনেকটা আত্মগোপনে থেকে কৃত অপরাধ কর্মের প্রায়শ্চিত্ত করছেন। কদাচিৎ নিউইয়র্কের জ্যামাইকা এলাকার রাস্তায় বের হলেও এড়িয়ে চলছেন বাংলাদেশীদের। অনেকের মতে অবলীলায় ভান করছেন অসুস্থতার। সম্প্রতি নিউইয়র্কের জ্যামাইকা হিলসাইডের রাস্তায় তার সাথে দেখা হয় সাপ্তাহিক বাংলাদেশ প্রতিনিধির। দেশের বর্তমান নাজুক অবস্থার জন্য তার যে দায় রয়েছে সেটা তিনি কিভাবে দেখেন এমন প্রশ্নে নিজকেে শামুকের মতো গুটিয়ে নেন। অসুস্থ দাবী করে কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন এবং সটকে পড়েন দ্রুত। এর আগেও তিনি কারো কারো সাথে এমন আচরণ করেছেন। জেনারেল মঈন দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছেন বলে প্রচার করলেও নিউইয়র্কে এ সংক্রান্ত কোন তথ্য উপাত্ত নেই কোথাও।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট বিশেষ করে গনতন্ত্রহীণতা, অপশাসন ও বিচারহীনতার অভিনব সংস্কৃতির সিংহভাগ দায় জে. মঈনের বলে মনে করেন দেশবাসী। কারণ তিনিই ছিলেন এক/এগারোর অবৈধ সরকারের মূল চালিকা শক্তি। তার অঙ্গুলি নির্দেশেই ফখরুদ্দিনের কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ ও জাতিকে উদ্ধারের নামে উভয় সংকটে নিপতিত করে। অর্থ ও ক্ষমতালোভী মঈন রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে কার্যক্রম শুরু করলে সবকিছুতে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। সমাজ এবং প্রশাসনের এমন কোন স্থান নেই যেখানে তার প্রসারিত কালো হস্তের স্পর্শ লাগেনি। বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ঢালাওভাবে রাজনীতিকদের জেল-জুলুমের শিকারে পরিণত করেন এক এগারোর সরকার। ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া তার জন্য হিতে বিপরীত হয়ে দাড়ায়।
বাংলাদেশের ১৩তম সেনা প্রধান জে. মঈন বরাবরই সুযোগ সন্ধানী। ২০০৭ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে সৃষ্ট সহিংসতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতিতে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে জে. মঈন সেই সুযোগ লুফে নেন। ১১ জানুয়ারি বিনা রক্তপাতে বঙ্গভবনের পাইক-পেয়াদাদের চড়-থাপ্পর মেরে কব্জা করেন মূল ক্ষমতা। দেশব্যাপী জারি করেন জরুরী অবস্থা। অঙ্গীকার করেন লাইনচ্যূত রাষ্ট্র নামক ট্রেনকে সঠিক ট্র্যাকে তোলার।
আশার বানী শুনান দেশবাসীকে। সাময়িক স্বস্তির পেয়ে দেশবাসী সমর্থন জানান তাকে। কিন্তু কিছুদিন না জেতেই ক্ষমতার প্রেক্ষাপট। বেড়িয়ে আসে আসল চেহারা। ক্রমশই স্পষ্ঠ হয়ে উঠে মঈন-ফখরুদ্দিন গংয়ের অভিসন্ধি। সুখ-শান্তর স্বপ্ন ও বেহেশতে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশবাসীকে ঠেলে দেন দোজখে। সেই দোজখের আগুনে আগুনে এখনো জ্বলছে মানুষ।
প্রায় দু’বছরের মাসনামলে মঈন যখন বুঝতে পারলেন যে তার মতো মাজুল সেনা প্রধানের পক্ষে রাষ্ট্রের হাল ধরা সম্ভব নয় তখনই তিনি বাঘের পিঠ থেকে নিরাপদ অবরোহনের পথ খুজতে থাকেন। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সফরে গিয়ে গন্ডা দেড়েক মাদী ঘোড়া নিয়ে দেশে ফিরেন তিনি।
ভারতের পরামর্শে মঈন আওয়ামীলীগের সাথে সমঝোতার পথ বেছে নেন। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও দায়মুক্তির শর্তে মঈন-ফখরুদ্দিন গং ২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামীলীগকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আরোহনের সুযোগ করে দেয়। এরমধ্যে দিয়ে নিজেরা মুক্তি পেলেও দেশবাসীকে অগনতান্ত্রিক এক দলীয় শাসন ব্যবস্থার শৃংখলে আবদ্ধ করে দিয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে দেশ আজ পরিণত হয়েছে গুম, খুন ও জঙ্গী হামলার অভয়ারণ্যে। সীমিত হয়ে পড়েছে বাক-ব্যক্তি ও সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা। বন্দুক যুদ্ধ, ক্রস ফায়ার, জঙ্গী ও জিম্মি সংকটটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে জাতি। এ দায় থেকে কিভাবে মুক্তি পাবেন এই মাতঙ্গ জেনারেল?
এছাড়া ২০০৯ সারের ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় ৫৭ জন চৌকস সেনা অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করার সময় নির্লিপ্ত-নির্বিকার ছিলেন মঈন। শুধু তাই নয়, পিলখানার ঘাতকরা প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় দৌলতখানায় যখন বৈঠক করতেন জে. মঈন তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ভবনটির মূল ফটকে বসে চা-কফি পানে মত্ত ছিলেন। বিডিআর হত্যাকান্ডের দায়ভার কিভাবে এড়াবেন জে. মঈন? যে সেনাপ্রধান তার অফিসারদের পিলখানায় নিরাপত্তা দিতে পারেনি অথচ সেই ব্যক্তি গুলশানের জঙ্গি হামলায় করণীয় নিয়ে এখন পরামর্শ বিতরণ করছেন।
জাতির সাথে প্রতারণাকারী জে. মঈন ২০০৫ সালের ১৫ জুন থেকে ২০০৯ সালের ১৫ জুন পর্যন্ত সেনা প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে তিনি অবৈধভাবে চাকুরির মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে নেন। দুর্নীতিপরায়ন মঈন জাতি সংঘ শান্তি মিশনে নেতৃত্বের দোহাই দিয়ে নিজেকে চার তারকা জেনারেলে উন্নীত করেন। চাকুরীতে থাকা অবস্থায় বেআইনীভাবে “শান্তির স্বপ্ন” নামে ফরমায়েশী একটি বই বাজারজাত করেন তিনি।
মঈন তার ভাই ইকবাল আহমেদকে ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেন। আর তিনি ছিলেন এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান। এক-এগারোর সময় মিথ্যে ও ভিত্তিহীন অভিযোগে ব্যবসায়ীদেরকে আটক করে তাদের নিকট থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করার মধ্য দিয়ে জনগনের নিকট সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেন। ধূর্ত অথচ দুর্বল চিত্তের জে. মঈন চাকুরী জীবনের শুরুতে বিমান বাহিনীর ফ্লাইট ক্যাডেটের প্রতিক্ষণ নিতে রাশিয়া যান। শারীরিক র্দৌবল্যের কারণে শেখান থেকে তাকে ফেরত পাঠানো হয়। বর্তমান সরকারের সঙ্গে আতাঁত করে সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা ভোগী জে. মঈন জন-রোষানলে পড়ার ভয়ে দেশ ও প্রবাসে প্রকাশ্যে আসনে নারাজ। সিংহশার্দুল বেড়ালের আকার ধারণ কররে যেমনটি হয় জে. মঈনের অবস্থা ঠিক তেমনি।

সূত্র:  সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, বিডিটুডে

Advertisements