অলিউল্লাহ নোমান
যেখানে জানাযা সেখানেই মানুষের ঢল। কাঁদছে সবাই। কাউকে দাওয়াত দিয়ে বা বাস ট্রাকে করে মজুরি বা ভাড়া দিয়ে আনতে হয়নি। সবাই এসেছেন নিজের তাগিদে, মনের জোড়ে ভালবাসার টানে। শুধুই কি মাওলানা নিজামীর জন্য দোয়া করতে এসেছেন সবাই? নাকি এটি একটি নীরব প্রতিবাদ জানাতে শামিল হয়েছেন কাতারে। অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষের যাওয়ার জায়গা নেই। কথা বলার সুযোগ নেই। ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থায় এই সুযোগ থাকেও না। তবে একটু সুযোগ পেলেই মানুষ নীরবে হলেও প্রতিবাদ জানাতে আসে। হাজির হয় মজলুমের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করতে। এরই উদাহরণ হচ্ছে মাওলানা নিজামীর জানাযা।

জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর জানাযায় সারা দেশেই মানুষের ঢল নেমেছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানের জানাযার ছবি গুলোই এর প্রমান। সাংবাদিকতায় একটি বাক্য রয়েছে ‘ছবি কথা বলে’। মাওলনা নিজামীর জানাযার ছবি গুলো মানুষের ভালবাসা ও জালিমের প্রতি প্রতিবাদের শ্লোগান।

কিন্তু বাংলাদেশের গণমাধ্যম নামে প্রচারযন্ত্রের কমতি নেই। এ গুলোর ভুমিকা দেখে রীতিমত অবাক লাগে। তারা নিজেদের দাবী করে নিরপেক্ষ। মাওলানা নিজামীর দন্ড কার্যকরে মিডিয়ার উল্লাস মানুষ দেখেছে। কিন্তু জানাযার চিত্র কি প্রকাশ করেছে তারা? তারপরও কিন্তু তারা নিরপেক্ষ! শত পুরুষের শয্যাসঙ্গী হয়ে যদি কোন তরুণী দাবী করেন তিনি কুমারি। মাওলানা নিজামীর জানাযার ছবি প্রকাশ না করেও তেমনি তারা দাবী করতে পারেন নিরপেক্ষ মিডিয়া বা গণমাধ্যম!

নিরপরাধ লোককে বানোয়াট, সাজানো ঘটনার মাধ্যমে অপরাধী বানিয়ে প্রাণ হরণের উল্লাসটাই হচ্ছে তাদের ‘নিরপেক্ষ’ আচরণের বহি:প্রকাশ। পাশাপাশি জানাযার দৃশ্য গুলো ধারন বা প্রচার করলে তো আর নিরপেক্ষতা থাকে না। তখনতো মাওলানা নিজামীর পক্ষে চলে যায়। পক্ষপাতিত্বতো করতে পারে না বাংলাদেশের ‘নিরপেক্ষ’ মিডিয়া!!

মিডিয়ার নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতি থাকে। সব দেশের মিডিয়া সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করে। সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী নিউজ ট্রিটমেন্ট দেয়া হয়। কিন্তু ঘটনা একেবারে কিল করার মানে, ফ্যাসিবাদকে উস্কে দেয়ার সম্পাদকীয় নীতি। ঘটনা ঘটলে ট্রিটমেন্টের বেলায় অর্থাৎ খবর পরিবেশনায় জায়গা দেয়ার ক্ষেত্রে হেরফের হতে পারে। একটু আগে-পিছে, ছোট-বড় আকারে হতে পারে। একেবারে ব্লাক আউট করে দেয়াটা ওই ঘটনার প্রতি চরম অবিচার। এর নামই হচ্ছে হলুদ সাংবাদিকতা। মাওলনা নিজামীর জানাযা প্রমান করছে বাংলাদেশে এখন এই হলুদ সাংবাদিকতার জয় জয়কার চলছে।

সোস্যাল মিডিয়া এবং কিছু অনলাইন পোর্টালে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর জানাযার স্থির চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। এই স্থিরচিত্র গুলোতে যেসব মানুষের ছবি দেখা যাচ্ছে তারা কি জনগনের কাতারে পড়ে!! নাকি জানাযায় যারা এসেছেন তারা ভিন্ন গ্রহের প্রাণী! জনগনের কাতারের লোক নন। বাংলাদেশের বৈধ নাগরিক হলে প্রচারযন্ত্র গুলোতে এই জানাযার দৃশ্য গুলো অবশ্যই জায়গা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রথম শ্রেনীর জাতীয় দৈনিক গুলোর অনলাই সংস্করণে ব্যতিক্রম দু’একটি ছাড়া কেউ প্রকাশ করেনি। এমনকি অনলাইনে ই-সংস্করণেও (অর্থাৎ প্রিন্ট পত্রিকার হুবহু) জানাযার কোন ছবি খুজে পাওয়া যায়নি। ইলেকট্রনিক মিডিয়া গুলোর খবরে নজর রেখে দেখা গেল কেউ সে গুলো প্রচারের আওতায় আনেনি।

মাওলানা নিজামীর ফাঁসি কার্যকরের পরবর্তি দু’দিনের সংবাদপত্র গুলোর দিকে নজর দিলে যে কোন ব্যক্তি নিজের বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে পারেন। তখন ধারনা হতে পারে জানাযার দৃশ্য গুলো দেখে প্রচারযন্ত্রের সাংবাদিক এবং মালিকরা হুশ হারিয়ে ফেলেছেন। তারা হয়তা ভেবেছেন এতদিন যাকে তারা ‘রাজাকার শিরোমনি’ বানিয়ে কাল্পনিক সংবাদ প্রচার করেছেন সেগুলো মানুষ বিশ্বাস করেনি। বা তাদের এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই মানুষ গুলো উপস্থিত হয়েছিলেন। তাই রাগে ক্ষোভে মিডিয়া গুলো জানাযার দৃশ্য প্রচারণা থেকে নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে রেখেছেন। জানাযার এই উপস্থিতি হচ্ছে সরকারি অপকর্ম, অন্যায়, অবিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগনের নীরব প্রতিবাদ।

বাংলাদেশের তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ মিডিয়া গুলোর হুশ হারানোরই কথা। তাদের বাপ-দাদা কারো জানাযায় হয়ত: এত মানুষের উপস্থিতি কল্পনাও করতে পারেনি। তাদের চেতনার স্পুলিঙ্গ ‘বঙ্গবন্ধু’র জানাযায় পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন মিলে মাত্র ১৮ জন লোক অংশ নিয়েছিলেন। এখানেও তাদের একটা ক্ষোভ থাকতে পারে। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর জানাযা হয়েছে সারা দেশে, প্রতিটি জেলা উপজেলায়। দেশের সীমানা পেরিয়ে দুনিয়ার যেখানে মুসলমানের বসতি রয়েছে সেখানেই জানাযা হয়েছে। মানুষ হাজির হয়েছে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে।

তারা যাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে চিৎকার দিয়ে গলা ফাঁটিয়ে ফেলেন তাঁর জানাযা হয়েছিল মাত্র একখান। তাতেও আবার সর্বসাকুল্যে ১৮ জনের উপস্থিতি। আর যাকে তারা বাংলাদেশের শত্রু বানানোর জন্য দিবানিশি প্রচারণা চালিয়েছেন তাঁর জানাযায় লাখো মানুষের উপস্থিতি! এতে প্রচারযন্ত্রের সাংবাদিক আর মালিকদের হুশ হারানোটাই স্বাভাবিক। তারা কেউ মরলেও এত মানুষের উপস্থিতি কল্পনা করতে পারেনি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী যোদ্ধাদের ট্রেনিং শেষে অস্ত্র হাতে শ্লোগান ছিল ‘আমার নেতা তোমার নেতা-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সাড়ে ৪ বছরের মাথায় তাঁকে খুন করা হয়। সেই নেতার জানাযায় কেন মানুষের উপস্থিতির সংখ্যা দশকের ঘর পার হয়নি? আত্মীয়স্বজনসহ স্বপরিবারে খুন হয়েছিলেন তিনি। খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। নীরব প্রতিবাদ জানাতেও তো জানাযায় উপস্থিত হতে পারতেন! দেশের কোন না কোন উপজেলা বা গ্রামে ভক্তরা গায়েবানা জানাযার জন্য চেষ্টা করেছেন এমন কোন সংবাদও খুজে পাওয়া যায় না। কিন্তু কেন এরকম হয়েছিল, সেটাও ভাবনার বিষয়।

নেতার ভক্তরা হয়ত: বলবেন, তখন বৈরী সরকার ক্ষমতা গ্রহন করেছিল। তাই ডরে, ভয়ে মানুষ জানাযায় আসতে সাহস পায়নি। তাদের এই যুক্তির জবাবে শুধু বলতে হয়, মাওলানা নিজামীকে যারা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে খুন করেছেন তারা কি তাঁর বন্ধু সরকার! এখন কি জামায়াতে ইসলামীর বৈরী সরকার ক্ষমতায় নয়? চরম বৈরীতার মধ্যে যদি দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় গায়েবানা জানাযায় মানুষের ঢল নামতে পারে, শেখ মুজিবুর রহমানের জানাযায় ১৮ জনের বেশি নয় কেন!

গ্রামে ছোট বেলায় একটা প্রবাদ বাক্য হর হামেশা শুনতাম। প্রবাদ বাক্যটি হচ্ছে ‘শেষ ভাল যার, সব ভাল তার’। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সরকারের সাজানো মামলায় দন্ডিত হয়েছেন। এই মামলার অন্যতম সাক্ষী শামসুল হক নানরœু বক্তব্যেই মামলা সাজানোর ঘটনাটি স্পষ্ট। কেউ চাইলে নান্নুর ভিডিওটি এখানে ক্লিক করে শুনে তিনি পারেন। কি বলার চেষ্টা করেছেন তিনি। তখন নিজের বিবেক দিয়ে বিচার করা সম্ভব হবে মাওলানা নিজামীকে খুন করার পরিকল্পনা কিভাবে চুড়ান্ত হয়েছে।

মতিউর রহমান নিজামী শেষ বিদায় নিয়েছেন মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে। ফাঁসির রশি আলিঙ্গন করেছেন হাসিমুখে। দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছেন সেটা স্পষ্ট। কিছুক্ষণ পরেই শেষ বিদায় হবে। এই অবস্থায়ও দৃঢ়তায় প্রকাশ পায় তাঁর ঈমান কতটা মজবুত ছিল। ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সভানেত্রী ফেইসবুকে স্ট্যাটাসে লিখেছেন শেষ বিদায়ের আগে স্ত্রীকে কি বলেছেন মাওলানা নিজামী। তাঁর স্ত্রী শামসুন্নাহার নিজামীর কাছে বরাবরের মতই জানতে চেয়েছেন কি পোশাক পরিধান করে আমি ফাঁসির মঞ্চে যাবো! তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায় মাওলানা নিজামী নিয়মিত স্ত্রীকে জিজ্ঞাস করতেন আজ কোন পোশাকটা পড়বো। শেষ দেখার সময়ও তিনি স্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছেন দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার মুহুর্তে কি পোশাক পড়বো। ঈমানের চেতনা কতটা দৃঢ় এবং মজবুত হলে মনোবল এতটা চাঙ্গা থাকে তার বাস্তব উদাহরণ হলেন মাওলানা নিজামী। এখানেই মাওলানা নিজামীর শ্রেষ্ঠত্ব। আর যেই নেতা শেষ বিদায়ে মানুষের ভালবাস তো নয়-ই, বরং ধিক্ষার পেয়েছেন তাঁর কথা না বলাই উত্তম। সুতরাং চেতনাধারী মিডিয়া ওলারা একটু মনোব্যথা পেতেই পারেন।

মাওলানা নিজামীর জানাযায় মানুষের স্বস্ফুর্ত উপস্থিতি দেখে হলেও হুশ হারানো মিডিয়া গুলোর ‘চেতনা’ ফিরে আসুক। সত্যের অন্তত কাছাকাছি তারা পৌছানোর চেষ্টা করুক। সত্যকে আড়াল করে মিথ্যা বেসাতির উল্লাস নয়, মিডিয়া হউক অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই।

লেখক: দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত।
সূত্র: RBN24.CO.UK

Advertisements