বিশ্বে মহাসড়ক নির্মাণ ব্যয়ে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশীয় বাজারে শ্রমিকের মজুরি কম থাকলেও দেশের ভেতরেই ১১ বছরে এ ক্ষেত্রে নির্মাণ ব্যয় ২৫ গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বিশ্বে সড়ক নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারতে আট লেন ও ছয় লেনের মহাসড়ক আছে। বাংলাদেশে ছয় লেনের মহাসড়ক পরিকল্পনার পর্যায়ে আছে। পাশের দেশ ভারতে নতুন চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হচ্ছে গড়ে সাড়ে ১০ কোটি টাকা, দ্রুত গণপরিবহন ও আধুনিক সড়ক ব্যবস্থায় এগিয়ে থাকা চীনে এক কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণে গড় ব্যয় ১০ কোটি টাকা। ইউরোপে কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় ২৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ছয়টি চার লেন প্রকল্পের কিলোমিটারপ্রতি গড় নির্মাণ ব্যয় ৫৪ কোটি টাকা। তার মধ্যে সর্বশেষ নেওয়া ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়কের নির্মাণ ব্যয় কিলোমিটারে ঠেকেছে ১২২ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়।

এদিকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের মহাসড়কের মান এশিয়ার যেকোনো দেশের তুলনায় নিচে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের মহাসড়ক আছে মাত্র ১ শতাংশ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে প্রকল্প ঝুলিয়ে প্রতি অর্থবছরেই মহাসড়কের নির্মাণ ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প নেওয়ার আগেই বেশি ব্যয় প্রাক্কলন করা হচ্ছে। এর নেপথ্যে রয়েছে কমিশন বাণিজ্য। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে চলছে কমিশন বাণিজ্য। আবার প্রকল্প ঝুলিয়ে রেখে বলা হয়, নির্মাণসামগ্রীর দাম, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় ও পরামর্শকের ভাতা বাড়ছে, তাই বাড়াতে হবে ব্যয়। যেমন প্রকল্প অনুমোদনের এক মাসের মাথায় ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন প্রকল্পে আরো ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে জমির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে। মান বাড়ানোর জন্য দুই লেন থেকে চার লেন মহাসড়ক নির্মাণের কিছুদিন পরই মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ সম্প্রসারণ করা হলেও কোথাও দেবে গেছে, কোথাও ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

তবে মহাসড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সওজ অধিদপ্তর বলছে, মহাসড়ক আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হালকা যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস লেন, উড়াল সড়ক কিংবা ফুট ওভারব্রিজ রেখে নতুন নকশায় নির্মাণ করতে গিয়ে নতুন নতুন মহাসড়ক নির্মাণে ব্যয় বাড়ছে।

জানা গেছে, আলাদা সার্ভিস লেনসহ বিভিন্ন সুবিধা রেখে মহাসড়ক নির্মাণে একের পর এক কাজ শুরু হয়েছে গত অর্থবছর থেকে। অথচ নির্মাণ ব্যয় বাড়ানোর সংস্কৃতি চলছে তারও অনেক আগে থেকে। সওজ অধিদপ্তরের অধীন বিলের ওপর নির্মাণ করা দেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের মহাসড়ক বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক ২০০৫ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। তারপর মানসম্পন্ন মহাসড়ক নির্মানের উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে পড়ে। ২০০৫ সালে ওই মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছিল পাঁচ কোটি টাকা। এখন ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেনে কিলোমিটারে খরচ পড়ছে ১২২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে ১১ বছরে ব্যয় বেড়েছে ২৫ গুণ পর্যন্ত। অথচ বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কেও হালকা যানবাহনের জন্য পৃথক সার্ভিস লেন তৈরি করা হয়েছিল।

ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা, জয়দেবপুর-এলেঙ্গা, হাটিকুমরুল-রংপুর, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ এই চার লেন প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ছয়টি চার লেন প্রকল্পে কিলোমিটারে গড়ে ব্যয় পড়ছে ৫৪ কোটি টাকা।

বিশ্বে সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয়-সংক্রান্ত বিভিন্ন দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের সঙ্গে বাংলাদেশে নেওয়া প্রকল্পগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প ছকের (ডিপিপি) তথ্য তুলনা করে উচ্চ ব্যয়ের বিষয়টি ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি গড় ব্যয় হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ছয় কোটি টাকা, দুই লেনের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় হবে বড় জোর ১২ কোটি টাকা। উড়াল সড়ক বা ফুট ওভারব্রিজ ও অন্যান্য সুবিধাসহ নির্মাণে কিলোমিটারে ২২ থেকে ২৪ কোটি টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। বুয়েটের অধ্যাপক, অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ১১ বছর আগে যেখানে কিলোমিটারে পাঁচ কোটি টাকা খরচ হয়েছে সেখানে একই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বাড়তে পারে না। প্রকল্প ব্যয় তদারক করার যে ব্যবস্থাপনা আছে তা দুর্বল। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রস্তাবিত ব্যয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাই স্বাধীন তৃতীয় সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া যায়। অনেক সময় রাজনৈতিক চাপেও খরচ বাড়ানো হয়।

গ্রিসের ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব এথেন্সের অধ্যাপক দিমিত্রিয়স স্যামবুলাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খরচ হয় গড়ে ২৯ কোটি টাকা। ৪০টি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের দেশের মহাসড়ক নির্মাণের ব্যয় বিশ্লেষণ করে তৈরি করা প্রতিবেদনে অক্সফোর্ড, কলম্বিয়া ও গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে, এসব দেশে নতুন চার লেন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ১৭ কোটি টাকা। ভারতের ২০১২-১৭ সালের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে দেশে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারে খরচ পড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ কোটি টাকা। চীনের ১২তম (২০১০-১৫) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, সে দেশে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে গড়ে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। দুই লেনের মহাসড়ক চার লেন করতে কিলোমিটারে খরচ পড়ছে প্রায় ১০ কোটি টাকা।

সওজ অধিদপ্তরের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্প। ২০০৬ সালে অনুমোদনের পর ২০১২ সালের মধ্যে মহাসড়কের ১৯২ কিলোমিটার দুই লেন থেকে চার লেন করার কথা ছিল। পরামর্শক নিয়োগ, মালামাল আমদানি, স্থাপনা অপসারণে দেরি—এসব অজুহাতে প্রকল্পের মেয়াদ ৯ বছরে ছয় দফা বাড়ানো হয়েছে। ব্যয় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে তিন হাজার ৭৯৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত ১৯২ কিলোমিটার অংশ চার লেন করতে কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের কাজ এ যাবৎ শেষ হয়েছে ৮০ শতাংশ। ৮৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটারের জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে কিলোমিটারে ২০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। প্রকল্পের কাজ এখনো ১০ শতাংশ বাকি। ২০১০ সালের জুলাইয়ে কাজ শুরু করে প্রকল্পের কাজ ২০১৩ সালের জুনে শেষ করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯০২ কোটি ২২ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। চারটি অংশে ভাগ করে কার্যাদেশ দেওয়ার পর দুটো অংশে কাজ বন্ধ থাকে টানা দেড় বছর। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণে সেই দুই অংশের কাজে গতি আসে। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দুই দফায় ব্যয় বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৮১৫ কোটি ১২ লাখ ১৯ হাজার টাকা। মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে দুই দফা।

ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে যাত্রী ও পণ্যবাহী এবং ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের নির্মাণকাজ শেষ করা হচ্ছে। অন্য তিন দেশে গাড়ি চলাচলের লক্ষ্যেই ঢাকা-সিলেট ও রংপুর-হাটিকুমরুল মহাসড়ক চার লেন করা হবে। রংপুর-হাটিকুমরুল মহাসড়ক চার লেন হবে ১৫৭ কিলোমিটার। আট হাজার ১৭৫ কোটি টাকার প্রকল্পে কিলোমিটারে নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ৫২ কোটি সাত লাখ টাকা। এখন তা কিলোমিটারপ্রতি ৬০ কোটি টাকা করা হচ্ছে। জয়দেবপুর-এলেঙ্গা চার লেন প্রকল্পে এরই মধ্যে কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ কোটি ছয় লাখ টাকা। আগামী অর্থবছর শুরুর আগেই প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঢাকা-সিলেট ২২৬ কিলোমিটার চার লেন প্রকল্পে ব্যয় হবে ১২ হাজার ৬৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তাতে কিলোমিটারে খরচ পড়বে ৫৬ কোটি টাকা। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন প্রকল্পে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে কিলোমিটারে ১২২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

সওজ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর আট লেন প্রকল্প ২০১১ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদনকালে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২০ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০১৩ সালে তা বাড়িয়ে করা হয় ১৩২ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৮৮ শতাংশ। এখন আবার এক কোটি ৩২ লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কারণে ব্যয় বাড়াতে হচ্ছে। কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২২ কোটি টাকা।

২০১০ সালের নভেম্বরে নেওয়া রংপুর বাইপাস চার লেন প্রকল্পের ব্যয় ৭৭ কোটি ৭১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২০১৩ সালেই করা হয়েছিল প্রায় ১২৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ১৬ কিলোমিটারের চার লেন গত বছরের ১৪ জুলাই উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে প্রায় আট কোটি টাকা। ২০০৮ সালে নেওয়া নোয়াখালীর চৌমুহনী চার লেনের ব্যয় শুরুতে ২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ধরা হলেও কয়েক বছরের ব্যবধানে আরো ১৪ কোটি টাকা বাড়ানো হয়।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা গড়ে ওঠেনি উল্লেখ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অদক্ষতার কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য জাতীয় নীতি করা হবে। প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির সময়ই প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে, যাতে প্রকল্পের রিভাইজড বাজেট না করতে হয়, তার ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি। প্রকল্প পরিচালক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থাকলে তাঁর সামনে দিয়ে প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে থাকলে তাঁর তো একটা চক্ষুলজ্জা থাকবে। তাঁর জবাবদিহিতা তৈরি হবে। প্রকল্প শুরুর সময়ই পরবর্তী বছরগুলোর ব্যয় একেবারে নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।’

কেন এভাবে প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে—জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মহাসড়কগুলোর কাঠামো ও সুবিধা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে চাইছি। এ জন্য নতুন মহাসড়কে আলাদা সার্ভিস লেন ছাড়াও পথচারী পারাপারের সেতু রাখা হবে ইন্টারসেকশনগুলোতে। ভূমি অধিগ্রহণেও ব্যয় বাড়ছে। আমরা ব্যয় যুক্তিযুক্ত করার ওপর এখন থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মাওনা উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে এ মহাসড়ক প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে। জয়দেবপুর-এলেঙ্গা মহাসড়কও এমনভাবে করা হচ্ছে যাতে কোনো যানবাহনকে না থামতে হয়। এসব বিষয় হিসাব করলে দেখা যাবে ব্যয় ঠিকই আছে।’ তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যত বেশি টাকার প্রকল্প তত বেশি কমিশন পেয়ে থাকেন সওজ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলীরা। ঠিকাদাররা অর্থ ভাগ করে নেন প্রকৌশলীদের সঙ্গে। সওজ অধিদপ্তরের অলিখিত নিয়ম হলো কমিশন বাণিজ্য। প্রকল্প অনুমোদনের সময় সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, অতিরিক্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীরা ৫ শতাংশ হারে কমিশন পান। প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়ার সময় নির্বাহী প্রকৌশলীর কমিশন থাকে ২ থেকে ৩ শতাংশ। কাজ শেষ হলে সাশ্রয় হওয়া অর্থ ভাগ হয় নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলীদের মধ্যে। কমিশনের একটি অংশ পান ঠিকাদার।

কাজ শেষ হলে বিল পরিশোধের আগে ১ শতাংশ কমিশন দিতে হয় নির্বাহী প্রকৌশলীকে, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাকে দিতে হয় ২ শতাংশ, উপবিভাগীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও পান কমপক্ষে ১ শতাংশ। তবে সব ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের সঙ্গে প্রকৌশলীদের গোপন বোঝাপড়ায় অর্থ ভাগ হয়। সওজ অধিদপ্তরের বেশির ভাগ প্রকৌশলী কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। তবে একটি অংশ কমিশন বাণিজ্যের বিরোধিতা করে আসছে। কমিশন বাণিজ্য বিষয়ে ঢাকা জোনের একাধিক প্রকৌশলী কালের কণ্ঠকে বলেন, নানা অজুহাতে প্রকল্পে ব্যয় বাড়ে। কাজ না করে সময়ক্ষেপণ করা হয়। পরে বলা হয়, নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে, ব্যয় বাড়াতে হবে। সওজ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্প অনুমোদনে জড়িতদের অনেককে এই কমিশন দিতে হয়। সেটা বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেতে সওজ অধিদপ্তর থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে।

মানহীন মহাসড়ক ৯৯ শতাংশ : বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন-২০১৫ থেকে জানা গেছে, সড়ক অবকাঠামোর মানের দিক থেকে এশিয়ার সব দেশের তুলনায় নিচে বাংলাদেশের অবস্থান। বিশ্বের ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৯তম স্থানে। সড়ক অবকাঠামো সূচকে ১০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ২.৯, ভারতের ৩.৮, চীনের ৪.৬, পাকিস্তানের ৩.৮ ও শ্রীলঙ্কার স্কোর ৫.১। ২০১৪ সালে প্রকাশিত এডিবির কারিগরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সওজ অধিদপ্তরের মহাসড়কের মোটামুটি আদর্শ মানের মহাসড়ক মাত্র ১ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৮৭ শতাংশই নিম্নমানের। এর মধ্যে ৭২ শতাংশ কালো তালিকাভুক্ত। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ৪৪, জয়দেবপুর-জামালপুর মহাসড়কের ৬০, জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গার ৫৭, ঢাকা-বাংলাবান্ধা মহাসড়কের ৭৬, কাশিনাথপুর-রাজশাহী মহাসড়কের ৮১, দৌলতদিয়া-মংলা মহাসড়কের ৭৫ ও ঢাকা-পটুয়াখালী মহাসড়কের ৮২ শতাংশ নিম্নমানের। দেশের ৯৬ শতাংশ মহাসড়ক দুই লেনের।

উৎসঃ   কালের কণ্ঠ
Advertisements