1462336588শেখ আবু তালেব, ঢাকা :
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থ লুটের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক থেকে সাইবার ও আইটি নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত ফায়ারওয়াল উদ্দেশ্যমূলকভাবে আগেই ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবরে আরটিজিএস(রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) নামে আন্ত:ব্যাংক লেনদেনের বিশেষ সফটওয়্যার বসানোর সময় তা করা হয়েছিল। এর পরেই ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। মূলত তখন থেকেই রিজার্ভ লুটের ক্ষেত্র তৈরি করা হয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা। সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়টি ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি, তদন্ত সংস্থা সিআইডি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালকদেরও জানানো হয়েছে রিজার্ভ লুটের পরে।

অপরদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থ পাঠানো হয় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাকাতি শাখার ৫টি অ্যাকাউন্টে। সেগুলো খোলা হয়েছিল ২০১৫ সালের মে মাসে। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়, সবগুলো অ্যাকাউন্টই করা হয়েছে ভুয়া কাগজ-পত্র দিয়ে।

রিজার্ভ লুটেরর ৩ মাস আগে আরটিজিএস স্থাপনে নিরাপত্তা ফায়ারওয়াল ফেলে দেওয়া ও ১০ মাস পূর্বে ২০১৫ সালের মে ব্যাংকে ভুয়া কাগজ-পত্র দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা একইসূত্রে গাঁথা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক থেকে নিরাপত্তা ফায়ারওয়াল ফেলে দেওয়ার সময় ঊর্ধ্বতন কোন কর্মকর্তার অনুমোদন নেওয়া হয়নি। সুইফটের সঙ্গে আরটিজিএস সংযোগ দেয়ার ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনে ব্যবহৃত হয়ে আসা সুইফটপদ্ধতি। এভাবে পেমেন্ট সিস্টেম দুর্বল করে পরিকল্পিতভাবে চক্রটি রিভার্জের অর্থ হাতিয়ে নেয়। রিজার্ভের অর্থ লুটের পরে কম্পিউটার ও সার্ভারে প্রবেশের অনেক তথ্য মুছে ফেলে চক্রটি। তদন্ত কমিটি এই বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানায়, আরটিজিএস সফটওয়্যারটি দ্রুত বসাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উর্দ্ধতন কয়েকজন কর্মকর্তা অতি-উৎসাহী ছিলেন। নিরাপত্তা ফায়ারওয়াল ফেলে দিয়ে কেন এই কাজটি করা হয়েছিল তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এ বিষযটি সামনে নিয়ে তদন্ত করলেই রিজার্ভ লুটের মোটিভ ও মূল হোতাদের চিহ্নিত করা যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘ দিন ধরে সুইফট সিস্টেমের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক লেনদেন করে আসছে। কিন্তু এত দিন এ সিস্টেমের মাধ্যমে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু আরটিজিএস সংযোগ দেয়ার পরপরই রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি ঘটেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সকল কার্যক্রম পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় আলাদা-আলাদা বিভাগের মাধ্যমে। বিভাগগুলোর অধীনেই সকল কর্মকর্তা-কর্মচারি দায়িত্ব পালন করেন। সকল কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রতিটি বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন একজন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদ মর্যাদার কর্মকর্তা। একজন নির্বাহী পরিচালক(ইডি) একাধিক বিভাগ ও জিএমদের কাজ তদারকি করেন। ইডিদের দায়িত্ব ও কর্মবন্টন এবং তা তদারকি করেন ডিজিগণ(ডেপুটি গভর্নর)।

আরটিজিএস বসানোর কার্যক্রমটি আইটি-কমিউনিকেশন বিভাগের হওয়ায় তা বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ডিজি-৪ নাজনীন সুলতানার অধীনে ছিল। সুইফটের নেটওয়ার্ক টার্মিনালের কম্পিউটারে আরটিজিএস সংযোগ দিতে গিয়ে নতুন সমস্যায় পড়ে ব্যাংকের কর্মকর্তারা এবং এ কাজের দায়িত্ব পাওয়া সুইডেন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি। নিরাপত্তা ফায়ারওয়াল আরটিজিএসকে গ্রহণ করেনি। তাই নতুন সফটওয়্যারটি ইনস্টল করা যায়নি। পরে তড়িঘড়ি করেই ফায়ারওয়ালকে প্রথমে অকার্যকর(ডিএসএবল) করা হয়। তাতেও সুবিধা করতে না পারায় দ্বিতীয় ধাপে একেবারেই বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি সিস্টেম থেকে ফেলে দেওয়া হয় নিরাপত্তা ফায়ারওয়াল।

জানা যায়, সে সময় ডিজি নাজনীন সুলতানা ছুটিতে দেশের বাইরে ছিলেন। আরটিজিএস সফটওয়্যার বসাতে অন্য এক ডিজিকে দিয়ে দ্রুত স্বাক্ষর করানো হয় নথিতে। বিদেশ যাওয়ার আগ পর্যন্ত নাজনীন সুলতানাই আরটিজিএস বসানোর সকল কার্যক্রম তদারকি করছিলেন। আরটিজিএস বসানোর সময়ে নিরাপত্তা ফায়ার ওয়াল সরানোর কথাটি কোথাও উল্লেখ ছিল না বলেই জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রটি।

সূত্রটি জানায়, এভাবে দ্রুত আরটিজিএস বসানোর জন্য উর্দ্ধতন অনেক কর্মকর্তাই তখন বিরোধিতা করেছিলেন। কৌশল হিসেবেই ডিজি-৪ কে বিদেশ পাঠিয়ে তার অনুপস্থিতে নথি পাশ করিয়ে নেওয়াকে রিজার্ভ লুটের ক্ষেত্র তৈরি এবং এ সংক্রান্ত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

কেন সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তার মতামত না নিয়ে কাদের উৎসাহে কাজটি করা হলো তা বের করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে।

সূত্র জানায়, সুইফটের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্পাদিত চুক্তির শর্ত মোতাবেক, সুইফট সিস্টেম যে রুমে থাকবে সেখানে কোনো আইটি কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক আইটি বিভাগের দুই জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে সুইফট রুমে। সুইফট সার্ভার যে কম্পিউটারে থাকবে সেই কম্পিউটারে অন্য কোন সিস্টেম বা লোকাল নেটওয়ার্ক সংযোগ দেওয়া যাবে না। কিন্তু সুইফটকে না জানিয়ে সেই কম্পিউটারে আরটিজিএস সিস্টেম সংযোগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক কম্পিউটার দিয়েই সুইফট ও আরটিজিএসের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে অর্থ লেনদেন করত বাংলাদেশ ব্যাংক।

এছাড়াও সুইফট নেটওয়ার্কের কম্পিউটারের সঙ্গে লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক স্থাপন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কম্পিউটারের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। কেন এ কাজটি করা হয়েছিল তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, সুইডেনভিত্তিক সিএমএ স্মল সিস্টেম এবি নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে আরটিজিএস(রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) সিস্টেম বসানোর চুক্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্ত:ব্যাংক লেনদেনে দ্রুত মোটা অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের জন্য ব্যবহার করা হয় আরটিজিএস। মাত্র ১ মিনিটেই স্থানীয় মুদ্রার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে বৈদেশিক মুদ্রার মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করা যায়। বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে গ্রাহক ও ব্যাংক এ লেনদেনে করতে পারে। বলা হয়, সেই সুবিধার জন্যই নাকি আরটিজিএস পদ্ধতিটি বসানো হয়েছে।  বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা ও সিএমএ স্মল সিস্টেম এবি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি) অ্যালেক্স শাজা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সিএমএ’র স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে বাংলাদেশের মেসার্স স্পেক্ট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম লিমিটেড। সেই চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে আরটিজিএস স্থাপনের কাজ শুরু করে জুলাইয়ের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এবং সেপ্টেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পদ্ধতিতে লেনদেন চালাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবরে চালু করা হয় আরটিজিএস।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের(এডিবি) আর্থিক ও বিশ্বব্যাংকের কারিগরি সহায়তায় আরটিজিএস প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। এডিবিকে আর্থিক যোগান দেয় জেএফপিআর(জাপান ফান্ড ফর পোভার্টি রিডাকশন)।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চুরি করেছে সংঘবদ্ধ দেশি-বিদেশি একটি চক্র। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করছে, এর মধ্যে ১৯.৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার শ্রীলংকা থেকে ফেরত আনা গেছে। আর ৮১ মিলিয়ন ডলার রয়েছে ফিলিপাইনে। ফিলিপাইনের প্রচেষ্টায় ব্যবসায়ী কিম অংয়ের কাছ থেকে কিছু ডলার উদ্ধার করতে পেরেছে দেশটি। কিন্তু ফিলিপাইনের পত্রিকাগুলো বলছে, দ্বিতীয় দফায় আরো ৮৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা চুরি করে পাঠানো হয় ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। ফেডারেল রিজার্ভের সন্দেহ হলে সেই অর্থের ছাড় আটকে দেয় ফিলিপাইন। পরে সে অর্থ ফেরত নেয় ফেডারেল রিজার্ভ। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছুই বলেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করছে, অর্থ ছাড়ে ৩৫টি আদেশ পাঠানো হয়েছিল ফেডারেল রিজার্ভে। কিন্তু তদন্ত দল কম্পিউটারের তথ্য বের করে দেখতে পায় আদেশ গিয়েছিল ৭০টি। এসব আদেশে টাকা স্থানান্তরের নির্দেশ ছিল ১৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ পরিমাণ অর্থ ফেডারেল রিজার্ভে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে সে দিন ছিল না। এ কারণে লেনদেনে সন্দেহ হয় ফেডারেল রিজার্ভের। তাই প্রথম দিকের আদেশগুলো কার্যকর হয়। পরের আদেশের বিষয়ে কনফার্মেশন চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সাড়া না পেয়ে অর্থ ছাড় আটকে দেয় ফেডারেল রিজার্ভ। এখন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আসলে কত টাকা সরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে? প্রশ্নটির উত্তর এখন পর্যন্ত অজানাই রয়ে গেছে।

সূত্র: শীর্ষ নিউজ

Advertisements