palestine-ambassy-cda_13219_1463427455সাক্ষাৎকারে ফিলিস্তিনি সিডিএ ইউসেফ রামাদান
বৈঠকের সবচেয়ে বেশি প্রমাণ ভারতের হাতে
আসলাম চৌধুরীর বৈঠক শুধু এক কাপ চা খাওয়া নয় * বাংলাদেশ প্রমাণ চাইলে অবশ্যই তথ্য দেয়া হবে
ফিলিস্তিনের ‘চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স’ (সিডিএ) ইউসেফ এস ওয়াই রামাদান বলেছেন, মেন্দি সাফাদির সঙ্গে আসলাম চৌধুরীর বৈঠকটি শুধু এক কাপ চা খাওয়ার বিষয় নয়। এক ঘণ্টার বেশি স্থায়ী ছিল ওই বৈঠক। সেখানে বাংলাদেশ থেকে আসলাম চৌধুরী একাই ছিলেন। তার বাইরে ভারতের কিছু লোক ছিলেন যারা ইসরাইলকে সমর্থন করেন। এসব তথ্য আমাদের ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া। তবে এই ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিলেন সেটা নিরাপত্তা বাহিনী বিচার বিশ্লেষণ করে জানতে পারবে।

রামাদান সোমবার বারিধারায় ফিলিস্তিনি দূতাবাসে যুগান্তরকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন। মেন্দি ও আসলামের মধ্যে বৈঠকে কী কী বিষয় আলোচিত হয়েছে জানতে চাইলে ফিলিস্তিনি সিডিএ বলেন, বাংলাদেশের পাসপোর্ট থেকে ‘এ পাসপোর্ট ইসরাইল বাদে সব দেশের জন্যে প্রযোজ্য’ বাক্যটি মুছে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ইসরাইল তাদের সুরক্ষায় কাজ করবে বলেছে। কেননা ইসরাইল মনে করে, বাংলাদেশে বর্তমানে মুসলিম ব্রাদারহুডের সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। এটা মোটেও সত্য নয়। এটা হল সাফাদির অজ্ঞতা। সবাই জানে বাংলাদেশে এ সরকারের আমলে ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠী সমস্যায় আছে। তিনি সম্ভবত এ সরকারের ধরন সম্পর্কে অবহিত নন। বাংলাদেশে এ সরকারের আমলে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মিলেমিশে আছে। কিংবা সাফাদি বোকার মতো অভিযোগ করছে। আরেকটা আলোচ্য বিষয় হল, খুব সহসাই ইসরাইলের জন্য বাংলাদেশের দরজা খুলে যাবে। বাংলাদেশের জনগণ যখন সেখানে গিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দ্বিধা করে না, সেখানে সাফাদির এমন ভাবাটা নিশ্চয়ই অজ্ঞতা। এ ঘটনার নেপথ্যে কে কে এ আয়োজন করেছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টার গোড়ায় যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটা ইস্যু হল, যিনিই এ বৈঠকের আয়োজন করে থাকুন না কেন তার উচিত ছিল অন্য দেশে বৈঠকের আয়োজন করা, ভারতে নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফলে শুরু থেকেই এটা বোকামি।

তিনি বলেন, ইসরাইল শুধু ফিলিস্তিনের শত্রু নয়, ইসরাইল গোটা মানবজাতির শত্রু। গত ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে ইসরাইল চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই, পাকিস্তানসহ অনেক দেশের সঙ্গে কোনো রকমের হলেও সম্পর্ক তৈরি করতে। কিন্তু তারা সফল হয়নি। তাই তারা বিশ্বাস করে এগুলোর কোনো একটি দরজা ভাঙতে পারলে অন্য দেশগুলোতেও প্রবেশের দরজাও ভাঙতে পারবে। একদা এক আরব রাষ্ট্রদূত বর্তমান সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীকে বলেছিলেন, আপনারা কেন বাংলাদেশীদের অন্তত জেরুজালেমে কিংবা আল-আকসা মসজিদ পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দেননি। জবাবে বাংলাদেশের মন্ত্রী বলেছেন, ইসরাইলের দখলে থাকা পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশীদের সেখানে যেতে অনুমতি দেব না। বাংলাদেশ হবে সর্বশেষ দেশ, যে দেশ এমন অনুমতি ফিলিস্তিনি সিডিএ বলেন, বাংলাদেশ চাইলে এ বিষয়ে তদন্তে প্রমাণ দিয়ে সহায়তা করতে প্রস্তুত ফিলিস্তিন। তার মতে, ভারত এ ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশকে অনেক বেশি সহায়তা করতে পারে। কেননা বৈঠকটি ভারতের মাটিতে হয়েছে। ফলে ভারতের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থার কাছে সব রেকর্ডই থাকার কথা। পাশাপাশি তিনি এ আশাও করেন যে, এ ঘটনায় আসলাম চৌধুরী নিজে কিংবা খুব স্বল্পসংখ্যক বিএনপির লোক জড়িত। বিএনপির কোনো নেতা কিংবা গোটা দল মোটেও এতে জড়িত নয়। ফিলিস্তিনি সিডিএ অবশ্য আসলাম চৌধুরী গ্রেফতারের পর গোটা বিষয়টিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে অভিহিত করেন।

ইউসেফ রামাদান বলেন, ‘আমি মোসাদ ইস্যুটি প্রথমে শুনেছি শাহরিয়ার আলমের (পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী) কাছ থেকে। আমি এ ইস্যুটি আমার সরকারকে অবহিত করেছি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা বিষয়টি দেখছেন। আমি আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর জানতে পারি যে, তারা বিষয়টি আগেই জানেন। সাধারণত এ ধরনের ক্ষেত্রে আমরা না চাইলে কোনো তথ্য স্বেচ্ছায় আমাদের সরকারের সংস্থাগুলো দেয় না। ফিলিস্তিনের সরকার এ ইস্যুটি অনেক আগেই জানে। তারা এ ইস্যুতে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃংখলা বাহিনীকে নিযুক্ত করেছে।’

ফিলিস্তিনি সিডিএ বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাংলাদেশ অন্য সূত্র থেকেও তথ্য পেতে পারে। কারণ বৈঠকটি ভারতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ভারত বাংলাদেশকে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার অংশ মনে করে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যাহত হলে এটা আশপাশের গোটা অঞ্চলেই প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন স্থান নয়। এটাও বিবেচনায় নিতে হবে। ভারতের নিরাপত্তার বিষয়ে ভালো গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। মোসাদের সাফাদি কোনোভাবেই ভারতের গোয়েন্দা নজরের বাইরে যাওয়ার কথা নয়। ভারতের গোয়েন্দারা নিশ্চয়ই তাকে সতর্কতার সঙ্গে নজরে রেখেছে।’

বাংলাদেশের তদন্ত কাজে আপনি কি সহযোগিতা করতে পারেন জানতে চাইলে রামাদি বলেন, ‘এটা আমার অবস্থান নয়। আমি এখানে একজন কূটনীতিক। আমি ফিলিস্তিনের দূতাবাস প্রধান। তবে যদি বাংলাদেশ তদন্তে প্রমাণ দিয়ে সহায়তার জন্য অনুরোধ করে অবশ্যই আমাদের কাছে যা আছে, তা দিতে কোনো দ্বিধা করব না। আমি অন্য কোনো উপায়ে প্রমাণ পেলেও তা বাংলাদেশ সরকারকে দেব’। তিনি বলেন, ‘এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এটি একটি নিরাপত্তা ইস্যু। তাই আমি এ ইস্যুতে কোনো হস্তক্ষেপ করিনি। আসলাম চৌধুরী বাংলাদেশের নাগরিক। তাই আমরা এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করব না।
তিনি বলেন, মেন্দি সাফাদি একটি কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠান চালায় বলে জানতে পেরেছি। তখনই আমি মনে করি ইসরাইলি লিকুদ পার্টি কোনো নিপীড়িত মানুষের ব্যাপারে আগ্রহী হবে না। বাংলাদেশ একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশ। বাংলাদেশ তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ ও বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ। বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই আমরা এ দেশটির সঙ্গে খুবই জোরালো ও মজবুত সম্পর্ক বজায় রেখে চলছি। আমাদের দায়িত্ব হল এটা রক্ষা করা এমন কি এর আরও উন্নয়ন করা এবং এ সম্পর্ক কিংবা সম্পর্কের উন্নয়নকে কোনো কিছু ধ্বংস করতে চাইলে তা বন্ধ করা। আমি মনে করি, এ বৈঠক আমাদের সম্পর্ককে অবশ্যই ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত করতে চেয়েছিল। এ সম্পর্ককে সুরক্ষার জন্য আমি তাই উদ্যোগ গ্রহণ করি। বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ করি।’

ওই বৈঠক যে কোনো কূটনৈতিক কিংবা গোয়েন্দা ফাঁদ ছিল না সেটা কতটা নিশ্চিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, সব বিকল্পই খোলা। যে কোনো কিছুই হতে পারে। কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। কিন্তু আমরা একুশ শতকে বাস করি। তথ্য লুকিয়ে রাখা সম্পূর্ণ অসম্ভব। আপনি তথ্য কিছু সময়ের জন্য লুকাতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের জন্য তা লুকাতে পারবেন না। ইসরাইলি সংবাদ মাধ্যম নিজেই সব কিছু প্রকাশ করেছে।’

ইউসেফ রামাদন বলেন, ‘গত ১১ মে আমি যখন প্রথমে আমার বিবৃতি দিয়েছিলাম তখন এটা স্পষ্ট রাজনৈতিক ইস্যু ছিল। আমি বলেছি, এ ঘটনায় আমি দুঃখিত ও ক্ষুব্ধ। আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রথমে বিএনপির সঙ্গে কথা বলি। আমি টেলিফোনে এ বিষয়টি পরিষ্কার করতে বলি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন খুবই উদার, তিনি আমাদের দূতাবাসে এসেছেন। আমি তাকে স্বাগত জানাতে পেরে সম্মানিত বোধ করেছি। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তারা বিএনপি হিসেবে কোনো ইসরাইলি নাগরিক কিংবা ইসরাইলি মিসনের সঙ্গে কিছু করেননি। সেটা সম্ভবত ছিল আসলাম চৌধুরীর নিজের উদ্যোগ। আমরা যখন ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলি, আমি তাকে খোলাখুলিভাবে বলি যে, এটা কেবল এক কাপ চা খাওয়ার বিষয় নয়। ওই বৈঠক এক ঘণ্টার বেশি সময় স্থায়ী হয়েছে।

ফিলিস্তিনি সিডিএ আরও বলেন, ‘আসলাম চৌধুরী গ্রেফতার হওয়ার পর এটি আর রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এটি এখন আর আমাদের বিষয় নয়। এটা এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আমরা এ ইস্যুর সঙ্গে মোটেও যুক্ত হতে চাই না। আমরা শুধু মনিটর করব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা প্রথম নাকি দ্বিতীয় বৈঠক এমন বিষয় আমি অনুমান করতে চাই না। আমার সরকারের কাছ থেকে কোনো তথ্য না এলে আমি তা দিতে পারি না।’

বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা বলিনি। তিনি (আসলাম চৌধুরী) গ্রেফতার হয়েছেন। নিরাপত্তা ইস্যুর কারণেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে এই বিষয়টি এখন এদেশের পেশাদার নিরাপত্তা বাহিনীর বিবেচ্য। এমন এক লোককে নিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে যিনি সরকারের কেউ নন, সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীও নন। ফলে এটা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আমরা কথা বলিনি।’

ফিলিস্তিনি সিডিএ বলেন, ‘আমার আশা থাকবে, আসলাম চৌধুরী নিজের উদ্যোগে এটা করেছে, কিংবা তার দলের খুব স্বল্পসংখ্যক গ্রুপের হয়ে এটি করেছেন। তার দলকে প্রতিনিধিত্ব করে করেনি। বিশেষ করে তার দলের মূল নেতাদের প্রতিনিধিত্ব করেনি। এটা আমার আন্তরিক আশা। তার দলের প্রতিনিধি হয়ে এটা করে থাকলে তা হবে একটা দুর্যোগ। আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি, বিএনপির নেতৃত্ব ও সমর্থকদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ফিলিস্তিনের সমর্থক। ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি তাদের বিশেষ অনুভূতি রয়েছে। ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি সমর্থন ছিল সবার। এ সম্পর্ক ধরে রাখতে চাই। কারণ বাংলাদেশের নাগরিকরা আমাদের ভাই’।

আসলাম চৌধুরীকে রক্ষায় কোনো প্রভাবশালী দেশ চেষ্টা করতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি এখনও বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তদন্ত করছে। তারা দেখছে তিনি দোষী নাকি নিরাপরাধ। যদি তিনি দোষী না হন তবে তাকে সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। কিন্তু তিনি যদি ইসরাইলের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে আমেরিকান কিংবা অন্য কেউ তাকে রক্ষা করতে পারবে না।’

উৎসঃ   যুগান্তর
Advertisements