ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ আসামী ॥ বাথরুমে রাত কাটাচ্ছে অনেকে
‘রাখিব নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ’ এই ভিশন নিয়ে দেশের কারাগারগুলোয় কার্যক্রম চললেও এখন অতিরিক্ত বন্দীর চাপে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় চলছে দেশের ৬৮ কারগারে। ধারণ ক্ষমতার কোথায়ও তিন আবার কোথায়ও চারগুণ বন্দী রয়েছে এসব কারগারে। এছাড়া প্রতিদিন শত শত মানুষ কারাগারে যাচ্ছে। পুলিশের চলমান বিশেষ অভিযানে ৩ দিনই গ্রেফতার হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ জন । এদের ২/৪জন ছাড়া বেশীরভাগই জেলে গেছে।

অভিযোগ রয়েছে পুলিশ জঙ্গি গ্রেফতারের নামে রাতে আধারে নিরীহ মানুষকে আটক করছে। এরা বেশীরভাগই বিএনপি কিংবা জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত। আটককৃত এসব মানুষকে কোন না কোন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলার পর জামিন না মঞ্জুর হওয়ায় জেলে পাঠাচ্ছে।

জেল খেটে সম্প্রতি বেরিয়েছে এমন কয়েকজন বন্দীর সাথে আলাপ করে জানা গেছে,ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুন বেশি বন্দী নিয়ে মারাত্মক সঙ্কটে পড়েছে কারা প্রশাসন। কারা অভ্যন্তরে দেখা দিয়েছে মারাত্মক বিপর্যয়। বন্দীর অতিরিক্ত চাপে বেশিরভাগ কারাগারে চলছে খাদ্য, চিকিৎসা, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও শোয়ার জায়গার মহাসঙ্কট। একজনের শোয়ার জায়গায় আছেন ৫ থেকে ৭ জন। অনেকেই বাধ্য হয়েই পালা করে ঘণ্টা হিসাবে কোনোমতে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন। অনেকে রাত কাটাচ্ছে বাথরুমে। আবার অনেক সেলে বন্দীরা রাতে নির্ঘুম রাত্রি যাপন করছেন। এছাড়া, মশার উপদ্রব চরম আকার ধারণ করেছে। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকায় মানবিক বিপর্যয় এবং কারাবন্দীদের ক্ষোভ বাড়ছে। তবে, কারা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, বিপুলসংখ্যক বন্দীর ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, কারাগারে অতিরিক্ত বন্দীর বিষয়টি স্বীকার করে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানিয়েছেন, দেশের কারাগারগুলোতে ৩৪ হাজার ৭৯৬ জন ধারণ ক্ষমতার মধ্যে বন্দী রাখা হয়েছে প্রায় ৬৯ হাজার ৭৭৪ জন। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ বন্দী কারাগারে রাখা হয়েছে। বন্দী ধারণক্ষমতা ৮০ হাজার হওয়া উচিত। তিনি জানান, সর্বশেষ তথ্য অনুসারে গত ২৪ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখ পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে ৬৯ হাজার ৭৭৪ জন বন্দী আছে। আর অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে, ১৭ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কারাবন্দী ছিলো ৭৫ হাজার ৯২৭ জন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথ্য দেওয়ার পর কেটে গেছে আরো সাড়ে ৩ মাস। এ সময় প্রতিদিনই জেলে যাচ্ছে মানুষ। দিন যতই যাচ্ছে কারাগারে বন্দীর সংখ্যা আরো বাড়ছে।

সূত্র জানায়, ভোটার বিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীর নানাভাবে জুলুম নির্যাচন চালিয়ে যাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই গ্রেফতার করা হচ্ছে বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের। আন্দোলন ঠেকানোর জন্য চলতি বছরে ৩ জানুয়ারি থেকে প্রতিদিনই সারা দেশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। চলছে গণগ্রেফতার । এসব গ্রেফতার অভিযানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পুলিশের সাথে অভিযানে অংশ নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, চট্রগ্রামে পুলিশ সুপারের স্ত্রী খুন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে গুপ্তহত্যার ঘটনায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোন তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই একতরফা বিএনপি- জামায়াতকে দোষারোপ করা হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে পুলিশ সারা দেশে অভিযানের নামে চালাচ্ছে গণগ্রেফতার। অভিযানে গ্রেফতার হচ্ছেন বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মী এবং নিরীহ মানুষ। গ্রেফতারকৃতদের জেলে পাঠানো হচ্ছে।

সূত্র জানায়, রাজনৈতিক বন্দী ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় কারাগারের কক্ষে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। কারা ভবনের বারান্দা, বাথরুমের সামনে এমনকি ফাঁকা স্থানেও তাঁবু টানিয়ে বন্দী রাখা হচ্ছে। এতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার বন্দী। এছাড়া অতিরিক্ত বন্দী থাকায় কারাগারের ভেতরে ও বাইরের নিরাপত্তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ।

গত ফেব্রুয়ারির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দীর ধারণক্ষমতা ২ হাজার ৬৮৬ জন। অথচ সেখানে অবস্থান করছেন এর কয়েকগুণ বেশি বন্দী। সেখানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার বন্দী অবস্থান করছেন। একই চিত্র দেশের অন্য কারাগারগুলোতেও। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৮৫৩ হলেও রয়েছেন প্রায় ৬ হাজার বন্দী। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ হাজার ৪৭৭ জনের স্থলে অবস্থান করছেন সাড়ে ৩ হাজারের বেশি বন্দী।

এছাড়া ঢাকা বিভাগের ২১টি কারাগারে অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ১০ হাজার ৯০২ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ১০ হাজার ২৯৫ জন ও নারী ৬০৭ জন। কিন্তু বর্তমানে এই কারাগারগুলোতে ২৫ হাজার ৩৬ জন রয়েছে। রাজশাহী বিভাগের ৮টি কারগারের ১০ হাজার ১০৮ জন বন্দীকে রাখা হয়েছে। এ কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা ৪ হাজার ১৬৪ জন।

রংপুর বিভাগের ৮টি কারাগারে ৫ হাজার ১৭৪ জন বন্দী রয়েছে। এই ৮টি কারাগারের ধারণক্ষমতা ৪ হাজার ৪৪৭ জন। চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি কারাগারে ১৫ হাজার ১৪৮ জন কারাবন্দী রয়েছে। এ সব কারাগারের ধারণক্ষমতা ৫ হাজার ৭২৯ জন। এ ছাড়া সিলেট বিভাগের ৪টি কারাগারের ধারণক্ষমতা ২ হাজার ৩৪৬ জন। বর্তমানে সেখানে ৪ হাজার ৮৫৩ জন বন্দী রয়েছে। খুলনা বিভাগের ১০ কারাগারের ধারণক্ষমতা ৪ হাজার ৭৬০ জন। বর্তমানে রয়েছে ৯ হাজার ৩৪৬ জন। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগের ৬টি কারাগারে ধারণক্ষমতা ১ হাজার ২৯৬ জন। বর্তমানে বন্দী রয়েছে ৩ হাজার ১৩৭ জন।

বন্দীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে একাধিক জেল সুপার জানান রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধির কারণে হঠাৎ করে বন্দীর সংখ্যা বেড়েছে। তারা বলেন, আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম চললে অনেক আসামী জামিন পান। তবে কোনো ধরনের সমস্যার কথা অস্বীকার করেন তারা।

অতিরিক্ত বন্দীর চাপে কারাগারে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে প্রবীণ আইনজীবী রফিকুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, একজন বন্দীর অধিকার জেল কোডে উল্লেখ রয়েছে। এর কোনো ব্যত্যয় হলে তা মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে পরিগণিত হবে। আর মাত্রাতিরিক্ত বন্দীর বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন কারাগারগুলোর নির্মাণ সম্পন্ন হলে এ অবস্থা কিছুটা প্রশমন হবে।

ইসলামিক মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এডভোকেট মাইন উদ্দিন মিয়া গতকাল দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, কারাগারের যে অবস্থা তাতে মানবিক বিপর্যয় চলছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়ে জেলে যাচ্ছে। মানুষের ন্যূনতম মানবধিকার নেই । যে হারে বন্দী বাড়ছে তাতে কারগারের বাথরুম কালিবাড়ি এবং কেসিগেট এলাকায় মানুষের স্থান সংকুলন হবে না। তিনি বলেন, সরকারের উচিত হবে নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে বিনা দোষে গ্রেফতার করে যেন জেলে না পাঠানো হয়।

Advertisements