প্রায় ২০ হাজার লোক গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সপ্তাহব্যাপী পুলিশের বিশেষ অভিযান। জঙ্গিবিরোধী অভিযানের ঘোষণা দিলেও পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এই অভিযানে জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে মাত্র ১৯৪ জন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর খুনের সাথে জড়িত কোনো জঙ্গি এই বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার হয়নি। সর্বশেষ ১৬ জুন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৭ জঙ্গি গ্রেফতার হয়।

গত ১০ জুন রাত থেকে দেশজুড়ে সপ্তাহব্যাপী জঙ্গি ও সন্ত্রাসীবিরোধী অভিযান শুরু হয়। শুরু থেকেই এই অভিযান নিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ আসে। তাদের অভিযোগ ছিল বিনা কারণে পুলিশ নিরীহ মানুষ ও বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে। অভিযানের প্রথম চার দিন পুলিশ সদরের পক্ষ থেকে গ্রেফতারের পুরো তালিকা প্রকাশ করা হয়।

১৪ জুন পুলিশ সদরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, ১৩ জুন জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযানে ২৬ জঙ্গিসহ অন্যান্য মামলায় ৩১১৫ জন গ্রেফতার করা হয়। জঙ্গিদের মধ্যে ১২ জন জেএমবি, ৫ জন হিজবুত তাহরীর, ১ জন আল্লার দল, ১ জন হুজি এবং ৭ জন অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের সদস্য।

এ ছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক উদ্ধার ও অন্যান্য মামলায় মোট ৩০৮৯ জন আসামি গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত আসামিদের মধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা মূলে ২৩৬৮ জন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার মামলায় ৩৮ জন, মাদক উদ্ধার মামলায় ২৯৫ জন এবং অন্যান্য মামলায় ৩৮৮ জন।

গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ২৩টি আগ্নেয়াস্ত্র যার মধ্যে ৭টি বিদেশী পিস্তল, ২টি দেশী পিস্তল, ১টি এলজি, ৪টি রিভলবার, ২টি শুটারগান, ২টি ওয়ান শুটারগান এবং ৫টি দেশী পাইপগান রয়েছে। এ ছাড়া ১০টি ম্যাগাজিন, ১৮ রাউন্ড গুলি, ১১টি কার্তুজ, ৬টি ককটেল, ৫০০ গ্রাম গানপাউডার, ৪টি চাপাতি, ২টি কালো স্কুল ব্যাগ, বেশ কিছু সরকারবিরোধী লিফলেট, উগ্রপন্থী বই এবং অন্যান্য ধারালো অস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে।

১৩ জুন পুলিশ সদর দফতর জানায়, ১২ জুন ৩৪ জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ জন জেএমবি, ৩ জন হিজবুত তাহরীর, ৩ জন আনসার আল ইসলাম এবং ৩ জন আল্লার দল সংগঠনের সদস্য। এ ছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক উদ্ধার ও অন্যান্য মামলায় মোট ৩২১১ জন আসামি গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত আসামিদের মধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা মূলে ২৫৭৮ জন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার মামলায় ১৯ জন, মাদক উদ্ধার মামলায় ১৬০ জন এবং অন্যান্য মামলায় ৪৫৪ জন। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৭টি ম্যাগাজিন, ৮টি চাপাতি, ৩৩ রাউন্ড গুলি, ২টি পেট্রোল বোমা, ৩১টি ককটেল এবং ২৮টি বইসহ অন্যান্য ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ১টি রিভলবার, ৬টি পিস্তল, ১টি বিদেশী বন্দুক, ৫টি এলজি রয়েছে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৮৬টি মোটরসাইকেল আটক করা হয়েছে।

১২ জুন পুলিশ সদর জানায়, ১১ জুন ৪৮ জঙ্গিসহ বিভিন্ন মামলায় ২১৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ৪৮ জঙ্গির মধ্যে ৪৭ জন জেএমবি এবং একজন এবিটি (আনসার উল্লাহ বাংলা টিম) জঙ্গি সংগঠনের সদস্য।

এ ছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক উদ্ধার ও অন্যান্য মামলায় মোট ২০৮৪ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত আসামিদের মধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা মূলে ১৪৯৬ জন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার মামলায় ৪১ জন এবং মাদক উদ্ধার মামলায় ৩৯১ জন এবং অন্যান্য মামলায় ১৫৬ জন। গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের কাছ থেকে ২টি শুটারগান, ১ রাউন্ড গুলি, ৫০০ গ্রাম গান পাউডার, ১৭টি ককটেল, ২টি ১২ বোরের বন্দুকের কার্তুজ, ৯টি চাপাতিসহ অন্যান্য ধারালো অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ বই উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৮১টি মোটরসাইকেল আটক করা হয়।

১১ জুন প্রেরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১০ জুন ৩৭ জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ জন জেএমবি, ৭ জন জেএমজেবি এবং বাকি ৩ জন অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। এ ছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল, নিয়মিত মামলা এবং অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার মামলায় মোট ৩১৫৫ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত আসামিদের মধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা মূলে ১৮৬১ জন, নিয়মিত মামলায় ৯১৭ জন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার মামলায় ১৯ জন এবং মাদক উদ্ধার মামলায় ৩৫৮ জন। গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের কাছ থেকে ১টি শুটারগান, ১ রাউন্ড গুলি, ৫০০ গ্রাম গানপাউডার, ১৫টি ককটেল, ২১টি জেহাদি বই এবং ১৫টি ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭৫৭টি মোটরসাইকেল আটক করা হয়েছে।

পরের তিন দিনের মোট গ্রেফতারের হিসাব পুলিশ সদর দফতর থেকে দেয়া হয়নি। তবে এই তিন দিন গড়ে প্রায় তিন হাজার গ্রেফতার হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। একাধিক সূত্র বলেছে, গ্রেফতার নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে পুলিশ সদর দফতর গ্রেফতারের পুরো তালিকা প্রকাশ না করে শুধু জঙ্গিদের গ্রেফতারের তালিকা মিডিয়ায় প্রকাশ করে। পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহছান বলেছেন, ওই ক’দিন গড়ে দু-তিন হাজার গ্রেফতার হয়েছে। পুলিশ সদর দফতর জানায়, সাত দিনের জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের মোট ১৯৪ জন জঙ্গি সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের মধ্যে ১৫১ জন জেএমবি, ৭ জন জেএমজেবি, ২১ জন হিজবুত তাহ্রীর, ৬ জন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, ৩ জন আনসার আল ইসলাম, ৪ জন আল্লার দল, ১ জন হরকাতুল জিহাদ এবং ১ জন আফগান ফেরত জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। বিশেষ অভিযানে ১৯৪ জন জঙ্গি গ্রেফতার হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত খুনগুলোর সাথে সম্পৃক্ত কোনো জঙ্গি এরমধ্যে নেই বলে জানা যায়। পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে কিছু জানানো হয়নি।

গত ৯ জুন পুলিশ সদর দফতরে আয়োজিত এক সভায় সিদ্ধান্ত হয় জঙ্গি ও সন্ত্রাসী গ্রেফতারে দেশজুড়ে সপ্তাহব্যাপী সাঁড়াশি অভিযানের। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন। ৯ জুন সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয় অভিযান। তবে পুলিশের তথ্যে ১০ জুন থেকে গ্রেফতারের কথা উল্লেখ করা হয়।

এ দিকে শুরু থেকেই বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ থেকে এই অভিযানের বিরোধিতা করা হয়েছে। অভিযানের নামে তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের অভিযোগ করা হয় দল দু’টির পক্ষ থেকে। নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে আজ ১৮ জুন বিএনপি সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এ দিকে জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান গতকাল বলেছেন, সরকার উচ্চ আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে দেশব্যাপী গণগ্রেফতার অভিযান চালিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির ও বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করেছে।

অপর দিকে সাত দিনের অভিযান শেষে গতকাল সকালে নিজ বাসায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেছেন, চলমান সাঁড়াশি অভিযানে গত সাত দিনে ১৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঈদ সামনে রেখে এ ধরনের অভিযান সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি এনেছে। তিনি বলেছেন, টার্গেট কিলিং ও জঙ্গিবাদ দমনেই সারা দেশে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। এ অভিযানে কোনো ধরনের পুলিশি গ্রেফতারবাণিজ্য হয়নি।

সূত্র:   নয়াদিগন্ত
Advertisements