১৯৪৭ সাল থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে। এমন অভিযোগ করেছেন ভারতের বুকার পুরস্কার জয়ী লেখিকা ও সমাজকর্মী অরুন্ধতী রায়। ভারতের সংবিধান রচয়িতা ড. বি আর আম্বেদকরের বই ‘অ্যানিহিলেশন অফ কাস্ট’ (জাতি বর্ণের নাশ) -এর তামিল অনুবাদ প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। উল্লেখ্য, বইটিতে অরুন্ধতীর টীকা সংযুক্ত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় সেনাবাহিনী নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, আসাম, গোয়া, জুনাগাদ, কাশ্মির এবং ছত্রিশগড়ের জনগণের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। কারা এই  জনগণ? তারা হলো খ্রিস্টান, মুসলিম, শিখ, দলিত সম্প্রদায়।’

এর আগে বহুবার জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ব্যবহার নিয়ে সাড়া জাগানো মন্তব্য করেছেন তিনি। দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত  ‘আফজাল গুরুর ফাঁসি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্ক’ শীর্ষক এক নিবন্ধে অরুন্ধতী রায় বলেছিলেন,‘আফজাল গুরুর সত্যিকার কাহিনী ও ট্র্যাজেডি শুধু আদালতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই,প্রকৃত ঘটনা জানতে হলে কাশ্মির উপত্যকার ঘটনা জানতে হবে। এটি একটি পরমাণু যুদ্ধক্ষেত্র এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সামরিকীকরণ এলাকা। এখানে রয়েছে ভারতের পাঁচ লাখ সৈনিক। প্রতি চারজন বেসামরিক নাগরিকের বিপরীতে একজন সৈন্য! আবু গারিবের আদলে এখানকার আর্মি ক্যাম্প ও টর্চার কেন্দ্রগুলোই কাশ্মিরীদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের বার্তাবাহক। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিতে সংগ্রামরত কাশ্মিরীদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে এখন পর্যন্ত ৬৮ হাজার মুক্তিকামীকে হত্যা করা হয়েছে এবং ১০ হাজারকে গুম করা হয়েছে। নির্যাতিত হয়েছে আরও অন্তত এক লাখ লোক।’

‘দি গড অফ স্মল থিংস’ বইয়ের জন্য বুকার পুরস্কার জয়ী এই লেখিকা, দীর্ঘদিন ধরে ভারতে সামাজিক অবিচারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবং সেনাবাহিনী ‘ঔপনিবেশিক’ আদলে কাজ করছে বলে উল্লেখ করেছেন।

বিভিন্ন জাত, গোত্র ও সম্প্রদায়ের প্রতি এই অবহেলাকে তিনি ‘নিষ্ঠুর সামাজিক যাজকতন্ত্র’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন এই বিষয়গুলোকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় আনতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনা করা উচিত।’

তিনি ভারতের বর্তমান অবস্থাকে আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলন (সিভিল রাইট মুভমেন্ট) এর সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন। আমেরিকার কারাগারগুলো থেকে আফ্রিকান আমেরিকানদের মুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতেও বহু মুসলিম, শিখ ও দলিত সম্প্রদায়ের লোক বন্দি রয়েছেন। বিরাজমান সমস্যাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন ‘জাত হচ্ছে পুঁজিবাদের মূল।’

এসময় অরুন্ধতী জানান, কথা বলার জন্য তাকে আরও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। কারণ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জে এন সাইবাবার জামিন না মঞ্জুরের বিষয়ে কথা বলার অপরাধে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

এটি প্রথমবার নয় যখন অরুন্ধতী রায় আধুনিক ভারত রাষ্ট্রের এই রোগাক্রান্ত ক্রটিগুলোর দিকে আঙুল তুললেন। এসব সমস্যা নিয়ে এর আগেও তিনি খোলা-মেলা মতামত দিয়েছেন। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মির ও মনিপুরে ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

অরুন্ধতী রায়ের জন্ম ১৯৬১ সালে,ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে। মা ছিলেন কেরালার এক সিরিয়ান খ্রিষ্টান পরিবারের মেয়ে। বাবা রঞ্জিত রায় ছিলেন বাঙালি,শিলংয়ে চা-বাগানের কর্মকর্তা। অরুন্ধতীর শৈশব কেটেছে কেরালায়,সেখানকার স্কুলে পড়ালেখা করেছেন তিনি। পরে দিল্লির স্কুল অব প্ল্যানিং অ্যান্ড আর্কিটেকচারে স্থাপত্যবিদ্যার ওপর শিক্ষা নেন অরুন্ধতী। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত তার এক মাত্র উপন্যাস ‘দি গড অব স্মল থিংস’ এর জন্য ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার পান। তিনি ২০০৪ সালে সিডনি শান্তি পুরস্কার পান।

ন্যায়-সমতা আর মুক্ত পৃথিবীর পক্ষের একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিশ্বজুড়ে অরুন্ধতী এক পরিচিত নাম। নিজ রাষ্ট্র ভারত থেকে শুরু করে দুনিয়ার সব পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন তুলে যাচ্ছেন তিনি।

সূত্র: স্ক্রল. ইন, বাংলা ট্রিবিউন

Advertisements