13055444_1078218815599415_3521030034196468911_nস্টালিন সরকার
গ্রামগঞ্জের মানুষ রাজধানী ঢাকার গুলিস্তানকে ঠকবাজদের আখড়া বলে থাকে। ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও প্রতারক চক্র গুলিস্তানে সিন্ডিকেট তৈরি করে মানুষ ঠকাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। গ্রামের কেউ ঢাকায় এলে গুলিস্তানে টুকিটাকি জিনিসপত্র কেনেন স্ত্রী, পুত্র ও কন্যার জন্য। অধিকাংশ বাসের কেন্দ্রস্থল গুলিস্তান হওয়ায় ওই স্থান হয়ে ওঠে মানুষের জন্য সবচেয়ে সুবিধার জায়গা। গুলিস্তানে পণ্য কিনে প্রতারিত হননি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। পুরনো কাপড় রং-রিপু করে ও জিঞ্জিরার পারফিউমকে বিদেশী পারফিউম বলে বিক্রি করা হয়। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ বাহারি রংচং দেখে পণ্যের দাম করলেই আকাশছোঁয়া দাম হাঁকা হয়। দাম জিজ্ঞেসের পর গ্রাহকরা হাঁটা দিলে তাকে বাধ্য করা হয় দাম বলতে। বললে নানাভাবে হয়রানি করা হয়; সবকিছু কেড়ে নেয়া হয়। আবার সম্মানজনক দাম বললেই পণ্য দিয়ে দেয়া হয়। নকল পণ্য বুঝতে পেরে কেউ নিতে না চাইলে ব্যবসায়ী ও প্রতারক চক্র যৌথভাবে তাকে নাজেহাল করে এবং সবকিছু ছিনিয়ে দেয়। কখনো কখনো ছিনতাইকারী হিসেবে প্রচার করা হয়। আবার পণ্য ক্রয় করলেও তাকে ঠকতেই হয়। গুলিস্তানের প্রতারক চক্রের মতোই যেন বাংলাদেশে একচেটিয়া ব্যবসা করছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। সুচ থেকে শুরু করে মগ-জগ, বাস-ট্রেন সবকিছুতে ভারত একচেটিয়া ব্যবসা করছে। কিন্তু তাদের এ ব্যবসায় সততার চেয়ে থাকে প্রতারণা বেশি। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পণ্য ভাল দিয়ে লাভ কম করেন সুনাম ও বাজার ধরে রাখার জন্য। কিন্তু ভারত যেন ঢাকার গুলিস্তানের প্রতারক সিন্ডিকেটের মতোই বাংলাদেশ তাদের নি¤œমানের পণ্য সরবরাহ করে উচ্চমানের দাম নিচ্ছে। আর এতে সহায়তা করছে দেশের ভিতরের একটি সুবিধাবাদী চক্র, যারা ভারতের তাঁবেদারি করতে সদাব্যস্ত। এক. দেশের মিডিয়ায় খবরটি তেমন গুরুত্ব পায়নি।

দু-তিনটি পত্রিকায় ভিতরের পাতায় গুরুত্বহীনভাবে এবং ইনকিলাবের শেষের পাতায় নিচের দিকে ‘ভারত থেকে আনা লাল-সবুজ কোচের মান নিয়ে প্রশ্ন : প্রথম ট্রায়াল রানে গতিবেগ বাড়েনি’ শিরোনামে খবরটি ছাপা হয়। রেলওয়ের জন্য ভারতীয় বগি (কোচ) এনে প্রথম পরীক্ষায় সেগুলো খুব নি¤œমানের বলে প্রমাণিত হয়। প্রশ্ন হলো বেশি মূল্য দিয়ে ভারত থেকে নি¤œমানের রেল বগি আমদানীর নেপথ্যে কী রহস্য? আর প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রকৃত ব্যবসার মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজার ধরে রাখার বদলে গুলিস্তানের প্রতারকদের মতো ঠগবাজির আশ্রয় নিল কেন? ভারতের ঠকবাজির ফাঁদে পা দেয়ার নেপথ্যের রহস্য কী? নি¤œমানের বগি কিনে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের জন্য দায়ী কে? ব্যবসা আর প্রতারণা কি এক জিনিস? বাংলাদেশে কোচ, বাস, স্কুটার, সিএনজি, টেক্সি, টায়ার টিউব আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিসহ পরিবহন সেক্টরের একচেটিয়া ব্যবসা এখন ভারতের দখলে। এতে করে দেশীয় শিল্প হুমকীর সম্মুখীন। তারপরও ভারত নি¤œমানের পণ্য দিয়ে প্রতারণা করছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে একই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার তৈরি ১৫০ রেলবগি আমদানীর সিদ্ধান্ত হয়। ইতোমধ্যে ১৫টি বগি আমদানী করে রাখা হয়েছে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে। ওই সব বগি ঢাকা টু চট্টগ্রাম রুটের সুবর্ণ এক্সপ্রেসে সংযোজন করা হবে। ইন্দোনেশিয়ার ইনকা কোম্পানী থেকে ক্রয় করা বগিগুলো খুবই উন্নত মানের। দুই. ‘ইয়ে ইন্ডিয়াকা স্টিল হ্যায়; স্টেইনলেস স্টিল নেহি’ উক্তি করেছেন ভারতের জনৈক ইঞ্জিনিয়ার। বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ভারত থেকে আমদানী করা লাল-সবুজ কোচ (বগি) দেখে তিনি এ মন্তব্য করেন। ঢাকঢোল পিটিয়ে রেলের জন্য আমদানী করা ভারতীয় নয়নাভিরাম বগিগুলো সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপে প্রথম ট্রায়াল রানে কুপোকাত হয়। ঘন্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিবেগের কথা বলে আমদানী করা বগিগুলো ১শ কিলোমিটার বেগে চলতেই প্রচ- শব্দ হয়। বগিগুলো স্টেইনলেস স্টিলের তৈরী বলে বিক্রী করা হলেও এক প্রকারের ভারতীয় টিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। বগির ভেতরের ফ্রেমও স্টিল না হওয়ায় চুম্বক ধরলে আটকে যাচ্ছে।

ফিটিংস সুগঠিত না হওয়ায় কয়েক মাসেই নড়বড়ে হয়ে যাবে। ইলেকট্রিক ওয়ারিং করা হয় পেস্টিংয়ের মাধ্যমে। ইলেকট্রিক ক্যাবলে কোনো সমস্যা দেখা দিলে আংশিক মেরামত নয়; পেস্টিং ভেঙ্গে পুরোটাই খুলে/ভেঙ্গে মেরামত করতে হবে। এসি বগিতে এসি মেশিন আছে অথচ ফ্যান নেই। এতে বগিগুলোতে ঠান্ডা স্থায়ী না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ফ্রিজগুলোতে বোতল রাখার ক্লিপ খুবই নি¤œমানের। ট্রায়াল রানের সময় এগুলোর বেশিরভাগ নড়বড়ে হয়ে গেছে। সৈয়দপুর রেল কারখানা থেকে ১৩টি কোচ নিয়ে একটি বিশেষ ট্রেন সিরাজগঞ্জের জামতৈল স্টেশন পর্যন্ত এসে আবার সৈয়দপুরে ফিরে গেছে। ট্রায়ালেই লক্কড়ঝক্কড় মার্কা বগির লংজিভিটিও কম। ৫২২ কিলোমিটার ট্রায়াল রানের নেতৃত্ব দেন রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী ফকির মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। ভারত থেকে আমদানি করা ব্রডগেজের জন্য আমদানী করা ৪০টি লাল সবুজ কোচ আসে ২০ মার্চ ও ৪ এপ্রিল। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারকানার প্রাথমিক পরীক্ষা নিরীক্ষা ও লোড টেস্টিংয়ের পর ট্রায়াল রানে এই ত্রুটি ধরা পড়ে। পঁচা মাল (বগি) ভারতে ফেরত পাঠান না মেরামত করে চালিয়ে দেন স্টোই এখন দেখার বিষয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের কৃর্তপক্ষ কি করেন সেটা বোঝা যাবে কয়েকদিনের মধ্যেই। কারণ এই বগি ক্রয়ে কারা বখরা পেয়েছেন, কারা স্পিরিড মানি নিয়েছেন তা অজানা। তিন. চলতি বছরের প্রথম দিকে বাংলাদেশ রেলওয়ে ১২০টি নতুন যাত্রিবাহী ব্রডগেজ রেলবগি ক্রয়ের এক চুক্তি সই করে। দ্বিপাক্ষির চুক্তির ওই সভায় রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের বিদায়ী হাইকমিশনার পংকজ শরণ এবং রাইইস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজীব মেহরোতর, বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিম জোনের চীফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও প্রকল্প পরিচালক আবদুল মতিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। রেলের বগিগুলো কিনতে ব্যয় হবে প্রায় ৮ কোটি মার্কিন ডলার। রেলভবনে অনুষ্ঠিত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) মো. খলিলুর রহমান এবং ভারতের রাইটস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ভি কে জৈন। ভারতীয় ঋণ ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে এই যাত্রিবাহী বগিগুলো কেনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। ভারতের অমৃতসরের কাপুরতলা রেল কোচ ফ্যাক্টরীতে যাত্রিবাহী এই বগিগুলো নির্মাণ করা হয়।

খবরে প্রকাশ এই বগিগুলো তৈরির সময় মান পর্যবেক্ষণে বিড়াট লটবহর নিয়ে রেলেও কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার কর্মকর্তা ভারত সফর করেন। কিন্তু তারা কি নির্মাণের সময় দেখেননি স্টেইলনেসের বদলে টিন দিয়ে বগিগুলো নির্মাণ হচ্ছে? নাকি দাদাদের অতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে দেশের সঙ্গে বেঈমানী করে ভারতীয় ব্যবসায়ীক স্বার্থে বগির মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি? চার. দলীয়করণ, ঘুষ ও দুর্নীতির কারণে জনগণের ট্যাক্সে পরিচালিত দেশের সিভিল প্রশাসনে কর্মরতাদের দেশপ্রেম নিয়ে মানুষের সন্দেহ প্রবল। বিশেষ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধিদপ্তর, পরিদপ্তরগুলোতে ঘুষ ছাড়া মানুষ সেবা পায় না। ওই সব সরকারি অফিসের চেয়ার-টেবিল, ইট বালুও নাকি ঘুষ ছাড়া নড়েচড়ে না। আমজনতার মধ্যে এই ধারণা একেবারে বদ্ধমূল। দুর্নীতিবাজে প্রশাসন ভরে গেলেও এখনো কিছু দেশপ্রেমী কর্মকতা রয়েছেন প্রশাসনে কর্মরত। তারা দেশের জন্য কাজ করতে চান, দেশের স্বার্থ দেখেন এবং নীতি নিয়ে চলতে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রশাসনে দলবাজীর কারণে তারা অনেক সময় সবকিছু করতে পারেন না। আর ওএসডি হওয়ার আশঙ্কাতো রয়েছেই। ভারতের টিনের তৈরি রেলের বগি স্টেইনলেস স্টিলের বগি হিসেবে যারা ক্রয় করে দেশে এনেছেন; তারা যেমন অসততা ও অনৈতিকতার স্বাক্ষর রেখেছেন। দেশের সঙ্গে গাদ্দারী করেছেন। তেমনি যারা এই বগিগুলো ট্রায়াল রানে নিয়ে ত্রুটিগুলো ধরেছেন; বিরাগভাজন হওয়ার ভয়েও সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ করেছেন; তারা দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখেছেন। দুর্নীতিবাজরা প্রভাবশালী এবং তারা অখুশি হয়ে চাকরিচ্যুত করতে পারেন এমন আশঙ্কার পরও বিবেকের তাড়নায় ভারতীয় বগিগুলোর ত্রুটি ধরে তারা তা প্রকাশ করে দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন। এই সাহসিকতার জন্য রেলে কর্মরত ওই সব কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ইঞ্জিনিয়ার দেশবাসীর ধন্যবাদ প্রাপ্য। এরাই হলো এদেশের সূর্যসন্তান। পাঁচ. বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রচার করা হলেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক বৈষম্য পাহাড়সম। স্বাধীনতার পর মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির অনুযায়ী বেরুবাড়ি নেয়ার পর থেকে বাংলাদেশ শুধু দিয়েই গেছে ভারতকে; পক্ষান্তরে ভারত শুনিয়েছে শুধুই আশ্বাসের বাণী। সেই আশ্বাসে বিশ্বাস করে আমাদের নেতানেত্রীদের মধ্যে এখনো চলছে দিল্লী তোষণ নীতি। কখনো কখনো প্রতিযোগিতা। গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে মোট ২২টি চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায় আন্তঃযোগাযোগের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের জনগণের জন্য বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন সম্ভাবনার যুগে প্রবেশ ও অধিকতর উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার দাবি করা হয়। চুক্তিতে ভারতকে কানেকটিভিটির নামে করিডোর প্রদান, মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জায়গা দেয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চুক্তিসহ ভারতের চাওয়া সব সুবিধাই বাংলাদেশ দিয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ পেয়েছে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। মূলত বাংলাদেশের প্রাপ্তি শূন্য। বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা চুক্তির ঢোল বাজানো হলেও চুক্তি হয়নি।

বাণিজ্য চুক্তির নবায়ন করা হয়েছে, নৌপথে ট্রানজিট ও বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে সবগুলো ভারতের স্বার্থে। ভারতের ঋণের বিষয়ে সমঝোতা, বাংলাদেশের মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ভারত ব্যবহারে সমঝোতা, ভেড়ামারায় ভারতকে অর্থনৈতিক অঞ্চল দেয়ার বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ। ভারত সরকার বাংলাদেশকে ২০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়ে শর্ত দিয়েছে শতকরা কমপক্ষে ৭৫ ভাগ ভারতীয় পণ্য ও সেবা কিনতে হবে বাংলাদেশকে। সেই ঋণে পণ্য কেনা হচ্ছে ভারত থেকে। ভারতের কাছে সুদের বিনিময়ে ঋণ নিয়ে তাদের কাছে রেলের বগি কেনার এ কোন পরিণতি? ভারতের তাঁবেদারী এবং প্রশাসনিক রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু কি? ব্যবসার নামে ভারতের এই ঠকবাজির শেষ পরিণতি কি সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে রেলের যে কর্মকর্তা ভারত থেকে আমদানী করা রেলের বগির ত্রুটি ধরে প্রকাশ করেছেন, তাকে অভিনন্দন।

সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব
ছবি: বাঁশেরকেল্লা

Advertisements