‘বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের’ দাবিদার প্রতিবেশী ভারতের পানি আগ্রাসন আজ ষোল কোটি জন-অধ্যুষিত বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল ভূভাগজুড়ে শুরু হয়েছে মরুকরণ প্রক্রিয়া। তাই ফারাক্কা বাঁধ শুধু এ দেশের মানুষের জীবন-মরণের সঙ্কটই নয় বরং এর ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের স্বাভাবিক প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বিপন্ন হয়েছে। এ দেশের স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা লিখেছিলেন: ‘ভারত ঠাণ্ডা মাথায় যে কাজটি করে যাচ্ছে, তা হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর অমানবিক বোমা বর্ষণের চাইতে কম নিষ্ঠুর নয়। তার প্রলয়ঙ্করী প্রতিক্রিয়াগুলো একসাথে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি না বলে আমাদের বেশির ভাগ মানুষ চোখ বুঁজে এই জুলুম সহ্য করে যাচ্ছি।’ আজ থেকে ৪০ বছর আগে ভারতের পানি আগ্রাসনের পরিণতি যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা দিব্যদৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭৬ সালে অশীতিপর এ মানুষটি ভগ্ন শরীর নিয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে জাতিকে এক কাতারে সমবেত করতে ডাক দিয়েছিলেন। তার সে ডাকে লাখ লাখ মানুষ সাড়া দিয়ে আগ্রাসী শক্তির ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে তিনি এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, আন্তর্জাতিক যাবতীয় আইন-কনভেনশনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই বাঁধের মাধ্যমে ভারত অপরাধী দেশের স্তরে নেমেছে।

ফারাক্কা সমস্যার সূচনা ’৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে। গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগের খবর জেনে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। পাকিস্তানি প্রতিবাদের উত্তরে ভারত ১৯৫২ সালে জানিয়েছিল, গঙ্গার বাঁধ নির্মাণ এখনো অনুসন্ধান পর্যায়েই রয়েছে। ১৯৬০ সালে ভারত প্রথম এ ব্যাপারে পাকিস্তানের সাথে বৈঠকে বসে। এ প্রক্রিয়া চলা অবস্থাতেই ১৯৬১-৬২ সালে ভারত গোপনে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে। এভাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগেই ১৯৭০ সালে ফিডারখাল ছাড়া ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণকাজ ভারত শেষ করে ফেলে। এর পরপরই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে ফারাক্কা সমস্যার প্রতি পাকিস্তানের আগ্রহ লোপ পায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর বন্ধুত্বের ছদ্মাবরণে ভারত নতুন করে ফারাক্কা বাঁধ চালুর ব্যাপারে তৎকালীন আওয়ামী সরকারের ওপর চাপ দিতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় আমলাতন্ত্র আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছিল। ফলে সহজেই এ সময় ভারতের স্বার্থ সিদ্ধি হয়, ভারতের চাপের কাছে আওয়ামী লীগ আত্মবিসর্জন দেয়। ১৯৭৫ সালের মুজিব-ইন্দিরার মর্মন্তুদ চুক্তিটি বাংলাদেশের আজন্ম অধিকার বিসর্জনের নামান্তর। মজার ব্যাপার হলো প্রথমে ফিডার ক্যানেলে পানি প্রবাহের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক চালুর কথা বলে মাত্র ৪১ দিনের জন্য (২১ এপ্রিল ’৭৫-৩১ মে ’৭৫) ফারাক্কা চালু করা হয়; কিন্তু সেই ৪১ দিনের সময়সীমা আজো পার হয়নি! সম্পূর্ণ গায়ের জোরে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের মহাসর্বনাশ করে চলেছে। বাংলাদেশের কোনো আহ্বানেই ভারতের তরফ থেকে সাড়া না পেয়ে ১৯৭৬ সালে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ফারাক্কার বিষয়টি উত্থাপন করেন। ফলে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয় ভারত। এরই ফলে ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকায় ফারাক্কা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি এ চুক্তিতে বাংলাদেশের ন্যূনতম পানি প্রাপ্তির জন্য ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ রাখা হয়; কিন্তু দেশী-বিদেশী চক্রান্তে রাষ্ট্রপতি জিয়া শহীদ হওয়ার পর ১৯৮২ সালে ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে ভারত অস্বীকৃতি জানায়। নতুন করে সে বছরই দুই দেশের মধ্যে এক সমঝোতা চুক্তি হয় মাত্র দুই বছরের জন্য; কিন্তু সেখানে গ্যারান্টি ক্লজ তুলে দেয়া হয়। এরশাদের গোটা শাসনামল ভারতবিরোধী ডঙ্কা বাজিয়ে নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিল তার সরকার। ফারাক্কার পানি দাবি একচুলও সামনে নিয়ে যেতে পারেনি তারা। ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ফারাক্কা সমস্যার সমাধানে আবারো তৎপরতা শুরু হয়। জাতিসঙ্ঘের ৪৮তম অধিবেশনে ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। আবারো বিশ্বসভায় বিষয়টি আলোচনায় আসে; কিন্তু কার্যকর কিছু ঘটার আগেই ১৯৭৫ সালে আত্মবিসর্জন দেয়া আওয়ামী লীগ আবার বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়ে আগের মতো আরো একটি ‘দাসত্ব চুক্তি’ সম্পাদন করে। তারপরের ইতিহাস সবার জানা, পদ্মা-যমুনায় বহু পানি গড়িয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয় বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন ক্রমশ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জোয়ারের সময় সমুদ্রের লোনা পানি দেশের অভ্যন্তর ভাগে প্রবেশ করলে নদীর পানি ঠেলে সেই লোনা পানিকে সমুদ্রে ফেরত পাঠায়; কিন্তু ফারাক্কার কারণে নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো পদ্মা অববাহিকায়। এই লবণাক্ততার ফলে এ দেশের বিরাট অংশের ক্ষেতখামার, শিল্পকারখানা আজ মারাত্মক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিলুপ্ত হওয়ার পথে। পদ্মার ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন পেশার লাখ লাখ মানুষ আজ জীবিকাহারা। ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই শুধু নয়, বাংলাদেশের ওপর আর্থ-সামাজিক একটি বড় বিপর্যয় ধেয়ে আসছে। সরকারি হিসাব মতে (১৯৯৭) ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুধু বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে ক্ষতি হচ্ছে প্রতি বছর গড়ে এক হাজার কোটি টাকা। নৌপরিবহনের ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নৌবন্দরগুলোতে কর্মরত হাজার হাজার মানুষ পথে বসার উপক্রম হয়েছে। এ দেশের পাতাল পানিতে আর্সেনিক বিষের ঘনত্ব আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ফারাক্কা।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এরূপ জীবন-মরণ সমস্যার মুখোমুখি হয়েও আমরা চুপ করে আছি বছরের পর বছরজুড়ে। মানবসৃষ্ট এ চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে উঠতে পারছি না। জাতীয় জীবনের এ মহা সঙ্কটকালে গোটা জাতির যেখানে শিরদাঁড়ার ওপরে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর কথা, সেখানে আমরা দুর্ভাগ্যজনকভাবে শুধু বিভক্তিই লালন করে যাচ্ছি।

আমাদের দুর্বলতা কোথায় তা শত্র“র কাছে স্পষ্ট। ৩৫ বছরে ফারাক্কা সমস্যার মতো জাতীয় সঙ্কটও যখন আমাদের জাগাতে পারেনি, নব্যকারবালার সৃষ্টিকেও যখন বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছি, তখন আরো বড় বিপর্যয় আসবে এটাই তো স্বাভাবিক।
আজ সময় এসেছে দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশীদের এক কাতারে দাঁড়িয়ে দেশের স্বার্থের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হওয়ার। ভারতের অন্যায় আগ্রাসী পানি নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার। মওলানা ভাসানীর সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করে প্রবন্ধের ইতি টানছি : ‘জনগণের সংগ্রাম পারমাণবিক মারণাস্ত্রের চাইতে শক্তিশালী’।

20160317_115848

ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ
লেখক : শিক্ষক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্যসচিব, আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি, রাজশাহী।
E-mail: masud197802@yahoo.com

সূত্র: নয়াদিগন্ত

Advertisements