সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্পর্কে আমেরিকার ভয়ানক দুশ্চিন্তা নিয়ে নোয়াম চমস্কি এখনো তার স্বভাবসিদ্ধ লেখালেখি অব্যাহত রেখেছেন। এ ব্যাপারে চমস্কির উদ্বেগও কমেনি। তার নতুন বই ‘কে শাসন করছে পৃথিবী?’ -তে স্বভাবতই তার অনুরণন রয়েছে। তিনি এ বইতে অন্য সব বিষয়ের সাথে ভিয়েতনাম যুগকে বলেছেন ‘ক্ষমতার আগ্রাসন’। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় অতি সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া তার এই লেখাটির দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশ হলো আজ। এর অনুবাদ করেছেন সুমাইয়া হাবিবা

আজকের চ্যালেঞ্জ র্পূব এশিয়া
আমেরিকান হ্রদের শুরুর সাথে সাথে কিছু লোকের ভ্রু কুঁচকে গেছে, যখন গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন বের হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমেরিকান বোমারু বিমান দক্ষিণ চীন সাগরে রুটিন মিশনে ওড়ার সময় বেখেয়ালে চীনের কৃত্রিম দ্বীপের দুই নটিক্যাল মাইলের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে একে ঘিরে বিবাদ সৃষ্টিকর ইস্যু সৃষ্টি হয়েছে, যা তাদের ক্রুদ্ধ করেছে।’ যারা সত্তর বছর ধরে পরমাণু অস্ত্রের যুগে তাদের ক্রুর রেকর্ডের জন্য সুপরিচিত তাদের সম্পর্কে সবাই অবগত যে, এটি প্রায়ই হতে থাকা একটি ছোট্ট ঘটনা মাত্র, যা আরেকটি আখেরি পরমাণু যুদ্ধের জ্বলে ওঠার জন্য ভয়ানক রকম নিকটবর্তী হচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চায়নার উত্তেজনামূলক ও দখলদারিমূলক আচরণের যে একজন সমর্থক নয় সে-ও লক্ষ করল, এই আকস্মিক ঘটনায় চায়নিজ পরমাণু সক্ষম বোমারু বিমানকে জড়ানো হয়নি ক্যারিবিয়ানে। অথবা ক্যালিফোর্নিয়ান উপকূল বন্ধ করেনি। অথচ চায়নার একটি চায়নিজ হ্রদ প্রতিষ্ঠা করতে কোনো ভণ্ডামির প্রয়োজন নেই।
বিশ্বের জন্য সৌভাগ্যবশত, চায়নিজ নেতারা এটা বুঝতে পেরেছেন তাদের দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য রুট অপ্রতিরোধ্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দ্বারা শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে আছে জাপান থেকে মালাক্কা প্রণালী ছাড়িয়েও পুরো এলাকা। একইভাবে চীন পশ্চিমা বিশ্বে বিশাল বিনিয়োগ বিস্তৃত করতে অগ্রসর হয়েছে এবং সতর্কভাবে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার অংশ হিসেবে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বাণিজ্য উন্নয়নমূলক অবকাঠামো যাতে মধ্য এশিয়া ও রাশিয়া অন্তর্ভুক্ত এবং খুব তাড়াতাড়িই ইন্ডিয়া-পাকিস্তানও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। সাথে ইরানও পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দেবে। আবার বলা হয়েছে ওইসব অঞ্চলের সব সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করতে। এখানে এক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে অবজ্ঞা করা হয়েছে।
চীন পুরাতন সিল্করোডের আধুনিক রূপদান করে নতুন করে নির্মাণ করতে চাইছে। এখানে উদ্দেশ্য শুধু সেসব অঞ্চলকে চায়নিজ বলয়ে নিয়ে আসা নয়; বরং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে পৌঁছা। এতে বিশাল অঙ্ক ঢালা হয়েছে একটি সমৃদ্ধ এশিয়ান জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সিস্টেম তৈরির জন্য। সাথে দ্রুতগতির রেললাইন ও বিস্তৃত পাইপলাইনও স্থাপন হবে।
এই উদ্যোগের একটি উপাদান সিল্করোড নামে মহাসড়ক বিশ্বের বৃহত্তম পর্বতের কিছু অংশ ধরে এগিয়ে পাকিস্তানে চীনের সংস্কার করা ঘাদার বন্দর পর্যন্ত গেছে, যা তেলের বহরকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করবে। এ উদ্যোগের আরো একটি বিষয়, চীন-পাকিস্তান আশা করছে, এর মাধ্যমে পাকিস্তানে ব্যাপক শিল্পন্নোয়ন ঘটানো। যে উদ্যোগ পাকিস্তানে অব্যাহত সামরিক সহায়তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র নেয়নি এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদকে শক্ত হাতে দমন করার জন্য একটি উপায় তৈরি করা, যা চীনের পশ্চিমে জিনজিয়ান প্রদেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। ঘাদার বন্দর চীনের একটি মুক্তা অনুসন্ধান অভিযানের অংশ হতে চলেছে। ভারত মহাসাগরে ঘাঁটি নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে বাণিজ্যিকভাবেই, তবে সাথে সম্ভাব্য সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্যও। এ প্রত্যাশা নিয়ে যে, চীন ভবিষ্যতে একদিন আধুনিক যুগে প্রথমবারের মতো পারস্য উপসাগরে পাওয়ার প্রজেক্ট করতে সক্ষম হবে। এসবই হচ্ছে ওয়াশিংটনের দুর্বার সামরিক ক্ষমতা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য। পরমাণু যুদ্ধের ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য, যা যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালোভাবেই ধ্বংস করতে পারে।
২০১৫ সালে চীন এশিয়ান অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এইইবি) প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজে এর সব থেকে বড় শেয়ারহোল্ডার হয়। গত জুন মাসে ৫৬টি দেশ বেইজিংয়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। ওয়াশিংটনের বিরাগ উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেনসহ অন্যরাও অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান অনুপস্থিত ছিল। কিছু বিশ্লেষকের বিশ্বাস এই ব্যাংক ভবিষ্যতে আন্তজাতিক হর্তাকর্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক) টেক্কা দেবে, যেগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। কেউ কেউ আশা করছেন- এসসিও ভবিষ্যতে ন্যাটোর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে।

(পরের কিস্তি আগামীকাল)

সূত্র: নয়াদিগন্ত

Advertisements