জামায়াত নিষিদ্ধের আগে ‘গ্রাউন্ড ওয়ার্ক’ হিসেবে চারটি বিষয় নিয়ে কাজ করছে সরকার। ইস্যুগুলো হলো (১) জামায়াতের পক্ষের আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে তোলা, (২) জামায়াতপন্থী সংগঠনগুলোকে জামায়াতের ভেতর থেকে বের করে আনা, (৩) নিষিদ্ধ করা হলে সংগঠনটির নেতারা যেন অন্য কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর ভর না করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা ও (৪) নিষিদ্ধের পর দলটির নেতাকর্মীরা যেন দেশের ভেতরে কোনও বৈরি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা। এই চারটি ইস্যু নিশ্চিত হওয়ার পরই জামায়াত নিষিদ্ধের কাজ দ্রুত শেষ করতে চায় ক্ষমতাসীন দলটি। তবে, গুরুত্বপূর্ণ এ চার ইসুতে সফলতা আসতে দেরি হলে জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়টিও বিলম্বিত হবে। সরকারের একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী কয়েকজন নেতা জানান, ‘গ্রাউন্ড ওয়ার্ক’গুলো শেষ না করে জামায়াত নিষিদ্ধ করে উটকো একটি ঝামেলা আপাতত ঘাড়ে তুলে নিতে চায় না সরকার। এ জন্যে আরও কিছু সময় দরকার হলেও তা নিতে চায় ক্ষমতাসীন দলটি।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে নিজামী, মুজাহিদদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সেই রায়ও কার্যকর করা হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার অভিযোগে ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সংগঠন হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধেরও ব্যাপারেও সচেষ্ট তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাহী আদেশে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা ঝুঁকি বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। তাই জামায়াত নিষিদ্ধ করতে আইনি প্রক্রিয়ার পথ অনুসরণ করেছে সরকার। এ প্রক্রিয়ায় যাওয়ার কারণে কিছুটা ধীরগতিতে হচ্ছে জামায়াত নিষিদ্ধ করার কার্যক্রম। সরকার মনে করছে, নির্বাহী আদেশে জামায়াত নিষিদ্ধ সম্ভব, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায় গেলে কিছুটা বিলম্ব হলেও পাকাপোক্ত হয় কাজটি।

আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা রয়েছে, জামায়াত নিষিদ্ধের আগে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মানসিকতা কী—তা নিশ্চিত হওয়া। এক্ষেত্রে তাদের সমর্থন ইতিবাচক হলে জামায়াত নিষিদ্ধে তা সরকারের পক্ষে কাজ করবে। এ জন্যে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিগগিরই জামায়াত নিষিদ্ধ হবে। এ বিষয়টি নিয়ে কিছু কাজ চলছে। নির্বাহী আদেশ এ সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার কথা সরকার ভাবছে না বলেই কিছুটা দেরি হচ্ছে তাতে। আইনি প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ হবে জামায়াত। তিনি বলেন, এজন্য ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম অ্যাক্ট ট্রাইব্যুনাল’ সংশোধনের কাজ চলছে। সংশোধনের কাজ শেষ পর্যায়ে। শেষ হলেই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সংগঠন হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধের আবেদন করা হবে। এটি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

নীতি-নির্ধারণী মহল বলছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির পাশাপাশি ইসলামী সংগঠনগুলোর মধ্য থেকে জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি জোরালো হলে সরকারের জন্যে তা পোয়াবারো। জামায়াত নিষিদ্ধের পরে যেন অন্তত কোনও ইসলামী দল ও সংগঠনের ভেতর থেকে আন্দোলন না হয়, তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। একইসঙ্গে ইসলামী সংগঠনগুলোর সঙ্গেও যেন সম্পর্ক নষ্ট না হয়—এ পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের রয়েছে। আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী মহল মনে করছে, ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো জামায়াত নিষিদ্ধের দাবিতে একাট্টা হলে অনেকটা নির্বিঘ্নে কাজটি করা সম্ভব হবে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সংগঠন হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ বদ্ধপরিকর। বিষয়টি নির্ভেজালভাবেই করতে চায় সরকার। তাই এক্ষেত্রে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। জামায়াত নিষিদ্ধ এখন সময়ের ব্যাপার। তবু এ কাজটি করার জন্য জোরালো জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমরা চাই, জামায়াত নিষিদ্ধ সর্বস্তরের দাবি হয়ে উঠুক। তিনি বলেন, সরকার মানবতাবিরোধীদের বিচার করেছে। শুধু বিচার কাজই নয়, তাদের রায়ও বাস্তবায়ন করেছে। জাতি বিশ্বাস করে জামায়াত নিষিদ্ধের কাজটিও আওয়ামী লীগ সরকারই করবে।

Advertisements