মানুষ খাবার খায় বাঁচার জন্য। অথচ সেই খাবারই এখন এ দেশের মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে। কারণ খাবারে ভরা বিষ! বিষ মানে নানা রকম রাসায়নিক দ্রব্য (কেমিক্যাল) ও ভেজাল, যা মানুষের শরীরের জন্য কখনই উপযুক্ত নয়।

চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এ বিষে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ধীরে-ধীরে। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। আস্তে-আস্তে অকেজো হচ্ছে কিডনি, লিডার, পাকস্থলী, হৃৎপি-সহ শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। শুধু তাই নয়, মরণব্যাধি ক্যানসারও ডেকে আনছে এই ভেজাল খাবার।

সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, এসব খাবার খেয়ে অধিকহারে নানাবিধ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, অর্থাৎ শিশুরা। এ ছাড়া পরিবর্তন আসছে মানুষের গড়নে। বাড়ছে খর্বকায় মানুষের সংখ্যা। মোটা হয়ে যাচ্ছে শিশুরা। তাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।

পবিত্র রমজানেও এ ভেজালের ব্যবসা কমেনি, উপরন্তু বেড়েছে। ভেজাল ইফতারি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে সব বয়সের মানুষ। তাদেরই একজন আফিফা, বয়স ছয় বছর। রাত থেকে তার পেটব্যথা। তাই সকালে মা-বাবা নিয়ে এসেছেন শিশু হাসপাতালে। আফিফার মায়ের আশঙ্কা, বাইরের ইফতারি খাওয়ার কারণেই এমনটি হয়েছে তার মেয়ের।

শিশু হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেল, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত অনেক শিশুকে নিয়ে এসেছেন তাদের অভিভাবকরা। অপেক্ষা করছেন ডাক্তারের জন্য। হাসপাতালের একাধিক ডাক্তার জানান, প্রতিদিনই এখানে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত একাধিক শিশু আসে। অনেক শিশুকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিডনি ও লিভারের সমস্যা পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের এসব রোগের জন্য দায়ী ভেজাল খাদ্য।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, শিশু জন্মানোর আগেই মায়ের পেটে থাকাবস্থায় ভেজাল খাবার খাচ্ছে। ফলে পরিপূর্ণ সুস্থ শিশু প্রসব করতে পারছেন না মা। তিনি বলেন, মানুষ ভেজাল খেয়ে অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু ডাক্তার তো রোগ ভালো করার ওষুধ দিতে পারে, ভেজালমুক্ত খাবার নয়। তাই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে রোগীকে ওষুধের সঙ্গে সেই ভেজাল খাবারই খেতে হচ্ছে।

২০১৫ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দূষিত খাবারের কারণে প্রতিবছর সারা বিশ্বে ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মৃত্যু হচ্ছে ৪ লাখ ২০ হাজার জনের। এর মধ্যে বাংলাদেশসহ দণি-পূর্ব এশিয়ায় দূষিত খাবার খেয়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। অসুস্থ হয়ে পড়ছে ১৫ কোটি মানুষ। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দণি-পূর্ব এশিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে তিনটিই ডায়রিয়ায় ভোগে।

শুধু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই নয়, এ ধরনের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে একাধিক গবেষণায়ও। কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের ১৬ শতাংশ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতিবছর এ রোগে মারা যাচ্ছে কমপে ৩৫ হাজার মানুষ। এ হিসাবে কিডনি রোগে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় পাঁচজন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ৯০ শতাংশেরও বেশি কিডনি রোগীর মৃত্যু হয় বিনাচিকিৎসায়। এ ছাড়া ৮০ শতাংশ অকেজো হওয়ার পর রোগী জানতে পারেন, তার কিডনি অকেজো হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর পথ-খাবারের ৫৫ শতাংশে নানা ধরনের জীবাণু রয়েছে। এসব খাবার বিক্রেতাদের ৮৮ শতাংশের হাতেও নানাবিধ জীবাণু থাকে।

নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, পচন রোধে ব্যবহৃত ফরমালিন এখন মেশানো হচ্ছে মাছ, দুধ, মিষ্টি ও ফলে। বাহারি কৃত্রিম রঙ মেশানো হচ্ছে সবজি, ফল ও মিষ্টিতে। গুঁড়া-মসলায় মেশানো হচ্ছে ইটের গুঁড়া ও কৃত্রিম রঙ। খাদ্য ও পানীয়তেও মেশানো হচ্ছে স্বাস্থ্যের জন্য তিকর রঙ। আম, পেঁপে, কলা, টমেটো প্রভৃতি কৃত্রিমভাবে পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথ্রেল ইত্যাদি। শুঁটকি মাছে মেশানো হচ্ছে কীটনাশক ডিডিটি।

চিকিৎসকরা জানান, ফরমালিন অত্যন্ত বিষাক্ত। নিয়মিত ফরমালিনযুক্ত খাবার খেলে শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ক্ষতি হয় কিডনি, লিভার ও পাকস্থলীর। কৃত্রিম রঙযুক্ত খাবার খেলে ক্যানসার হওয়াসহ তি হয় লিভার, কিডনি, হৃৎপি- ও অস্থিমজ্জার। পাকানোর জন্য ব্যবহৃত কার্বাইড ও ইথ্রেলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারও তি করে লিভার ও কিডনির। ডিডিটির কারণে দেহে ক্যানসারসহ নানা জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান ও ক্যাম্পাসের সভাপতি ডা. এমএ সামাদ বলেন, খাদ্যে ভেজালে প্রতারণার চেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে স্বাস্থ্যের। ফরমালিনযুক্ত খাবার নিয়মিত খেলে শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্যানসার হতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতি হয় কিডনি, লিভার ও পাকস্থলীর।

তিনি আরও বলেন, ভেজাল প্রতিরোধ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল কঠোর হাতে দমন করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশেও তা সম্ভব। এ কাজে সরকারকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে সৎ ব্যবসায়ী ও জনগণকেও।

উৎসঃ   আমাদের সময়

Advertisements