১৯৩৯ সালে নাৎসিদের উদ্দেশে ফিউরা, ‘যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ, সত্যের জন্য নয় বরং বিজয়।’ এক ব্যক্তির প্রয়োজন, কারণ কিংবা প্রেক্ষাপট অন্য ব্যক্তির নাও হতে পারে; কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দিলে যা হয়, সেটাই হলাকস্ট। জার্মানকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত এবং আর্যদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বানাতে, ফিউরার যে গণহত্যা, নাগাসাকি-হিরোশিমায় বোমা ফেলতে বাধ্য হয়েছিল মিত্রপক্ষ, বিশ্বযুদ্ধ শেষ।

দেশ বিভাগের পর আমার পরিবারও যদি ভারতে চলে যেত, বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থিতিশীল করার দায়ে দিল্লির বিরুদ্ধে সাংঘাতিক অভিযোগের যোগ্যতা কিংবা ভিত্তি কোনোটাই থাকত না। ৬৯ বছর ধরেই এ অঞ্চলে দিল্লির ভ্রষ্ট পররাষ্ট্র ও সীমান্ত নীতির কারণেই, দেশত্যাগ ও শত্র“ সম্পত্তির দৃষ্টান্ত, যাকে সম্পদ বলব না বরং মানব সভ্যতার অভিশাপ। এখন চলছে ‘ক’-‘খ’ তফসিল নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে শত্র“ করে তোলার প্রক্রিয়া। যে পথে হাঁটছে রাষ্ট্র, সমাধানের বদলে বিপর্যয় অনিবার্য।

২ লক্ষ স্কয়ার ফুটের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে সল্টলেক কিংবা দণ্ডকারণ্য, সর্বত্রই দেশ বিভাগের কালো ছাপ! ’৪৭-এর পর থেকেই ১৮০০ মাইল দূরত্বে দু’টি মুসলিমপ্রধান দেশের সাথে ভারতের দুই রকম সীমান্ত নীতি? অন্যথায় ৬৯ বছরে ২ লাখ একরের বেশি শত্র“সম্পত্তি এবং লাখ লাখ দেশত্যাগীর বিষয়টি, ইন্দিরা-মুজিব আমলেই নিষ্পত্তি হতে পারত। বরং ভারতীয় সংখ্যালঘুরা ৮ ভাগ থেকে প্রায় ১৮-এর বেশি এবং সমাজ ও রাজনীতিতেও দারুণ প্রভাবের দৃষ্টান্ত, কোনোক্রমেই এই পাড়ের সাথে মেলে না। বরং দিল্লি বন্ধু মনে করলেও, আওয়ামী লীগ আমলেই অত্যাচার বাড়ে। অন্যথায় ’৭১-এর পরেই মাইগ্রেশন বন্ধ হওয়ার কথা। বরং যুদ্ধ শেষে দেশত্যাগীদের সংখ্যা আরো বেড়েছে। কংগ্রেস-বিজেপি সব এক গোয়ালের গরু। যতবারই ওপাড়ে ক্ষমতা বদল হয়, এপাড়ের সংখ্যালঘুদের ভাগ্যবিপর্যয়ও বাড়ে। সব রাজনৈতিক দলের পকেটেই দেশত্যাগীদের জমি, সিন্ডিকেট ভাঙার বদলে ভূমিদস্যুদেরকে ভরণপোষণ করেছে সব সরকারই। ‘থাকলে ভোট, গেলে জমি’ প্রবাদটা এখন প্রতিষ্ঠিত। সরকার বদল হলেই দিল্লিতে গিয়ে হাজিরা দিতে হয়। তার পরও ৬৯ বছরে ৪২ ভাগ সংখ্যালঘু এখন সিঙ্গেল ডিজিট! এই দেশ বসনিয়া কিংবা আর্মেনিয়া নয় যে, এ হারে দেশত্যাগ করতে হবে কিংবা এত অল্প সংখ্যালঘুর দৃষ্টান্ত দিয়ে ভারসাম্যতা রক্ষা হবে।
’৪৭-এর মধ্যরাতকেন্দ্রিক ঘটনাগুলোকে ভুলে যাওয়া অমানুষের পরিচয়। ’৫০-এর রায়টে স্কুল পুড়িয়ে দিলে, তিন সন্তানকে কলকাতার স্কুলে ভর্তি করলেন মা। এর পর থেকেই বারবার যুদ্ধ-দাঙ্গায় মমতাময়ী মায়ের যন্ত্রণার কঠিন রূপ দেখেছি। বাবা কিছুতেই দেশত্যাগ করবেন না। তাই কখনো পাসপোর্ট, কখনো দালাল ভরসা আমার মায়ের।

ভারত কোনো আমেরিকা নয়। প্রতিবেশী কানাডার সাথে আমেরিকা কখনোই ঔপনিবেশিক আচরণ করে না। সাম্প্রতিকালে দিল্লি যেসব দৃষ্টান্ত রাখছে, নাকে তেল দিয়ে ২০ দল ঘুমালেও, ভবিষ্যৎ অন্ধকার। মুক্তিযোদ্ধা ডা: জাফরউল্লাহ, ‘অকারেন্স’ ঘটিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় দিল্লি। যে সরকারই আসুক, আওয়ামী লীগকেই পছন্দ, ২০ দলকে সব সময়ই জঙ্গির খাতায়। খালেদা ভুল করলেও, আমজনতা ভুল করে না। এ দফায় বিরোধী শিবিরকে ১০০ ভাগ জঙ্গি বানানোর জন্য, ঢাকাকে পুরোপুরি দায়ী করা অন্যায়। কারণ ঢাকার মাথায় এত বুদ্ধি নেই। দিল্লি যাই ভাবুক, রামু-উখিয়ার ঘটনা এ আমলেই ঘটল। এর পরও দিল্লির নমনীয় আচরণেই, সংখ্যালঘু নির্যাতন পায়ের তলে আরো মাটি পেয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িতরা দলীয় হওয়ায় জেলখানার বাইরে। বাবরি মসজিদের প্রতিক্রিয়া দুই বাংলাতেই কিন্তু রামু-উখিয়ার ঘটনার পরও দিল্লির নির্বাক ভূমিকা- প্রাগৈতিহাসিক। বরাবরই দেশত্যাগের বিষয়টি পাত্তা না দিয়ে বরং রেশনকার্ড আর নাগরিকত্বের টোপ চলছে জ্যোতিবাবুর আমল থেকে মমতা পর্যন্ত। ফলাফল আরো প্রশ্নবিদ্ধ জমি এবং সংখ্যালঘুদের ভারসাম্যহীনতা। অস্বীকারের উপায় নেই, দেশ বিভাগের আগে সংখ্যায় লঘু হলেও বেশির ভাগ জমির মালিকানাই সংখ্যালঘুদের। বিষয়টি কি কখনোই উপলব্ধি করেছে দিল্লি?
সেলাইবিহীন সীমান্ত এতই ঢিলেঢালা, প্রথম থেকেই দুই দেশ বলা কঠিন। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ এবং রক্তাক্ত সীমান্ত এটা; কিন্তু প্রতি মাসেই বাংলাদেশী মরে না এমন দৃষ্টান্ত না থাকলেও বিজেবির গুলিতে কোনো ভারতীয় মরার প্রমাণ নেই। ২৬ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ৫ বছরে ১৪৬ জন মরেছে বিএসএফের গুলিতে। শুধু দেশত্যাগীদের জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক চোরকারবারিদের জন্যও উদাম সীমান্ত খুবই ইতিবাচক। ফলে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ জগৎ, যার ডলার মূল্য নির্ধারণ অসম্ভব। হতে পারে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এমন কোনো অপরাধ নেই যা এই সীমান্তে ঘটছে না। বিষয়টি দিল্লির গোচরে না থাকার কারণ কি? অথচ ১০ ট্রাক অস্ত্রসহ সব দোষ ২০ দলের ঘাড়ে? এ ধরনের পররাষ্ট্র নীতির সমালোচনা করে একাধিক পিএইচডি সম্ভব। পাবলিক সেন্টিমেন্ট কবে আমলে নিয়েছে দিল্লি-ঢাকা?


রাজনৈতিক নিম্নচাপ থেকে কী ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, উদাহরণ ইরাক। আইএস সৃষ্টি করেনি আমেরিকা বরং মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারদের পেট্রো ডলারের খোরাক জোগাতে গিয়েই আইএস উদ্ভাবন। দিল্লির ভ্রষ্ট নীতির কারণেই এখন আর সংখ্যালঘু নির্যাতনকে সংখ্যাগুরু থেকে আলাদা করা যাবে না। রামু-উখিয়ার ঘটনা সাম্প্রদায়িক হলে, শ্যামল কান্তি হচ্ছে সর্বজনীন, আর ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সংখ্যাগুরুদের বিষয়ে দিল্লির কলকাঠির সাথে ফিলিস্তিনে মোসাদ নীতির পার্থক্য নেই।
সন্ত্রাসের বিষয়টিকে যত হালকা চোখে দেখছে, তেমন নয়। স্থিতিশীল বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে, দুধ দাঁতওয়ালা মুরগি কবিরদের মতো সুবিধাভোগীদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হাস্যকর। ২০ দল নয় বরং এই সাবকন্টিনেন্টে আইএস ঢুকলে কেন দায়ী থাকবে ভারত, উদাহরণ ইরাক। ২০১৪ সালে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর, যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি, সুযোগ নিলো ইসলামিক স্টেট। আর এ সুযোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী, প্রতিবেশী ভারতের মতোই, ওয়াশিংটনের ভ্রান্ত পররাষ্ট্রনীতি। ধাপে ধাপে রাজনৈতিক শূন্যতার কারণেই জঙ্গিবাদের পরিবেশ সৃষ্টি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অস্বীকার প্রবণতা, আইএসের পোয়াবারো। প্রয়োজন বুঝে জঙ্গি আছে, জঙ্গি নেই তত্ত্বটি, জঙ্গিবাদের দাওয়াত। একটি খুনেরও হালনাগাদ করার বদলে, সব দোষ বিরোধী শিবিরের ওপর? চুন খেয়ে মুখ পুড়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টেকনিক মানতে রাজি নয় পশ্চিমারা। এ কথাই ওয়াশিংটন আবারো জানিয়ে দিলো। ‘সাইট’-এর সমালোচনা এবং আইএস অস্বীকার করলেই রক্ষা হবে না। কারণ বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ঘরের জঙ্গিরা আর ঘরেই সীমাবদ্ধ নয়। আদর্শের তাত্ত্বিক বিষয়টি আমলে না নিয়ে ভুল করছে দিল্লি-ঢাকা। আমি কোনো বিশেষজ্ঞ নই, তবে ৯/১১ পরবর্তী জঙ্গিবাদ উত্থান উদ্বেগের সাথে দেখছি। ‘রহস্য উদঘাটনের দাবি, চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব,’ মানবজমিন ২৪ মে’র কলামটি লক্ষণীয়। এ পরিস্থিতিতে পড়তে হলো কেন?

বৈশ্বিক সন্ত্রাসের অনেক ব্যাখ্যা। প্যালেস্টাইনের বন্ধু ইহুদি বংশোদ্ভূত লিঙ্গুইস্ট নোম চমস্কি কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসের জন্য পশ্চিমকেই দায়ী করেন। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এই দাবি ভুল। ‘সাইটের’ বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগও ভুল। বরং ১/১১ সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতাই প্রাথমিক কারণ। পরবর্তীতে ৫ জানুয়ারি ঘটিয়ে, মহামারিকে আরো সম্প্রসারিত করল দিল্লি। এত কিছু ঘটার পরও বোধোদয় হলো না। মিশন কন্ট্রোলের ইঙ্গিতে বিরোধী শিবিরের ওপর কমিউনিস্ট স্টাইলে অস্ত্র ব্যবহার করছে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র। সে দিন কী ঘটেছিল ইরাকে? একটু পেছনে যাওয়া যাক। তলে তলে আল মালিকির দ্বৈত ভূমিকা এবং বার্থ পার্টির নিষিদ্ধ সৈন্যরাই গোপনে ইসলামিক স্টেটের জন্ম দিয়েছিল। আর মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সাথে সাথেই মালিকির সেনাবাহিনীর অস্ত্রসমর্পণ শেষে পলায়ন এবং আইএসআইর আগমন। এবার ইসলামিক স্টেটের টার্গেট, ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট।


সুতরাং চারটি বিষয় মীমাংসা হোক। ১. বর্ষায় নদীর যৌবন এলে… সবখানেই খালেদার ষড়যন্ত্র এবং গুয়ামের ভূমিকম্পের জন্য দায়ী তারেক। ২. ৫ জানুয়ারিতে ভোট হয়নি কিন্তু প্রতিটি নাগরিকই ভোট দিয়েছে। ৩. প্রতিবারই দুর্ঘটনা ঘটবে এবং হওয়ামাত্রই উন্নতির পাহাড়ে ধামাচাপা পড়বে। ৪. যারা ভারতের শত্র“ তারা বাংলাদেশেরও শত্র“ (মন্ত্রীর বক্তব্য)।

৫ জানুয়ারির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ১৫তম সংশোধনীতে। এই কাজে দিল্লির ভ্রান্ত পররাষ্ট্র নীতিই ১০০ ভাগ দায়ী, যা অবলীলায় স্বীকার করেন পঙ্কজ শরণরা। ১৫তম সংশোধনী অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তার উত্তরসূরি না পাওয়া পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে, এত বুদ্ধি আওয়ামী লীগের নেই। টেলিগ্রাফকে দেয়া সজীবের সাক্ষাৎকারটি মোটেও আমলে নেয়নি বিরোধী শিবির। তার কথা, ‘আমার কাছে তথ্য আছে আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় যাবে’। অর্থাৎ আজকের এই বিজয়ের গল্প, সে দিনের অগ্রিম বার্তা। সুতরাং আর যদি নির্বাচন নাও হয়, বলতে হবে ভোট সুষ্ঠু হয়েছে। একই সাথে ওবামা-হাসিনার উদয় সত্ত্বেও ওবামার সূর্যটা এখন হোয়াইট হাউজের পশ্চিমে। দিল্লির আবহাওয়া অফিস বলছে, হাসিনার সূর্য পূর্ব আকাশে থাকবে ২০৪১ সাল পেরিয়ে। আর এ কাজে পর্যায়ক্রমে নির্মূল করা হচ্ছে বিরোধী শিবিরকে। জামায়াত শেষ, এবার টার্গেট বিএনপি। মুক্তিযোদ্ধা ড. ওসমান ফারুক নাকি সিলেট সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে গিয়ে গ্রেফতার এড়িয়েছেন। দিল্লির এসব ভুল আচরণই আল বাগদাদির ঘোষণার মূলে। তলে তলে ঢুকে পড়ে নেটওয়ার্ক বানাচ্ছে জঙ্গিরা। পৃথিবীর সপ্তম জনবহুল দেশ এবং প্রতি বর্গমাইলে সবচেয়ে বেশি ঘনবসতির মধ্যে জঙ্গিদের মিশে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

ভারতকে জঙ্গিবাদ থেকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের কেন? ভারতের তুলনায় যোগ্যতাই বা কী! কী অদ্ভুত চিন্তা ওদের! বরং বিশেষ দলকে টার্গেট করার বদলে, সব দলকেই আমলে নেয়া দিল্লির জন্য শুভ। ক্রিয়া থাকলে প্রতিক্রিয়াও থাকবে। ভারতের ভেতরে অভ্যুত্থান ঠেকাতে ঢাকার ওপর অতিনির্ভরতা, পরিস্থিতিকে ইরাকের মতো করে তুলছে। ভারতের ভেতরে স্বাধীনতাকামীদের দাপট আজকের নয়। অঙ্গরাজ্যগুলো জুড়েই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিশাল নেটওয়ার্ক। অতিসাম্প্রতিক, মনিপুরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঠেকাতে ৬ জওয়ান নিহত। কাশ্মিরে কী হচ্ছে সবাই জানে। অস্ত্র দিয়ে আন্দোলন কত দিন নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। ভারতের গণতন্ত্র আসল না নকল, বিতর্ক হতেই পারে। ওই দেশের বড় একটি গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বঞ্চনা এতই দুর্বিষহ, মানবাধিকার পরিস্থিতি এতই নাজুক, ঢাকার ওপর ভরসা করে লাভ নেই।

ওপাড়ে আজমল গুরু এপারে নিজামীদের ফাঁসি দিলেই যদি জঙ্গি নির্মূল হতো, আল বাগদাদির ঘোষণা আসত না। এ ঘোষণা একজন ভারতীয় মুজাহিদিন, ফারুক শেখের মুখ দিয়ে। সুতরাং গ্লোবাল টেরোরিজম ঠেকাতে, ২০ দল নির্মূল বাদ দিয়ে, বরং ঘর পরিষ্কার করুন। দিল্লিই বলুক, কংগ্রেস-বিজেপির সমালোচনায় কয়টা কলাম লিখেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস? কর্তৃত্ববাদী সরকারের সমালোচনায় কেন এত লিখেও ক্লান্ত হচ্ছে না, পশ্চিমের পত্রিকাগুলো? যে বিষয়টি দিল্লির এখনই আমলে নেয়া উচিত, এতগুলো সমালোচক একসাথে ভুল করতে পারে না, অর্থাৎ এই সর্ষে দিয়ে ভূত তাড়ানো সম্ভব না।


পাকিস্তানের সাথে সীমানা ১০০ ভাগ নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় ব্যতিক্রম। সীমান্ত বিষয়টিকে আরো দুর্বিষহ করল বিজেপি সরকার। কথায় কথায় এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ চায়। কানেকটিভিটির নামে কী হচ্ছে, সবাই জানে। পাবলিক সেন্টিমেন্ট বাদ দিয়ে নানা চুক্তির মধ্যে উপনিবেশের মুখ। পাক-ভারত সীমান্তে একজন খুন হলেই যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব কিন্তু এই দেশের এত মানুষ মারলেও কিছুই হয় না কেন? এক ফেলানি হত্যাকাণ্ডের পরেই বিএসএফের পোশাক পাল্টে দেয়া যেত। জানি না ৫ জানুয়ারির কী ব্যাখ্যা করতেন চমস্কি! তবে ভারতের চমস্কি জনাব কুলদীপ নায়ার, স্টেটমেন্ট পত্রিকায় লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। যদি হয়, আগেভাগেই বলে দেয়া যায় শেখ হাসিনা পরাজিত হবেন না। ঢাকায় পৌঁছানোর পর মনে হয়েছে এই দেশ তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। বাংলাদেশকে ভারত থেকে আলাদা করা কঠিন। আরো খারাপ, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। হাসিনার প্রধান শক্তি দিল্লি।’
‘আওয়ামী লীগ সমর্থনে ভারতীয় নীতি অপরিবর্তিত,’ পঙ্কজ শরণের এ বক্তব্য, সার্বভৌমত্ব বিরোধী। সালমান খুরশিদের মতো চৌকস রাজনীতিবিদদের দিয়ে এ ধরনের বক্তব্য কেন প্রচার করাচ্ছে দিল্লি, গবেষণার দাবি রাখে। ৫ জানুয়ারির জন্য কেন আওয়ামী লীগকেই বেছে নিয়েছিল দিল্লি, প্রয়োজন স্বতন্ত্র তদন্ত কমিশন। পঙ্কজ শাসনামলেই ৫ জানুয়ারিতে সুজাতা সিংদের রাজনৈতিক বিস্ফোরণ, পরবর্তীতে বিরোধী শিবিরে ফাঁসি কার্যকরের তুলকালাম। পঙ্কজ-সুজাতাদের দোষ দিতেই পারি কিন্তু মিশন কন্ট্রোলটি কার? ৫ জানুয়ারির টেকনিক ব্যবহার করে কংগ্রেসও ক্ষমতায় থাকতে পারত কিন্তু করেনি। কারণ ভারতীয় রাজনীতিবিদদের কাছে ‘ভারতমাতার’ স্বার্থ সবার আগে। ৩৫ আর ৪৬-এর বিধানসভার দৃষ্টান্ত এরা, বিশ্বাস করা যায়!
মধ্যপ্রাচ্যের অভিভাবক আমেরিকা, এ অঞ্চলে দিল্লি। তাদের স্বার্থেই ২০৪১ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে আওয়ামী লীগ। অগ্রিম প্রোগ্রাম দিয়ে সেটা প্রমাণও করেছে। কুলদীপ যথার্থ বলেছেন, নির্বাচন হবে কিন্তু জিতবে হাসিনা।


এসব লেখার কারণ, আইএস ঢুকবে, নাকি ঢুকবে না, সিদ্ধান্ত ভারতের। জন্ম বাংলাদেশে, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ও কাটিয়েছি দেশেই। দেশের চেহারা কবে এমন ছিল? ন্যাটোর কারণে মধ্যপ্রাচ্যে সুবিধা হচ্ছে না বলেই ঘাঁটি স্থাপনের জন্য রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া অঞ্চলকে বেছে নেয়ার ঘোষণা। বিপুলসংখ্যক মুজাহিদিন এই সাবকন্টিনেন্ট থেকেই গেছে। ফলে রিক্রুটমেন্টের ব্যাপারটাও ইতিবাচক। ইন্দিরা-মুজিব আমলেই বিষয়গুলোর মীমাংসা না হওয়াটা আজকের অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এমন কোনো নিকৃষ্ট ঘটনা নেই, যা দিয়ে দিন শুরু হয় না বাংলাদেশীদের। সরকার নিরাপদ কিন্তু মরছে জুলহাস মান্নান আর অভিজিতরা! সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ঢাকাকে দিল্লির বার্তা অত্যন্ত হাস্যকর। গুপ্তহত্যা বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিটি বক্তব্যই পদার্থহীন এবং জঙ্গিদের জন্য ইতিবাচক। একমাত্র কমিউনিস্টরাই এ ধরনের আচরণ করে।

এত দিনে দিল্লির বোঝা উচিত, এত সমালোচক একসাথে ভুল করতে পারে না এবং কেন সমালোচনা, সেই তত্ত্ব বিশ্লেষণ। কারণ ছাড়া এত সমালোচনা কেউ করে না। রাষ্ট্রের মেগা উন্নতির গেইমথিওরির সাথে আসল বাংলাদেশের মিল কোথায়? বিরোধী শিবির ধ্বংসের মাধ্যমে রাষ্ট্র এবং মানুষ, একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী থাকলে, জাপানি উন্নতি দিয়ে কী হবে? কাক ময়ূর সাজলেও কাক। মধ্যপ্রাচ্যে বোমা ফেলতে ফেলতে ন্যাটোর অর্থনীতিতে ধস, মার্কিন অর্থনীতিতে ১৯ ট্রিলিয়নের ছিদ্র, অত্যন্ত অশুভ বার্তা নিয়ে এলো ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। খবর মে মাসেই একাধিক পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীর আত্মহত্যা। আবারো আড়াই হাজার কোটি চেয়ে হুমকি দিলো বেসিক ব্যাংকের এমডি, অন্যথায় বন্ধ হয়ে যাবে। বিষয়গুলো দিল্লি আমলে না নিলে ওয়াশিংটনের মতোই ভুল করবে। ‘এদের ভুলেই সনাতন ধর্মানুসারীদের সংখ্যা, কমতে কমতে আজ এই দুঃখজনক পর্যায়ে।’

বাংলাদেশের এক্স রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম, ১৯ মে নিউ ইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন, ‘দ্য রিয়েল সোর্স অব টেরোরিজম ইন বাংলাদেশ। বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেটের উপস্থিতি অস্বীকার করছে দলের নেতারা…। সরকারের আরো ক্ষতিকর দিক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার… মূল ধারা ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সরকারের দমন পীড়নের কারণেই এর বেশির ভাগ ঘটনা ঘটছে।’ ১০ হাজার মাইল দূরে থেকে মাইলাম সাহেবের যে অনুধাবন, রাজনৈতিক শূন্যতার ভূমিকম্পের ওপর বসেও টের পায় না আমাদের বিশ্লেষকেরা?


গর্ভবতী কন্যা মাকে বলছে, ঘুম পেয়েছে, ব্যথা উঠলে ডাক দিও। মায়ের উত্তর, ডাকতে হবে না, বরং ব্যথা উঠলে তুমিই পাড়ার সবাইকে জাগিয়ে তুলবে। গুপ্তহত্যাগুলো বলছে, এ দেশে আইএসের ভ্রুণ নিষিক্ত হয়েছে।

৫ জানুয়ারিতে গণতন্ত্রকে শৈশবেই ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ, ৫০ বছরেও সম্ভব না। তাহলে সমাধান কী! প্রয়োজন ঢাকা-দিল্লির নিজের ক্ষতের চিকিৎসা করা, অর্থাৎ একটি অলিখিত ‘পিস ট্রিটি’। প্রতিদিন ঝড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কেউই টিকতে পারবে না। দিল্লিকেই অসম পররাষ্ট্র ও সীমান্ত নীতি থেকে বেরিয়ে এসে, বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিতে হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য আলাদা নীতিমালা। মাইগ্রেশন ও জমিসংক্রান্ত ক্রাইসিসের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিমালা। অসম বাণিজ্যের মানসিকতা ত্যাগ করে বাংলাদেশকে সহায়তা। এ দেশের রাজনীতি, ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট, সমাজ এবং বিরোধী শিবিরে প্রভাব খাটানোর বদলে ভারসাম্য পররাষ্ট্রনীতি। বিশেষ দলকে বেছে নেয়ার বদলে সব দলের সাথেই সমান আচরণ। সর্বোপরি বন্দুকের নলে ক্ষমতা ও মিশন কন্ট্রোলটির কাটা ফেলে দিতে হবে।

যত দিন পর্যন্ত আওয়ামী লীগেই আটকে থাকবে, সংখ্যালঘুসহ কোনো বিষয়ই নিষ্পত্তি হবে না; অন্যথায় অভিজিতরা মরতেই থাকবে, পূর্ণিমাদের দেশত্যাগ চলবে, ‘আইএস’ ঢুকলে দায়ী থাকবে ভারত। খালেদাকে গ্রেফতারের পরিকল্পনা যেখান থেকেই আসুক, দিল্লিকেই ভাবতে হবে, পাকস্থলী সেটি হজম করতে পারবে কি না! এ অঞ্চল অস্থিতিশীল হলে, ১০০ ভাগ দায়ী থাকবে ভারত।

 

মিনা ফারাহ
নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশী কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী

সূত্র: ইসসাফ

Advertisements