সরকারি হস্তক্ষেপে চরম সংকটে পড়েছে ইসলামী ব্যাংকে। সরকারি পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র ৪ পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার পর থেকে এই সংকটে পড়েছে ব্যাংকটি। ইতিমধ্যে বেতন ভাতা, নিয়োগ প্রক্রিয়া, ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের ছাটাই এবং পরিচালনা পর্ষদের দুই-এক জন চরম অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ব্যাংকটির সবচেয়ে গুরত্বপূর্ন ও স্পর্শকাতর পদে নিয়োগ দেয়ায় এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি পর্যায়ে সবোর্চ্চ অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করছে ইসলামী ব্যাংক। এমন কি রেমিন্টেসের ২৮ থেকে ৩০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিষ্ঠানটি । প্রতিষ্ঠানটি যদি সংকটে মুখে পরে তাহলে গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাবে ব্যাংকটির প্রতি।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় , সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ বিভাগ রিস্ক ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান নিজেই রিস্কি। এর কারন হিসাবে পাওয়া গিয়েছে সরকার যাকে এই বিভাগের পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়েছেন সামীম  মোহাম্মদ আফজাল। তিনি ইসলামী ফাউন্ডেশনের ডিজি ছিলেন। ব্যাংকের পজিশন কি হবে, কোথায় যাবে;এক কথায় ব্যাংকের উত্থান-পতনের দায়-দায়িত্ব তার উপর নির্ভর করে। অথচ এই পরিচালকের ব্যাংক পরিচালনা করার নূন্যতম অভিজ্ঞতা তার নেই। রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ব্যাংকের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা, এই বিভাগের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে ব্যাংকের অর্থনীতি। ইসলামী ব্যাংকের আগের  চেয়ারম্যান ছিলেন দশ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দেশ-বিদেশে পড়াশোনা করা চার্টাড অ্যাকাউন্টেন্ট। কিন্তু ওই পদে  সামীমকে  চেয়ারম্যান করা হয়। ইসলামী লেবাস নিলেও সামীম মুলত সাবেক সরকারি আমলা। যাকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ইসলামী ফাউন্ডেশন ধ্বংস, এমনকি হাদীস পরিবর্তনেরও অসংখ্য অভিযোগ প্রকাশ হয়েছে।

অপর দিকে বিশ্বব্যাংক সুপারিশ করছে যে, ব্যাংক গুলোতে কোন ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃকতা জড়িত ব্যাক্তিদের না রাখতে।কিন্তু  ব্যাংকের আরেক পরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম তিনি তার ব্যক্তিগত সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে(ফেসবুক)লিখেছেন রাষ্ট্র ব্যবস্থার সবোর্চ্চ পর্যায়ে আস্থার কারনে আজ আমি ইসলামী ব্যাংকে একজন পরিচালক হিসোবে নিয়োগ পেয়েছি। এতে করে তিনি নিজেই তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিস্কার করে দিয়েছেন। শুধুমাত্র রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারনে ব্যাংকের পরিচালক হয়ে আসতে পেরেছেন ।

নিচে লিংকটি দেখুন —
সরকারী হস্তক্ষেপে চরম সংকটে ইসলামী ব্যাংক শুধু তাই নয় চট্টগ্রাম বঙ্গবন্ধু গবেষনা কেন্দ্রের সাধারন সম্পাদক তাকে নিজেদের দাবী করে অভ্যর্থনা জানান। তার স্টাটাসটি হুবুহু তুলে ধরা হলো –

‘‘আমাদের সবার প্রিয় ও সুপরিচিত আন্তজাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ব্যাংক ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ বিশিষ্ট অর্থনিতীবিদ “অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ ” সার ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লি: এর →ইসি চেয়ারম্যান মনোনীত হওয়ায় বঙ্গবন্ধু গবেষনা কেন্দ্র,কেন্দীয় শাখা ও চট্রগ্রাম মহানগর শাখার পক্ষ থেকে প্রাণঢ়ালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। সৌজন্য :মোঃনুহউল আলম রাসেল। সাংগঠনিক সম্পাদক বঙ্গবন্ধু গবেষনা কেন্দ্র,চট্রগ্রাম মহানগর।’’

এই দিকে দেশের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ন রাজভান্ডার থেকে যখন রাজকোষ লুট হয়ে যাচ্ছে, এই অবস্থায় স্বচ্ছ এবং স্বচ্ছল এই ইসলামী ব্যাংকে সরকার নিয়োগ দিয়ে অবস্থার সংকট সৃষ্টি করেছে। এ কারনে অন্য ব্যাংকগুলোতে ঋন প্রদান ও বিনিয়োগ নিয়ে যে অস্বচ্চতা, দুনীর্তি ও লুটের ঘটনা ঘটেছে ইসলামি ব্যাংকে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভবনা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।এমন কি নামে-বেনামে বিনিয়োগের মধ্যমে লুটের সম্ভবনা উঠিয়ে দেওয়া যায়না।সাধারন গ্রাহকদের অর্থ যথাযথ বিনিয়োগ না হলে আমানত বন্ধ হয়ে যাবে। র্দীঘদিন থেকে ইসলামি ব্যাংকে বিনিয়োগ বন্ধ রয়েছে।বিনিয়োগ না হলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক থেকে পাওয়া কয়েকটি বার্তা নিম্মে তুলে ধরা হলো –

ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এর শেয়ার হোল্ডার ও বিনিয়োগকারীরা। নতুন করে চার স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়ায় তাদের মধ্যে উদ্বিগ্ন আরও বেড়ে গেছে বলে জানা গেছে। সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিতদের  অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেয়ার পরই ওই সব ব্যাংকে অর্থ লুট ও তছরুপের ঘটনার কথা স্মরণ করে তারা এ হতাশা ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য, গত ১৯ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক (ডিজি) সামীম মোহাম্মদ আফজাল, পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হেলাল আহমেদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম ও ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আজিজুল হককে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক ব্যাংক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকে এমন কোন সমস্যা তৈরি হয়নি যে, নতুন করে পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। এই ব্যাংকটি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তাই কোন গুরুতর কারণ ব্যতিরেকে হঠাৎ  করে সরকারের ঘনিষ্ঠ লোকদের নিয়োগ দেয়ায় শেয়ার হোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়ে গেছে এই ভেবে যে, অন্যান্য ব্যাংকে যেভাবে অর্থ লুপাট হয়েছে, এই ব্যাংকেও কী সেই ভাবে অর্থ লুপাটের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি হলে ব্যবসা গুটিয়ে তাদের মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়া ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকবে না।

প্রসঙ্গতঃ অরিয়েন্টাল ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকসহ অসংখ্য  কেলেঙ্কারীতে বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা আজ হুমকীর মুখে। লুটেরার দল ব্যাংকগুলোকে যেভাবে লুট করছে, তাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতির সম্মুখিন। পুরো ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। এ থেকে উত্তরণে ও ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করার জন্য ‘এন্টাপ্রাইজ গ্রোথ এ্যান্ড ব্যাংক মর্ডানাইজেশন প্রজেক্ট (বিএমপি)’-এর মতো আরো একটি প্রকল্প চালু করার আভাস দিয়েছে সংস্থাটি। বিষয়টি চূড়ান্ত করতে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ফিলিপ হোরারে আগামী সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে আসতে পারেন।

বাংলদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ৩ মাসে ব্যাংকিংখাতে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপী বেড়েছে। মার্চ প্রারম্ভিক শেষে ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিক খেলাপী দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা-যা মোট অনাদায়ী ঋণের ৯.৯২ শতাংশ।

এর বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক একটি সফল ব্যাংক হিসেবে দেশেবিদেশে স্বীকৃত বেসরকারি ব্যাংক। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই ব্যাংকটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকটি ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করে আসছে। ব্যাংকটির স্থানীয় শেয়ার হোল্ডার ৩৬.৪২ শতাংশ এবং বিদেশি শেয়ার হোল্ডার ৬৩.১৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ছাড়াও ৮টি দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিদেশি স্পন্সর শেয়ার হোল্ডার রয়েছে।

বিভিন্ন মহলের কিছু অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় গুরুত্বে সঙ্গে ব্যাংকটি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। ২০১৫ সালে ব্যাংকটি আইসিএমএবি বেস্ট করপোরেট অ্যাওয়ার্ড, এনআরবি রিকগনিশন অ্যাওয়ার্ডসহ ৬টি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করে।

জানুয়ারি ২০১২ সালে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার দর ছিল ২৮ টাকা। যারা এই সময় ব্যাংকটির শেয়ার এ বিনিয়োগ করেছেন তারা এ যাবত ৮৭% বোনাস শেয়ার বেং ৩৫% নগদ লভ্যাংশ পেয়েছেন। চলতি বছরের ১৯ মে-তে শেয়ার দর ছিল ২৪.৩০ টাকা। হতাশাজনক শেয়ার বাজারে এই শেয়ারটি বিনিয়োগকারীর মূলধনের ক্ষতি না করে বরং অধিক মুনাফা দিয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে  করেন, ইসলামী ব্যাংক যখন এভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই সরকার তার নিজশ্ব লোক নিয়োগ দেয়াটা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ১৯৯৮ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে তিন খ-ের একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সে প্রতিবেদনেও বিশ্বব্যাংক কোনো অবস্থাতেই রাজনীতিবিদদের সরকারি ব্যাংকের পরিচালক করা যাবে না বলে সুপারিশ করে। কারণ, এতে ব্যাংকের রাজনীতিকায়ন হয় এবং স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটে।

পর্যবেক্ষকরা বলেন, নতুন পরিচালক নির্বাচিত হবেন এবং আরো ভালোভাবে ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালিত হবে এটি একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। উল্লেখ থাকে যে, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের ভোলাটালিটি অধিকহারে বেড়ে গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, শেয়ার মার্কেটে শেয়ারটির ব্যাপক লেনদেন হয় যা অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

ইসলামী ব্যাংকের অধিকাংশ  সূত্রে  জানা গেছে, শুধু সরকারি হস্তক্ষেপ নয়, ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি অংশের অশুভ তৎপরতাও ব্যাংক  কার্যক্রম ধ্বসের পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সূত্রটি জানায়, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের মেয়াদ খুব শিগগির শেষ হয়ে যাচ্ছে। ব্যবস্থাপনার পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে ব্যাংকটির বর্তমান কর্মকর্তাদের অনেকেই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে দেখা যায়। এতে ব্যাংকের ওপর সরকারের একটি অশুভ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এতে ব্যাংকের ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না বলে মনে করেন ব্যাংক বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: বিডি সংবাদ

Advertisements