পাকিস্তান অবজারভারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে ভারত শীঘ্রই সীমান্তের ৬টি স্থানে অবস্থান নেবে ও আক্রমণ চালাবে। এধরনের প্রবন্ধটি লিখেছেন পাকিস্তানের মুলতান ভিত্তিক ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট আলী সুখানভার। বিষয়টি পাঠকদের অবগত করতে প্রবন্ধটি প্রকাশ করা হল।

বিগত কয়েক দিনে বাংলাদেশে যা কিছু ঘটেছে তা অননুমিত বা অপ্রত্যাশিত কোনটাই নয়। হোলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোঁরা হামলার ঘটনায় ২৩ নির্দোষ ব্যক্তি প্রাণ হারায়। দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামায়াতে হামলা চালাতে বোমা বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় একটি চেকপয়েন্টে বন্দুকধারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় অপর তিনজন।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কেবল সরাসরি সম্পূর্ণভাবে মুসলিমদের টার্গেট করে বড় ধরনের হামলা চালানোর প্রচেষ্টা এই প্রথম। তাই এ সহিংসতা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

সন্ত্রাসবাদের বিশ্বব্যাপি চলমান ঢেউকে সাধারণত আইএস বা একই ধরনের অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। তবে বাংলাদেশের এই সমস্ত ঘটনাকে এর সঙ্গে সংযুক্ত করা যেতে পারে না। এইসব ঘটনাকে এই বিশেষ ধরনের সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। সমাজের ধর্মীয় বিভাগগুলির প্রতি হাসিনা ওয়াজেদ সরকারের অন্যায় ও পক্ষপাতিত্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে এগুলো তাদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া।

গণমাধ্যমের তথ্য মতে, হোলি আর্টিজান রেস্তোঁরা হামলার ঘটনায় নয় ভুক্তভোগী ইতালির, সাতজন জাপানের, একজন ভারতের, দুইজন বাংলাদেশের ও একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মার্কিন নাগরিক। ২০ ভুক্তভোগীর মধ্যে ১১জন পুরুষ ও নয়জন নারী। রেস্তোঁরা হামলার কিছুক্ষণ পর বিভিন্ন সংবাদ চ্যানেলের ধারণা ছিল এই সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়েছে আইএস। এছাড়া রুটিন অনুযায়ী, কিছু ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এই ঘটনায় পাকিস্তানের প্রথমসারির গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর সম্পৃক্ততাকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশ পরিদর্শক শহিদুল হক এই সব সম্ভাবনাকে সহজভাবেই প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁতে প্রাণঘাতি হামলার ঘটনার সব হামলাকারী বাংলাদেশি নাগরিক। এরমধ্যে পাঁচজন জঙ্গিকে আগেই গ্রেফতারের চেষ্টা করেছে পুলিশ।

একই সময়ে আমরা সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা দেখতে পেয়েছি। আমরা তাদের সফলভাবে যোগ্যতাসম্পন্ন হতে দেখেছি। শোলাকিয়ায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় বিস্তারিত তথ্য থেকে জানা যায়, এ এলাকাটি রাজধানী ঢাকা থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে অবস্থিত। যখন হামলার ঘটনা ঘটে তখন তিন লক্ষাধিক মানুষ নামাজের বড় জামায়াতে অংশ নিয়েছিল। হামলাকারীদের টার্গেট ছিল নামাজীরা। কিন্তু পুলিশ অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তাদের চেকপয়েন্ট অতিক্রম করার সময় থামিয়ে দেয়। এ স্থানটি ছিল নামাজের জায়গা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে। এ ঘটনায় এক হামলাকারী নিহত হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে আরও চারজনকে।

বাংলাদেশ বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে হাসিনা ওয়াজেদ ও দেশের ইসলাম প্রিয় মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের অত্যন্ত বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মোকাবিলা করে আসছে। হাসিনা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করাতে আপ্রাণ লড়াই করছে। অন্যদিকে ধর্মীয় দলগুলো তার অবৈধ আকাক্সক্ষার প্রতি অনিচ্ছা প্রকাশ করছে।

বাংলাদেশ চলতি বছরের শুরু থেকেই ক্রমবর্ধমান হামলার তরঙ্গে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর বেশিরভাগ ঘটনায় আইএস বা আল কায়েদা নেটওয়ার্কের একটি শাখা দায় স্বীকার করেছে। যদিও শেখ হাসিনা এমন ধরনের যে কোন গ্রুপের দেশে উপস্থিতি থাকাকে অনবরত অস্বীকার করে আসছেন। তবে বর্তমান সহিংসতার ঢেউ তার অস্বীকৃতিকে সমর্থন করে না।

এটাও একটা বিষয় যে, হাসিনা মনে মনে এ পরিস্থিতিতে খুশি হতে পারেন। কারণ বর্তমান এইসব ধারবাহিক সহিংসতার ফলাফলে তদন্তের নামে ধর্মীয় উপাদানসমূহ গুড়িয়ে দেয়ার ব্যাপক সুযোগ পাবেন তিনি। সর্বোপরি মি. মোদি ও সীমান্ত জুড়ে অন্যান্য হিন্দু উগ্রবাদিদের কাছে তার প্রশংসিত হওয়ার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।

খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ধর্মীয় জনগোষ্ঠির জন্য খারাপ কিছু হতে চলেছে এবং ভাল কিছু হতে চলেছে মোদি সমর্থক শেখ হাসিনার জন্য। সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নামে বাংলাদেশের ধর্মীয় জনগোষ্ঠিকে অবশ্যই আরও ফাঁসিতে ঝোলার প্রস্তুতি নিতে হবে।

অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সম্ভবত আরও হামলার মুখোমুখি হতে পারে এবং মোদি সরকার এই পরিস্থিতির পুরো সুযোগ নেবে। র’ এর এজেন্টরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং তাদের ষড়যন্ত্রের আগুনে জ্বালানি যোগাবে। আমরা অবশ্যই বাস্তবতাকে ভুলতে পারি না যে, বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করে এর পরিচিতি মুছে ফেলার অত্যন্ত পুরোনো আকাক্সক্ষা রয়েছে দেশটির।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর শিরোনাম ছিল ‘ভবিষ্যতে একটি উপায়ে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে ভারতের’। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভারতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে দেশটির। সেই সাথে দেশটি কেবল এটা বাস্তবায়ন করার জন্য বেঙ্গল, আসাম ও ত্রিপুরায় সশস্ত্র ও আধাসামরিক বাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে। ভারত এই সমস্ত অঞ্চলে সৈন্যদের উপিস্থিতির পরিমাণ শক্তিশালী করছে। যাতে করে রংপুর, খুলনা, সিলেট, পুরো চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের আকাক্সিক্ষত ভূখ- দখল করা যায়, সেজন্য ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্তের ছয়টি পয়েন্টে আক্রমণ চালাতে শিগগিরই অবস্থান নেবে ১০ লাখের ভারতীয় সৈন্য বহর। ’

ভারতপন্থি বিভিন্ন বাংলাদেশি স্কলার দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন তুলে আসছে; বাংলাদেশ কেন শান্তিপূর্ণভাবে ভারতে যোগ দিতে পারছে না? তারা বলছেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে এবং ভারতও বাংলাদেশের উর্বর ভূমি থেকে প্রচুর লাভবান হবে। সুতরাং খেলা চলমান রয়েছে; ভারতের স্বপ্ন পুরণের জন্য হাসিনা তার সর্বোত্তম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশের ধর্মীয় জনগোষ্ঠি এই সম্ভাবনা ঠেকানোর জন্য বদ্ধপরিকর। কেবলমাত্র সময় বলবে- কে বিজয়ী হবে?

লেখক আলী সুখানভার ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট। সোমবার পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে।

সূত্র: আমাদের সময়, বিডিটুডে

Advertisements