feroz-kamalফিরোজ মাহবুব কামাল: ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

ইরাকের বুকে শিয়া,সূন্নি ও কুর্দি জনগণ ১৪শত বছর যাবত শান্তিতে একত্রে বসবাস করেছে।ধর্মীয় ফেরকার নামে মুসলিম সভ্যতার এ লালন ভূমিকে খণ্ডিত করার চিন্তা কখনোই তাদের মাথোয় আসেনি। কিন্তু ২০০৩ সালে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হওয়ার পর সেরূপ শান্তিপূর্ণ বসবাসকে অসম্ভব করা হয়েছে।মুসলিম ভূমিতে তাদের মূল এজেন্ডা তো এটিই। মুসলিমদের মাঝে পারস্পারীক ঘৃণা ও সংঘাত বাড়াতে তারা প্রতিষ্ঠা দিয়েছে গণহত্যা ও নির্মূলের রাজনীতি।ইরাক অধিকৃত করার পর পরই মার্কিনীগণ সূন্নীদের হত্যায় ও তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংসে শিয়াদের হাতে বিপুল পরিমান অস্ত্র তুলে দেয়। অস্ত্র দেয় কুর্দিদেরও। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ এভাবে মুসলিম দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বদলে গণহত্যা বাড়িয়েছে। ইরাককে তিন টুকরায় বিভক্ত করার কাজে এখন দলিল রূপে খাড়া করছে নিজেদের সৃষ্ট সে ঘৃণা ও সংঘাতকে। তারা বিভক্ত করতে চায় সিরিয়াকেও। এভাবে মুসলিম ভূগোলকে খণ্ডিত করাই ইসলামের শত্রুশক্তির স্ট্রাটেজী। তাতে যেমন লুণ্ঠনের কাজটি সহজ হয়,তেমনি ইসরাইলের নিরাপত্তাও বৃদ্ধি পায়। মুসলিম উম্মাহকে শক্তিহীন করার এর চেয়ে সফল কৌশল আর কি হতে পারে? এরাই ১৯৪৭’য়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্ররূপে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় খুশি ছিল না। দেশটি বেঁচে থাকুক -তাতেও তারা রাজি ছিল না।তাই প্রচণ্ড খুশি হয়েছে একাত্তরে দেশটির বিভক্তিতে।কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ বিগত ৬৮ বছর ধরে স্বাধীনতার লড়াই লড়ছে; সে স্বাধীনতা রুখতে সেখানে অবস্থান নিয়েছে ৬ লাখের বেশী ভারতীয় সৈন্য। ইতিমধ্যেই এক লাখের বেশী কাশ্মীরীকে তারা হত্যা করেছে এবং সেখানে ধর্ষিতা হয়েছে বহুহাজার কাশ্মীরী রমনী।এমন একটি আগ্রাসী দেশ স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ায় আগ্রহ দেখাবে -সেটি কি কোন সুস্থ মানুষ বিশ্বাস করতে পারে? বাংলাদেশ আরেকটি অধিকৃত কাশ্মীরে পরিণত হোক –সেটিই তো ভারতের লক্ষ্য। বাংলাদেশকে সেরূপ একটি কাশ্মীরে পরিণত করায় মুজিব ও তার অনুসারিদের অবদান কি কম? ভারতীয় হিন্দুগণ কি তাই মুজিবকে ভূলতে পারে? শেখ মুজিব বাংলার মাটিতে যতই ঘৃণীত হোক,এই একটি মাত্র কারণে ভারতীয়গণ তাকে হাজার হাজার বছর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। বাংলাদেশীদের জন্য নির্মম স্বৈরাচার,ভয়ানক দুর্ভিক্ষ ও লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু উপহার দিলে কি হবে,তিনিই আনন্দ বাড়িয়েছেন ভারতীয়দের। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর এতো আনন্দ ভারতীয় হিন্দুগণ আর কোন কালেই পায়নি।

পাকিস্তান ভাঙ্গার ব্পিদটি শেখ মুজিব না বুঝলেও দলটির বহু নেতাকর্মী বুঝতেন। অনেকে এমন কি ৬ দফাকেও ক্ষতিকর ভাবতেন। তাই শেখ মুজিব যখন ৬ দফা পেশ করেন,তখন পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন ১৭টি জেলার মধ্যে ১৪টি জেলার আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ দল ছেড়ে চলে যান।সেটি তুলে ধরেছেন আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুর রাজ্জাক। (মেঘনা,৪ঠা ফেব্রেয়ারি,১৯৮৭)।নিজ দলের নেতাকর্মীদের মনের সে অবস্থাটি শেখ মুজিবও জানতেন। তাই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা নিয়ে তিনি এমন কি নিজ দলের নেতাকর্মীদের সাথেও প্রকাশ্যে কথা বলেননি। তাকে এগুতে হয়েছে গোপন পথে। কায়েদে আযম মুহাম্মদ জিন্নাহর রাজনীতি থেকে মুজিবের রাজনীতির এখানেই মূল পার্থক্য।পাকিস্তান প্রস্তাবটি লাহোরের মিন্টো পার্কের মুসলিম লীগের জনসভায় পেশ করেন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা ফজলুল হক। সে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিতে সেদিন গৃহীত হয়।এরপর ১৯৪০-৪৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে প্রকাশ্যে আন্দোলন হয়েছে। গণভোটও হয়েছে।“পাকিস্তান” বলতে কি বুঝায় সেটি যেমন ভারতীয় কংগ্রেসের নেতাগণ বুঝতে ভূল করেনি,তেমনি ব্রিটিশ সরকারের মাঝেও তা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল না। কিন্তু মুজিব কখনো সে ভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের বিষয়কে জনগণের সামনে তুলে ধরেননি।জনগণের মতামতও নেননি। অথচ সেটিকে গোপন রেখে তা নিয়ে বছরের পর বছর কাজ করেছেন ভারতীয়দের গুপ্তচরদের সাথে নিয়ে।যে কোন দেশেই এমন রাজনীতিকেই বলা হয় ষড়যন্ত্রের রাজনীতি।সেটিই ছিল মুজিবের রাজনীতি।বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বাংলাদেশে আজ  যে বিতর্ক,সেটি একাত্তরের পূর্বেই শেষ হওয়া উচিত ছিল।সেরূপ বিতর্ক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১৯৪৭’য়ের আগেই সমাপ্ত করা হয়েছিল।কিন্তু ষড়যন্ত্রের গোপন রাজনীতিতে সেটি হয় না। ফলে বিলুপ্তির বদলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্ক ও সংঘাত দিন দিন আরো তীব্রতর ও রক্তাত্ব হচ্ছে।

বাঙালী মুসলিমের স্বপ্নভগ্ন

পাকিস্তানের সৃষ্টিতে ভারতের অন্যান্য মুসলিমের স্বপ্ন যাই হোক,বাংলার মুসলিমের স্বপ্নটি ছিল বিশাল। সমগ্র ভারতের মাঝে বাংলাই ছিল মুসলিম লীগের মূল দুর্গ। অন্যদের তুলনায় বাঙালী মুসলিমের অবদানটিও ছিল সর্বাধিক।সেটি যেমন ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্ম দানে,তেমনি ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগষ্ট কলকাতায় রাস্তায় হিন্দু গুণ্ডাদের হাতে হাজার হাজার মুসলিমের রক্তদানে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজপথের এরূপ চুড়ান্ত রাজনৈতিক যুদ্ধটি ভারতের অন্য কোন প্রদেশে হয়নি।কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর অকাঠ্য যুক্তিতর্ক ব্যর্থ হয় তাদের উপর প্রভাব ফেলতে।অবশেষে যু্ক্তিতর্কের রাজনীতিতে হতাশ হয়ে জিন্নাহ ঘোষণা দেন,এখন লড়াই করেই আমাদের পাকিস্তান নিতে হবে। জিন্নাহর বক্তব্যটি ছিল সুস্পষ্ট।পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না পেলে উপমহাদেশের মুসলিমদের পিষ্ট হতে হবে হিন্দুদের পদতলে –তা নিয়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মনে কোন সংশয় ছিল না। ইংরেজের গোলামী শেষ হওয়া মাত্রই তাদের জীবনে শুরু হবে আরেক নৃশংস গোলামী -যা সহজে শেষ হবার নয়।পরিস্থিতির এ মূল্যায়নটি শুধু জিন্নাহর একার ছিল না,ছিল অধিকাংশ ভারতীয় মুসলিমের।তাদের কাছে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লড়াইটি গণ্য হয় বাঁচামরার লড়াই রূপে।সে লড়াইকে চুড়ান্ত পর্যায়ে নিতে কায়েদে আযম ঘোষিত ১৯৪৬ সালের ১৬ আগষ্টের“ডাইরেক্ট এ্যাকশন” দিবসটি বাংলায় যত কঠোর ভাবে পালিত হয় সেরূপ ভারতের আর কোথাও পালিত হয়নি। এবং তাতেই পাল্টে যায় ভারতের মানচিত্র;এবং প্রতিষ্ঠা পায় পাকিস্তান।

কিন্তু বাঙালী মুসলিমের ১৯৪৭’য়ের স্বপ্নটি বাঁচেনি;সেটির মৃত্যুও ঘটে বাংলার বুকেই।সেটি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে। যে পাকিস্তানকে বাঙালী মুসলিমগণ রক্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিল,সে পাকিস্তানকেই তারা পাকিস্তানের আজন্ম শত্রু ভারতকে সাথে নিয়ে পরাজিত করে। ফলে ১৯৪৬’য়ের ১৬ই আগষ্ট যে ইতিহাস নির্মিত হয়েছিল কলকাতায়,তারই বিপরীত ইতিহাস নির্মিত হলো ঢাকায়।সেটি ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায়। পাকিস্তানের অবাঙালী সৈনিকেরা হয়তো কোনদিন ভাবতেই পারিনি পাকিস্তান বাঁচানোর যুদ্ধটি তাদের করতে হবে দেশটির জন্মভূমি বাংলার বুকে। কংগ্রেসী গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে একসময় মুজিবও কলকাতার রাজপথে ছিলেন সেটি ইয়াহিয়ারও অজানা ছিল না।সম্ভবত এ কারণেই ইয়াহিয়া খান বিশ্বাস করেছিলেন,মুজিব আর যাই হোক পাকিস্তান ভাঙ্গবে না। এমন একটি বিশ্বাসের কারণে সেনাবাহিনীর ধারণকৃত পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে মুজিবের বক্তব্যের গোপন ক্যাসেটও ইয়াহিয়ার বিশ্বাসকে হেলাতে পারিনি।এজন্যই ১৯৭১’য়ের রণাঙ্গনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি ছিল না।ফলে একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানের মানচিত্র তার নিজ জন্মভূমি পূর্ব পাকিস্তানে বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু খণ্ডিত পাকিস্তানটি যে এখনও মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে পশ্চিম পাকিস্তানে বেঁচে আছে -হয়তো তাতেই পাকিস্তানের দাবী নিয়ে ১৯৪৬’য়ের ১৬ই আগষ্ট কলকাতার রাজপথে মুসলিম লীগের ডাইরেক্ট এ্যাকশন দিবসে হাজার হাজার বাঙালী মুসলিমের প্রাণদানের বড় স্বার্থকতা। তাদের রক্তদান পুরাপুরি বৃথা যায়নি। 

বেঁচে থাকবে একাত্তর

বাঙালী মুসলিম ইতিহাসে উনিশ শ’ একাত্তর অবশ্যই বেঁচে থাকবে।বেঁচে থাকবে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ে।জ্ঞানবান মানুষেরা শুধু বিজয় থেকেই শিক্ষা নেয় না,সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি নেয় পরাজয় থেকে।পরাজয়ের মাঝেই তারা আগামী দিনের জন্য বিজয়ের সন্ধান পায়।ইতিহাসের পাঠ এজন্যই তো মানব জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।একাত্তরে বিশাল বিজয় এসেছিল ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের জীবনে।এবং পরাজয় এসেছিল ইসলামের পক্ষের শক্তির। সেদিন পৌত্তলিক ভারতের বিশাল বাহিনী ও তাদের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের সামনে পাকিস্তানের একার পক্ষে দাঁড়ানোর সামর্থ্য ছিল না।আজকের মত সেদিন দেশটির হাতে আনবিক বোমাও ছিল না।তাছাড়া এমন একটি যুদ্ধের প্রস্ততি ভারত স্রেফ একাত্তরে নেয়নি,নিয়েছিল বহু বছর আগে থেকে। তাছাড়া রণাঙ্গণে ভারতীয় বাহিনী একাকী ছিল না,তাদের পাশে ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের বিশাল বাহিনী। ফলে ঘনিয়ে আসে পাকিস্তানের পরাজয়।এবং বিজয়ী হয় শেখ মুজিব ও তার নাশকতার রাজনীতি।

পশ্চিম পাকিস্তানীরা একাত্তরের পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়েছে।তারা সেদিন বুঝেছিল, সামরিক শক্তির বিকল্প একমাত্র সামরিক শক্তিই। রাজনীতি দিয়ে সেটির মোকাবেলা করা যায় না। জনশক্তি,কৃষিউন্নয়ন বা শিল্পউন্নয়ন দিয়ে স্বাধীনতা বাঁচানো যায় না। এজন্য বিপুল অর্থ, শ্রম ও মেধার বিনিয়োগ চাই। একাত্তরের সে শিক্ষাকে সামনে রেখে বিশ্বের তাবৎ শক্তির চোখ রাঙানীকে উপেক্ষা করে তারা গড়ে তুলেছে পারমানবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার। গড়ে তুলেছে যুদ্ধ বিমান,মিজাইল ও  ট্যাংক উৎপাদনের নিজস্ব ইন্ডাস্ট্রী। ফলে পাকিস্তানে আর দ্বিতীয় বার একাত্তর আসেনি। তারা বদলা নিয়েছে একাত্তরের শত্রু সোভিয়েত রাশিয়া থেকেও। দেশটিকে আফগানিস্তানের মাটিতে পরাজিত করে ইতিহাস থেকেই বিলুপ্ত করে দিয়েছে। তাতে জন্ম নিয়েছে মধ্য এশিয়ার বুকে ৬টি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র।

প্রশ্ন হলো,একাত্তর থেকে বাংলাদেশীদের শিক্ষাটি কি? সেটি কি একাত্তরের চেতনার নামে ভারতের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণের দায়বদ্ধতা? সেটি কি সাংস্কৃতিক,অর্থনৈতিক ও আদর্শিক সীমান্ত বিলুপ্তি? আত্মসমর্পণের সে দায়বদ্ধতায় মুজিব ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন;এবং বাংলাদেশীদের গলায় পড়িয়েছিলেন গোলামীর শিকল। অথচ ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা লাভে কারো প্রতি আত্মসমর্পণের দায়বদ্ধতা ছিল না। কারো সাথে দাসচুক্তিও স্বাক্ষর করতে হয়নি। কোন বাঘকে দীর্ঘ ২৫টি বছর খাঁচায় বন্দী রেখে ছেড়ে দিলে সে বাঘ আর খাঁচা থেকে বেরুতে চায় না।স্বাধীন ভাবে বাঁচা ও শিকার ধরায় তার আর কোন আগ্রহ থাকে না। স্বেচ্ছায় খাঁচার জীবন বেছে নেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ২৫ সালা দাসচুক্তির এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। একাত্তরের যুদ্ধের ন্যায় ভারত এক্ষেত্রেও বিজয়ী হয়েছে। ফলে ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণের চরিত্রগত স্বভাবটি এখন আর শুধু আওয়ামী লীগের একার নয়। সেটি এখন অন্যদেরও স্বভাবে পরিণত হয়েছে। ফলে গুজরাতের খুনি নরেন্দ্র মোদী যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয় তখন তাকে শুধু আওয়ামী লীগই অভিনন্দন জানায় না,অন্যরাও জানায়। নিজ ধর্ম এবং নিজ বিশ্বাস নিয়ে স্বাধীন ভাবে বাঁচার খরচটি বিশাল। শুধু সরকারকে রাজস্ব দিলে,কিছু সৈন্য পাললে ও সৈন্যদের হাতে অস্ত্র তুলে দিলেই সে স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না।স্রেফ দোয়া-দরুদ পাঠেও সে স্বাধীনতা বাঁচে না। অর্থদান, শ্রমদান ও মেধাদানের পাশাপাশি দেশবাসীকে সেজন্য প্রাণদানেও প্রস্তুত থাকতে হয়।ইসলামে এটি পবিত্র জিহাদ।এমন জিহাদে প্রাণ দিলে মহান আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করেন। কিন্তু যে দেশে জিহাদ দূরে থাক, জিহাদ বিষয়ক বই নিষিদ্ধ করা হয় সে মুসলিম দেশের কি স্বাধীনতা বাঁচে?

একাত্তরে সাতচল্লিশের অখণ্ড পাকিস্তানের হারিয়ে যাওয়াটি বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের জীবনে গণ্য হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন রূপে।সে অর্জন নিয়ে বাংলাদেশীদের জীবনে প্রতি বছর সবচেয়ে বড় উৎসবটি হয়। এ উৎসবে তারা একা নয়।একই দিনে বিশাল উৎসব হয় নয়াদিল্লির শাসক মহলেও। তবে ১৬ই ডিসেম্বরে বিজয়ের বড় আনন্দটি মূলত ভারতীয় হিন্দুদের। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে আর কোন কালেই পৌত্তলিক কাফেরগণ আনন্দের এতো খোরাক মুসলিম জনগণের হাতের কামাই থেকে পায়নি।তাদের এমন বিজয় অতীতে কোন মুসলিম ভূমিতেও অর্জিত হয়নি। মুজিব ও তার অনুসারিদের প্রতি এজন্যই ভারতীয় হিন্দুগণ চিরকৃতজ্ঞ। মুসলিমের চলার পথটি সবসময়ই পবিত্র কোরআনে প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকিম বেয়ে। সেটি যেমন ধর্মকর্মের ক্ষেত্রে,তেমনি রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও। সে পথটি কখনোই সমাজের কাফের-মুশরিকদের রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির সাথে মিশে না। কারণ তাদের পথ তো দোয়াল্লীন তথা বিভ্রান্তদের পথ। যখন মিশে,তখন বুঝতে হবে নিজেদের পথটি সিরাতুল মোস্তাকীম নয়। প্রশ্ন হলো,১৪শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে আর কোন কালেই কি মুসলিমদের রাজনীতির রোডম্যাপ পৌত্তলিক এজেন্ডার সাথে এরূপ একাত্ম হয়েছে? সেরূপ গর্হিত কান্ড ইহুদীদের ইতিহাসে একবার ঘটেছিল,সেটি খন্দকের যুদ্ধকালে। মদিনার ইহুদীগণ এক আল্লাহতে বিশ্বাসী হয়েও আরবের মুর্তিপুজারি মুশরিকদের সাথে জোট বেঁধেছিল লা-শরিক আল্লাহর ইবাদতকারি মুসলিমদের নির্মূলে। অথচ তারা জানতো,মুসলিমগণ ইহুদীদের আহলে কিতাব রূপে মান্য করে। তাদের কাছে হযরত মূসা (আঃ)একজন মহান রাসূল এবং পবিত্র কোরআনে তাঁর সম্পর্কে অতি প্রশংসনীয় বর্ণনা এসেছে। ইহুদী মেয়েদের তারা নিজ ঘরে বধু হিসাবে বরণ করে। তাছাড়া মদিনার ইহুদীদের নিরাপত্তা দিতে মুসলিমগণ চুক্তিবদ্ধও ছিল। ইহুদীর ইতিহাসে অতি গভীর বিচ্যুতি ও কলংকের ঘটনা যে,তারা মুসলিমদের নির্মূলে পৌত্তলিক মুশরিকদের সাথে জোট বেঁধেছিল।

মদিনার ইহুদীদের ন্যায় মুর্তিপুজারি মুশরিকদের সাথে নিয়ে মুসলিম দেশ ভাঙ্গা, মুসলিম হত্যা ও তাদের ঘরবাড়ী লুণ্ঠনের ন্যায় গর্হিত কর্ম ঘটেছে একাত্তরে, এবং সেটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশ বাংলাতে। তবে ঘটনাটি শুধু মুসলিম দেশ ভাঙ্গা এবং বাঙালী ও অবাঙালী মুসলিমদের হত্যাতেই সীমিত থাকেনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশকে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলিতে পরিণত করা হয়েছে। চাপানো হয়েছে ভারতের চরণ তলে নতুন অধীনতা। এ পরাধীনতায় অসম্ভব হয়েছে পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। অসম্ভব হয়েছে বাংলার মুসলিম ভূমিতে ইসলামের বিজয় সাধন। ইসলামের প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকার বাড়াতে এবং সে লক্ষ্যে সংগঠিত হতে দিতেও ভারত রাজী নয়। কারণটি সহজ। ইসলামের বিজয় ও মুসলিমের শক্তিবৃদ্ধিকে ভারত নিজের জন্য বিপদ মনে করে। ফলে এ অধীনতা কি সহজে শেষ হবার? ১৯৪৭’য়ে স্বাধীনতার যে ট্রেনটি নতুন ভবিষ্যতের পথে সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছিল তা এখন অতি গভীর খাদে।বস্তুত এরূপ গভীর খাদে পড়াটাই একাত্তরের অর্জন। সে খাদ থেকে উত্থানের কি সহজ রাস্তা আছে? উদ্ধার পেলেও কি নিজ লক্ষ্যে চলার স্বাধীনতা মিলবে? স্বাধীনতা এখন শৃঙ্খলিত।

মুসলিমের যাতে কল্যাণ হিন্দুর তাতে অকল্যাণ;এবং মুসলিমের যাতে অকল্যাণ তাতেই হিন্দুর কল্যাণ –এমন চেতনাটি কি বঙ্কিম চ্যাটার্জির একার? সেটি তো অধিকাংশ ভারতীয় বর্ণহিন্দুর। এমন চেতনার বিজয় এখন সমগ্র ভারত জুড়ে। হিন্দুর কল্যাণ বাড়াতে ভারতে তাই ঘন ঘন মুসলিম-নিধন হয়। সে বঙ্কিমী চেতনার প্রবল পুজারী নরেন্দ্র মোদী এখান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এমন কি রবীন্দ্রনাথের চেতনা কি তা থেকে ভিন্নতর বা উন্নত ছিল? রবীন্দ্রনাথ তার “প্রায়শ্চিত্ত” নাটকে প্রতাপাদিত্যের মুখ দিয়ে নিজের ভাবটি প্রকাশ করেছেন এ ভাষায়,“খুন করাটা যেখানে ধর্ম,সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।” এতে তো ভয়ংকর সন্ত্রাসের সুর। এমন সহিংস চেতনা নিয়ে কি কেউ কি মুসলিমের বন্ধু হতে পারে? এমন চেতনার কারণে ভারতীয় হিন্দুগণ কোন কালেই পাকিস্তানের বন্ধু হতে পারিনি।বন্ধু হতে পারিনি ভারতীয় মুসলিমদেরও। হিন্দুদের কল্যাণ বাড়াতে পাকিস্তানের জন্মও তারা চায়নি। একাত্তরে তারা যুদ্ধ নিয়ে হাজির হয়েছিল মূলত হিন্দুস্থানের কল্যাণ নিশ্চিত করতে, সেটি কখনোই বাঙালী মুসলিমের কল্যাণ বাড়াতে নয়। এটিই হলো একাত্তরের যুদ্ধর মূল কারণ। এমন হিন্দুরা কি বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারে? একাত্তরে ভারতীয় বাহিনী লুণ্ঠনে নেমেছিল কি সে বন্ধুত্বের প্রমাণ দিতে? এমন সহিংস চেতনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে কলকাতায় মিছিলে নেমেছিলেন।অথচ সে রবীন্দ্রনাথের গান হলো বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত! ব্রিটিশের লুণ্ঠনে ছিয়াত্তেরর মনন্তর এসেছিল। আর ভারতীয় লুণ্ঠন দিয়েছিল ১৯৭৩-৭৪’য়ের ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। বিদেশীদের অধিকৃতি এভাবেই উপহার দিয়েছে বহুলক্ষ মানুষের মৃত্যু। অথচ ২৩ বছরের পাকিস্তানী আমলে বাঙালী মুসলিমের জীবনে এমন নৃশংসতা একটি বারও ঘটেনি।১৯৪৭’য়ের স্বাধীনতার এ ছিল বড় নেয়ামত। ভারতের মত আগ্রাসী দেশের আঁচল ধরে জন্মলাভের কারণে বাংলাদেশ জন্মসূত্রেই পরাধীন। ব্রিটিশের হাতে পরাধীনতায় বাংলার নদ-নদী ও জলবায়ু স্বাধীনতা হারায়নি। কিন্তু ভারতের আগ্রাসী থাবা পড়েছে সেখানেও। নির্মম হামলা হচ্ছে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর। দেশ দ্রুত পরিণত হতে যাচ্ছে মরুভূমিতে। বাঙালী মুসলিমের জীবনে তাই আজ  ভয়াবহ বিপর্যয় এবং সর্বমুখী অধীনতা। বিপর্যয় ও অধীনতার এরূপ করুণ কাহিনী নিয়ে একাত্তরের ইতিহাস শুধু বাঙালী মুসলিম ইতিহাসে নয়,সমগ্র মুসলিম ইতিহাসেও বহু হাজার বছর বেঁচে থাকবে। (সমাপ্ত)।

সূত্র: শেখনিউজ.কম

Advertisements