আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

মন্দ বা কু-ঋণের ভারে জর্জরিত দেশের ব্যাংকিং খাত। আর এ দুর্নাম থেকে বের হতে নতুন পদ্ধতি নিয়েছে ব্যাংকগুলো। মূলত খেলাপী ঋণ কম দেখাতে ব্যাপকহারে ঋণ অবলোপন করতে শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। কু-ঋণের মধ্যে আদায় অযোগ্য ঋণই মূলত অবলোপন করা হয়। তবে অবলোপন করার পরও যেহেতু আদায়ের সুযোগ থাকে তাই খেলাপী ঋণের পরিমাণ কম দেখাতে ঋণ অবলোপনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে খেলাপী ঋণ কম দেখাতে ব্যাংকগুলো গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা অবলোপন করেছে। এর মধ্যে গত এক বছরে অবলোপন করা হয়েছে ৪ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। অবলোপনকৃত অর্ধেকের বেশি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকের।

বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি মন্দ ঋণ অবলোপন করেছে ২০১৩ সালে। ওই বছর অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। এতে বছর শেষে অবলোপন করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৩০ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। এর আগে ২০১২ সালে অবলোপন হয়েছিল দুই হাজার ৯৯২ কোটি টাকা। গত ২০১৪ সালে ৬ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। ওই বছর শেষে অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে অবলোপন করা হয়েছে চার হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এ ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে অবলোপন করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে অবলোপনকৃত ঋণের পরিমান ছিল ১৮ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে তিন হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। বিশেষায়িত দুই ব্যাংক অবলোপন করেছে ৫৫৫ কোটি টাকা।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ রয়েছে ১৭ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। গত ২০১৪ সালে ছিল ১৫ হাজার ৫০ কোটি টাকা। আগের বছর শেষে ছিল ১২ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ৪০৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০৫ কোটি টাকা। গত ২০১৩ সালে ছিল  ৪৩৪ কোটি টাকা। ঋণ অবলোপনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধা নিয়ে প্রচুর ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। প্রকৃতপক্ষে খেলাপী ঋণ আরও বেশি হওয়ার কথা। গত ২০১৪ সাল শেষে খেলাপী ঋণ ছিল ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।

এদিকে রাজনৈতিক আধিপত্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির অভাব ও টানা কেলেঙ্কারিতে ব্যাংকিং খাতে গভীর সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’। একই সঙ্গে আর্থিক নীতি প্রণয়নে অকার্যকারিতা, শিথিল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ তদারকির অভাব বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা প্রকট হয়ে উঠেছে বলেও মনে করে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পর্যালোচনা ২০১৬’ এর মার্চ মাসের সংখ্যায় সামগ্রিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে। প্রতিষ্ঠানটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, শেয়ার মার্কেটে ধস, অতি মুনাফার লোভ দেখিয়ে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ব্যবসার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ প্রভৃতি ব্যাংকিং খাতকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আর এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রতিরোধ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ও তত্ত্বাবধায়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

ব্যাংকিং খাতে বৃহৎ আর্থিক কেলেঙ্কারি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার দিক সম্পর্কে উন্নয়ন অন্বেষণ জানায়, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ (নন পারফরমিং লোন) ৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে এসে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে উপনীত হয়েছে। খেলাপি ঋণের এ হার ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর এসে বেড়ে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ উপনিত হয়েছে। এ ছাড়া খেলাপী ঋণ ও অবলোপণকৃত ঋণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ঋণ আদায়ে এ ব্যর্থতার জন্য ব্যাংকগুলোর অদক্ষতাকেই দায়ী করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে প্রতিবছরই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। অথচ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় না; যা বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতির অকার্যকারীতাকেই প্রমাণ করে। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ ধরা হয়েছিল। অথচ অর্জিত হয়েছিল ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। অনুরূপভাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ ধরা হলেও অর্থবছর শেষে মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। ঋণের বিস্তার ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির মধ্যে যোগসূত্র নির্দেশ করে ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’ বলেছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির শ্লথ গতি বিনিয়োগ হ্রাস করবে।

এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে নেওয়া নীতিসমূহ উচ্চ সুদের হার ও সুদের হারের ব্যবধান কমাতে এবং আর্থিক অর্ন্তভূক্তি ত্বরান্বিত করতে পারেনি। অন্যদিকে, সরকারি ও ব্যক্তিখাতে ব্যাংকের ওপর অধিকৃত পরিচালন ব্যবস্থা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অদূরদর্শিতা ব্যাংক কেলেঙ্কারি এবং ঋণ খেলাপির মতো সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ খাতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়ে ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে; যা গত বছরের এই সময়ে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ ছিল। একইভাবে এ সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশে উপনীত হয়েছে। খাতটিতে গত বছরের একই সময় ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ।

বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকে তারল্য বাড়ছে। আশানুরূপ ঋণ চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলোর কাছে প্রচুর তারল্য জমে আছে। বেড়েছে ব্যাংকিং খাতের পরিচালন খরচ। পাশাপাশি কমেছে ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা। এতে ব্যাংকগুলোতে অলস পড়ে রয়েছে অতিরিক্ত তারল্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত তারল্য জমা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতবছর (২০১৫) শেষে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংরক্ষণের প্র্রয়োজন ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো রেখেছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত তারল্য ১ লাখ ২০ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। অথচ ওই বছরের জুনে এর পরিমাণ ছিল ৪৪ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ বিদেশ থেকে সরাসরি সহজ শর্তে ও তুলনামূলক সুবিধাজনক সুদে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিচ্ছে। যার কারণে ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি ঋণের চাহিদা কমে গেছে। ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ঋণ বেড়েছে মাত্র ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ।

ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বছরের শেষ সময়ে এসে সব ব্যাংকই ঋণ আদায় করে। ফলে ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে যায়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেও একই প্রবণতা হতে পারে। কারণ বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কেউ বিনিয়োগ করে লোকসান গুনতে চাচ্ছে না। ফলে ব্যাংক ঋণের প্রবাহ কমে গেছে। তবে ব্যাংকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারল্য থাকলে তা অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) তারল্য রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা। এই ৫ ব্যাংকের তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৪১ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ১ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা, তারল্য স্থিতি রয়েছে ১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ১ লাখ ৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকার তারল্য স্থিতি রয়েছে। এসব ব্যাংকের তারল্যের প্রয়োজন ছিল ৬৯ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। বেসরকারি ইসলামিক ব্যাংকগুলোর তারল্য স্থিতি ৩০ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা, প্রয়োজন ছিল ১৮ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ২১ হাজার ২২ কোটি টাকার তারল্য সম্পদ রয়েছে। এ সময়ে বিদেশি ৯ ব্যাংকের ৬ হাজার ৯৬১ কোটি টাকার তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল।

জানা যায়, বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিতে এ বছরের প্রথমার্ধ জানুয়ারি-জুনের মুদ্রানীতিতে রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদহার কমানোর ফলে সার্বিক ঋণ-আমানতে সুদহার কমেছে। ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহ ও আন্তঃব্যাংক (কলমানি) মার্কেটে সুদহার নিম্নপর্যায়ে থাকায় নীতি সুদহার দশমিক ৫ শতাংশ হারে কমানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ডিসেম্বর ব্যাংকগুলো গড়ে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। কিন্তু গতবছর শেষে সেটা আরো কমে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে আমানতের সুদহার কমার সঙ্গে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদও কিছুটা কমিয়েছে। ২০১৪ সাল শেষে ব্যাংকগুলো গড়ে ১২ দশমিক ৪৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। গতবছর সেটা কমে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

সবকিছু মিলিয়ে ভালো অবস্থায় নেই ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি।

Advertisements