দাউদ ওগলু
দাউদ ওগলু

গত বৃহস্পতিবার তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী আহমদ দাউদ ওগলু এক সংবাদ সম্মেলনে শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি পার্টির ঐক্যের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চেয়ারম্যান পরিবর্তন দলের জন্য আরো বেশি সঠিক হবে। আগামী ২২ মের কংগ্রেসে আমি দলীয় প্রধানের পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না।’

দাউদ ওগলুর এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তুরস্কের রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রিত্বের যুগের অবসান হতে যাচ্ছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই দেশটি কার্যত রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাবে। তবে দেশটির এই সিদ্ধান্তের রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।

২০০১ সালে তুরস্কের খ্যাতিমান রাজনীতিক নাজিমুদ্দিন আরবাকানের ওয়েলফেয়ার পার্টি (আরপি) সাংবিধানিক আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধ হলে দলটির কিছু নেতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে নতুন রাজনৈতিক দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি)। নতুন এই দলটি ২০০২ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। পরবর্তী ১৪ বছরে দলটি প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা রজব তাইয়েব এরদোগানের নেতৃত্বে টানা ১০টি নির্বাচনে জয় লাভ করে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি পৌরসভা নির্বাচন, দুইটি সাংবিধানিক গণভোট ও একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। একে পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকার ধারাবাহিক সফলতায় দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আনতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। এরদোগানের নেতৃত্বে তুরস্ক জি-টুয়েন্টি সদস্যপদ লাভ করে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য পদ লাভে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। এ ছাড়া তার সরকার বেসামরিক রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব বন্ধের মাধ্যমে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংখ্যালঘুসহ সব নাগরিকের সমান অধিকার বাস্তবায়ন করে।

এরদোগানের প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদে সরকারের সাথে আমলাতান্ত্রিকতার দ্বন্দ্বের কথা প্রায়ই শোনা যেত। ২০০২ সালে একে পার্টিকে রুখতে এরদোগানকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণাও করা হয়েছিল। পাঁচ বছর পরে আরেক বিতর্কিত রায়ে একই দলের নেতা ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ গুলকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করে সাংবিধানিক আদালত। পার্লামেন্টের অচলাবস্থা ও বিক্ষোভের মধ্যে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের হুমকিও দেয় সেনাবাহিনী। এমন পরিস্থিতিতে এরদোগান আগাম নির্বাচন ঘোষণা করেন এবং জনগণ আবারো তাদের নিরঙ্কুশ সমর্থন দেয়।

কয়েক মাস পরে ১৯৮২ সালে প্রণীত সংবিধান সংশোধনের পদক্ষেপ নেয় একে পার্টির সরকার। সেই সংবিধানে আমলান্ত্রিকতাকে শক্তিশালী করার জন্য প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল। সরকার ও আমলাতন্ত্রের এই বিরোধ নিরসনের জন্য ২০০৭ সালে এক সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যাতে ৬৯ ভাগ জনগণ পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। এর সাত বছর পর তুরস্কের প্রথম সরাসরি নির্বচিত প্রেসিডেন্ট হন এরদোগান এবং তার জায়গায় একে পার্টি প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন আহমদ দাউদ ওগলু।
কিন্তু দাউদ ওগলুর পদত্যাগের ঘোষণার পর এই প্রশ্ন আসছে যে, একই আদর্শ ও একই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা দুই ব্যক্তি কেন এক সাথে কাজ করতে পারছেন না?

এটা স্পষ্ট যে, এই সমস্যা সাংবিধানিক, ব্যক্তিগত নয়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী দুইজনের একসাথে কাজ করা সম্ভব নয়। দুই বছর আগে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেও এরদোগান এখনো একে পার্টির অবিসংবাদিত নেতা। তুর্কি জনগণের মধ্যে তার রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের কাছে জনগণের রয়েছে অনেক প্রত্যাশা। সাম্প্রতিক সময়ে এই নেতা দেশের ভবিষ্যৎ সঙ্কট নিরসনে স্বপ্রণোদিত হয়ে অনেক কার্যক্রম শুরু করেছেন। এ কাজকে বেগবান করতেই প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা দরকার বলে মনে করা হচ্ছে।
দেশকে এগিয়ে নিতে হলে একে পার্টির নেতৃবৃন্দকে নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আগামী ২২ মে’র দলীয় কংগ্রেসে এই পদক্ষেপের প্রথম কাজ হিসেবে দলটিকে এমন একজন দলীয় প্রধান নির্বাচন করতে হবে যিনি চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রেসিডেন্টের সাথে কাজ করতে পারবেন। নতুন নেতৃত্বের অধীনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে একে পার্টিকে।

প্রধানমন্ত্রী দাউদ ওগলুর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কারের সূচনা, যা তুরস্কের প্রধান নির্বাহী হিসেবে প্রেসিডেন্টের ভূমিকাকে জোরদার এবং সেসব কার্যক্রম মন্ত্রিসভার সাথে সমন্বয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব তৈরি হবে। অন্যভাবে বলা যায়, দাউদ ওগলুর এই সিদ্ধান্তের অর্থ হচ্ছে তুরস্ক কার্যকরভাবেই একটি প্রেসিডেনশিয়াল শাসন ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে।
ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে, সূত্র: নয়াদিগন্ত

Advertisements