আমাদের রিপোর্টে কোম্পানিটির ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি -তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ * পথে পথে ঘুরছে শেয়ারবাজারের ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারী * সোনালী ব্যাংকের কাছেও খেলাপি ঋণ ১৬৫ কোটি টাকা

আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতি করে শেয়ারবাজার থেকে নেয়া ৩শ’ কোটি টাকা ৭ বছরেও ফেরত দেয়নি বেক্সিমকো ত্রুপের প্রতিষ্ঠান জিএমজি এয়ারলাইন্স। ২০০৯ সালে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে এই টাকা নেয়া হয়। পরে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত করেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু টাকা আর ফেরত পায়নি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। টাকার জন্য ঘুরছে হাজারের বেশি বিনিয়োগকারী। আর টাকা ফেরত না দিলেও প্রভাবশালী এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বিএসইসি। এজন্য বিনিয়োগকারীদেরও দায়ী করছেন তারা।

এদিকে শুধু পুঁজিবাজার নয়, মুদ্রাবাজারেও কেলেংকারি করেছে জিএমজি। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ১৬৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে পুরোটাই কুঋণে পরিণত হয়েছে। আর ঋণ আদায়ের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই ব্যাংকের। বর্তমানে কোম্পানিটি বন্ধ।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। জানতে চাইলে শেয়ারবাজারে কারসাজি সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে এসব কোম্পানি। আমাদের রিপোর্টে কোম্পানিটির ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি। এসব ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান (আহমেদ সালমান ফজলুর রহমান)। সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ প্রশ্নে তার বক্তব্য নেয়ার জন্য মঙ্গলবার থেকে পাঁচ দিন অপেক্ষা করা হয়। মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে বিষয়বস্তু জানানো হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন। কিন্তু এরপর আর ফোন রিসিভ করেননি। দ্বিতীয় দফায় মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এরপর রিপোর্টটি যাতে প্রকাশিত না হয় সেজন্য বিভিন্ন মাধ্যমে তদবিরও করেন।

জানা গেছে, আইপিওর (প্রাথমিক শেয়ার) আগে মূলধন বাড়াতে নির্দিষ্ট কিছু বিনিয়োগকারীর কাছে শেয়ার বিক্রি করতে পারে কোম্পানি। শেয়ারবাজারের পরিভাষায় একে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট বলা হয়। কিন্তু কোম্পানিটি শেষ পর্যন্ত বাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ না পেলে প্লেসমেন্টের টাকা ফেরত দিতে হয়। একইসঙ্গে যতদিন টাকা আটকে রাখা হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের তার লভ্যাংশ দিতে হয়।

সূত্র জানায়, শেয়ারবাজার থেকে বড় অংকের মূলধন সংগ্রহের উদ্দেশে ২০০৯ সালে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে জিএমজি। এতে ১০ টাকার প্রতিটি শেয়ার ৪০ টাকা প্রিমিয়ামসহ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৫০ টাকা নেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় বাজার থেকে ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের মাধ্যমে প্লেসমেন্ট বিক্রি করা হয়। ওই চক্রটি বিনিয়োগকারীদের কাছে ৭৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছে।

এদিকে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার টাকার শেয়ার ১শ’ টাকায় রূপান্তর করে। পরবর্তীতে ১০ টাকা নিয়ে আসা হয়। ২০১০ সালে ১০ টাকার শেয়ার বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ১৫০ টাকায় বাজারে আনার জন্য তথ্যপত্র প্রকাশ করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

যেভাবে জালিয়াতি : ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জিএমজি এয়ারলাইন্স। পরের বছর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা ৭ বছর প্রতিষ্ঠানটি লোকসানি ছিল। এ সময়ে মোট লোকসানের পরিমাণ ৪২ কোটি টাকা। ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে ১ কোটি টাকা মুনাফা দেখায়। কিন্তু ২০১০ সালে অলৌকিকভাবে বেড়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা। ওই বছরের প্রথম ৯ মাসে প্রতিষ্ঠানটি ৭৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা মুনাফা দেখায়।

এছাড়াও রিপোর্টে ২০০৮ সালের স্থিতিপত্রে হঠাৎ করে ৩৩ কোটি টাকার পুনর্মূল্যায়ন উদ্বৃত্ত দেখানো হয়। এর ব্যাখ্যায় জিএমজি বলেছে, তাদের দুটি বিমানের সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে বিমান দুটি বেশ পুরনো। স্বাভাবিক নিয়মে পুরনো বিমানের সম্পদের দাম আরও কমার কথা। কিন্তু আলাদিনের জাদুর চেরাগের মতো দাম বাড়িয়ে দেখিয়েছে জিএমজি। এভাবে ১৬৬ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এ প্রতিষ্ঠানটি বাজার থেকে আরও ৬০ কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছিল। এখানেও ১০ টাকার শেয়ারে ৪০ টাকা প্রিমিয়াম চাওয়া হয়। ফলে প্রিমিয়ামসহ প্রস্তাবিত টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় আরও ৩০০ কোটি। কিন্তু কোম্পানির আর্থিক রিপোর্টে জালিয়াতি ধরা পড়ায় ২০১২ সালে আইপিও আবেদনটি বাতিল করে বিএসইসি। নিয়ম অনুসারে আইপিও আবেদন বাতিল করার পর বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দিতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে টাকা আটকে রেখেছে জিএমজি। কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন সালমান এফ রহমানের ছেলে শায়ান এফ রহমান।

রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানের রিজার্ভ অ্যান্ড সারপ্লাস ছিল ৩৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। কিন্তু ৯ মাসের ব্যবধানে ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রিজার্ভ দেখানো হয় ১১২ কোটি টাকা। একই সময়ে পার্কিংসহ অন্যান্য খাতে সিভিল এভিয়েশনের ১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা বকেয়া দেখানো হয়েছে। আর এসব কাজে কোম্পানিকে সহায়তা করেন বিএসইসির সাবেক সদস্য সাহাবুল আলম। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, ২০১০ সালের প্রথম ৯ মাসে জিএমজি এয়ারলাইন্স ৩৫ শতাংশের বেশি টিকিট বিক্রি করেছে। কিন্তু ট্রাভেল এজেন্সি কমিশন, ভ্যাট, ট্যাক্স ওই সময়ে ৬০ শতাংশ কমেছে। নিয়মানুসারে টিকিট বিক্রি বাড়লে ভ্যাট, ট্যাক্স বাড়ার কথা। এ প্রসেঙ্গ দুটি মন্তব্য করেছে তদন্ত কমিটি। প্রথমত, কোম্পানির আর্থিক রিপোর্ট সত্য নয়। আয়ের ভুয়া তথ্য দিয়ে শেয়ারবাজার থেকে প্রিমিয়াম বাড়িয়ে নিয়েছে।

আর আর্থিক রিপোর্ট সত্য হলে কোম্পানিটি সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছে। এছাড়া আলোচ্য সময়ে কোম্পানির ফোন ও ফ্যাক্স বিল ৯২ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে কোম্পানির গ্রস মুনাফা বেড়েছে ১২০ শতাংশ এবং নিট মুনাফা বেড়েছে ১৩৩ শতাংশ। আর পরিচালন ব্যয় বেড়েছে মাত্র ৯ শতাংশ। অর্থাৎ কারসাজির মাধ্যমে কোম্পানির স্থিতিপত্র বাড়ানো হয়েছে।

জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা মূলধন সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছি। এখানে প্লেসমেন্টের কথা বলা নেই। আর প্লেসমেন্টের মাধ্যমে যারা শেয়ার নিয়েছে, তারা কোম্পানির প্রচারণা এবং বুঝে শুনে শেয়ার নিয়েছেন। সবকিছুতে কমিশনকে দায়ী করলে হবে না।’ যেসব বিনিয়োগকারী শেয়ার নিয়েছে, তাদেরও দায় রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা একটি নীতিমালা করে দিয়েছি। ওই নীতিমালা অনুসারে ১০০ জনের বেশি বিনিয়োগকারীর কাছে প্লেসমেন্ট বিক্রি করা যায় না।

Advertisements