নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করে। কয়েক বছর ধরে দ্রুত হারে বাড়তে থাকে তা। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু গড় আয় ১ হাজার ৩১৬ ডলার, টাকার অঙ্কে যা ১ লাখ ৫ হাজারের কাছাকাছি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভাগ্যদেবী সবচেয়ে বেশি সুপ্রসন্ন ছিলেন জনপ্রতিনিধিদের ওপর।

সুইজারল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাস ও সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) যৌথভাবে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ছয় বছরের কম সময়ের ব্যবধানে সংসদ সদস্যদের (এমপি) আয় বেড়েছে ৩২৪ শতাংশ। বর্তমানে এমপিদের বার্ষিক গড় আয় প্রায় কোটি টাকা, যা একজন সাধারণ মানুষের আয়ের প্রায় শতগুণ। সংসদ নির্বাচনের আগে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের জমা দেয়া আয় বিবরণীর ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

‘দ্য রিয়েল পলিটিকস অব বাংলাদেশ: দি ইনসাইড স্টোরি অব লোকাল পাওয়ার ব্রোকারস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে জমা দেয়া হলফনামার হিসাব বিবরণী পর্যালোচনা করে বলা হয়, ২০০৮ সালে নির্বাচিত এমপিদের মাথাপিছু বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ ২৭ হাজার টাকা। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে অর্থাৎ ২০১৩ সালের শেষে এ আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৮ লাখ ৭১ হাজার টাকায়। অর্থাৎ ছয় বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে সংসদ সদস্যদের আয় বেড়েছে ৩২৪ শতাংশ।

তবে ২০০৮ ও ২০১৩— এ দুই বছরই বার্ষিক আয়ের পরিমাণ শূন্য দেখিয়েছেন ২৩ জন এমপি। পর্যালোচনায় এদের আয় শূন্য ধরেই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনপ্রতিনিধিদের আয় বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করলেও সার্বিক বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের আয় ও সম্পদ বিবরণী নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। এতে সাতটি ভিন্ন ভিন্ন খাত থেকে তাদের আয়ের পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট সম্পদের বিশদ বিবরণ নেয়া হয়। খাতগুলো হলো— কৃষি, বাড়িঘর বা দোকানপাট অথবা এ ধরনের ভাড়া আদায়যোগ্য সম্পদ, ব্যবসা, আর্থিক সম্পত্তি, চাকরি কিংবা এ ধরনের সমজাতীয় পেশা। যেসব আয় বা সম্পদ এ ছয় খাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, সেগুলোকে ‘অন্যান্য’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর এ বিবরণীর ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরিতে সংসদ সদস্যদের আয় বিবরণীকে দুটি আলাদা ভাগে বিভক্ত করা হয়। এর একটিতে রাখা হয় পুনর্নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আয় বিবরণী। আর অন্য ভাগে পর্যালোচনা করা হয় নবনির্বাচিত এমপিদের আয় বিবরণী। এতে দেখা যায়, ২০১৩ সালের শেষে পুনর্নির্বাচিত এমপিদের গড় বার্ষিক আয় ছিল ১ কোটি ৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে নবনির্বাচিত এমপিদের গড় বার্ষিক আয় ৯২ লাখ টাকা। ২০০৮ সালে পুনঃ ও নবনির্বাচিত উভয় ভাগেরই গড় আয়ের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত এমপিদের আয় বেড়েছে ২৯২ শতাংশ। আর পুনর্নির্বাচিতদের ক্ষেত্রে এ বৃদ্ধির হার ৩৫৫ শতাংশ।

ছয় বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের গড় মাথাপিছু আয় ও মূল্যস্ফীতির বিপরীতে জনপ্রতিনিধিদের এ পরিমাণ আয় বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য-উপাত্ত যাচাই না করে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শুধু রাজনীতিবিদ নন, সবার আয়ই বেড়েছে।

আয় বিবেচনায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করে পর্যালোচনা করা হলে সেখানেও আয়বৈষম্যের বিষয়টি উঠে আসে। এমপিদের আয় বিবরণী পর্যালোচনায় আরো যেসব বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো— আয়বৈষম্যের ব্যাপক বর্ধনশীলতা ও ২০ শতাংশ এমপির আয়ে বাকি ৮০ শতাংশের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত উল্লম্ফন।

২০১৩ সালে আয়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ২০ শতাংশ এমপির বার্ষিক গড় আয় ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। অন্যদিকে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ২০ শতাংশের গড় আয় ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ এ সময় আয়ের দিক থেকে সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা এক-পঞ্চমাংশ এমপির তুলনায় সবচেয়ে এগিয়ে এক-পঞ্চমাংশের গড় আয় ১২৬ গুণ বেশি ছিল। যদিও ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা ২০ শতাংশ এমপির বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৮৮ লাখ ও ২ লাখ ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে উভয় দলভুক্ত এমপিদের আয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ৪১ গুণ।

একই সঙ্গে এ সময়ের ব্যবধানে আয় প্রবৃদ্ধির দিক থেকে  উপরের ২০ শতাংশই এগিয়ে ছিল সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে প্রথমোক্ত দলের আয় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৬৫ শতাংশ আর শেষোক্ত দলের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ উভয় অংশের আয় প্রবৃদ্ধির অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৭ঃ১।

খোদ জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেই এ পরিমাণ আয়বৈষম্য নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ক্ষমতায় থেকে যারা তা ব্যবহারের সুযোগ বেশি পেয়েছেন, তাদেরই সম্পদ বেড়েছে বেশি। আর যারা সুযোগ কম পেয়েছেন, তুলনামূলক কম পরিমাণে তাদের সম্পদ বেড়েছে। সংসদ সদস্যদের সম্পদ ও আয় বিবরণীতে কোনো ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে তা ভালোভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।

এমপিদের আয়ের সবচেয়ে বড় উত্স হলো ব্যবসা। ২০০৮ সালে ব্যবসা থেকে জনপ্রতিনিধিদের বার্ষিক গড় আয়ের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা। বিভিন্ন আর্থিক সম্পত্তিতে বিনিয়োগ বাবদ ২০০৮ সালে এমপিদের গড় বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। ২০১৩ সালে এ খাত থেকে তাদের গড় বার্ষিক আয় দেখানো হয় ২০ লাখ ৫২ হাজার টাকা। ব্যবসার পর এমপিদের আয়ের দ্বিতীয় শীর্ষ উত্স হিসেবে রয়েছে আর্থিক সম্পদ। আর পেশাজীবী হিসেবে তাদের আয় সবচেয়ে কম।

জানতে চাওয়া হলে চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের এমপি মঈনউদ্দিন খান বাদল বলেন, এখন যারা রাজনীতিতে আসেন, তাদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। প্রতিবেদনে ৩২৪ শতাংশ আয় বৃদ্ধির কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে আয়ের পরিমাণ যদি আরো বেশি হয়, তাতেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

সূত্র: বনিক বার্তা

Advertisements