মুক্তিযোদ্ধা মো.শাহজাহান মিয়ার বয়স এখন ৭০ ছুঁই ছুঁই। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ভারতের বীরভূমের  চাঁদপাড়া ক্যাম্প থেকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে এসে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তিনি।

৮ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন তিনি। তার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন এমএ জলিল। যুদ্ধ করেছেন যশোরের ফোকরা এলাকায়। এ ছাড়াও মাদারীপুরের শিবচর, কলাবাড়ি ও বরিশালের শিকারপুরে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ শেষে জাতির জনকের নির্দেশে অস্ত্র জমা দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এমএ জলিল তাকে মুক্তিযুদ্ধের সনদ দেন। তাকে সনদ দিয়েছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা স্টুয়ার্ড মুজিবও।

১৯৯৮ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম গেজেটভুক্ত হওয়ার সময় তিনি দেশের বাইরে থাকায় নাম ওঠেনি গেজেটে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের জুলাই মাসের ১৯ তারিখ নাম গেজেটভুক্ত করতে আবেদন করেন তিনি। এরপর বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে নাম যাচাই বাচাই করে মাদারীপুরে পাঠানো হয়। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল কর্তৃক প্রেরিত তালিকায়ও তার নাম ছিল।

গেজেটভুক্তকরণ ও সাময়িক সনদ প্রদানের জন্য ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল  মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কাগজপত্র ও সহযোদ্ধা কর্তৃক প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্রের মূলকপিসহ তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়। যথাসময় উপস্থিত থাকলেও তিনি সনদ পাননি।

এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই সনদ পাওয়ার ব্যাপারে। সনদের জন্য ছোটাছুটি করে তিনি এখন ক্লান্ত। মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধেও এতটা ক্লান্ত হইনি, যতটা হচ্ছি সনদ সংগ্রহ করতে ঘুরে ঘুরে।’

তিনি জানান, বয়সের ভারে এখন তিনি ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। জীবদ্দশায় তিনি সরকারি তালিকায় নিজের নাম দেখে যেতে চান। তাই একটি সনদের জন্য এখনো ছোটাছুটি করছেন। এভাবে ছোটাছুটি করতে গিয়ে তার একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করার চেয়েও যেন অনেক কঠিন কাজ একটি সনদ পাওয়া।

মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘আমরা চাই প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা তার প্রাপ্য সম্মান পাক। কোনো মুক্তিযোদ্ধা যেন অবহেলার শিকার না হয়।’

মাদারীপুর সদর উপজেলা ধুরাইল গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর হোসেন, বলেন, ‘আমরা একই সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। কিন্তু আমার নাম যখন (১৯৯৮ সাল) গেজেটভুক্ত করি তখন শাহজাহান দেশের বাইরে থাকায় তার নাম গেজেটভুক্ত করতে পারেনি। আমরা চাই শাহজাহানের নাম গেজেটভুক্ত হোক। আমরা একই সঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছি, এক সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। আমি সনদ পেলে শাহজাহান কেন পাবে না। আমরা দাবি জানাই শাহজাহান যেন দ্রুত সনদ পায়।’

মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘অর্থ ও বয়স কোনোটাই আমার নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার শেষ আবেদন- জীবিত অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চাই, মুক্তিযোদ্ধার সনদ চাই।’

মাদারীপুর বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহজাহান হাওলাদার বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য দিনের পর দিন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অফিসে অফিসে ঘুরবে এটা দুঃখজনক। বর্তমানে যারা সনদ প্রদানের নীতিনির্ধারক তারা প্রায় সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পরে জন্মগ্রহণ করেছে। তাই তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ তিতিক্ষা সম্পর্কে ধারণা কম।’ তিনি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে সরে এসে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সহজে সনদ প্রদানের আহ্বান জানান।

এ ব্যাপারে মাদারীপুরের বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শফিউর রহমান বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি।বিষয়টি আমার জানা নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের সাময়িক সনদ প্রদান এবং গেজেটভুক্তকরণ কাজটি অত্যান্ত স্পর্শকাতর। তাই ইচ্ছে থাকলেও সহজেই এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয় না।’

সূত্র: রাইজিংবিডি ডট কম

Advertisements