13296248_10205948949375483_1887177304_nহাফেজ মাওলানা মুফতি মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন- ভারতের ঐতিহাসিক দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে ইফতা (মুফতি) ডিগ্রি নিয়েছেন। কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতা ও লেখালেখির মাধ্যমে। ঢাকাস্থ চকবাজার মৌলভীবাজার মাদরাসায় মুহাদ্দিসের দায়িত্ব পালন করেন প্রায় এক যুগ। জেনারেল ও মাদরাসা শিক্ষার সমন্বয়ে কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার কারিকুলাম আবিস্কার করে বোদ্ধামহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশসহ দেশের অভিজাত সব প্রকাশনীতে তিনি লিখেছেন। দৈনিক যুগান্তরের ইসলাম ও জীবন পাতায় খন্ডকালিন সাংবাদিকতাও করেছেন মুফতি মুজাহিদ। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থ ৪২ টি। জনাব মুজাহিদ লেখালেখির জন্য সুধী সমাজ সাহিত্য পদক ও রাহমানী পয়গাম সাহিত্য পদক প্রাপ্তিসহ একাধিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেষ্টমেন্ট লিমিটেডের শরীয়াহ্ সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সেন্ট্রাল শরীয়াহ্ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশের ফিকহ কমিটিরও সদস্য। সম্প্রতি ইসলামি অর্থনীতি ও ব্যাংকিং প্রসঙ্গে তার সাথে কথা বলেন প্রিয়.কমের প্রিয় ইসলাম বিভাগের এডিটর ইনচার্জ মাওলানা মিরাজ রহমান

প্রিয়.কম : ইসলামিক ফাইন্যান্স বা ইনষ্টেমেন্ট বলতে কী বোঝায়? 

মুফতি মুজাহিদ : ফাইন্যান্স-অর্থায়ন ও ইনভেষ্টমেন্ট-বিনিয়োগ প্রায় একই বিষয়। ইসলামী শরীয়াহর বিধিবিধান মেনে যে অর্থায়ন বা বিনিয়োগ কর্মকান্ড পরিচালিত হয় তাই ইসলামিক ফাইন্যান্স বা ইনভেষ্টমেন্ট। ব্যবসা বাণিজ্য ও সব ধরনের লেনদেন সম্পর্কে কোরআন হাদিস ও ফিক্হের সুবিশাল পরিসরে ব্যপক বিধি-বিধান রয়েছে। রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু কার্যকর পদ্ধতি। যেগুলো ইসলামের শুরু যুগ থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে চর্চিত হয়ে আসছে। এসবের আলোকেই ইসলামিক ফাইন্যান্স বা ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

প্রিয়.কম : একজন আলেম হিসেবে একটি ইসলামিক ইনভেষ্টমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে নেয়ার পেছনে আপনাকে কী অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে?

মুফতি মুজাহিদ : এক সময় ইসলামি ব্যাংকিং সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা ছিলো না। অনেকের মতো আমারও ধারণা ছিলো ইসলামি বা শরীয়াহ্ ভিত্তিক ব্যাংকিং দেশে যা চলছে এগুলো নামে মাত্র শরীয়াহর কথা বলে। কাজে কর্মে হয়তো শরীয়াহ্ নেই এসব প্রতিষ্ঠানে। লেখালেখির সুবাদে ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে কিছু ফরমায়েশি প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখতে হয় এবং কিছু অনুবাদের কাজও করতে হয়। তখন বিশ্ব বরেণ্য আলেম বিচারপতি মুফতি তকি উসমানির লেখা ‘ইসলামি ব্যাংকারিকি বুনিয়াদে ও ‘গায়রে সুদী ব্যাংকারী নামক বই দুটির কথা জানতে পারি। ইংরেজিসহ কয়েকটি ভাষায় বই দুটির অনুবাদ ততদিনে ইসলামি ব্যাংকিং জগতে বেশ আলোড়ন তুলেছে। বই দুটি জোগাড় করে পড়তে শুরু করি। আর ধীরে ধীরে আমার এত দিনের ‘অজানা প্রসুত’ ধারণা বদলে যেতে থাকে। পরে বই দুটির কিছু অনুবাদের কাজও করি। বই দুটিতে ইসলামি ব্যাংকিং-এর মূলনীতি তুলে ধরেছেন ও ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাকে কোরআন হাদিসের আলোকে অতি যৌক্তিকভাবে খন্ডন করেছেন। মুফতি তকি উসমানি আরবজাহানসহ সারা বিশ্বের আলেম উলামার কাছে প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। সহীহ মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘তাকমিলায়ে ফাতহুলমুলহিম’ তো পরিপূর্ণ হাদিসের ‘দরসের’ জন্য অপরিহার্য মনে করা হয়।

ঐ বই দুটি আমাকেও স্বাভাবিকভাবেই আলোড়িত করে। সঙ্গে সঙ্গে একটা উপলব্ধি কাজ করে যে, বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ শরীয়াহ্ ভিত্তিক এসব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হালাল লেনদেনের প্রতিশ্রুতি পেয়ে লেনদেন করতে আসেন। হারাম এড়িয়ে হালাল মুনাফা লাভের আকাংখাই তাঁদেরকে এসব প্রতিষ্ঠানে টেনে নিয়ে আসে। আর এই মুনাফা যাতে সব দিক থেকে হালাল হয় ও বছরের শেষ অবধি আয়টা হালাল থাকে এজন্য আমানত সংগ্রহ ও বিনিয়োগ প্রদান এবং তা আদায় প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে অনেক সতর্ক থাকতে হয়। অনেক কাজ করতে হয়। করতে হয় অনেক নার্সিং। এভাবে মুনাফা বা আয়টা হালাল রাখতে যেসব প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হয় সেটাকে এক প্রকার লড়াই বলতে পারেন। এক ধরনের চ্যালেঞ্জ নেয়া বলতে পারেন। এই চ্যালেঞ্জের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো লক্ষ লক্ষ মানুষকে হারাম আয় থেকে বাচিয়ে রেখে তাদের হাতে হালাল আয় তুলে দেয়া। এই উপলব্ধিই এই কোম্পানিতে যোগদানের অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করেছে।

প্রিয়.কম :  এই দায়িত্ব আপনি কতটুকু উপভোগ করছেন? ম্যানেজমেন্ট কি আপনার শরীয়াহ্ বিষয়ক পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন?

মুফতি মুজাহিদ : আলহামদুলিল্লাহ্, এখনও পর্যন্ত তো বেশ উপভোগ করছি। আমি মনে করি এটা শুধু নিছক চাকুরি নয়। এটা ইসলাম ও মানবজাতির খেদমত। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তো শরীয়াহ্ বিষয়ক সব পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে নেয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই শরীয়াহর ক্ষেত্রে কারো ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। সুযোগ নেই অবহেলা বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার।

প্রিয়.কম :  বর্তমানে বাংলাদেশে ইসলামিক ইনভেষ্টমেন্ট কোম্পানির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

মুফতি মুজাহিদ : এই প্রশ্নটিই দিন দিন পরম প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। ১৯৮৩ সনে ইসলামি ব্যাংকিং-এর যাত্রা শুরু হয়। অথচ এর মাত্র ৩২ বছরের মাথায় এসে বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ইন্ডাষ্ট্রিতে ইসলামি ব্যাংকিং-এর সরব অংশগ্রহণ প্রায় ৩৬% (৩১.১২.২০১৫ পর্যন্ত)। পূর্ণাঙ্গ ও আংশিক (শাখা বা উইন্ডো) মিলিয়ে ইসলামিক ফাইন্যান্স বা ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে ২৬ টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও বোদ্ধারা এই সাফল্যকে অভাবিত বলে স্বীকার করছেন। ইসলামি অর্থনীতির মূল বার্তা হলো সম্পদ অর্জনে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ও অর্জিত সম্পদের সুষম বন্টন। অন্য দিকে ইসলামিক ফাইন্যান্স বা ব্যাংক যেহেতু টাকার বিনিময়ে টাকা আয় করে না বরং টাকা বিনিয়োগ করে পণ্য উৎপাদন করে তা থেকে আয় করে তাই অর্থের প্রবাহে কখনো স্ফীতি আসে না। অর্থাৎ ইসলামি অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস করে। (মুদ্রাস্ফীতির কারণে ভোগ্য পণ্যের দামও ক্রেতাদের নাগালে বাইরে চলে যেতে থাকে।) মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে একটি দেশের অর্থনীতির চাকা সবসময় সচল থাকে।  অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত থেকে মজবুতর হতে থাকে। আর এমন হলে কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হওয়ার মতো অবস্থায় পড়বে না। যদি কোন সময় দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান শরীয়াহ্ ভিত্তিক হয়ে উঠে তাহলে দেশের মুদ্রা স্ফীতি শূণ্যের কোঠায় নেমে আসবে। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে ইসলামিক ইনভেষ্টমেন্ট কোম্পানির প্রয়োজনীয়তা কতটা অপরিসীম।

প্রিয়.কম : বাংলাদেশের বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠান শরীয়াহ্ সম্মতভাবে নিজেদের কার্যক্রম চালাচ্ছে না এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সুদী প্রতিষ্ঠান। তাদের অধীনে থেকে কীভাবে সুদমুক্ত ইসলামি ব্যাংকিং বা ফাইন্যান্সিং সম্ভব? অথবা এ কারণে আপনাদের কী কী সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়? 

মুফতি মুজাহিদ : প্রথমেই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রসঙ্গে আসি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে থাকার কারণে এ প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, এমন একটি সুদী ব্যাংকের অধীনে থেকে কীভাবে সুদমুক্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব? এক কথায় এর উত্তর হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ইসলামি শরীয়াহ্ মোতাবেক ব্যাংকিং বা আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের শরীয়াহ্ মোতাবেক পরিচালিত হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই (হলে আরও ভালো হতো)। ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শরীয়াহ্ মোতাবেক তাদের কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করে থাকে। ইসলামি ব্যাংকগুলোকে কখনো বাংলাদেশ ব্যাংক সুদী কার্যক্রম চালাতে বাধ্য করে না; বরং ইসলামি ব্যাংকগুলো যাতে নির্বিঘ্নে শরীয়াহ্ নীতিমালা নিজেদের লেনদেনে বাস্তবায়ন করতে পারে এজন্য ‘গাইডলাইনস ফর ইসলামিক ব্যাংকিং’ নামক একটি চমৎকার নীতিমালা সার্কুলার আকারে জারি করে দিয়েছে। ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ নীতিমালা কতটুকু অনুসরণ করছে তারও নজরদারি করে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অন্যান্য ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সুদী ভিত্তিতে লেনদেন করে থাকলেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য সুদমুক্তভাবে লেনদেন করার বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন:-

এক. দেশের প্রতিটি ইসলামি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তার মোট তলবি ও মেয়াদী জমার ১১.৫% (পরিবর্তনীয়) বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত বা Statutory Liquidity Ratio (SLR) হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সংরক্ষণ করতে হয়। বর্তমানে SLR -এর মধ্যে ৬% নগদ অর্থে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। একে কেশ রিজার্ভ বা CRR বলা হয়। বাকি ৫.৫% বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশ সরকার ইসলামী বিনিয়োগ বন্ড (BGIIB)’ ও ইসলামি শরীয়াহ্ সম্মত অন্যান্য বন্ড/শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার সুযোগ রয়েছে। ইসলামি ব্যাংকগুলো CRR বাংলাদেশ ব্যাংকে সংরক্ষণ করলেও এর বিনিময়ে কোন সুদ পায় না। কিন্তু অন্যন্য ব্যাংকগুলোকে তাদের তলবি ও মেয়াদী আমানতের ১৯% SLR হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। এর মধ্যে ৬% নগদে এবং বাকি ১৩% বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের মাধ্যমে তারল্য সংরক্ষণ করে এবং এর বিপরীতে সুদ নিয়ে থাকে।

দুই. ইসলামি ব্যাংকগুলোর তারল্য উদ্বৃত্ত হলে তা বাংলদেশ সরকার প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশ সরকার ইসলামী বিনিয়োগ বন্ডে’ বিনিয়োগ করতে পারে। আবার তারল্য সংকট দেখা দিলে অবিক্রীত (Over purchased) ইসলামী বন্ড লিয়েন রেখে তার বিপরীতে ইসলামী বন্ড তহবিল থেকে বিনিয়োগ সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। আর এই বন্ড পরিচালিত হয় মুদারাবা পদ্ধতিতে। এছাড়া দেশে যেহেতু অনেকগুলো ইসলামি ব্যাংক গড়ে উঠেছে তাই প্রয়োজনে নিজেদের মধ্যে একেবারে সুদমুক্তভাবে মুদারাবা পদ্ধতিতে লেনদেন করে থাকে। সুদী ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করার কোন প্রয়োজন হয় না। পক্ষান্তরে অন্যান্য ব্যাংক তারল্য সংকট ও ঘাটতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবর্তিত REPO (Re-purchase Order) ও Reverse REPO ব্যবস্থা অনুসরণ করে থাকে। এ ছাড়াও তারা কলমানি মার্কেটে অংশগ্রহণ করে তারল্য উদ্বৃত্ত ও তারল্য ঘাটতির সমস্যার সমাধান করে থাকে। ইসলামি ব্যাংকগুলোর কলমানি মার্কেটে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।

তিন. বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক হওয়ার কারণে ইসলামি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি ক্লিয়ারিং এ্যাকাউন্টে বৈদেশিক মুদ্রা জমা রাখে। এ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক LIBOR (London Inter-Bank Offered Rate) অনুযায়ী সুদ দিয়ে থাকে। আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণেই এ সুদ এসে যায়। তবে এই সুদ ইসলামি ব্যাংকগুলো হালাল আয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে না। ইসলামি শরীয়াহর নির্দেশনা অনুযায়ী কোন ধরনের সওয়াবের নিয়ত ছাড়া তা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়।

প্রিয়.কম : আজকাল অনেক অনৈসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামি শাখা খুলছে। আমাদের প্রশ্ন হলো যে প্রতিষ্ঠানে বাকি সব হিসেব নিকেশ সুদী পদ্ধতিতে চলছে তার এক বা একাধিক শাখা কী করে ইসলামি পদ্ধতিতে চালানো যায়?

মুফতি মুজাহিদ : সুদী বা অনৈসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামি শরীয়াহ্ ভিত্তিক শাখা খুলতে পারে। এতে কোন সমস্যা নেই। কারণ, ইসলামিক শাখা সমস্ত হিসাবায়ন পৃথকভাবে শরীয়াহ্ পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। এর লেজার এমনকি সফটওয়ারও ভিন্ন থাকে। সুদী শাখাগুলোর হিসাবায়নের সাথে তা যুক্ত হয় না। আমাদের জানামতে যেসব সুদী আর্থিক প্রতিষ্ঠান উইন্ডো বা ব্রাঞ্চ খুলেছে তারা এ পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকেন। তাদেরও শরীয়াহ্ কাউন্সিল বা শরীয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটি রয়েছে। কাউন্সিল বা কমিটির দিক নির্দেশনা মেনেই তারা উইন্ডো বা ব্রাঞ্চ পরিচালনা করেন।

mozahid-1

ছবি : এমডি তুহিন

প্রিয়.কম : দেশের আলেম উলামা শ্রেণীর কাছে আপনাদের কোম্পানি কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে?

মুফতি মুজাহিদ : জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের অভূতপূর্ব খতিব মরহুম মাওলানা উবায়দুল হক আমাদের কোম্পানির শরীয়াহ্ কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাত সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা মহিউদ্দিন খানের মতো বিখ্যাত আলেম। এভাবে ইসালামি ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেষ্টমেন্ট শুরুর দিনটি থেকেই আলেম শ্রেণীর নেক পরামর্শ ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। অসংখ্য হাফেজ আলেম মুফতি ও তাবলিগিদের লেনদেন রয়েছে ইসলামিক ফাইন্যান্সের সঙ্গে।

প্রিয়.কম : অনেকে বলেন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলে ১০০% ভাগ হালাল ব্যবসা, বিনিয়োগ বা ব্যাংকিং সম্ভব নয়। এ সম্পর্কে বলুন।

মুফতি মুজাহিদ : এ ধারণা সঠিক হওয়ার কোন কারণ নেই। পৃথিবীর কোথাও কি এখন ১০০% ভাগ ইসলামি রাষ্ট্র আছে? খোদ সৌদি আরবও ১০০% ভাগ ইসলামি রাষ্ট্র নয়। তাদের শাসক নিয়োগ পদ্ধতিই তো ইসলাম সমর্থন করে না। তাহলে কি সৌদি আরবের মানুষ হালাল ব্যবসা বাণিজ্য করছে না? যে দেশের মানুষ নির্বিঘ্নে ইসলামিক আচার অনুষ্ঠান ইবাদত বন্দেগি পালন করতে পারে না সেখানেও হালালভাবে ব্যবসা বাণিজ্য ও ব্যাংকিং করা সম্ভব। এজন্যই তো ইউরোপ আমেরিকায় এখন ব্যপক হারে ইসলামি ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি গড়ে উঠছে। লুক্সেমবার্গ, লাসভেগাস, শিকাগো, লন্ডন, জার্মানির হামবুর্গ ও বার্লিনসহ অনেক অসৈলামিক দেশে ইসলামিক ব্যাংকিং গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের নিজস্ব কোন ধর্ম থাকতে হবে এমনও তো কোন কথা নেই। রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষের ধর্মই সে দেশের অঘোষিত রাষ্ট্র ধর্ম। এর সাথে তো সাধারণ মানুষের ব্যবসা বাণিজ্য ব্যাংকিং কার্যক্রমের তেমন কোন সম্পর্ক থাকার কথা নয়। আর রাষ্ট্রের সাথে তো কেউ ব্যবসা করে না বা রাষ্ট্রও কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। তাই এজাতীয় প্রশ্নও অযৌক্তিক।

প্রিয়.কম : মাদরাসা শিক্ষতরা যতুটুকু ইসলামি অর্থনীতি সম্পর্কে পড়াশোনা করেন, সেটাকে আপনি কতটুকু কার্যকর মনে করেন?

মুফতি মুজাহিদ : মাদরাসা শিক্ষায় মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে কিছু এবং সম্মান পর্যায়ে ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ক বেশ নাতিদীর্ঘ সিলেবাস আছে। সুবিশাল গ্রন্থ ‘হিদায়া’-এর এক খন্ডের (৩য় খন্ড) পুরোটাই তো কেনা বেচা বা লেনদেন সম্পর্কিত। এর বাংলা করলে প্রায় হাজার পনেরশ পৃষ্ঠা হয়ে যাবে। কিন্তু মজার বিষয় হলো ছাত্রদের খুব কমই বুঝতে পারেন যে, এটা ইসলামি অর্থনীতির বিষয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্যের ধরন বা পদ্ধতির সঙ্গে সমন্বয় করে পাঠদান করা হলে শিক্ষার্থীরা আরও অনেক বেশি জানতে ও বুঝতে পারবেন। কারণ, পুঁথিগত বিদ্যা ও বাস্তবিক প্রয়োগের মধ্যে বেশ পার্থক্য থাকে। এটার ধারণা না পেলে তো শিক্ষাটাই কেমন যেন পূর্ণাঙ্গতা পায় না। ইসলামি ব্যাংকসমূহের লেনদেনগত কার্যক্রমের ধারণা কিন্তু এই হিদায়া গ্রন্থ থেকেই নেয়া হয়েছে। অথচ হিদায়া পড়ুয়া মাওলানা সাহেব প্রথম বাক্যেই ইসলামি ব্যাংকিংকে বাতিল করে দিতে চান। এমন একজনকে আমি কিতাবের ‘ইবারতের’ সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখিয়েছি হিদায়ার ‘কিতাবুল বুয়ূ’ আর ইসলামি ব্যাংকি কার্যক্রমের মধ্যে কতটা মিল রয়েছে। পরে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন এটা তার বোঝার ভুল ছিলো। সঙ্গে সঙ্গে আমিও স্বীকার করেছি এমন ভুল প্রথমদিকে আমারও ছিলো।  তাই মাদরাসায় যে ইসলামি অর্থনীতি শিক্ষা দেয়া হয় সেটা পরিমাণের দিক দিয়ে যথেষ্ঠর চেয়ে বেশিই দেয়া হয়। কিন্তু শেখার বিষয়টি যেহেতু হাতে কলমে হচ্ছে না তাই শিক্ষার্থীরা এটা তেমন উপভোগও করতে পারছে না। তাই আমার মনে হয় পাঠদানের পদ্ধতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে। যিনি কিতাবু বুঝেন এবং বাজার ব্যবস্থাও বুঝেন (সবার বাজার ব্যবস্থা বুঝতে হবে এমন কোন কথা নেই।) এমন কাউকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ালে আশা করি বিষয়টা অনেক সহজ হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ্।

প্রিয়.কম : বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী ইসলাম বিষয়ক শিক্ষাগ্রহণ করে কওমি মাদরাসাগুলোতে। তারা আপনাদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে কতটা জড়িয়ে আছেন? যেহেতু তাদের সরকারি স্বীকৃতি নেই, তবুও যোগ্যতার বিবেচনায় আপনাদের মতো প্রতিষ্ঠানে তারা জায়গা পাবে কি?

মুফতি মুজাহিদ : যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন কম বেশি কিছু কিছু জায়গায় এখনও আছে। আল-আরাফাহ, শাহজালাল, এসআইবিএল, আইএফআইএল, ফারইষ্ট ইসলামি ব্যাংকসমূহে কিছু কওমি মাদরাসা শিক্ষিত কর্মকর্তা বেশ সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে পরিমাণটা বাড়ানো গেলে শরীয়াহ্ ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোই অবশেষে উপকৃত হবে।

প্রিয়.কম : পরিমাণটা বাড়ছে না কেন?

মুফতি মুজাহিদ : আগ্রহ না থাকলে যা হয় তাই হচ্ছে। কওমি মাদরাসা থেকে যারা পাশ করে বের হচ্ছেন তারা তো এই সেক্টরে আসছেন না। তাদের অধিকাংশই মসজিদ মাদরাসায় খেদমত করাকেই ব্রত হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এই সেক্টরে কাজ করাকে দীনি খেদমত মনে করছেন না। দুুনিয়াবি কাজ বলে এই সেক্টরকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। যে কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থপনা কর্তৃপক্ষেরও কওমি মাদরাসা সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা তৈরি হচ্ছে না। এই ব্যবধানটা কমানো গেলে পরিমাণ বাড়বে বলে আশা করা যায়। আরেকটি কথা হলো কওমি পড়ুয়ারা ব্যাংকিং সেক্টর তো অনেক দূরের ব্যাপার ব্যবসা বাণিজ্যকে দিকে কজন পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন? নিয়ত ঠিক থাকলে ব্যবসা বাণিজ্যও যে ইবাদত হয়ে উঠতে পারে এই ফজিলতের অনেক হাদিস উনারা অনেক ভালো জানেন। আমার প্রশ্ন হলো রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বড় সুন্নত কোনটি চাকুরি করা নাকি ব্যবসা বাণিজ্য করা? চাকুরি সম্পর্কে কটা ফজিলতের হাদিস আছে? আমি যে সবাইকে ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে বলছি তা কিন্তু নয়। আলেম উলামদের কিছু অংশ ব্যবসা বাণিজ্যে আসলে এই সেক্টরে আরো সততার পরিবেশ গড়ে উঠবে। এতে দেশ ও দেশের মানুষই বেশি উপকৃত হবে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত পৌছে দেয়া সহজ হবে।

প্রিয়.কম : সাধারণ একটা প্রশ্ন, আপনাদের প্রতিষ্ঠানের নামই বলে দিচ্ছে এখানে ইসলামিক কার্যক্রম ছাড়া অন্য কিছু হচ্ছে না। তাহলে আবার শরীয়াহ্ বোর্ডের প্রয়োজন হলো কেন? গোটা ব্যবস্থাপনা পরিষদই শরীয়াহ্ মোতাবেক হওয়া উচিত ছিলো।     

মুফতি মুজাহিদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ইসলামিক ব্যাংকিং গাইডলাইন’-এ শরীয়াহ্ ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য শরীয়াহ্ বোর্ড বা শরীয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটি গঠনের কথা বলা আছে। শরীয়াহ্ বোর্ড মূলত পরামর্শক বা উপদেষ্টা পরিষদের মতো কাজ করে থাকে। ব্যবস্থপনা কর্তৃপক্ষ তো কোম্পানির যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আর কোম্পানির সামগ্রিক কার্যক্রম শরীয়াহ্ মোতাবেক পরিচালিত হচ্ছে কি না এটা দেখার দায়িত্ব শরীয়াহ্ বোর্ডের। মসজিদে তো সব সময় ইবাদত বন্দেগি হবে এটাই স্বাভাবিক। তারপরও সেখানে ইমাম খতিব থাকেন। শরীয়াহ্ বোর্ডের মর্যাদা অনেকটা সেরকম। তাছাড়া অনেক সময় জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফাতওয়া দিতে হয়। শরয়ী যেকোন সমস্যার সমাধানের পথ বের করতে হয়। শরীয়াহ্ বিশেষজ্ঞদের পক্ষেই এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। তাছাড়া নতুন কোন  প্রোডাক্ট চালু করতে হলে শরীয়াহ্ বোর্ড এর শরয়ী দিক বিবেচনা করে দেখে। শরীয়াহ্ বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষেই যেকোন প্রোডাক্ট বাজারে চালু করা হয়। এজন্য একটি শক্তিশালি ও কার্যকর শরীয়াহ্ বোর্ড বা কমিটি ছাড়া একটি শরীয়াহ্ ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কথা চিন্তাও করা যায় না।

প্রিয়.কম : শরীয়াহ্ মোতাবেক পরিচালিত আপনাদের কী কী প্রোডাক্ট বা কার্যক্রম রয়েছে?

মুফতি মুজাহিদ :  আমানত গ্রহণের জন্য এক ধরনের প্রোডাক্ট আর বিনিয়োগ প্রদানের জন্য অন্য ধরনের প্রোডাক্ট রয়েছে। আমানত গ্রহণ করা হয় মুদারাবা পদ্ধতিতে। মূলত আমরা মুদারাবা মুতলাকা পদ্ধতিতে আমানত গ্রহণ করে থাকি। এর অধীনে অনেকগুলো মুদারাবা জামা/সঞ্চয় স্কীম রয়েছে। যেমন : ১. মুদারাবা পেনশন জমা স্কীম। ২. মুদারাবা মাসিক মোহর জমা স্কীম। ৩. মুদারাবা মাসিক বিবাহ সঞ্চয় জমা স্কীম। ৪. মুদারাবা মাসিক শিক্ষা সঞ্চয় জমা স্কীম। ৫. মুদারাবা মাসিক হজ্জ সঞ্চয় জমা স্কীম। ৬. মুদারাবা মেয়াদী জমা জমা স্কীম। ৭. মাসিক মুনাফাভিত্তিক মুদারাবা জমা স্কীম। ৮. মুদারাবা স্পেশাল ডিপোজিট স্কীম। ৯. মুদারাবা গৃহসংস্থান স্কীম। ১০. মুদারাবা লাখোপতি/ কোটিপতি জমা স্কীম। ১১. মুদারাবা ক্যাশ ওয়াক্ফ ডিপোজিট স্কীম। ১২. মুদারাবা স্বল্প মেয়াদী জমা স্কীম প্রভৃতি।

আর যেসব বিনিয়োগ প্রোডাক্ট রয়েছে সেগুলো হলো: ১. বাই-মুরাবাহা। ২. বাই- মুরাবাহা মুয়াজ্জালা। ৩. বাই- মুয়াজ্জাল। ৪. বাই- সালাম। ৫. বাই-ইস্তিসনা। ৬. মুদারাবা মুকায়িদা। ৭. মুশারাকা। ৮. মুশারাকা মুতানাকিসা বা হায়ারপারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিলক। ৯. ইজারা। ১০. ইজারা মুনতাহিয়া বিততামলীক ইত্যাদি। এটা পরীক্ষিত শতভাগ প্রমাণিত যে, প্রতিটি আমানত গ্রহণ ও বিনিয়োগ পদ্ধতির বর্ণনা কোরআন হাদিস ইসলামি ফিকহে রয়েছে।

প্রিয়.কম : কেউ কেউ অভিযোগ করেন, শরীয়াহ্ নামধারী এসব কোম্পানি নামে মাত্র ইসলামি; কাজে ইসলামি নয়। এ সম্পর্কে আপনাদের কি কিছু বলার আছে?

মুফতি মুজাহিদ : এ প্রশ্নের উত্তর ওপরের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরে অবধারিতভাবেই চলে এসেছে। এ ধরনের প্রশ্ন বা অভিযোগ এক সময় অনেক শোনা যেতো। এখন সম্ভত চিত্র কিছুটা বদলেছে। কারণ, এর উত্তরও নানাভাবে দেয়া হয়েছে। বলা যায় এ ধরনের প্রশ্ন এখন মীমাংসিত। কেউ কেউ এর সঙ্গে এও জুড়ে দেয় যে, ইসলামি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুদী ব্যাংকের মতোই, ইসলামের নাম দিয়ে তারা ঘুরিয়ে সুদ খায়। অভিযোগটি সঠিক নয় এক অংশও। ইসলামি ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তত্ববধানের জন্য শক্তিশালি শরীয়াহ্ পরিদর্শক ও সুপারভাইজারি কমিটি সবসময় কার্যকর থাকে। তারা তো সবকিছু দেখভাল করছেনই। যদি বিনিয়োগ প্রদান বা ডিপোজিট সংগ্রহে কোন কর্মকর্তা ভুল করে থাকেন তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেটা শুধরে দেয়া হয়। নামাজ রোজা ইত্যাদি আদায়ের সময়ও তো ভুল হতে পারে। ভুল হলে সেটা কিভাবে শুধরাতে হবে তাও ইসলাম বলে দিয়েছে। এক্ষেত্রেও তাই হয়। তাছাড়া ইসলামি ব্যাংক ও সুদী ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। এই পার্থক্যের কথা বিস্তারিত আলোচনা করলে অনেক বড় পরিসর প্রয়োজন। কে না জানে ইসলামি ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয় ইসলামি শরীয়াহর আলোকে। সুদী ব্যাংক এধরনের কোন নীতি অনুসরণ করে না। যারা এসব শরীয়াহ্ ভিত্তিক প্রতিষ্ঠনে লেনদেন করেন তারা কিন্তু মুদারাবা, মুশারাকা, বাই- মুরাবাহা/মুয়াজ্জাল,বাই-সালাম, বাই- ইস্তিসনার নাম জানেন। এটা কিভাবে জানেন? এই পদ্ধতিতে লেনদেন হয় বলেই তো গ্রাহকরা কোরআন হাদিসে বর্ণিত এসব পদ্ধতির নামগুলো জানেন। সুদী ব্যাংকে কি এই মোডগুলো চর্চিত হয়?

তাই আমি বলবো দূর থেকে অনেক কিছু বলা যায়। অথবা ভাসা ভাসা জানা থেকে অনেক প্রশ্ন/অভিযোগের সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। কাছে আসলে ভেতরে ঢুকলে অনেক প্রশ্নের উত্তর এমনিতেই পেয়ে যাবেন। আর বিরোধীতার ইচ্ছে পুষে রাখলে যতই যুক্তিগ্রাহ্য করে জবাব দেয়া হোক না কেন অভিযোগকারীর অভিযোগ কোন দিন ফুরোবে না। আর এটাও ইসলামিক কোন পদ্ধতি নয়।

প্রিয়.কম : বাংলাদেশে ইসলামিক ফাইন্যান্স বা ইসলামিক ইনভেষ্টমেন্টের ভষ্যিৎ সম্পর্কে কিছু বলুন।

মুফতি মুজাহিদ : এক কথায় বলতে গেলে ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ভারি উজ্জল। আজ থেকে প্রায় ৩২ বছর আগে মাত্র একটি ব্যাংক একটি ব্রাঞ্চ নিয়ে ইসলামি ব্যাংকিং-এর যাত্রা শুরু করেছিলো। আর আজ পূর্ণাঙ্গ ও উইন্ডো বা ব্রাঞ্চে শরীয়াহ্ ভিত্তিক ব্যাংকিং বা আর্থিক লেনদেন করছে ২৫ টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৫৬টি। সমস্ত ব্যাংকের মোট ব্রাঞ্চ হলো ৯১৩১, আর এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্রাঞ্চ হলো ৯৬৮ টি। আরও বেশ কয়েকটি ব্যাংক ইসলামি শাখা খোলার জন্য বা পূর্ণাঙ্গরূপে প্রচলিত ব্যাংক থেকে শরীয়াহ্ ভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করে রেখেছে। এ পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে ইসলামি ইনভেষ্টমেন্ট কোম্পানিগুলো আল্লাহর রহমতে এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। ভষ্যিতেও যে এ গতি আরও বিপুলতা পাবে এতো বলাইবাহুল্য।

প্রিয়.কম : সুদ ছাড়া ইনভেষ্টমেন্ট বা ব্যাংক কোম্পানি কীভাবে চলে?

মুফতি মুজাহিদ :  ইসলামে সুদ নিষিদ্ধ। তবে ব্যবসা বাণিজ্যর প্রতি ইসলাম উৎসাহ দিয়েছে। ব্যবসার মাধ্যমে মুনাফা অর্জনকে ইসলাম স্বকৃতি দিয়েছে। সূরা বাকারার ২৭৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ ব্যবসাকে করেছেন হালাল আর সুদকে করেছেন হারাম।  তাই ইসলামি ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুদী লেনদেন করে না। শরীয়াহ্ সম্মত ব্যবসা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে থাকে (যেমন- বাই-মুরাবাহা, মুয়াজ্জাল, মুদারাবা, মুশারাকা, সালাম ইস্তিসনা ইত্যাদি)। সোজা কথায় ইসলামি ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান মুদারাবা পদ্ধতিতে ডিপোজিট গ্রহণ করে আর শরীয়াহ্ নির্দেশিত পন্থায় তা বিনিয়োগ করে। এই বিনিয়োগ থেকে যে মুনাফা অর্জিত হয় তাই আয়ের প্রধান উৎস। অর্জিত এই চুক্তি মোতাবেক সঞ্চয়কারী ও ব্যাংকের মধ্যে হারাহারিভাবে বন্টিত হয়।

প্রিয়.কম : দীর্ঘ সময় আপনি আমাদেরকে দিয়েছেন। দিয়েছেন অনেক মূল্যবান তথ্য ও বক্তব্য। এজন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি ভালো থাকুন।

মুফতি মুজাহিদ :  আপনাদেরকে ধন্যবাদ। আপনারাও ভালো থাকুন।

সূত্র: প্রিয়.কম

Advertisements