অপরাধ একই, কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন। তাই মিডিয়ায় আপনার প্রেজেন্টেশন ভিন্ন হয়ে যাবে। অমুসলিম হলে অপেক্ষাকৃত নরম অনুভূতি পাবেন মিডিয়ার কাছ থেকে। কিন্তু যদি মুসলিম হন তাহলে নির্দয় ট্রিটমেন্টের জন্য প্রস্তুত থাকুন।

ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতার ভিত্তিতে একই রকম ‘অপরাধী’র প্রতি ট্রিটমেন্টের এমন বৈষম্য পশ্চিমা মিডিয়ায় একেবারে স্বীকৃত হয়ে গেছে। অনেক বড় বড় লেখক সাংবাদিকরা এসব দেখিয়েছিনে বই/নিবন্ধ লিখে। অনেকে মনে করতে পারেন, হয়তো বাংলাদেশে বিষয়টা ওরকম নেই। তাদের জন্য দুঃসংবাদ! ‘অপরাধী’র ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষমমূলক ট্রিটমেন্টের ক্ষেত্রে পশ্চিমা মিডিয়া থেকে কোনো অংশে কম নয় বাংলাদেশি মিডিয়া।

উদাহরণ দেখতে পারেন।

২০১৫ সালের ১৫ আগস্ট রাঙ্গামাটিতে স্থানীয় সনাতনধর্মাবলম্বী পাহাড়ি কিছু সশস্ত্র যুবকের সাথে বন্দুকযুদ্ধ হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের। সেনাবাহিনী তাদেরকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি দিয়েছে। এবং বন্দুযকযুদ্ধের ঘটনাটি সরকারি বাহিনীর ‘আয়োজিত’ ছিলনা, তা স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রই তখন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিল। সে ঘটনায় ৫জন পাহাড়ি যুবক মারা যান।

পরদিন ১৬ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলো তাদের প্রথম পাতায় এ ঘটনার সংবাদ পরিবেশন করে এভাবে– “সেনাবাহিনীর সাথে গোলাগুলিতে পাঁচ আদিবাসী নিহত”।

লক্ষ্যণীয়, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নিহতদেরকে খুবই স্পষ্টভাবে ‘সন্ত্রাসী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রথম আলো তাদের প্রতিবেদনে যেসব সেনাসূত্রের বক্তব্য ছাপিয়েছে সেখানে তারা বার বার নিহতদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ বলেছেন।

কিন্তু প্রথম আলো তাদের সংবাদের শিরোনামে সেনাবাহিনীর দাবি মতে ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটি উল্লেখ করেনি। বরং নিহতের সশস্ত্র থাকার তথ্য পাশ কাটিয়ে ‘আদিবাসী নিহত’ লেখা হয়। যেন, নিহতরা খুবই নিরীহ ‘আদিবাসী’ কেউ! খবরের ইন্ট্রোতেও লেখা হয় ‘পাঁচ আদিবাসী যুবক নিহত’। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দাবি মতে ‘সন্ত্রাসী’ লেখতে প্রথম আলোর ‘মনে’ সায় দেয়নি, নিহতদের প্রতি সহানুভূতি জেগেছে। (ভেতরে অবশ্য ‘সন্ত্রাসী’ কথাটির উল্লেখ আছে।)

এবার দেখুন একজন মুসলিম ‘অপরাধী’কে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক হত্যার পর প্রথম আলোর খবরের ধরন।

গত ৯ মার্চের প্রথম আলোর একটি শিরোনাম, “বন্দুকযুদ্ধে’ জেএমবির আরেক জঙ্গি নিহত”। ইন্ট্রোতে লেখা হয়েছে, “রাজধানীতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ জেএমবির আরেক জঙ্গি নিহত হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সোমবার গভীর রাতে খিলগাঁওয়ে এই বন্দুকযুদ্ধ হয়। এতে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) ‘কমান্ডার’ পিয়াস (৩৫) নিহত হন।”

 মার্চ ০৯, ২০১৬ এর প্রথম আলোর একটি সংবাদ

পুলিশের প্রচলিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ রাঙামাটিতে ওই দিন ঘটা সেনাবাহিনীর বন্দুকযুদ্ধের চেয়ে ভিন্ন। পুলিশের বিরুদ্ধে ‘বন্দুকযুদ্ধের গল্প বানিয়ে’ ধরে নিয়ে মানুষকে হত্যার প্রমাণিত অভিযোগ আছে। দেশীয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ নিয়ে বহু রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।

কিন্তু এই বিতর্কিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’র দাবিদার পুলিশের বক্তব্য এবং নিহত ‘অপরাধী’র পরিচয় হিসেবে পুলিশের বলে দেয়া অভিধা (জঙ্গি) হুবহু শিরোনাম এবং ইন্ট্রোতে উল্লেখ করেছে প্রথম আলো!

রাঙামাটির ঘটনায় নিহতরা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ইউপিডিএফ এবং জনসংহতি সমিতির সদস্য বলে সেনাবাহিনীর দাবি ছিল। প্রথম আলো সেই দাবিটি শিরোনাম এবং ইন্ট্রো দুই জায়গায়ই দেয়নি। দিয়েছে এরপরের প্যারায়- ‘সেনাবাহিনীর দাবি’ বলে উল্লেখ করে।

কিন্তু দেখুন, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ‘জেএমবির সদস্য’ বলে পুলিশের যে দাবি তা প্রথম আলো তাদের খবরের শিরোনাম এবং ইন্ট্রো উভয় জায়গাতে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে! যেন, পুলিশের দাবি শতভাগ সঠিক না হয়ে পারে না, এ ব্যাপারে প্রথম আলো নিশ্চিত!

প্রথম আলোর মাত্র দুটি খবরের তুলনা এখানে তুলে ধরা হলো। তাতে দেখা গেল, কিভাবে নিষিদ্ধ অমুসলিম সংগঠনের সদস্যরা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর কিভাবে হত্যাকারী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দাবিকে পাশ কাটিয়ে নিহতদের প্রতি সনানুভূতি দেখাতে হয়। আর নিষিদ্ধ মুসলিম সংগঠনের সদস্য বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর কিভাবে হত্যাকারী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দাবিকে হাইলাইট করতে হয়।

বাকি বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর অবস্থা প্রথম আলোর চেয়ে মোটেও ব্যতিক্রম নয়। অন্যান্য ইস্যুগুলোতে যে যার মতো স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। খুবই ‘নীতিবাগিশ’ হয়ে সংবাদ লেখবে, প্রচার করবে। কিন্তু যখনই মুসলিম পরিচয়ের কোনো ‘অপরাধী’র নাম আসবে, তখন সব নীতিনৈতিকতাকে জলে ভাসিয়ে ‘কর্তৃপক্ষীয় দাবি’র আলোকে ‘অপরাধী’কে বিচার করবে।

মুসলিম ‘অপরাধী’ বলে (রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক) চিহ্নিত ব্যক্তিদের নিয়ে বাংলাদেশি মিডিয়ায় কর্তৃপক্ষীয় বক্তব্যকে হাইলাইট করে প্রকাশিত সাম্প্রতিক কয়েকটি সংবাদের স্ক্রীনশট–

———

Advertisements