সরকার-বিচার বিভাগ মুখোমুখি
সরকার-বিচার বিভাগ মুখোমুখি

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে যাবে কি যাবে না এ ইস্যুটি নিয়ে সরকার এবং বিচার বিভাগ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যে এ মুহূর্তে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সরকার বিচারকদের অপসারণ অর্থাৎ ‘ইমপিচ’ করার ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে নিতে চায়। অন্যদিকে বিচারপতিরা তাতে নিজেদের জন্য চরম নিরাপত্তাহীনতার অশনি সংকেত দেখছেন।

মনে করা হচ্ছে, উচ্চ আদালত এতোদিন যে সুদৃঢ় স্বাধীনতা ভোগ করেছেন সেটি ভেঙে পড়বে। সরকার বা জাতীয় সংসদের সদস্যরা আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত তাদের বিরুদ্ধে গেলেই ওই বিচারপতিকে অপসারণ করতে লেগে যাবেন। সংসদের দ্বারা ইমপিচ করার ক্ষমতা কার্যকর হলে বিচারবিভাগকে সবসময়ই সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ক্ষমতার চরম অপব্যবহার হতে পারে বলে বিচারপতি এবং আইনজ্ঞরা আশংকা করছেন।

সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে নেয়ার ব্যাপারে সরকার ইতিমধ্যে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিলো। এ সংক্রান্ত আইনের খসড়াও মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। কিন্তু, গত বৃহস্পতিবার ৫ মে হাইকোর্টের এক রায় পুরো প্রক্রিয়াকেই থামিয়ে দিয়েছে। রায়ে বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে দেয়া সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট বিভাগ। শুধু তাই নয়, হাইকোর্টের বিচারপতিরা ‘সংসদের হাতে অপসারণ ক্ষমতাকে ইতিহাসের দুর্ঘটনা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

দেখা যাচ্ছে, হাইকোর্টের ওই রায়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছে সরকার। জাতীয় সংসদে এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এই রায়কে ‘সংবিধান পরিপন্থী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, যাঁরা বিচারক, আমরা তাঁদের চিনি, জানি। আমরা ক্ষমতায় বলেই তাঁরা বিচারক হয়েছেন। সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ছাড়াও সরকারের অন্য শরিক জাতীয় পার্টি এবং জাসদের এমপিরা প্রায় একই ভাষায় কথা বলেছেন। আইনমন্ত্রী, এটর্নি জেনালেরসহ অবশেষে সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যাতে তাদের ইচ্ছা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেন।

এ মুহূর্তে সবাই চেয়ে আছেন, আপিল বিভাগ কী পদক্ষেপ নেন সেটি দেখার জন্য। মনে করা হচ্ছে, আপিল বিভাগ হয়তো প্রাথমিকভাবে এই রায়কে স্থগিত করবেন। কিন্তু, তাতে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হবে না। এর কারণ, বিষয়টি সাবজুডিস থেকেই যাচ্ছে। এ অবস্থায় সরকার নতুন কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ পাবে না।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরকার এখন অত্যন্ত জরুরিভাবে চাইছে বিচারপতিদের ‘ইমপিচ’র করার ক্ষমতা হাতে পেতে। এটি না পাওয়া পর্যন্ত সরকারের ভেতরকার টেনশন দূর হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক সময়েও কয়েকটি আদেশ সরকারের মনপূতঃ না হওয়ায় নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত ক্ষেপে আছে ভেতরে ভেতরে। বিশেষ করে খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে সাজা দেয়া, ত্রাণমন্ত্রী মায়ার দুর্নীতি মামলার সাজা বহাল- এ ঘটনাগুলোকে সরকার স্বাভাবিকভাবে নেয়নি।

তাছাড়াও প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ‘অবসরের পর রায় লেখা বন্ধের’ যে নীতি গ্রহণ করেছেন সেটিকে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা তাদের জন্য অশনি সংকেত বলে মনে করছেন। সরকারের মধ্যে এমন আশংকা বদ্ধমূল হয়েছে যে, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যে কোনো সময় বিচারপতি খায়রুল হকের ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল’ রায়ের বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। প্রথমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের এই রায়টি বিচারপতি খায়রুল হক অবসরের ১৭ মাস পদে প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয়ত, মৌখিক বা সংক্ষিপ্ত রায়ের সঙ্গে পরবর্তীতে প্রকাশ করা পূর্ণাঙ্গ রায়ের বড় ধরনের গরমিল রয়েছে। বিরোধীদল বিএনপি ইতিমধ্যেই দাবি তুলেছে, খায়রুল হকের সেই অবৈধ রায় বাতিলের জন্য। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা যদি তা-ই পদক্ষেপ নেন সেক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবীত হবে এবং তাতে বর্তমান সরকারেরও আর আইনগত বৈধতা থাকবেন না। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সেই কারণেই সরকার বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে নিতে চাইছে জরুরিভিত্তিতে। যাতে বিকল্প হিসেবে ‘ইমপিচ’র মরণাস্ত্রটি এক্ষেত্রে ‘সময়মত’ ব্যবহার করা যায়।

কিন্তু, পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সরকারের সেই উদ্দেশ্য এখন আর সফল হচ্ছে না। বিচারবিভাগ ইতিমধ্যেই নিজেদের সুরক্ষার নীতি গ্রহণ করেছেন। হাইকোর্টের এই রায়টি শুধু দু’জন বিচারপতির মতামত নয়, গোটা বিচারবিভাগের মতামতেরই প্রতিফলন ঘটেছে এর মাধ্যমে।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর থেকে সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের বিধানে এ পর্যন্ত তিনবার পরিবর্তন করা হয়েছে। বাহাত্তরের সংবিধানে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা ছিল সংসদের হাতে। সংবিধানের ৯৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা ছিল, প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের ভোটে সমর্থিত প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ করা যাবে। আর ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদে বলা ছিল, অপসারণের প্রস্তাব-সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তবে ওই অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন আজ পর্যন্ত প্রণীত হয়নি। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে মিন্ত্রসভা।

১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে ৯৬ (২) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দিয়ে দেওয়া হয়। আর ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদটি বিলুপ্ত করা হয়।

১৯৭৭ সালে বিচারকদের অপসারণের পদ্ধতিতে আবার পরিবর্তন আসে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে এক সামরিক আদেশে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে দেওয়া হয়। এরপর ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান সংবিধানে ঢুকে যায়। ২০১০ সালে আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করলেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে অনুমোদন দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাহাত্তরের সংবিধানের অনেক বিষয় ফিরিয়ে আনা হলেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাদ পড়েনি। সর্বশেষ ষোড়শ সংশোধনীতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাদ দিয়ে বাহাত্তরের সংবিধানের ৯৬ (২) ও (৩) অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে আনা হয়।

সূত্র:  শীর্ষ নিউজ

Advertisements