১ম পর্ব

ইসলাম হচ্ছে একটা বিশ্বজনীন জীবন বিধান। পৃথিবীর যে-কোনো বংশ-গোত্রের লোকই ইসলামের পথে যে-কোনো সময় আসতে পারে। কারো জন্যেই কোনোরকম বাধা নেই কিংবা ইসলামে প্রবেশের ব্যাপারে গোত্র বা বংশ বিশেষের কোনোরকম তুলনামূলক প্রাধান্যও নেই। ইসলাম সেই আবির্ভাবের সূচনা থেকেই যে ব্যাপারে আকর্ষণীয় ছিল তা হলো চমৎকার সব নৈতিক শিক্ষা, আধ্যাত্মিক এবং আত্মগঠন সংক্রান্ত মৌলিক শিক্ষা। আর এসব আকর্ষণীয় শিক্ষার মূল প্রোথিত রয়েছে পবিত্র আল-কোরআনে। আল কোরআনের উচ্চতর চিন্তাধারা এবং উন্নত ও শক্তিমান জ্ঞানের প্রবাহ মানুষকে নিয়ে যায় জীবন উৎকর্ষের রাজপথে। কোরআন এ পথে যেতে মানুষকে যথার্থ দিক-নির্দেশনা দেয়। ইসলাম মানুষকে দেয় স্বাধীনতা ও চিন্তার ভারসাম্য, সেইসাথে দৃষ্টিভঙ্গির উর্ধ্ব থেকে উর্ধ্বতর দিগন্তে পাখা মেলা এবং সত্য আবিষ্কারের অবাধ অধিকার। এই অধিকার চর্চা করেই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসেছেন এইবাত বালদাচিনা নামের এক রমনী। তাঁর মুসলমান হবার ইতিকথা নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।

এইবাত বালদাচিনার বয়স একত্রিশ বছর। কিছুকাল আগে তিনি মুসলমান হয়ে নিজের নাম রাখেন সুরাইয়া। নওমুসলিম এই মহিয়সী নারী অস্ট্রেলিয়ার অধিবাসী। তাঁর মা হলেন ব্রিটিশ আর পিতা হলেন ইতালীয়।ছোটো বেলায় তাকেঁ ক্যাথলিক খ্রিষ্টান হিসেবে বারিস্নান দেওয়া হয়েছিল। সুরাইয়া তাঁর পুরো শিক্ষাজীবন কাটিয়েছেন ক্যাথলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সমাজ বিজ্ঞানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেছেন। স্বয়ং সুরাইয়া এ সম্পর্কে বলেছেনঃ “আমি এক খ্রিষ্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি। কিন্তু সেই কিশোরী বয়সেই আমার ভেতর একটা বিষয় আমি অনুভব করতাম। সেটা হলো আমি ভাবতাম যে নিশ্চয়ই এই বিশ্বের স্রষ্টা একক কোনো সত্ত্বা হবেন। ত্রিত্ববাদ বা তিন খোদার বিষয়টি আমার কাছে কেন যেন গ্রহণযোগ্য বলে মনে হতো না। আমার মনে হতো ইঞ্জিল গ্রন্থে কোনো কোনো নবীর ব্যাপারে যেসব অন্যায় বিষয়-আশয় আরোপিত হয়েছে সেসব কিছুতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে হতে পারে না। কিন্তু আমি যেই ক্যাথলিক খ্রিষ্টান পরিবেশে বেড়ে উঠেছি সেখানে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে গবেষণা করার কোনো সুযোগ ছিল না।”
এইবাত বালদাচিনা আরো বলেনঃ “আমার বয়স যখন নয় বছর,তখন আমাকে পাদ্রির কাছে নিয়ে যাওয়া হলো স্বীকার করার জন্যে। স্বীকার মানে হলো পাদ্রি আমার কাছে চাচ্ছিলো-আমি যেন স্বীকার করি গত সপ্তার দিনগুলোতে আমি কী কী গুনাহ বা অন্যায় কাজ করেছি।স্বীকার করার কারণ হলো তাতে গুনাহের বোঝা হালকা হয়ে যাবে। আমি তাকে বললাম গত সপ্তায় আমি কোনোরকম অন্যায় কাজে লিপ্ত হই নি। আর যদি কোনোরকম গুনাহ বা অন্যায় কাজ করিও,তাহলে আমি সরাসরি খোদার কাছে বলবো,তাঁর কাছে তওবা করবো।”

অস্ট্রেলিয়ার অধিবাসী মিস এইবাত নিজের ধর্মের শিক্ষাগুলোর ব্যাপারে সন্দেহ করতেন বলে অন্য ধর্ম নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। তিনি বলেনঃ এক স্রষ্টাকে অন্বেষণ করতে গিয়ে প্রাচ্যের ধর্মগুলো নিয়ে পড়ালেখা শুরু করলাম।অবশ্য প্রথমে ইসলাম থেকে দূরত্ব বজায় রাখলাম, কেননা আমাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা ছিল। আমাদেরকে বোঝানো হতো যে ইসলামে নারীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয় এমনকি মানুষই মনে করা হয় না। হিন্দুত্ববাদ নিয়ে পড়ালেখা করলাম।কিন্তু আমার কাছে মোটেই আকর্ষণীয় মনে হলো না। বৌদ্ধবাদ তারচেয়ে অনেকটা ভালো বলে মনে হলো। কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনাগুলো খুব একটা যৌক্তিক বলে মনে হয় নি আমার। এগুলো আমার তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হলো না।

এইবাতের ভেতরে সত্য সন্ধানী কৌতূহলী একটা সুরের অনুরণন খেলে যাচ্ছিল,তিনি আনমনেই সেদিকে ছুটলেন। স্রষ্টাকে খুঁজে ফেরার আকর্ষণ তাঁর ভেতরে ধীরে ধীরে শিখার প্রজ্জ্বলিত হতে লাগলো। সেই আলোয় তিনি সত্যের পথ অন্বেষণে ধাবিত হলেন। এরকম একটা সময়ে তাঁর মা মিশর সফরে যান। তার কিছুদিন পর মিস এইবাতও মিশর সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানেই তাঁর ভেতরে জাগরণের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দেখা দিল। তাঁর ভাষায়ঃ “যখন মিশর অভিমুখী বিমানের ভেতর ছিলাম,হেডফোন কানে লাগিয়ে রেডিও শুনছিলাম। রেডিও শুনবো কী! কেবল নব ঘুরাচ্ছিলাম। ওয়েব ব্যাণ্ড বা তরঙ্গের পর তরঙ্গে নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খেলা করছিলাম। হঠাৎ করে বিশেষ একটা রিদমিক সুর কানে বেশ ভালো লাগলো। সম্ভবত আরবি ভাষার সঙ্গীত ছিল। সুরটা আমার কাছে এতো বেশী স্বস্তিদায়ক এবং প্রশান্তিকর ছিল যে বিমানে যতোক্ষণ ছিলাম আমি আর ঐ ব্যান্ডটা পাল্টাই নি। যদিও আমি জানতাম না এর অর্থ কী!

যাই হোক, মিশরে সবকিছুই আমার ভালো লাগলো। গরিব মুসলমানদেরকেও দেখলাম অভাব-অভিযোগ সত্ত্বেও বেশ উদার এবং নিজেদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট। এটা বেশ অবাক করার মতো ব্যাপার ছিল, কেননা পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে মানুষেরা সেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু টাকার পেছনে ছোটে,তারপরও তারা সবসময় অতৃপ্ত এবং অসন্তুষ্ট। পাশ্চাত্যে একটা মানুষ যতোক্ষণ পর্যন্ত কর্মঠ থাকে ততোক্ষণ তাকে মূল্যায়ন করা হয়।বয়স্ক বা বৃদ্ধরা সেখানে বৃদ্ধাশ্রমে কাটায়। অথচ মুসলমানরা বয়স্কদেরকে বেশ সম্মান করে। ভ্যাপারটা আমাকে বেশ আকৃষ্ট করলো। পরে বুঝলাম এটা তাদের ইসলামী সংস্কৃতিরই অঙ্গ।

মুসলমানরা রমযান মাসে রোযা রাখে এবং নিজেদের আচার-আচরণের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকে। ইসলামে পারিবারিক ব্যবস্থাটি বেশ মার্জিত। ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের সাথে পূত-পবিত্র জীবন যাপন করে। সাধারণত অন্যায়ের কেন্দ্রগুলো থেকে তারা দূরত্ব বজায় রাখে। আর এই সুন্দর ব্যবস্থাপনাগুলো অপর ধর্মের লোকজনকে ইসলামে দীক্ষিত হলো অনুপ্রাণিত করে। এজন্যেই লক্ষ্য করা গেছে গত বছর ইউরোপে ৪ লাখেরও বেশি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে।এদের বেশিরভাগই হলেন শিক্ষিত শ্রেণী। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে যেভাবে ফেৎনা ফাসাদে, যুদ্ধ-বিগ্রহ, শোষন-নিপীড়ন লেগেই আছে তাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মানুষ। শিক্ষিত শ্রেণী তাই নীতি-নৈতিকতা আর চিন্তা-চেতনার নবমূল্যায়নের পেছনে ছুটছে। এভাবে গবেষণা করতে গিয়েই তারা ইসলামের যুগোপযোগী অনাবিল আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে ধন্য করার অবকাশ পাচ্ছে।

২য় পর্ব

গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে ইউরোপে যারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে তাদের বেশিরভাগই শিক্ষিত শ্রেণীর। কেননা বিশ্বব্যাপী চলমান অস্থিরতা আর শোষণ-বঞ্চনাক্লিষ্ট মানুষ এখন নিরূপায় হয়ে একটা সুষ্ঠু সমাধান আশা করছে। সেই লক্ষ্যেই চিন্তাশীল ব্যক্তিরা গবেষণা চালাচ্ছেন। আর যারাই গবেষণা চালাতে গিয়ে ইসলামী আদর্শ নিয়ে পড়ালেখা করেন তারাই অনন্য এই আদর্শের মোহে বিমুগ্ধ হয়ে যান এবং ইসলাম গ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে ধন্য করে তোলেন।কেননা তাঁরা যে আদর্শ বা পরিত্রাণের যেরকম মাধ্যম খুজেঁ বেড়ান সে সবই খুজেঁ পান ইসলামে। বেলজিয়ামের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন লওজ ওয়ার সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে লিখেছে,চল্লিশ হাজারেরও বেশি বেলজিয়ান নাগরিক গেল ক’বছরে মুসলমান হয়েছে।

বেলজিয়ামের মোট জনসংখ্যা এক কোটির মতো। তার মাঝে মুসলমানদের সংখ্যাই হলো সাড়ে চার লাখ। এই পরিসংখ্যান উল্লেখ করে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনটি লিখেছেঃ এভাবে এতাটা দ্রুততার সাথে যদি বেলজিয়ানরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে তাহলে ২ হাজার ১২ সালের মধ্যে বেলজিয়ামে মুসলমানদের সংখ্যা পাঁচ লাখে পৌঁছে যাবে। যেসব বেলজিয়ান ইসলামে দীক্ষিত হয়েছেন তাদের এই ধর্মান্তরের পেছনে যে যুক্তিটি তারা দেখান তাহলো ইসলামে মানুষ এবং খোদার মাঝে কোনোরকম মাধ্যম বা তৃতীয় পক্ষের অস্তিত্ব নেই। তাদের দৃষ্টিতে আধ্যাত্মিক জীবনে পবিত্রতার ক্ষেত্রে ইসলামের যে দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। মিস এইবাত বলেনঃ

মিশরে একদিন এক কফি হাউজের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কানে ভেসে এলো সেই মিষ্টি মধুর আওয়াজ-বিমানের ভেতর রেডিওতে যা শুনে আমি প্রশান্তি পাচ্ছিলাম। আমি পেরেক বিদ্ধের মতো দাঁড়িয়ে গেলাম। জানতে চাইলাম এটা কিসের শব্দ।বললো এ হচ্ছে কোরআন তেলাওয়াতের শব্দ।

আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করে ঐ কোরআনের একটা ইংরেজি সংস্করণ জোগাড় করে পড়লাম। আমি ভীষণভাবে কোরআনের আয়াতের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়লাম। আমি বিস্ময়কর এই গ্রন্থে জীবনের পরিপূর্ণ বিধি-বিধান লক্ষ্য করলাম। দেখলাম সবকিছুই যৌক্তিক এবং বাস্তবায়নযোগ্য।এমন কোনো বিষয় নেই যার সম্পর্কে কোরআনে বলা হয় নি।কোরআনের যে বাচনভঙ্গি,অন্যদের সাথে সম্পর্কের যে প্রক্রিয়া,হালাল-হারামের ব্যাপারে যেরকম গুরুত্বারোপ, জ্ঞান,মনোবিজ্ঞান, পরিবার, প্রশিক্ষণ, শাসনকার্য ইত্যাদি সকল কিছুই ইসলামে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমি ইঞ্জিলের পরিবেশের মধ্যে বড়ো হয়েছি তবে আমার মনে হতো ইঞ্জিলের একটা অংশ খোদার বক্তব্য নয়।সে রাতে আমি যখন আমার রুমে কোরআন পড়লাম ঠিখ তখনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম ইঞ্জিল এবং কোরআনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোরআনের যে বক্তব্য তা এক আল্লাহর পক্ষ থেকে আর তার অর্থও একদম যথার্থ এবং সুস্পষ্ট। ঐ রাতে আমি সকাল পর্যন্ত কোরআন পড়েছি। অবশেষে আমি এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছলাম যার সাথে আমার চিন্তার সাযুজ্য রয়েছে। আমি ভাবতাম ইসা (আ) কিছুতেই খোদা হতে পারে না। যদি তিনি খোদাই হতেন তাহলে তিনি এই মর্তলোকে বসে কার দরবারে মোনাজাত দিতেন? মূলত যিনি খোদা,তাঁর তো মুনাজাত দেওয়ারই প্রয়োজন নেই। কোরআন সুস্পষ্টভাবে এবং সরাসরি বলেছেঃ হে আহলে কিতাব!তোমরা তো ইসা (আ) কে খোদার পুত্র বলে অভিহিত করো,অথচ তিনি কেবল একজন পয়গাম্বর মাত্র। কোরআন আমাকে এমনভাবে আকৃষ্ট করলো যে পরদিন সকালে আমি আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলাম এবং মুসলমান হয়ে গেলাম।

মিস এইবাত ইসলাম গ্রহণ করাটাকে অভ্যন্তরীণ পবিত্র যে আহ্বান আছে তার ডাকে সাড়া দেওয়া বলে মনে করেন এবং তিনি বিশ্বাস করেন কোরআনের প্রাণদায়ী আয়াতগুলোর আলোকরশ্মি সৌন্দর্য আর নূরের জানালা দিয়ে তাঁর চেহারায় এসে পড়েছে। তিনি বলেন যখন কোরআন পড়লাম,এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারলাম যে এই গ্রন্থের শিক্ষাগুলো সেই মহান জিনিস যেগুলোকে সবসময় নিজের ভেতর লালন করতাম এবং সেসব নিয়ে সবসময় ভাবতাম। আসলে কোরআন একটা স্মরণীয় জিনিস,যখনি তা আমার স্মৃতিতে জেগে ওঠে ভাবতেই ভালো লাগে যে কী চমৎকার এবং পূত-পবিত্র জিনিস আমার অস্তিত্ব জুড়ে বিরাজ করছে।

আমি যেহেতু ইসলামের বিধি-বিধানগুলো যথার্থভাবে জানতাম না,তাই অস্ট্রেলিয়া ফিরে আসার পর স্বভাবগতভাবেই আমি উপলব্ধি করলাম যে অন্যায় বা গুনাহের পরিবেশ থেকে দূরে থাকা উচিত।
বিশিষ্ট মুসলিম চিন্তাবিদ আবু হামেদ গাযযালী মনে করেন মানুষের চিন্তাগত পরিবর্তনকে মূল্যায়ন করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। সেজন্যেই সত্যকে উপলব্ধি করার যে আনন্দ এবং উত্তেজনা মানুষের ভাগ্যে জোটে সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তারপরও বহু নওমুসলিম এই অবস্থা বা পরিস্থিতিটা উপলব্ধি করেছেন। তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করাকে এমন একটা নূরের প্রভাব বলে মনে করেন যা আল্লাহ তায়ালা তাদেঁর অন্তরে প্রজ্জ্বলিত করে দিয়েছেন এবং তাদেঁরকে সত্যের ঝর্ণাধারায় অবগাহিত করেছেন।

পাঠক! যাঁরা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব চর্চা না করলেও মোটামুটি বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে পড়ালেখা করে তাদেঁর কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করে থাকেন, তাঁরা অস্ট্রেলিয় নওমুসলিম এইবাত বালদাচিনার কথাগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখবেন এবং নতুন কোনো বক্তব্য থাকলে কিংবা আপনাদের কোনো দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে তাও আমাদের জানাতে পারেন। মনে রাখবেন ইসলাম সবসময় গবেষণাকে প্রাধান্য দেয়। এমনকি কলমের কালিকে শহীদের রক্তের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান বলে মনে করে।তাই গবেষণা করলে অনেক বেশি কল্যাণ পেতে পারেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তৌফিক দিন। সবশেষে নওমুসলিম এইবাত তথা সুরাইয়াকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন ও মোবারকবাদ জানিয়ে শেষ করছি আজকের আলোচনা।

৩য় পর্ব

আজ আমরা আগেকার আলোচনারই ধারাবাহিকতায় কথা বলার চেষ্টা করবো। বিগত কয়েক শতাব্দিতে পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের প্রভাব ঠেকাতে বিভিন্ন উপায়ে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। বিশেষ করে গেল কয়েক দশকে ইসলাম এবং মুসলমানদের ব্যাপারে তাদের শত্রুতাপূর্ণ প্রচারণা নতুন নতুন গণমাধ্যমে ব্যাপক বেড়ে গেছে। এতোসব প্রচারণা সত্ত্বেও পশ্চিমা বিশ্বে শিক্ষিত বা বুদ্ধিজীবী পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণের মাত্রা বেড়ে গেছে। পাশ্চাত্যের এই শিক্ষিত শ্রেণী এখন তাদের মানসিক প্রশান্তি,কল্যাণ,আধ্যাত্মিক শূণ্যতা পূরণ ইত্যাদি সবকিছুই ইসলামের নীতি-নৈতিকতার মাঝে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যাই হোক এ বিষয় নিয়েই আজকের আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো। আপনারা আমাদের সাথেই আছেন যথারীতি এ প্রত্যাশা রইলো।

পশ্চিমা কোনো কোনো সমাজ বিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানী মনে করেন শিক্ষিত শ্রেণীর ইসলাম গ্রহণের পেছনে যে বিষয়টি মৌলিক কারণ হিসেবে কাজ করেছে তা হলো মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং আত্মিক বিষয়-আশয়ের প্রতি ইসলামের গভীর দৃষ্টি এবং গুরুত্বারোপ। এই মনোবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে নিরাপত্তাহীনতা,পরিবার কাঠামো ভেঙ্গে পড়া,বিচিত্র বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি পশ্চিমাদেরকে ইসলাম নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে। জার্মানীর ইসলাম গ্রহণকারী ডঃ হফম্যান মনে করেন ইসলাম এবং ইসলামের শিক্ষাগুলো আকর্ষণীয় হবার কারণেই পশ্চিমারা এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। হফম্যান এখন মুসলিম চিন্তাবিদের পোশাক পরে ধর্মীয় এবং গবেষণামূলক বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশ নিচ্ছেন। তিনি বলেছেনঃ যখন সূরা নাজমের ৩৮ নম্বর আয়াত পড়লাম যেখানে লেখা হয়েছে-কেউই আরেকজনের গুণাহের বোঝা নিজের কাঁধে নেবে না।
এ আয়াতটি পড়ার পর আমি আমার পূর্বেকার বিশ্বাসের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে পড়লাম। এই আয়াত অন্যায়ের পরম্পরাকে স্বীকার করে না এবং আরো ইঙ্গিত করে যে,মানুষ আর আল্লাহর মাঝে কোনো মধ্যস্থতাকারী নেই যে কিনা আল্লাহর পক্ষ থেকে গুনাহগুলোকে মাফ করে দেবে।’

বিশিষ্ট এমব্রায়োলজিস্ট বা ভ্রূণবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ডঃ কিথ মুরের মতে ইসলামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি হলো আল-কোরআন এবং তার অনন্ত বিস্ময়। ডঃ মুরকে বলা হয়েছিল প্রায় দেড় হাজার বছর আগে কোরআনে ভ্রূণ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে সে সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে। ডঃ মুর তখনো এ সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য জানতেন না,তাই ভেবেছিলেন আধুনিকতম একটা বিষয়ে এতো প্রাচীন একটা গ্রন্থে নিশ্চয়ই যথার্থ কোনো তথ্য এ ব্যাপারে থাকবে না। তাই মুসলমানদের ঐশী গ্রন্থ কোরআনকে প্রশ্নের সম্মুখিন করার জন্যে তিনি ভ্রূণ প্রাসঙ্গিক কোরআনের আয়াতগুলো নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে দেন।

কিন্তু পড়াশোনা শেষে ভ্রূণসহ সমগ্র বিশ্ব সম্পর্কে কোরআনে অকাট্য ও বিজ্ঞানসম্মত তথ্যপঞ্জী পেয়ে তিনি ভীষণ আশ্চর্য হন। তিনি শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে এই গ্রন্থ কোনো ব্যক্তির পক্ষে লেখা একেবারেই অসম্ভব একটি ব্যাপার। এই গ্রন্থটি এমন কারো পক্ষেই লেখা সম্ভব যিনি মানব তো ননই, বরং অতিমানবীয় এমন এক সত্ত্বা যিনি সকল বিষয় সম্পর্কে সচেতন ও সর্বজ্ঞ। ডঃ মুর কোরআনে কোনো দুর্বল দিক তো খুজেঁ পান-ই-নি,উল্টো বরং এই গ্রন্থ থেকে তিনি যা কিছু জেনেছেন বা খুজেঁ পেয়েছেন তার আলোকে নিজের লেখা বইগুলোর পরবর্তী সংস্করণে সংশোধনী এনেছেন।

গত দু’আসরে আমরা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক এইবাত বালদাচিনার ঈমান আনার কথা বলেছি। তিনি বছরের পর বছর এক আল্লাহর সন্ধানে এবং বিশ্বের সৃষ্টি রহস্য উদ্ধারের পেছনে মেধা ও শ্রম দিয়ে অবশেষে সত্যকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি এখনো বিশ্বাস করেন যিনি তাঁর দোয়া কবুল করেছেন তিনি পরম দয়াময় একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। কোরআনের বরকতে আল্লাহ তাঁর সামনে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং হেদায়েতের দরোজা খুলে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ আমি এমন এক পরিবেশে বড়ো হয়েছে যেখানে কোনো কোনো বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষের অবাধ মিলন ঘটতো,এ্যালকোহলিক পানীয় আর অশোভন পোশাক পরার প্রচলন ছিল। কে কার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারবে-এই চিন্তায় বিভোর ছিল সবাই। এ ধরনের জীবন মানুষকে অস্থির ও অশান্ত করে তোলে। কিন্তু কোরআন আমাকে সেই অশান্ত অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে প্রশান্তচিত্ত হওয়া এবং সম্মানিত ও মর্যাদাবান হবার সুযোগ এনে দিয়েছে।

মানুষের জন্যে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন বিধান। ইসলাম যেমন বস্তুবাদের অন্ধ অনুরাগকে সমর্থন করে না। তেমনি বৈরাগ্যপূর্ণ জীবনযাপনকেও ইসলাম পছন্দ করে না। ইসলাম ইহকালীন জীবনটাকে পরকালীন অনন্ত জীবনের সুখশান্তি নিশ্চিত করার পথ অনুসন্ধানের দিকে আহ্বান জানায়। তবে ইহকালকে প্রত্যাখ্যান করে না। বিনোদন ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। ইসলাম ন্যায়পরায়নতার ধর্ম। এটি মানুষের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলাম বস্তুবাদিতা এবং আধ্যাত্মিকতার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে। তাই ইসলামে সুস্থ বিনোদনের ব্যাপারে কোনো বাধা নেই। তবে অশ্লীল-অশোভন বিনোদন যেহেতু মানুষের পরকালীন জীবনের সুখশান্তির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে সেহেতু এই বিনোদনকে ইসলাম সমর্থন করে না। আত্মা এবং দেহের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করে ইসলাম।

বিশিষ্ট মনীষী মরিস টি ইয়াস বলেছেনঃ ‘সত্যকে খুজেঁ বের করার জন্যে চিন্তা করা,কথা বলা ও প্রচেষ্টা চালানোর অভ্যাস এবং চর্চা কেবল তার পক্ষেই সম্ভব যে ছো
টোবেলায় একই ধরনের পরিবেশের মধ্যে প্রতিপালিত হয়েছে।’ টি ইয়াসের বক্তব্য নিঃসন্দেহে তাৎপর্যবহ। তারপরও কিছু কিছু সত্যান্বেষী মনের মানুষ ব্যাপক প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে উঠেও সত্যের নাগাল পেতে সক্ষম হন। তেমনি একজনের কথা আমরা আপনাদের বলেছি। তিনি অস্ট্রেলিয়ান নওমুসলিম বালদাচিনা। তাঁর প্রচেষ্টা এবং ইসলাম গ্রহণ আল্লাহ কবুল করুন-আমরা এই দোয়া করছি তাঁর জন্যে।

আসলে ইসলাম নিয়ে গবেষণার দ্বার সবার জন্যেই উন্মুক্ত। যে যতো বেশি ইসলাম নিয়ে গবেষণা করবেন তিনি ততো বেশি উপকৃত হবেন। এটা মুসলিম-অমুসলিম সবার জন্যেই সমানভাবে প্রযোজ্য। ইসলাম আসলে কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠি বা বর্ণ-গোত্রের ধর্ম নয়,ইসলাম একটা বিশ্বব্যবস্থা। এটি সার্বজনীন একটি ধর্ম। সকল মানুষ এই ধর্ম থেকে উপকৃত হতে পারে।

সূত্র: রেডিও তেহরান

Advertisements