feroz-kamalফিরাজ মাহবুব কামাল:  অধিকৃতি ইসলামের শত্রুপক্ষের

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা হলো, দেশটি এখন আর মুসলিমদের হাতে নেই্। ইসলাম ও মুসলিম –এ দুটি শব্দ পরিত্যক্ত হয়েছে এদেশের মূল পরিচিতি থেকে। বাংলাদেশের উপর বর্তমান অধিকৃতিটি ইসলামের শত্রুপক্ষের। মুসলিম হওয়াটি তাদের কাছে কোন গুরুত্বই বহন করে না। তারা গর্বিত ভারতপন্থি সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদী রূপে। দেশ শাসনে তারা নিজেরাও স্বাধীন নয়, তাজউদ্দীনের প্রবাসী সরকারের ন্যায় তারাও দিবারাত্র খাটছে ভারতের এজেন্ডা পালনে। তবে পার্থক্যটি হলো, তাজউদ্দীনের বসবাস ছিল কলকাতায়, আর হাসিনার অবস্থান ঢাকায়। পাকিস্তান আমলে যারা ছিল ভারতের ট্রোজান হর্স তথা গুপ্ত সৈনিক, একাত্তরের পর তারা অবতীর্ণ হয়েছে প্রকাশ্যে ময়দানে। তাদের কারণে ভারতের দখলদারিটি স্রেফ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অঙ্গণে নয়; সেটি অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক,বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় আক্বীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও।ক্ষমতাসীন জোটটি যে ভারতপন্থি সেটি তারা গোপনও করে না। ফলে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পরিচিতি এখন ভারতীয় বলয়ভূক্ত একটি আশ্রীত দেশরূপে। ফলে বাংলাদেশে বুকে ভোট ডাকাতি, সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকহত্যা বা শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যার ন্যায় গুরুতর অপরাধকর্ম ঘটলেও বিদেশীরা তা নিয়ে কিছু বলে না। তারা ভাবে এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তারা ভাবে, ঘরের চাকর-বাকর পিটানোর ন্যায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতেরও কিছু করার অধিকার আছে।

ভারতের আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে বাংলাদেশের উপর ভারতেসবীদের অধিকৃতি প্রথমে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধজয়ের ফলে। পরবর্তীতে তা বার বার নতুন জীবন পেয়েছে ভোট ডাকাতির মাধ্যমে। এ অধিকৃতির সাথে শুধু যে বাঙালী জাতীয়তাবাদী নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসী ক্যাডারগণ জড়িত –তা নয়।বরং জড়িত দেশের প্রশাসন,পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী, বিচার ব্যবস্থা,নির্বাচনি কমিশন এবং মিডিয়া। কারণ, ভারতীয় পঞ্চম বাহিনী বা ট্রোজান হর্সদের অবস্থান শুধু দেশের রাজনীতির অঙ্গণে নয়, তাদের অবস্থান সর্বস্তরে ও সর্বপ্রতিষ্ঠানে। ভারত-বিরোধী নেতাকর্মীগণ তাই লাশ হয় শুধু লগি-বৈঠা ও পিস্তলধারী রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে নয়, আদালতের বিচারকদের হাতেও। তাদের হাতে ভোট ডাকাতির নির্বাচনও সুষ্ঠ নির্বাচন রূপে বৈধতা পায়। শাপলা চত্ত্বরের হত্যাকাণ্ডে তাই রাজনৈতিক গুণ্ডাদের পাশে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও দেখা যায়। তাদের সাথে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের ভিতরে ও বাইরে কর্মরত ভারতীয় গুপ্তচরগণও -যারা কখনোই চায় না বাংলাদেশের বুকে জনগণের মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাক। সেটি চাইলে ভারত সরকার কি কখনো শেখ মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারকে সমর্থন দিত? সমর্থন দিত কি ভোট ডাকাতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শেখ হাসিনার সরকারকে? ভারত চায় না বাংলাদেশের স্বাধীনতা। চায় না, দেশটির জনগণ তাদের নিজ নিজ ধর্মকর্ম ও আক্বীদা-বিশ্বাস নিয়ে স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠুক। ইসলামের শত্রুপক্ষের সে ষড়যন্ত্র স্রেফ ১৯৭১ থেকে নয়, বরং ১৯৪৭ সাল থেকেই। তবে হাসিনার সৌভাগ্য হলো, তার পিতার ন্যায় তাকে আর চোরা পথে আগরতলায় গিয়ে ভারতীয় গুপ্তচরদের সাথে গোপন বৈঠক করতে হয় না, সে বৈঠকগুলি বসে বঙ্গভবনে বা গণভবনে।

মুসলিমদের কীভাবে দাবিয়ে রাখা যায় -সে বিষয়ে ভারতীয় শাসকগণ সিদ্ধহস্ত। সে কাজে তারা হাত পাকিয়েছে ভারত ও কাশ্মীরের মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানারূপ নির্যাতনে নেমে। ভারতে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ২০ কোটি -যা বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে জনসংখ্যার চেয়ে অধীক। অথচ একমাত্র ঢাকা বা করাচী শহরে যতজন মুসলিম ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, আইনবিদ, কৃষিবিদ, হিসাবরক্ষক, শিল্পপতি,প্রফেসর এবং সামরিক ও বেসামরিক অফিসার বসবাস করে এবং তাদের হাতে যত গাড়ী ও দালানকোঠা আছে তা সমগ্র ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের নাই। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে অন্যান্য শহরের কথা তো বাদই রইলো। সেদেশে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের স্থাপিত সাচার কমিশনের রিপোর্ট, ভারতীয় মুসলিমদের অবস্থা সেদেশের অচ্ছুৎ নমশুদ্রদের চেয়েও খারাপ। শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, পরিকল্পিত ভাবে অসম্ভব করা হয়েছে ইসলামি শিক্ষালাভ, শরিয়ত পালন এবং পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে তাদের বেড়ে উঠা।সে অভিন্ন প্রকল্পটি এখন বাংলাদেশের মুসলিমদের উপরও চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা শতকরা ৮ ভাগ হলে কি হবে বাংলাদেশের প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, মিডিয়া ও পুলিশ বিভাগের বিশাল অংশ তাদের হাতে অধিকৃত। প্রশ্ন হলো, শরিয়তী বিধান পালন ছাড়া কি পরিপূর্ণ ইসলাম পালন সম্ভব? সে ব্যর্থতা নিয়ে কি সম্ভব,মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে সত্যিকার মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়া? সেরূপ পরিচয় দানটি যে অসম্ভব সেটি সুস্পষ্ট করা হয়েছে পবিত্র কোরআনের এ ঘোষাণায়ঃ “যারা (কোরআনে) নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের। –তারা জালেম। –তারা ফাসেক।”-(সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)। তাই নামায-রোযা পালনে যেমন আপোষ করে না, তেমনি আপোষ করে না শরিয়ত প্রতিষ্ঠায়।

ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে যখন বঙ্গ বিজয় হয় তখন বাংলার মুসলিম জনসংখ্যা যখন শতকরা ১০ ভাগও ছিল না।অথচ তখনও তিনি শরিয়ত ভিন্ন অন্য কোন আইনকে আদালতে স্থান দেননি। কারণ মুসলিমের কাছে শরিয়তী আইন ভিন্ন সব আইনই কুফরী আইন, ফলে মুসলিম ভূমিতে সেগুলি অবৈধ ও পরিতাজ্য। মুসলিম যেমন নিজ ঘরে মুর্তি রাখতে পারে না, তেমনি নিজ রাষ্ট্রে কুফরি আইনও রাখতে পারেনা। তাই কোন দেশে মুসলিমগণ শাসনক্ষমতা হাতে পেলে প্রথম দিন থেকেই নামায-রোযা, হজ-যাকাতের সাথে শরিয়তী আইনেরও প্রতিষ্ঠা শুরু করে। মুসলিম হওয়ার এটি এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। সেটি না করলে ঈমান থাকে না। আর ঈমান ভেঙ্গে গেলে কি ইবাদত কবুল হয়? কবুল হয় কি দোয়া-দরুদ? ওজু ভেঙ্গে গেলে যেমন নামায হয় না, তেমনি ঈমান ভেঙ্গে গেলে কোন ইবাদত ও দোয়াদরুদও কবুল হয় না। এমন কি হজের দিনে দোয়া কবুলের স্থান আরাফতের ময়দানে গিয়ে করলেও কবুল হয় না।ঈমানহীন,আমলহীন ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারহীন ব্যক্তিগণ যদি মুসলিম হওয়ার দাবী করে তবে তারা গণ্য হয় মুনাফিক রূপে। এমন ব্যক্তির নামায-রোযা, হজ্-যাকাত, দোয়াদরুদ তাকে মুনাফিফ হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে না। ওহুদের যুদ্ধের সময় মদিনায় এমন মুনাফিকদের সংখ্যা ছিল শতকরা ৩০ ভাগ। মসজিদে নববীর জায়নামাজে তাদের চেতনা যায়নি। তারা ধরা পড়ে তখন যখন মুসলিম জীবনে ওহুদের যুদ্ধ এসে হাজির হয়। নবীজী (সাঃ) সে যুদ্ধে মদিনা থেকে এক হাজার সঙ্গি নিয়ে জিহাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন, কিন্তু তাদের মধ্য থেকে ৩০০ জন ছিটকে পড়ে। তখন ধরা পড়ে তাদের মুনাফেকী পরিচয়।নবীজী (সাঃ)র পিছনে নামায পড়ে এবং রোযা রেখেও তারা মুনাফিক হওয়া থেকে বাঁচেনি। বর্তমান সময়ে তাদের সংখ্যা যে বহুগুণ বেশী হবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

তাই যে সমাজে জিহাদ নেই সে সমাজে কে সাচ্চা ঈমানদার,আর কি মুনাফিক সেটি চেনার অন্য উপায় নেই। তখন মুসলিম সেজে ইসলাম ও মুসলিমের ভয়ানক ক্ষতি করাটা এরূপ দুর্বৃত্ত ভণ্ডদের জন্য সহজ হয়ে যায়। তারা তখন টুপিদাড়ি,মাথায় কালো পট্টি এবং হজ-ওমরাহ ও তাবলিগী এজতেমাতে গিয়ে মুসলিমদের ধোকা দেয়। এজন্যই তারা জিহাদের শত্রু। কারণ জিহাদ তাদের আসল চেহারা ফাঁস করে দেয়। জিহাদ বন্ধ করেতই এ দুর্বৃত্তগণ ইসলামের সর্বোচ্চ ইবাদতকে সন্ত্রাস বলে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলীতে ইসলামের বড় বড় ক্ষতিগুলো কাফেরদের দ্বারা হয়নি;হয়েছে এসব মুনাফিকদের হাতে। ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার নামে মুসলিম বিশ্ব যেরূপ ৫৭টি দেশে বিভক্ত -সেটি কি নবীজী (সাঃ)র সূন্নত? এটি তো মুনাফিকদের কাজ। যে কোন মুসলিম ভাঙ্গাতেই তাদের উৎসব। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে তারা ছিল পরাজিত, কিন্তু এখন তারা বিজয়ী। ফলে ভয়ানক বিপদ বেড়েছে ইসলাম ও মুসলিমের। ভাষা ও ভূগোলের নামে মুসলিমদের বিভক্ত রাখা এবং শরিয়তী বিধানকে পরাজিত রাখাই তাদের রাজনীতি। তারা সে বিজয়কে ধরে রাখার জন্য বিশ্বের তাবৎ কাফের শক্তির সাথে মৈত্রী গড়বে সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? ব্যক্তির সাচ্চা ঈমানদারি ধরা পড়ে ইসলামের বিজয়ে আপোষহীন অঙ্গীকার থেকে। মুনাফিকদের জীবনে সে অঙ্গীকার থাকে না। এ কারণেই তারা দূরে থাকে জিহাদের ময়দান থেকে। কারণ জিহাদ জান ও মালের কোরবানী চায়, স্রেফ কথায় কাজ দেয় না। ফলে জান ও মাল বাঁচানো যাদের জীবনের মূল প্রজেক্ট,তারা পরিণত হয় জিহাদের শত্রুতে। তারা তখন জোট বাঁধে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়ে। এ পথেই তারা তাদের স্বার্থ দেখে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মানব জাতির বিভাজনটি মূলতঃ তিন শ্রেণীতে। এক). ঈমানদার, দুই). কাফের, তিন). মুনাফিক।এবং মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মুনাফিকগণ গণ্য হয় কাফেরদের চেয়েও অধীকতর নিকৃষ্ট জীব রূপে। মুনাফিকদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালার ক্রোধ যে কঠোর -সেটি বুঝা যায় পবিত্র কোরআনের এ আয়াতেঃ “নিশ্চয়ই মুনাফিকদের অবস্থান হবে জাহান্নামের আগুনের সর্বনিম্ন স্তরে, তাদের জন্য জুটবে না কোন সাহায্যকারী।” –(সুরা নিসা,আয়াত ১৪৫)।তবে এ কোরআনী ঘোষণার মাঝে বিবেকমান মানুষের জন্য রয়েছে আরেকটি কঠোর হুশিয়ারি। সেটি হলো,পরকালে যাদের জন্য বরাদ্দ জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থান,দুনিয়াতেও কি তারা কোন সম্মানজনক স্থান পায়? বরং বিশ্বমাঝে তারা অপমানিত ও অসম্মানিত হয় দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে।

মুসলিম সমাজে শরিয়তের গুরুত্বটি অপরিসীম। এছাড়া কোন মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট গড়ে উঠতে পারে না। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কোন জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস নয়; নামায-রোযার ন্যায় এটি ইসলামের অতি মৌলিক ও মামূলী বিষয়। বরং শরিয়ত পালিত না হলে যে ইসলাম পালন হয় না -সেটিই হলো ইসলামের বুনিয়াদী বিশ্বাস। এমন একটি বিশ্বাসের কারণেই সিরাজদ্দৌলার আমলেও বাংলার প্রতিটি আদালতে শরিয়তী আইন ছিল। শরিয়তী আইন ছিল মোঘল শাসিত ভারতে। কিন্তু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কাফেরদের দখলদারী প্রতিষ্ঠার পর নির্মূল করা হয় শরিয়ত আইন।কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। তখন অসম্ভব হয় দ্বীনপালন। ব্রিটিশগণ ভারতের জনসংখ্যার শতকরা একভাগও ছিল না, কিন্তু ভারত জুড়ে কুফরি ব্রিটিশ আইন প্রয়োগ করতে তারা কোনরূপ বিলম্ব করেনি। অথচ তাদের অনুসারি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের দাবী,শরিয়তী আইন প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা শতভাগ মুসলিম হতে হবে। অথচ নবীজী বা খলিফায়ে রাশেদার আমলে মুসলিম ভূমিতে কি শতকরা ৮০ ভাগ মুসলিম ছিল? অথচ বাংলাদেশে শতকরা ৯২ ভাগ মুসলিম। পরাধীনতার কুফলটি গভীর। বনের সিংহকে ২০ বছর খাঁচায় বন্দী রাখার পর দরজা খুলে দিলে সে খাঁচার বাইরে যায় না। স্বাধীন ভাবে বাঁচায় ও শিকার ধরায় তার রুচী থাকে না। গোলামী জীবন এভাবে শুধু বন্দী বাঘ বা সিংহের অভ্যাসেই পরিবর্তন আনে না, পরিবর্তন আনে মানব সন্তানের বিশ্বাস, অভ্যাস ও সংস্কৃতিতেও। অথচ কাফেরদের গোলামীর খাঁচায় বাঙালী মুসলিমদের জীবন কেটেছে ১৯০ বছর।বিশ্বর খুব কম মুসলিম জনগোষ্ঠির জীবনেই এত দীর্ঘকালীন কাফের শক্তির গোলামী এসেছে। দিল্লির মুসলিমগণ গোলাম হয়েছে বাঙলীদের ১০০ বছর পর ১৮৫৭ সালে। কাফেরদের জিন্দানে এরূপ দীর্ঘ গোলামীর ফলে বাঙালী মুসলিমের জীবনে বিলুপ্ত হয়েছে পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচার রুচী এবং অভ্যাস।বিলুপ্ত হয়েছে ইসলামের সনাতন বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। বরং চেতনার গভীরে ঢুকেছে কুফরির শিকড়। এবং বিলুপ্ত হয়েছে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ। ফলে বিশ্বের কোনে কোনে আজ  যেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে চলছে অদম্য জিহাদ, বাংলাদেশে মাদ্রাসার হুজুর বা মসজিদের ইমামগণ শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কথা মুখে আনতে রাজী নয়। তারা ভাবেন নামায-রোযা, হজ-যাকাত,দোয়া-দরুদ ও তাসবিহ পাঠ এবং বড় জোর তাবলীগ জামায়াতের ইজতেমায় অংশ নেয়াই হলো ইসলাম। এবং ভাবেন, পরকালে তাতেই মুক্তি মিলবে। একই রোগ ধরেছে তাদেরও যারা ইসলামের নামে আন্দোলন বা রাজনীতি করে।শরিয়ত বা জিহাদের কথা মুখে এনে এরা বৃহৎ শক্তিবর্গকে রাগাতে চায় না। এতে বুঝা যায়, তাদের মনে মহাশক্তিমান আল্লাহর ভয়ের চেয়ে বান্দার ভয়ই অধীক। প্রশ্ন হলো, এমন ভীরু ও কাপুরুষদের জন্য কি মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর জান্নাতের দরজা খুলবেন? জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমি ক্রয়ের সামর্থ্যও কি এরূপ কাপুরুষদের আছে? জান্নাতের টিকিট তো কিনতে হয় জান ও মালের কোরবানী দিয়ে। শহীদ হওয়ার নসীব না হলে অন্ততঃ নিয়েত থাকাটি তো ফরজ। নবীজীর হাদীসঃ যারা জীবনে জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না তারা মুনাফিক। তাছাড়া শরিয়তকে দূরে সরিয়ে কি ঈমান বাঁচানো যায়? পালিত হয় কি মহান আল্লাহতায়ালার গোলামী? নবীজী ও তার সাহাবাদের জীবনে একটি দিনও কি শরিয়তী আইনের বাইরে কেটেছে? শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে বার বার তাদেরকে জিহাদের ময়দানে নামতে হয়েছে;পেশ করতে হয়েছে অর্থ ও রক্তের কোরবানী।বাংলাদেশের জন্য আরেক বিপদ হলো, বাংলাদেশ থেকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ বিদায় হলেও বিদায় নেয়নি এদেশে জন্ম নেয়া তাদের মানসিক গোলাম।

ইবাদত যেখানে অপরাধ

কাফেরদের জিন্দানে গোলাম হওয়ার নাশকতাটি বিশাল। স্রেফ নামাজ-রোযা বা হজ-যাকাতের মাধ্যমে সে ঈমান-বিনাশী নাশকতা থেকে বাঁচা যায় না। নামাজ-রোযা, হজ-যাকাত ও দোয়াদরুদের সে সামর্থ্য থাকে না বলেই অধিকৃত জীবনের নাশকতা থেকে বাঁচতে ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসক্রিপশন হলো জিহাদ। জিহাদকে এজন্যই প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ করা হয়েছে। এরূপ জিহাদে জানমালের কোরবানীর চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে উত্তম নেককর্ম নেই। পবিত্র কোরআনের তাই ঘোষিত হয়েছে,“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ভালবাসেন যারা আল্লাহর রাস্তায় সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সারি বেঁধে যুদ্ধ করে।” –(সুরা সাফ. আয়াত ৪)। অতএব যারা মহান আল্লাহতায়ালার ভালবাসা পেতে চান তাদের সামনে জিহাদ ভিন্ন অন্য রাস্তা নাই। এবং জিহাদের নির্দেশ পালনে যারা অনীহা দেখায় মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ঈমানের দাবীতে সাচ্চা বলতেও নারাজ। পবিত্র কোরআনে সে ঘোষনাটি এসেছে এভাবে,“একমাত্র তারাই মু’মিন যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আনে, অতঃপর আর কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দে ভোগে না এবং নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। (ঈমানের দাবীতে) তারাই সাচ্চা।”–(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫)।জিহাদ যে প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ এবং জিহাদ থেকে দূরে থাকা যে মুনাফেকীর লক্ষণ –অধিকাংশ মোফাচ্ছিরদের মতে এ আয়াতটি হলো তার সুস্পষ্ট দলিল। তাই ঈমানের দাবীতে কে কতটা সাচ্চা সেটি যাচাইয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত মাপকাঠিটি নামায-রোযা বা হজ-যাকাত নয়। বেশী বেশী দোয়াদরুদ পাঠও নয়। সেটি হলো জিহাদে জান ও মালের বিনিয়োগ। নামায-রোযা পালনে ও তাসবিহ পাঠে নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের জীবনে কোন রূপ কমতি ছিল না। কিন্তু এরপরও তারা শুধু নামাযী,রোযাদার বা হাজীই ছিলেন না, তাদের প্রত্যেকে সশস্ত্র যোদ্ধাও ছিলেন। সকল সঙ্গিদের রণাঙ্গনে হাজির করার ক্ষেত্রে সমগ্র মানব ইতিহাসে মহান নবীজী (সাঃ)র এটি এক অনন্য সাফল্য। বিশ্বের আর কোন নেতা কি তার অনুসারিদের সিকি ভাগকেও সশস্ত্র যোদ্ধা রূপে রণাঙ্গণে প্রাণদানে হাজির করতে পেরেছে? অথচ মহান নবীজী (সাঃ)র সাফল্য এক্ষেত্রে শতভাগ। তার এমন কোন সাহাবাই ছিল না যারা রণাঙ্গনে যায়নি। দৈহীক ও আর্থিক সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যারা যায়নি তারা চিহ্নিত হয়েছে মুনাফিক রূপে। জিহাদে ঈমানদারদের এরূপ আত্মদান ও অর্থদানের কারণেই মুসলিম ভূমি শত শত বছর যাবত বেঁচেছে কাফিরদের হাতে অধিকৃত হওয়া থেকে। মুসলিম ভূমিতো তখনই শত্রুর হাতে অধিকৃত হতে শুরু করে যখন তারা ধর্মপালনকে স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ পাঠে সীমিত করে। সে জিহাদী চেতনা বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশে আজ  অনুপস্থিত। নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলাম তাদের কাছে অজানা ও অদ্ভুদ মনে হয়। ফলে মুক্তি মিলছে না ইসলামের শত্রুপক্ষের দীর্ঘকালীন অধিকৃতি থেকেও।

স্বাধীনতার নামে অধিকাংশ মুসলিম দেশে যা চলছে তা হলো ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে দীর্ঘ পরাধীনতারই ধারাবাহিকতা। সে অধিকৃতি যে এখনো শেষ হয়নি সেটি সুস্পষ্ট ভাবে বুঝা যায় মুসলিম দেশের আদালতগুলোর দিকে তাকালে। সেখানে পূর্ণ অধিকৃতি কুফুরী আইনের। দেশের উপর মুসলিমদের দখলদারির প্রমাণ কি মসজিদ-মাদ্রাসা ও নামাযীর সংখ্যা? ভারতের ন্যায় কাফের শাসিত দেশে কি মসজিদের সংখ্যা কি কম? নামাযীর সংখ্যাও কি নগন্য? সেটি তো বুঝা যায় দেশে সার্বভৌমত্ব কোন আইনের। ঈমানদার ব্যক্তি একজন কাফের থেকে ভিন্নতর পরিচয় পায় মহান আল্লাহতায়ালা উপর তার ঈমান ও আমলের কারণে। তেমনি একটি মুসলমিমদেশ কাফের দেশ থেকে ভিন্নতর পরিচয় পায় সেদেশে শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা থেকে। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফা রূপে ঈমানদারকে শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ পাঠ করলে চলে না, তাকে অতি  গুরুত্বপূর্ণ অন্য যে দায়িত্বটি পালন করতে হয় তা হলো কোরআনে বর্নিত শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। বস্তুত সে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে প্রকাশে ঘটে মহান রাব্বুল আলামীনের উপর সাচ্চা ঈমানের।সে সাচ্চা ঈমানের বলেই  ঈমানদার ব্যক্তি হাজির হয় জিহাদের ময়দানে।যার মধ্যে ঈমানের সে গভীরতা নাই সে ব্যক্তি সারা জীবন নামায-রোযায় কাটালেই কখনোই জিহাদে হাজির হয়না। জিহাদ মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ ইবাদত। অন্য কোন ইবাদতে প্রাণ গেলে সরাসরি জান্নাত প্রাপ্তির নসিব হয়না। কিন্তু জিহাদে প্রাণ গেলে সে সুযোগ জুটে। নিহত হওয়ার পরও সে নতুন জীবন পায়। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। তাদের আমলে যত জিহাদ সংগঠিত হয়েছে তা আর কোন কালেই হয়নি। ফলে ইসলামের সমগ্র ইতিহাসে তারাই সবচেয়ে গর্বের। তাদের কর্মের উপর পবিত্র কোরআনে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এরূপ মহান মর্যাদা লাভের কারণ, ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় তাদের বিনিয়োগটি ছিল সর্বাধিক। মুসলিমগণ সেদিন বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছে স্রেফ নামায-রোযা ও দোয়া-দরুদের বরকতে নয়, সে সাথে বিশাল বিনিয়োগটি ছিল জান ও মালের।কিন্তু বাংলাদেশীদের মাঝে কোথায় সে সাচ্চা ঈমানদারী? কোথায় সে শ্রেষ্ঠ ইবাদত পালনে আগ্রহ? ইসলামের বিজয়ে কোথায় সে জানমালের বিনিয়োগ? তারা তো অর্থ ও ভোট দিয়েছে, এমন কি প্রাণ দিয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষকে বিজয়ী করতে। এবং নিজ দেশের ভিতরে ডেকে এনেছে ভারতের ন্যায় একটি কাফের দেশকে। ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে দেশ অধিকৃত হলে সাচ্চা ধর্মপালন যে কতটা অসম্ভব হয় তার প্রমাণ হলো বাংলাদেশ। ইবাদতও তখন নিয়ন্ত্রিত হয়। হক কথা বলা এবং জিহাদের ন্যায় ইসলামের শ্রেষ্ঠ ইবাদতটি তখন শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়। বরং সিদ্ধ ও প্রশংসনীয় কর্ম হয় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ইসলামের শত্রুশক্তির বিজয়ে অর্থ, শ্রম ও মেধার বিনিয়োগ।

সূত্র: শেখনিউজ.কম

Advertisements