বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতিতে অধ্যাপনা করেছেন। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। বাংলাদেশের বাজেট এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার গতি-প্রকৃতির ওপর নজর রাখেন তিনি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন তিনি। ড. মুস্তাহিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গোলাম রাব্বানী

প্রশ্ন : নতুন অর্থবছরের বাজেটের কোন দিকটিকে দেশের চলমান অর্থনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? অনেকেই এবারের বাজেটের লক্ষ্যগুলোকে উচ্চাভিলাষী বলতে চাইছেন। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : গত অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের তুলনায় এবার বাজেটের আকার ১৫ শতাংশ বেশি। গত বছরের বাজেট সংশোধন করে দুই লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল। সে হিসাবে গত অর্থবছরের তুলনায় এই বাজেট প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা বেশি। এটা থেকে ধারণা করা যায়, আমরা জাতি হিসেবে অত্যন্ত উচ্চভিলাষী হয়ে গেছি। বাজেটে অর্থমন্ত্রী তার উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সেই সাথে সামর্থ্যরে দিকটুকুও দেখতে হবে। আমাদের সামর্থ্য এত নেই। অর্থমন্ত্রী প্রস্তাব করেছেন যে, দেশের ভেতর থেকেই তিনি আয় করবেন ২ লাখ ৪৮ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরকে আদায় করতে হবে দুই লাখ তিন হাজার ১৫২ কোটি টাকা। এ ছাড়া এনবিআরবহির্ভূত কর হচ্ছে প্রায় সাত হাজার ২৫০ কোটি টাকা ও এনবিআরবহির্ভূত আয় আসবে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ অর্থাৎ প্রায় ২৮-২৯ শতাংশ আসবে অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক অনুদান থেকে। সরকার চাচ্ছে, এর মধ্যে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে, ১৯ হাজার কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র থেকে সংগ্রহ করতে এবং প্রায় ৩২ হাজার কোটি বৈদেশিক ঋণ পেতে। এর ফলে অনুদান ছাড়া ঘাটতি হবে প্রায় সাড়ে ৯২ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি আমাদের জিডিপির তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ। ঘাটতির এই পরিমাণ বাজেটের যে নীতি প্রণয়ন করা হয়, তার মধ্যেই আছে; কিন্তু সম্ভবত একধরনের সম্প্রসারণশীলতা এই বাজেটের মধ্যে থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাই, সমতাভিত্তিক অর্থনীতি চালু করতে চাই। এসব বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বাজেটের প্রথম দিকে কিছু কথা বলেছেন, তিনি প্রবৃদ্ধি চান, উন্নয়ন ও সমতাভিত্তিক সমাজ চান। এর জন্য কতগুলো অনুমান তিনি করে নিয়েছেন যে, দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি আরো বাড়বে। বিশ্ব অর্থনীতিতে শ্লথগতি চলছে এবং তেলসহ বেশ কিছু জিনিসপত্রের দাম পড়ে গেছে। সেই অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক বেশি রফতানি প্রবৃদ্ধি হবে বলে তিনি মনে করছেন। তিনি মনে করছেন যে, অনেক বেশি রেমিট্যান্স আসবে, মূল্যস্ফীতি কম থাকবে, বিনিয়োগের একটা পরিস্থিতি বজায় থাকবে।

বাস্তবতাটা কী? বাস্তবতার নিরিখে আমরা যদি চিন্তা করি তাহলে এখানে একটা সমস্যা দেখতে পাই। সমস্যাটা হলো বাস্তবতার নিরিখে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য আমার কৌশলটা কী, সেটা। তার জন্য আমার সক্ষমতা আছে কি না? অর্থমন্ত্রী বলছেন, তার সক্ষমতা আছে। তার দাবি তিনি এনবিআরকে শক্তিশালী করেছেন ইত্যাদি; কিন্তু এনবিআরকে যতই শক্তিশালী করা হোক না কেন, আমরা দেখেছি, কোনো অবস্থাতেই রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশ অতিক্রম করেনি। গত অর্থবছরে এনবিআরের নির্ধারিত টার্গেট ছিল এক লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। সেখানে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা, সেটাও আদায় হয় কিনা সন্দেহ আছে। আমার ধারণা, সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হবে।
এবার বাজেটে ৩৫ শতাংশের বেশি রাজস্ব বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এই টার্গেট পূরণ সম্ভব নয় এ কারণে যে, সেটা গত বছরই আমাদের প্রমাণ করে দিয়েছে। গত বছর রাজস্ব আদায়ের যে টার্গেট আমরা নির্ধারণ করেছিলাম, সেটি অর্জিত হয়নি। বরং ঘাটতি রয়ে গেছে ১৫-১৬ শতাংশ। সে কারণে আমার ধারণা যে, অর্থমন্ত্রী যে এসব বলছেন, তা কেবল বলার জন্য বলা। তাকে বলতেই হবে। কারণ একটি ভোটারবিহীন নির্বাচনে তারা সাংবিধানিকভাবে একটা বৈধ সংসদ পেয়েছে। সেই সংসদই বাজেটটা তৈরি করছে গত দু-তিন বছর ধরে। তারা রূপকল্প দিতেই পারেন। বাস্তবতা আরো কঠিন। এই কঠিনের মধ্যে আমরা সবচেয়ে বেশি অনুভব করি, কেন দেশীয় বিনিয়োগ এখন শ্লথগতিতে নেমে এসেছে। সরকার বলছে, বিনিয়োগের হার হচ্ছে ২১.৭৮ শতাংশ। এটা হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগ। আমার ধারণা, এখানে কিছুটা বেশি করে দেখানো হয়েছে। এটা ২০ শতাংশের কাছাকাছি।

প্রশ্ন : বিনিয়োগে কেন এই স্থবিরতা নেমেছে বলে আপনি মনে করেন?
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : এর কারণ হচ্ছে, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের যে সঙ্কট আছে আমাদের, সেটার কোনো সমাধান দিতে পারছে না সরকার। বিনিয়োগকারী যারা, তারা কোনো জমি পাচ্ছেন না। আমাদের দেশে যেটাকে আমরা বলি কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস, সেটা অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশে বেশি। যেকোনো বিষয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখানে বেশি। ছয় মাসের বেশি লাগে বিদ্যুতের অনুমোদন পেতে। যেটা পাকিস্তান, ভারত, নেপাল এমনকি শ্রীলঙ্কার তুলনায়ও আমরা অনেক বেশি সময় নিয়ে থাকি। বিনিয়োগকারীরা যখন বিনিয়োগ করতে আসেন, তখন যদি দেখেন যে, তার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেটা দরকার, গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, জমি ইত্যাদি এবং তার সাথে যদি আমি কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস চিন্তা করি, তাহলে বিনিয়োগটা তাদের জন্য আকর্ষণীয় থাকে না। সে কারণেই অনেক সময় আমাদের দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে যায়। কারণ, এখানে সুযোগ না পেয়ে যারা বিত্তশালী মানুষ, যারা বিনিয়োগ করতে চান, তারা দেশে বিনিয়োগ না করে বাইরে অর্থ পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
সরকার আশা করছে যে, বৈদেশিক বিনিয়োগ আমাদের দেশে হবে। যেখানে দেশের মানুষই স্বস্তি পাচ্ছে না, সেখানে বিদেশী বিনিয়োগ কী করে আসবে? এটা অবাস্তব কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিনিয়োগ আসার অনেক বড় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বর্তমান বিশ্বে। চীনের অনেক বিনিয়োগ আশপাশের দেশে চলে যাচ্ছে। তারা এতদিন ভিয়েতনামে গেছে, এখন ভিয়েতনাম থেকে অন্যান্য দেশে যাচ্ছে। বাংলাদেশে একটা বড় সুযোগ ছিল; কিন্তু সেখানে আসবে কি না সন্দেহ আছে। এমনকি ভারতে প্রচুর বিনিয়োগ যাচ্ছে। থাইল্যান্ডে যাচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারেও যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কাতে তো এত দিন ছিলই। এই বিনিয়োগগুলো কিন্তু আমাদের দেশে আসত, যদি আমরা পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারতাম। অর্থাৎ বিনিয়োগের জন্য যে অনুকূল পরিবেশ, সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।
কথা হচ্ছে যে, দেশের মানুষ কেমন আছে? বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী? এটা অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড একটা প্রভাব ফেলে। আমরা যদি খেয়াল করি যে, বর্তমান সময়ে দেশের মানুষ কথা বলতে পারছে না।
স্বাধীনভাবে কথা বলা এবং লেখার ওপর কতখানি নিয়ন্ত্রণ সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে, এটা বাইরে থেকে আমরা হয়তো ততটা বুঝতে পারব না। গণমাধ্যমকর্মীরা তিলে তিলে সেটি টের পাচ্ছেন। দেশের এরকম একটা অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ করতে কে আসবে। কে তার টাকা খরচ করে বিনিয়োগটা করতে যাবে?

প্রশ্ন : এর পরও তো দেশে উৎপাদন বেড়েই চলেছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে অন্তত আমরা তাই দেখছি।
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে এখন শ্রমের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা অনেক বেড়েছে। আমাদের দেশের যে অসুবিধাটা হলো- আমাদের দক্ষ শ্রমিকও কিন্তু উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আমাদের যে তরুণ সম্প্রদায়, তাদের আমরা প্রযুক্তিগত দিকে আকর্ষণ করিয়েছি ঠিকই, কিন্তু এই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য তাদের যে প্রশিক্ষণ সেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারিনি। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিনি শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন; কিন্তু প্রশিক্ষণের জন্য তিনি কত টাকা দেবেন, কোথায় সে প্রশিক্ষণ হবে, সেসব কিন্তু স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতার কারণে একটা ধোঁয়াশা অবস্থায় আমরা আছি। এ কারণেই প্রশ্ন উঠছে, জনগণের কাছে কি এই সরকারের কোনো দায়দায়িত্ব আছে? তারা কি সত্যিই জনগণের প্রতিনিধি? তারা তো আসলে জনগণের প্রতিনিধি নন। জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে প্রতিষ্ঠা করেনি। সুতরাং তাদের সেই দায়িত্বও নেই। তারা একটি দায়সারা কাজ করে যাচ্ছেন। তবে অর্থমন্ত্রীকে দোষ দিয়ে লাভ নাই। তিনি অত্যন্ত মেধাবী একজন মানুষ। অত্যন্ত সংবেদনশীলও। সাথে তার বক্তব্য, কথা ও কাজকর্মে সব সময় তাকে অত্যন্ত দেশপ্রেমিক একটি মানুষ মনে হয়েছে; কিন্তু তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে কাজ করছেন।

প্রশ্ন : সরকার রাজস্ব আদায়ের জন্য মূল্য সংযোজন করের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা এবার আয়করকে ছাড়িয়ে গেছে। এভাবে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে অনেকে মনে করছেন। এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন।
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : একটা দিক হয়তো বলা যায় যে, সরকার নিশ্চিতভাবেই হয়তো কিছু রাজস্ব পাবে। আয়করের তুলনায় ভ্যাটে প্রাধান্য চলে গেছে। যদিও ভ্যাট আইন সংশোধন করার কথা ছিল এ বছর, তাতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট করার যে প্রস্তাব ছিল, সেটা এক বছর পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। এই ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে হলে মুদির দোকানেও অটোমেটিক ক্যাশ রেজিস্টার লাগবে। সেখানে কত টাকা বিক্রি হলো সে রেকর্ডটা থেকে যাবে। সে রেকর্ড থেকে এনবিআরের লোকজন এসে ডাটা কালেক্ট করবেন। অথবা এটা কম্পিউটারের সাথে যুক্ত থাকবে, অটোমেটিক্যালি জানা হবে যে, একটা দোকানে কত টাকা বিক্রি হয়েছে এবং সেই দোকানে কয়জন কর্মচারী কাজ করেন। এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলেই শুধু নতুন ধরনের ভ্যাট-ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব। যেটা উন্নত দেশে থাকে। তা না হলে প্যাকেজ ভ্যাটই (যেটা চলছে) আমাদের জন্য সুবিধাজনক। সেখানে যেটা বাড়ানো হয়েছে সেটা হলোÑ আগে যেটা ১৪ হাজার টাকা ছিল প্যাকেজ, সেটা জাস্ট দ্বিগুণ হয়েছে, অর্থাৎ ২৮ হাজার টাকা হয়েছে। এরকমভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভ্যাট বেশি আদায় হবে। এনবিআর আয়করের ব্যাপারে নতুন কোনো কৌশল নিয়েছে কি না আমার জানা নেই। তবে অনেক দিন থেকেই তারা জাতীয় পরিচয়পত্র ও টিআইএন দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে যে, কেউ কর ফাঁকি দিচ্ছে কি না। এভাবে যতটা বেশি আদায় করা যায়, এ ধরনের একটা পলিসি তারা নিয়েছে। আয়করের আওতা বাড়বে যেহেতু এখনো আয়করের সীমানা দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা রাখা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে অনেক কিছু না ও থাকতে পারে; কিন্তু বক্তব্যে এই ইঙ্গিত থাকা উচিত যে, তিনি যে বাজেট দিলেন, সেখানে কত টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, সেই টাকা তুলতে কী কী প্রক্রিয়ায় ট্যাক্স আদায় করা হবে। অর্থাৎ একটি সম্পূর্ণ রূপরেখা থাকা দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা না থাকলে, দক্ষতা বৃদ্ধির কথা স্বীকার করা যে, আমি এটা বৃদ্ধি করতে চাই। রাতারাতিতো দক্ষতা বৃদ্ধি করা যাবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখন অনলাইনে ভ্যাট এবং অন্যান্য ফি আদায় হয়। অনলাইনে আয়কর দেয়া হয়। আমাদের দেশে তো সেই সুযোগ সুবিধা নেই। ফলে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। তবে এই জায়গাগুলো অতিক্রম না করতে পারলে আমরা যত বড় বাজেটই দিই না কেন, তার বাস্তবায়নে আমাদের পক্ষে সমস্যা হবেই।

প্রশ্ন : এবারের বাজেটে ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বিদায়ী বছরেও এর কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে দেশে বিদেশী বা দেশী কোনো বিনিয়োগই বাড়ছে না। সার্বিক অর্থনৈতিক চাহিদাও স্থবির মনে হয়। কর্মসংস্থানের অবস্থাও ভালো নয়। রফতানির প্রবৃদ্ধি কমছে। এ কেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে সাধারণ মানুষ তাদের জীবনযাত্রায় এটি অনুভব করতে পারছে না।
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : যদি গত বছর আমরা সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে থাকি তা থেকে যদি পপুলেশন গ্রোথের জন্য ২ শতাংশ বাদ দেই, তাহলে সেটা হবে সাড়ে ৪ শতাংশ কিংবা ৫ শতাংশ। ১৬ কোটি লোক হিসাবে গত বছর কর ছিল মাথাপিছু ১১ হাজার ৮৭ টাকা, এই বছর মাথাপিছু কর ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ১৭২ টাকা। ১৯ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা যদি জিডিপি হয়, তা থেকে যদি মাথাপিছু আয় বের করতে চাই, তাহলে মাথাপিছু আয় হয় প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। এই টাকার ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে তাহলে সেটা দাঁড়াবে আরো প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা বেশি। বর্ধিত যে মাথাপিছু আয় হবে তার বেশির ভাগই কিন্তু সরকার নিয়ে নিচ্ছে অতিরিক্ত কর আদায়ে। সেই সাথে মূল্যস্ফীতি যদি ধরি ৫-৬ শতাংশ তাহলে সাধারণ মানুষ ব্যয় করতে গেলে আগের তুলনায় আরো দরিদ্র হবে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ সাধারণ ভোক্তার ভোগব্যয় বাড়বে বলে মনে হলেও প্রকৃত অর্থে তাদের ভোগব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা কম।

প্রশ্ন : শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য দূর করতে পারে না বলে বিশ্বের অনেক শীর্ষ অর্থনীতিবিদই মন্তব্য করছেন। অর্থমন্ত্রীও তার বাজেট বক্তব্যে ‘প্রবৃদ্ধি উন্নয়ন ও সমতার’ কথা বলেছেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য বাজেটে কী কী পদক্ষেপ আপনি দেখতে পাচ্ছেন।
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : প্রবৃদ্ধি বাড়লেই যে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন হয়, এটা ঠিক নয়। জীবনমান উন্নয়নের জন্য দেখতে হবে, যে বাড়তি জাতীয় আয় হলো সেটা কিভাবে বণ্টন হচ্ছে শ্রমিকের মধ্যে, শ্রমিকের মালিকের মধ্যে, সরকার কতটা নিচ্ছে। তার ওপরই নির্ভর করবে বিষয়টি। আমাদের সরকারের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর একটি চিন্তা আছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই বাধাগুলো এখনো রয়ে গেছে। মুখে বলছি যে, আমরা কৃষির ওপর জোর দিয়েছি, শিল্পের ওপরও জোর দিচ্ছি; কিন্তু শিল্পায়নের জন্য যে প্রয়োজনীয় কাজগুলো, সে কাজগুলো কিন্তু আমরা করতে পারিনি। ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির যে আশা করছে সরকার, সেটা না হলে এবং বর্ধিত জাতীয় আয় যদি সমভাবে বণ্টন না হয়, তাহলে মানুষের জীবনমান কখনোই উন্নত হবে না। তবে হ্যাঁ, এই বাজেটের বেশ কিছু জায়গায় আছে যে, যারা দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যারা সিঙ্গেল প্যারেন্ট ফ্যামিলি কিংবা কিছু জনগোষ্ঠী আছে, যাদের জন্য সরকার ভাতা বাড়িয়েছে, বিধবাভাতা বাড়িয়েছে। সম্ভবত এ ধরনের সামাজিক ব্যয়ের জন্য ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে; কিন্তু সত্যিকার অর্থে যদি আমি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে চাই, শ্রমিকের মান বাড়াতে চাই এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে চাই, তাহলে কিন্তু আমার প্রয়োজন হবে উন্নত প্রযুক্তির শ্রমিকদের আরো অধিকতর দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
একটা থিওরি ছিল আগে যেটাকে বলা হতো ট্রিকল ডাউন। মনে করা হতো যে, বিনিয়োগকারী লাভ পাবে, সে লাভ সে পুনরায় বিনিয়োগ করবে, বিনিয়োগ করলে সেখান থেকে কর্মসংস্থান হবে, সুতরাং সবাই লাভটা পেয়ে যাবে। সেটা থাকলেও বাংলাদেশে বর্তমানে কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। এনবিআর প্রতিবেদন দিয়েছে, গত তিন বছরে মাত্র ছয় লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। অথচ আমাদের দেশে লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার, এদের কর্মসংস্থানের সুযোগটা কোথায়? তারা যদি কর্মসংস্থানের যোগ্য না হয়ে থাকে, কিভাবে তারা যোগ্য হবে, তার ব্যবস্থাটা কোথায়? বিদেশে আমাদের যেসব শ্রমিক ভাইয়েরা কাজ করেন তাদেরও দক্ষতা কম। অদক্ষ শ্রমিক হিসাবে যায়, কেউ কেউ আধা-দক্ষ শ্রমিক হিসেবে যায়। ফলে আমাদের দেশের যে পরিমাণ মানুষ বিদেশে কাজ করেন তার তুলনায় অনেক কম রেমিট্যান্স পাই। সেখানেও অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। দেশের লাখ লাখ লোক বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ আমরা দিতে পারছি না।

প্রশ্ন : এবারের বাজেটের উন্নয়ন বরাদ্দের ব্যাপারে আপনার মতামত কী? বিশেষত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষির চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ। এই অগ্রাধিকার থেকে অর্থনীতি কতটা লাভবান হতে পারবে?
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : উন্নয়নকে আমরা কেবল রাস্তাঘাট, পুল, কালভার্ট, ব্রিজ- এটা দিয়েই পরিমাপ করি না। উন্নয়ন হলো- আমার শিক্ষাব্যবস্থা কেমন, আমার স্বাস্থ্যের সুরক্ষা কেমন, আমার সামাজিক নিরাপত্তা কেমন। এই জিনিসগুলোর বিচারে উন্নয়নকে দেখতে হবে। ১০টি বড় প্রকল্পে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো থেকে সরকার আশা করছে, এখানে মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট হবে। ফলে প্রতিটি স্তরেই কর্মসংস্থান হবে। তারা মনে করছে যে, পদ্মা ব্রিজ হলে মানুষের মাঝে মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট তৈরি হবে, উন্নয়নে গতি সঞ্চার হবে; কিন্তু আসল উন্নয়ন কি কেবল ব্রিজ-কালভার্টে। আসল উন্নয়নতো নিশ্চয়তা দেয় গ্যাস-বিদ্যুতের। আসল উন্নয়নতো নিশ্চয়তা দেয় একটা ভালো শিক্ষাব্যবস্থার, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরদার করার। এ ক্ষেত্রে কিন্তু সরকার অনেক পিছিয়ে আছে। সুতরাং সরকার যখন বলছে, প্রবৃদ্ধি উচ্চ হারে পৌঁছতে হলে এ ধরনের মেগা প্রকল্প নিতে হবে; কিন্তু এসব প্রকল্প করতে গিয়ে সরকার ঘাটতি করছে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশজ অর্থনীতির ব্যাংক থেকে নিচ্ছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা এবং সাড়ে ১৯ হাজার কোটি নিচ্ছে সঞ্চয়পত্র থেকে। অথচ ভালোভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে মানুষের হাতে অর্থ থাকত। সেটা ভ্যাটের মাধ্যমে সরকারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া যেত; কিন্তু এখন তারা কিভাবে দেবে? এখন অনেক মানুষই সঞ্চয় ভেঙে ভোগব্যয় করবে। সেখান থেকে এই টাকা ফেরত দেবে। মেগা প্রকল্প করলে তার টাকা সাধারণত বিশ্বব্যাংক কিংবা অন্যান্য জায়গা থেকে নেয়া প্রয়োজন। যেখানে সুদের হার কম। ১০ বছরের রেয়াত পাওয়া যায় এবং ৪০ বছরে শোধ করা যায়। মেগা প্রকল্পে নিজের সঞ্চয় থেকে ব্যয় করার একটি বড় এফেক্ট তৈরি হবে। এটা এখন বোঝা যাবে না। এই ঋণের বোঝাটা আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম চাপিয়ে দিচ্ছি। আজ আমি যে ঋণ করছি, সেটা আমি আমার সন্তানকে দিয়ে যাচ্ছি। ৪০ বছর পর আমার সন্তানেরা প্রশ্ন করতে পারে যে, তুমি যে এত ঋণ করে আমার ওপর এত বড় বোঝা দিয়েছ, তুমি কি যথার্থ কাজ করেছ? তুমি তো এই কাজটা ঠিক করোনি। আমি কেন টানতে যাবো এই ঋণের বোঝা। এই প্রশ্ন কিন্তু ভবিষ্যতে আসবে।

প্রশ্ন : জিডিপির তুলনায় বাজেটের আকার এখনো ১৪ শতাংশের কোঠায় রয়ে গেছে। যা তুলনীয় দেশগুলোর চেয়ে অনেক পেছনে। জিডিপি-রাজস্ব অনুপাতের ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের চেয়ে বাংলাদেশ পেছনে। এ অবস্থার উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব?
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : বাজেটের প্রস্তাবনায় কিছু কিছু বিষয় উল্লেখ থাকার প্রয়োজন ছিল। সেটি হচ্ছে, সরকার আয় করতে চাচ্ছে অনেক বেশি। সে আয় বাড়ানোর জন্য কৌশলটা কী, সক্ষমতা আছে কি না, যদি কৌশল থাকে সে কৌশলও বলা দরকার। যদি না বলতে চায়, তার পরও সরকারের বলা উচিত যে, আমার একটা কৌশল আছে। আর সক্ষমতাও বাড়ানো দরকার। সেখানে স্বীকার করা উচিত, আমাদের সে ধরনের সক্ষমতা নেই, আমাদের তা বাড়াতে হবে। এর নিরিখেই রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনাটা থাকলে ভালো হতো। আমরা এখনো জিডিপির ১৪ শতাংশের বেশি বাজেট দিতে পারছি না। অনেক দেশে অনেক বড় বাজেট তৈরি হয়। উন্নত দেশে কিন্তু জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাজেট দিয়ে থাকে। এর মধ্যে নরওয়ে, সুইডেন উল্লেখযোগ্য। এসব দেশ কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। ওইসব দেশে ছোট্ট দোকানদারও তার আয়ের ৩৫ শতাংশ করা হিসেবে সরকারকে দিয়ে থাকে। অর্থাৎ ওইসব দেশে প্রায় সবাই কর দিয়ে থাকে। সবাই করের ফলটাও ভোগ করে। এখন আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিক এই প্রশ্ন করতে পারেন যে, আজকে যে আমি মাথা পিছু কর ১৫ হাজার ১৭২ টাকা দিচ্ছি, আমি তার বিনিময়ে কত টাকা ফেরত পাচ্ছি? এই কারণে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে, শিক্ষার সুযোগ আমরা তৈরি করেছি, কিন্তু শিক্ষার মানের অবস্থা খুবই খারাপ। ফলে একটা লোক কর দিয়ে যে শিক্ষার সুযোগটি নিশ্চিতভাবে পাবে, সেটি হচ্ছে না। বড় শহর, বন্দর বা থানা এলাকার লোকেরাই কেবল এই সুযোগটা পাচ্ছে। আনুমানিক ৩০ শতাংশ মানুষ এই সুযোগটা পাচ্ছে। বাকি ৭০ শতাংশ বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে তারা কর দিতে অনুৎসাহিত হচ্ছে। এই সমস্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় বাজেট বক্তব্যে থাকা প্রয়োজন ছিল।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট উত্তরণের জন্য আঞ্চলিক উদ্যোগের প্রতি অনেকেই গুরুত্ব দিতে চান। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন।
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : বিনিয়োগ বাড়াতে গ্যাস এবং বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনেকেই বলেন, আমাদের দেশে গ্যাস সীমিত হয়ে আসছে এবং আগামী ১০ কিংবা ১৫ বছরের মধ্যে গ্যাস থাকবে না। রিনিউয়েবল এনার্জির ক্ষেত্রে সাধারণত এমনই হয়। একটা সময় পর সেই এনার্জি ফুরিয়ে যায়। গ্যাস পাওয়ার জন্য যে ধরনের বিনিয়োগ করতে হয়, সে ধরনের বিনিয়োগ করি নাই আমরা। এখনো স্থলভাগে প্রচুর জায়গা আছে যেখানে অনুসন্ধান চালালে আমরা গ্যাস পাবো। সমুদ্রের মতো বিশাল জায়গায় আমরা অনুসন্ধান করলে গ্যাস এবং তেল পাবো; কিন্তু আমরা সে দিকে নজর দিচ্ছি না। অথচ গ্যাস ও তেল পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অফুরন্ত সম্ভাবনা আছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে বিনিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আরো একটি বড় সম্ভাবনা আমরা কখনো ভেবে দেখছি না। সেটা হলো- বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা আছে। যদি আমরা যথাযথ আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে পারি এবং সেটি যদি অংশগ্রহণমূলক হয়, তাহলে কেউ কেউ ধারণা করেন, সেখানে দেড় লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। যেটা এই অঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদা মোটামুটি আগামী ৩০-৪০ বছরের মধ্যে মিটিয়ে ফেলতে পারবে; কিন্তু সেদিকে আমরা যাচ্ছি না।

প্রশ্ন : একসময় অনেক অর্থনীতিবিদ বলতেন বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট বা কানেকটিভিটি দিলে দু’দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আর থাকবে না। বাংলাদেশ মধ্য আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এই বক্তব্যের সাথে এখনকার বাস্তবতার ব্যবধান কোথায়?
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : দেশের সীমান্ত কেবল ভারতের জন্য নয়, সবার জন্যই উন্মুক্ত করা দরকার। সেখানে বিশ্বাস এবং আস্থা স্থাপন করা উচিত। যেখানে এক টন মাল বহন করতে আমাদের খরচ হয় প্রায় দুই হাজার টাকা, সেখানে ভারতকে মাত্র ১৯২ টাকা দিয়ে এক টন মাল পরিবহনের সুযোগ দেয়া হলো। কলকাতার দিক থেকে শুরু করবে, আগরতলায় গিয়ে শেষ করবে। মাঝখানের রাস্তাঘাট তারা ব্যবহার করবে। এইভাবে দরজা খুুলে দেয়া হয়েছে। সেভেন সিস্টার্সে বিদ্রোহীদের নিয়ে ভারত যে সমস্যায় ছিল, বাংলাদেশের দিক থেকে এখন সে ব্যাপারে নিরাপত্তা পাচ্ছে। ফলে ভারত নিরাপত্তার দিক থেকেও একটা বড় সুবিধা পাচ্ছে। আবার ভারত বাংলাদেশকে যে ঋণ দিচ্ছে তার ৮০ শতাংশই ভারতে ব্যয় করার শর্তে দিচ্ছে। তাহলে এই ঋণের লাভটা কী? তাই আন্তঃদেশীয় একটা চুক্তি করা উচিত যেখানে অন্যান্য দেশও যুক্ত থাকবে, সেটা ভেবে দেখা দরকার।
কানেকটিভিটি দেয়ার পর ভারতের সাথে বাণিজ্যিক বাধা দূর হয়ে যাবে বা আমরা সমানে সমানে যাবো, এই চিন্তা সঠিক নয়। বাংলাদেশ যেসব পণ্য রফতানি করতে চায় ভারতে সেসব ক্ষেত্রে শুল্ক বাধা কমিয়েছে; কিন্তু অশুল্ক বাধা প্রচুর রয়ে গেছে। সে কারণে বাংলাদেশ থেকে রফতানি দ্রব্য ভারতে পেঁছে না। পৌঁছলে সেটার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ১০ মাস বা ১১ মাস সময় লাগে। এখন এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তে পাঠিয়ে দেয়া সম্ভব; কিন্তু ভারতে এই প্রতিবেদন পাঠাতে হয় পোস্ট-অফিসের মাধ্যমে। ফলে আমাদের দেশের কোনো রফতানিা পণ্য পাঠাতে চাইলে তার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যে ব্যবস্থাপনা ভারত রেখে দিয়েছে, সেগুলোর সবই অশুল্ক বাধা। সে কারণে বাংলাদেশ পোশাক রফতানি শিল্পে এত উন্নতি হওয়ার পরও ভারতে পোশাক রফতানি করতে পারছে না। ভারত যখন মনে করল যে, বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আনা প্রয়োজন তখন হঠাৎ করে এই অশুল্ক বাধাগুলো উঠে গেল। আমাদের ব্যবসায়ীরা এক কেজি ইলিশের দাম পেল প্রায় ছয় ডলার। অথচ দেশের মানুষ ইলিশ খেতে পারছে না।
এ ছাড়া ভারতে আমরা আরো যেসব জিনিস পাঠাতে চাই, ভারত নিজেই সেটার কমপিটিটর। সে কারণে তারা অশুল্ক বাধা সৃষ্টি করে রেখেছে। ফলে কানেকটিভিটি দেয়ার পর ভারতের সাথে বাণিজ্যিক বাধা দূর হয়ে যাবে বা আমরা সমানে সমানে যাবো, এই চিন্তা সঠিক নয়। আমাদেরও উচিত ছিল এমন অশুল্ক বাধা তৈরি করা; কিন্তু আমাদের দেশে ভারতীয় পণ্যের জন্য কোনো অশুল্ক বাধা নেই। ভারত যেটা চায় সেটা হলো, বাংলাদেশের টেস্টিং ইনস্টিটিউটগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তারা ব্যয় করতে চাচ্ছে। করেছেও তাই। যেমন প্রাণের জুস যায় ভারতে। প্রাণকে সে জন্য প্রায় ১৪ মাস সময় ব্যয় করতে হয়েছে। অথচ এটা তিন-চার দিনের ব্যাপার। এই বাধাগুলোর কারণে আমরা বাণিজ্যিক ভারসাম্য ভারতের সাথে কখনোই করতে পারব না। তখনই করতে পারব, যখন আমাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।

প্রশ্ন : রিয়েল সেক্টর এবারের বাজেটে গুরুত্ব হারিয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। আপনার মন্তব্য কী?
প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদ : বাজেটে কৃষিতে ভর্তুকি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় ভর্তুকি কমতেই পারে। তবে ভর্তুকি দেয়া হতো কেবল দানাদার শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে; কিন্তু কৃষির অফুরন্ত সম্ভাবনা আছে আরো কয়েকটি জায়গায়। যে জায়গাগুলোর উল্লেখ বাজেটে থাকা উচিত ছিল। একটা হচ্ছে পোলট্রি শিল্প। এই শিল্পটাকে ভালোভাবে সমর্থন দিলে এর থেকে অনেক কিছু পাওয়া সম্ভব। এখান থেকে আমাদের প্রোটিন চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করাও সম্ভব। দ্বিতীয় হচ্ছে মৎস্য। সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষ প্রোটিন পেতই না, যদি পুকুরে রুই মাছ, তেলাপিয়া কিংবা পাঙ্গাশ চাষ না হতো। কৃষির এই দিকটিতেও প্রচুর সম্ভাবনা আছে। তাদের বিভিন্ন সুবিধা দেয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট খামার আছে। এসব খামারে গরু ও মহিষ চাষ হচ্ছে। এসব খামার থেকে দেশের গোশত ও দুধের চাহিদার একটা বড় অংশ পূরণ হচ্ছে। তাই তাদেরও প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন। কারণ এমন হাজার হাজার খামার তৈরি হতে পারে বাংলাদেশে। মহিষ খুব কষ্টসহিষ্ণু প্রাণী। এসব প্রাণী থেকে যে দুধ পাওয়া যায় সেসব দুধে প্রচুর প্রোটিন ও ফ্যাট থাকে। তাই দানাদার শস্য উৎপাদন থেকে কৃষির নজরটা যদি আমরা পোলট্রি, মৎস্য ও খামারিদের ওপর নিয়ে যাই তাহলে কৃষির ব্যাপক উন্নতি হবে। এর দ্বারা মোটামুটিভাবে প্রোটিনের যে সমস্যা, খাদ্য নিরাপত্তার যে সমস্যা সেটা আমরা মেটাতে পারব এবং বিদেশেও রফতানি করতে পারব।

সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্ত

Advertisements