সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্পর্কে আমেরিকার ভয়ানক দুশ্চিন্তা নিয়ে নোয়াম চমস্কি এখনো তার স্বভাবসিদ্ধ ভাষাশৈলীর লেখালেখি অব্যাহত রেখেছেন। এ ব্যাপারে চমস্কির উদ্বেগও কিছু কমেনি। তার নতুন বই ‘কে শাসন করছে পৃথিবী?’ -এ স্বভাবতই সেটা অনুপস্থিত থাকতে পারে না। তিনি এ বইতে অন্য সব বিষয়ের সাথে ভিয়েতনাম যুগের কথা বলাটা আবশ্যকীয় মনে করেছেন। এর একটাই সংজ্ঞা হয়- ‘ক্ষমতার আগ্রাসন’। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় অতি সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া তার এই লেখাটি কয়েক সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে নয়া দিগন্তে। এর অনুবাদ করেছেন সুমাইয়া হাবিবা

যখন আমরা কাউকে প্রশ্ন করি, এ বিশ্ব কে শাসন করবে? তখন সাধারণত আমরা যে পথে আমাদের চিন্তা বা দৃষ্টিকে প্রসারিত করি তা হলো, আমরা এমন কারো কথা ভাবি যে, বৈশ্বিক আন্তঃসম্পর্কে প্রধান ভূমিকায় থাকে বা কোনো মহাশক্তিধর কেউ। তাদের সিদ্ধান্তগুলো আমরা মেনে নেই। তাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ি। এটা দূষনীয় কিছু নয়। তবে সাথে এটাও খুব ভালোভাবে মাথায় রাখা উচিত যে, এ ধরনের অতি বাস্তব চিন্তাভাবনাগুলোই মারাত্মকভাবে আমাদের বিপথগামী করতে পারে।

আবশ্যিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত জটিলতা থাকবেই এবং যখন সাধারণ মানুষ বারবার প্রান্তিকতায় পৌঁছে যায়, তখন সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পছন্দ ও সিদ্ধান্তগুলো, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। এটা সব রাষ্ট্রের জন্য তো বটেই, এমনকি অধিক গণতন্ত্র চর্চাকারী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সত্য। আমরা কখনোই মানবজাতির নেতৃত্বকে বাদ রেখে বাস্তবিক উপলব্ধি অর্জন করতে পারব না। বিখ্যাত স্কটিশ দার্শনিক, রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ বলেছিলেন, ‘আজকের দিনে আমাদের ইংল্যান্ডের ব্যবসায়ীরা ও উৎপাদকেরাই হচ্ছে সত্যিকারের বহুজাতিক ব্যবসায়ীর গ্রুপ। তাদের নানা ধরনের প্রচুর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং একইভাবে রয়েছে খুচরা প্রতিষ্ঠানের বিশাল সাম্রাজ্য।’ এ সময় স্মিথকে অনুসরণ করাও বুদ্ধিমানের কাজ। অর্থাৎ ‘নিজের বেলা ষোলআনা, পরের বেলায় এক আনাও নয়’- এ জাতীয় জঘন্য নীতি পরিহার করে মানবতার স্রষ্টার পথে উৎসর্গিত পন্থায় অংশগ্রহণ করা। অন্যথায়, এ মতবাদ তীব্রতর, তিক্ত ও অবিরাম শ্রেণিযুদ্ধের কারণ হবে যা প্রায়ই একপক্ষীয় এবং নিজের দেশেই শুধু নয়, বিশ্বের বেশির ভাগ জনগণেরই ক্ষতির কারণ হবে।

সমকালীন বিশ্ব রীতিতে, হর্তাকর্তা প্রতিষ্ঠানগুলো মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকে। এটা শুধু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং দেশগুলোর জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও একই অবস্থা। এর ওপর নির্ভর করে তারা তাদের ক্ষমতা রক্ষা এবং নানাভাবে বিশাল আকারের অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রস্তুত করতে চায়। যখন আমরা মানবজাতির নেতৃত্বের ভূমিকা স্বীকার করে নেবো, তখন আমাদের এমন রাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে সময়ের দাবিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেমন- ‘পরিবর্তনশীল শান্তিপ্রয়াসী অংশীদারিত্ব’ (ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ)। এটা এক ধরনের উদ্যোক্তা অধিকার চুক্তি, যা ‘মুক্তবাণিজ্য চুক্তি’ (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট) নামে অপপ্রচারণা ও অপব্যাখ্যার শিকার। তারা এ বিষয়ে গোপনে আলোচনারত, শ’খানেক করপোরেট আইনজীবী ও লবিস্টের একটি অংশের বিবরণ দিচ্ছেন। উদ্দেশ্য, স্টালিন স্টাইলে খুব দ্রুততায় প্রক্রিয়া পরিচালন রীতি অঙ্কন করা, যাতে এ সংক্রান্ত আলোচনার পথ আটকে দেয়া যায় এবং শুধু হ্যাঁ অথবা না অপশনই থাকে। অঙ্কনকারীরা যে এটা হুট করে করছে তা কিন্তু নয়। তারা খুব ভালোভাবে এবং নিয়মিতই তাদের কাজ করে যাচ্ছে। জনগণ একটি সুনির্দিষ্ট সম্ভাব্য পরিণতির প্রতীক্ষা করছে।

দ্বিতীয় পরাশক্তি
দমনমূলক ও কারিগরি গণতন্ত্রের কয়েকবার হাতবদলের পর নব্য উদারনীতিবাদী চিন্তাধারা অতীত প্রজন্মকে সম্পদ ও ক্ষমতায় মনোনিবেশ করাতে পেরেছিল। কিন্তু তারা বিরোধী পক্ষকেও ভালোভাবে সক্রিয় করেছে। যেমন, ল্যাটিন আমেরিকায় সবচেয়ে ‘সুন্দরভাবে’ করেছে শুধু বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্র করা ছাড়া। যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশার চেয়ে অধিক উন্নতি করেছে, তারাও এখন দোদুল্যমান। কারণ, মন্দার সময় রাজনৈতিক নীতিনিষ্ঠায় অত্যন্ত কঠোর প্রভাব পড়ছে। এমনকি, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের অর্থনীতিবিদদের দ্বারাও নিন্দিত হচ্ছে (আইএমএফও রাজনৈতিক চরিত্র না নিলে তা অব্যাহত থাকবে।) আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্রাসেলস আমলাতন্ত্রে বদলে যাওয়ায় গণতন্ত্র আজ দলিতমথিত। তাছাড়া, উত্তরের ব্যাংকগুলো তাদের সভার কার্যবিবরণীর ওপর ভালোভাবেই ছায়া বিস্তার করেছে।

মূলধারার দলগুলো ক্রমাগত তাদের সদস্য হারাচ্ছে; ডান থেকে বামে, বাম থেকে ডানে। প্যারিস ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোপানোভার নির্বাহী পরিচালক ফ্রাঙ্কুই ল্যাফঁ সাধারণের মোহমুক্তির বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে বলেছেন, রাগান্বিত অক্ষমতা হলো জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের (যারা অন্তত গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ব্যাপারে নীতিবান) থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনগুলোকে স্থানান্তর করে মার্কেটে ছড়িয়ে বৃহদাকারে রূপদানের প্রকৃত শক্তি। এটা হুবহু নব্য উদারনীতিবাদী মতবাদের সারকথা। এর সাথে অনেক সামঞ্জস্যশীল প্রক্রিয়াই চাপা পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; কিছুটা একই রকম কারণে। এ বিষয়গুলো নিরূপণ এবং এ নিয়ে উদ্বেগ শুধু আমেরিকার জন্যই নয়, বিশ্বের জন্যও জরুরি। এর কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা।

নব্য উদারনীতিবাদী মতবাদের আকস্মিক হামলায় বিরোধী পক্ষের উত্থান আরেকটি মানসম্মত রেওয়াজ প্রচলনের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গির দিকে আলোকপাত করছে। এটি জনবিচ্ছিন্নভাবে ছিল। যখন হামেশাই অংশগ্রহণকারীদের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য দর্শকের ভূমিকাও মেনে নিতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন এটা উদার গণতান্ত্রিক মতবাদে আরোপিত হলো। এ রকম অবাধ্যতা সব সময়ই প্রভাবশালী শ্রেণীর জন্য উদ্বেগের বিষয়। আমেরিকার ইতিহাসেই দেখা যায়, জর্জ ওয়াশিংটন সাধারণ মানুষদের যারা জঙ্গিগোষ্ঠী গঠন করে তাদের স্পষ্টতই অতীব নোংরা ও কদর্য মানুষ হিসেবে গণ্য করতেন এবং তাদের এভাবে গণ্য করতে আদেশও দিতেন। এসব নিম্ন শ্রেণীর মানুষের অর্ধতব্য নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
হিংসাত্মক রাজনীতিতে ‘আমেরিকান বিদ্রোহ’ আমেরিকা থেকে সমকালের আফগানিস্তান, ইরাকে স্থানান্তরিত হয়েছে। উইলিয়াম পল্ক জেনারেল ওয়াশিংটন সম্পর্কে বলেন, তিনি যেসব সৈন্যকে ঘৃণা করতেন তাদের ব্যাপারে অভ্যুত্থান নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত ছিলেন। যে বিপ্লবকে হারানোর খুব কাছে তিনি চলে এসেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি যথার্থভাবেই সেটা করেছেন। তিনি ফ্রান্সে ব্যাপক হস্তক্ষেপ করেননি এবং বিপ্লব রক্ষা করতে পেরেছিলেন; যতক্ষণ পর্যন্ত না গেরিলারাই জয় লাভ করে, আমরা আজকে যাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলছি। তখন ওয়াশিংটনের ব্রিটিশ ধাঁচের আর্মি একের পর এক পরাজিত হচ্ছিল এবং আদতে যুদ্ধটিই হারতে বসেছিল।

রেকর্ড বলে, সফল বিদ্রোহের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো জয়ের পর একবার যখন জনসমর্থন মিলিয়ে যায় তখন নেতৃত্ব এই ‘নোংরা ও কদর্য’ মানুষদেরই দমন করে। এ নেতৃত্ব প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধে জয় লাভ করেছে গেরিলা কৌশল এবং গেরিলা সন্ত্রাস দিয়েই। এই ভয়ে এটা করা হয় যে, তারা সম্ভবত বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণীর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অভিজাত শ্রেণী সব সময় এই নিম্ন শ্রেণীর জনতাকে নানাভাবে নানারূপে অবজ্ঞা করে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই অবজ্ঞার আরেকটি রূপ হলো, আনুগত্য ও নিষ্ক্রিয়তার (মধ্যমপন্থী গণতন্ত্র) ডাক দেয়া।

মাঝে মাঝে রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনতার মতামতকে অনুসরণ করে থাকে, কেন্দ্রের ক্ষমতার প্রচণ্ডতা আরো অধিক পরিমাণে বাড়িয়ে তুলতে। এমনই একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটেছিল ২০০৩ সালে। যখন বুশ প্রশাসন তুরস্ককে আহ্বান করেছিল ইরাকে আগ্রাসনে অংশ নিতে। ৯৫ শতাংশ তুর্কি সেদিন এর বিরোধিতা করেছিল; যার ফলে এর বাস্তবায়ন হয়নি। ওয়াশিংটনকে বিস্মিত এবং ভয়কে উপেক্ষা করে, তুর্কি সরকার জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিকেই গ্রহণ করেছে। তুরস্ক এহেন দায়িত্বশীল আচরণ থেকে সরে আসায় অব্যাহত নিন্দায় জর্জরিত হতে থাকে। প্রতিরক্ষা উপসচিব পল উলফইজ যিনি গণমাধ্যম কর্তৃক প্রশাসনের আদর্শবাদী প্রধান আখ্যায়িত, তিনি তুর্কি সেনাবাহিনীকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন সরকারের এমন অন্যায় অনায্য সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার জন্য। এবং ক্ষমাও চাইতে বলেন। এ রকম ও অটলতার অন্যান্য সহস্র উদাহরণ আমাদের গণতন্ত্রের জন্য অলীক কল্পনা। গণতন্ত্র উন্নয়নে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের একাগ্রতা নিয়ে গুণকীর্তন জোরালোভাবেই হয়েছে। মাঝে মাঝে সমালোচনাও করা হয়েছে দেশের বাইরে ক্ষমতা প্রয়োগ করে অন্যদের ওপর তার গণতান্ত্রিক আকুলতা চাপিয়ে দেয়ার একপেশে চিন্তার জন্য।

তুর্কি জনগণ একা ছিল না, পুরো বিশ্বই মনেপ্রাণে ইন্দো-আমেরিকান আগ্রাসনের বিপক্ষে ছিল। আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের যুদ্ধের পরিকল্পনার সমর্থন সব জায়গায়ই বড়জোর ১০ শতাংশ ছিল মাত্র। যুদ্ধবিরোধী পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বেই প্রতিবাদে জ্বলে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সম্ভবত প্রথমবারের মতো সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রতিবাদ হলো; এমনকি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরুর আগেই। নিউইর্য়ক টাইমসের প্রথম পাতায় সাংবাদিক প্যাট্রিক টেইলর রিপোর্ট করেন, বর্তমানে সম্ভবত দু’টি পরাশক্তিই পৃথিবীতে বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের সাধারণ জনতার মতামত।

অভূতপূর্ব বিক্ষোভ হয় যুক্তরাষ্ট্রে। আগ্রাসনবিরোধী মিটিং-মিছিল হলো। এর শুরুটা হয়েছিল দশকের শুরুতে ইন্দোচীনে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে। যদিও অনেক দেরিতে, তবুও বিরোধিতার মাত্রাটা শেষমেশ বলিষ্ঠ ও প্রভাবশালী হতে পেরেছে। ১৯৬৭ সাল, যখন থেকে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন একটি প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হতে পেরেছে, সামরিক ঐতিহাসিক ও ভিয়েতনাম বিশেষজ্ঞ বার্নার্ড ফল সাবধান করেন, ভিয়েতনাম একটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সত্তা… এটি বিলুপ্তির হুমকির মুখে… যদি গ্রামাঞ্চলগুলো আক্ষরিকভাবেই মৃতুবরণ করে দৈত্যাকার সমরাস্ত্রের আঘাতে, এই আকারের একটি অঞ্চল চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে।”

কিন্তু যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন পরিণত হয়েছিল একটি শক্তিতে, যাকে অবহেলা করা যায় না। নচেৎ এটাকে এড়িয়ে যাওয়াই হতো যখন রোনাল্ড রিগ্যান এই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েই প্রেসিডেন্ট অফিসে এসেছিলেন যে, সেন্ট্রাল আমেরিকার ওপর আক্রমণ শুরু করবেন। তার প্রশাসন সেরকম পদক্ষেপের খুব কাছাকাছিই ছিল, বিশ বছর আগে জন এফ কেনেডি দক্ষিণ ভিয়েতনামে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাদের পিছু হটতে হয় জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে। ষাটের দশকের শুরুতে এর অভাব ছিল। সে আক্রমণ খুবই ভয়ানক ছিল। ভুক্তভোগীরা এখন অবধি সারিয়ে উঠতে চেষ্টা করে যাচ্ছে সে ক্ষতি। তবে দক্ষিণ ভিয়েতনামে ও ইন্দোচীনে যা ঘটেছিল, সেসব সঙ্ঘাতের অনেক পরে সেখানে দ্বিতীয় পরাশক্তি যে প্রতিবন্ধকতা আরোপ করেছিল, তা ছিল আরো মন্দ।

এটা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, ইরাক আক্রমণের ব্যাপক বিরোধিতার কোনো প্রভাব ছিল না। সে ক্ষেত্রে আমাকে ভুল মনে হয়। আবার, এই আক্রমণ বেশ ভয়ঙ্কর ছিল এবং এর পরবর্তী ফলাফল ছিল চূড়ান্তভাবে কিম্ভূতকিমাকার। তা সত্ত্বেও এটা এখন পর্যন্ত অত্যধিক মন্দই বিবেচিত হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি, প্রতিরক্ষা সচিব ডোনাল্ড রামসফেল্ড এবং বুশ প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা কখনোই এমনটি ভাবতে পারেননি যে, এ ধরনের প্রতিরোধ আসবে। প্রেসিডেন্ট কেনেডি এবং প্রেসিডেন্ট জনসন ৪০ বছর আগে তা গ্রহণ করেছিলেন কোনো রকম বাধা ছাড়াই।

চাপের মধ্যে পশ্চিমা ক্ষমতা
এখানে একটু বেশি বলতে হয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ভূমিকা রাখার সময় যখন আমরা একটি মানসম্মত নীতি অবলম্বন করব, তখন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের প্রভাবকগুলোকে পাশে সরিয়ে রাখতে হবে। তবে সামান্য নয় এমন আদেশগুলোকে সাথে নিয়ে। নাহলে চলুন, এমন একটি নীতি অবলম্বন করি, যা অন্তত বাস্তবতার একদম কাছাকাছি। তারপর আসা যাক এ প্রশ্নে; বিশ্ব কে শাসন করবে এবং এ সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো কী? যেমন চীনের পরাশক্তি হিসেবে উত্থান এবং এটা আবার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক মেরুকরণ। পূর্ব ইউরোপের ফুটন্ত নতুন স্নায়ুযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধ, আমেরিকার কর্তৃত্ব ও পতন, এবং একই পরিসীমায় ব্যপ্ত বিষয়গুলো।

পশ্চিমা শক্তিগুলো ২০১৬ আসার আগে থেকেই যে হুমকির সম্মুখীন হয়েছে, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রধান আন্তর্জাতিক কলামিস্ট গিডিয়ান র‌্যাচম্যান সে ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী অবকাঠামোর সংক্ষিপ্তসার তৈরি করেছেন। বৈশ্বিক মেরুকরণে যে পশ্চিমা ছবি অঙ্কিত, তার পুনর্বিবেচনা শুরু করেছেন। বলেছেন, ‘ স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত আমেরিকার সেনাবাহিনীর দুর্বার ক্ষমতা মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে।’ এটি তিনটি স্বতন্ত্র কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ১. পূর্ব এশিয়া; যেখানে মার্কিন নেভি প্রশান্ত মহাসাগরকে একটি মার্কিন লেক হিসেবে পরিচালনা করে। ২. ইউরোপ; যেখানে ন্যাটো মানেই যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে ন্যাটোর সামরিক ব্যয়ের তিন-চতুর্থাংশই একটি সদস্য রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার্থে ব্যয় হয়। ৩. মধ্যপ্রাচ্য। যেখানে দৈত্যাকার মার্কিন নৌ ও বিমানঘাঁটি রয়েছে সেখানে বিদ্যমান বন্ধুদের আশ্বস্ত করতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখাতে।

আজকের মেরুকরণের সমস্যা হচ্ছে, র‌্যাচম্যানের মতে, এই নিরাপত্তা নির্দেশ তিনটি কারণে হুমকির সম্মুখীন। প্রথমত, ইউক্রেন ও সিরিয়ায় রাশিয়ার হস্তক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, চীন তার নিকটবর্তী সাগরে অগ্রসর হচ্ছে। যা স্পষ্টতঃই আমেরিকার হ্রদের পানি নিয়ে প্রতিযোগিতা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মূলগত প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের কি উচিত অন্যান্য প্রধান শক্তিকে মেনে নেয়া, যা তার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের আশপাশে এক রকম প্রভাব বলয় তৈরি করবে? র‌্যাচম্যানের মতে, সাধারণ জ্ঞান বলে- বিশ্বে অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকিরণের কারণে এটাই উচিত। এখানে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বকে দেখার অনেক রকম দৃষ্টিভঙ্গি আছে। কিন্তু আমাদের এ তিনটি বিষয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটিকে অবশ্যই নিতে হবে।

পরের কিস্তি: কে শাসন করছে বিশ্ব?

সূত্র: নয়াদিগন্ত

Advertisements