ইকতেদার আহমেদআমাদের দেশে দীর্ঘকাল থেকে রাজনৈতিক নেতা ও বড় মাপের অপরাধীদের ক্ষেত্রে একটি বিষয় প্রায়ই লক্ষ করা যায়। একাধিক মামলায় জামিন লাভের পর ঠিক যে মুহূর্তে তাদের কারাগার থেকে মুক্তিলাভের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ পর্যায়ে অথবা মুক্তিলাভ পরবর্তী কারাগারের মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে এসেছেন, এমন অবস্থায় তাদের অন্য মামলায় আটক দেখিয়ে কারাগার থেকে বের হতে দেয়া হয় না। অথবা কারাগারের ফটক থেকে আটক করে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এরূপ ঘটনা বড় অপরাধীদের ক্ষেত্রে ঘটলে সাধারণ জনমানুষকে এ নিয়ে কোনো ধরনের আক্ষেপ করতে দেখা যায় না। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতা বা পত্রিকার সম্পাদক এরূপ পরিস্থিতির শিকার হলে, তা সত্যিই দেশের জনমানুষের কাছে গভীর মর্মবেদনা ও অসন্তোষের কারণ হয়ে দেখা দেয়।

চলাফেরার স্বাধীনতা দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সংবিধান এ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়ার কারণে দেশের যেকোনো নাগরিক জনস্বার্থে আইনের মাধ্যমে আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বিধি নিষেধ সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধে চলাফেরার স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। একজন ব্যক্তি যেকোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হলে আইনের বিধান অনুযায়ী তাকে কারাগারে অন্তরীণ রাখা যায়। কারাগারে অন্তরীণ এরূপ ব্যক্তি আদালত থেকে জামিন পেলে তিনি অন্তরীণ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। অপরাধের ধরন বিবেচনায় জামিন বিষয়ে জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্যÑ এ দুই ধরনের শ্রেণী বিভাজন থাকলেও জামিন দেয়ার বিষয়টি বিচারকের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত; যদিও এ স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতাটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে একজন বিচারককে যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখাতে হয়।
জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে আদালত থেকে জামিন লাভ অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে একজন বিচারক জামিন নামঞ্জুর করতে চাইলে তার জন্য যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখানো অপরিহার্য। অনুরূপ জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে যেসব অপরাধের সাজা মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সেসব অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির জামিন বাতিল করা হলেও বিশেষ বিবেচনায় একজন বিচারক স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে জামিন মঞ্জুর করতে পারেন। অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তি যে ক্ষেত্রে শিশু অথবা মহিলা অথবা অসুস্থ অথবা অক্ষম এগুলোর যেকোনো একটি বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের অপরাধের দায়ে অভিয্ক্তু ব্যক্তিকে বিচারক জামিন মঞ্জুর করতে পারেন। তাছাড়া অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তি অপরাধের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলে অথবা অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে তার কার্যটি প্রকাশ্য বা স্পষ্ট না হলে অপরাধ জামিন অযোগ্য সর্বোচ্চ ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাজার অন্তর্ভুক্ত হলেও স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে একজন বিচারকের জামিন দেয়ার অবকাশ আছে। আবার যেকোনো মামলা বিচারাধীন থাকাবস্থায় বিচারকের কাছে যদি প্রতীয়মান হয়, অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন অযোগ্য অপরাধ করেছে, এটি বিশ্বাস করার মতো যুক্তিসঙ্গত কারণ অনুপস্থিত সে ক্ষেত্রে তিনি মামলার পুনঃ তদন্তের আদেশ দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজ জিম্মায় বা জামিনদারের জিম্মায় মুক্তি দিতে পারেন।
ফৌজদারি কার্যবিধিতে মামলার তদন্তকাজ কত দিনের মধ্যে শেষ করে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে, সে বিষয়ে সময় নির্ধারণ করে দেয়া না থাকলেও ধারা নম্বর ১৬৭-এর বিধানাবলি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির গ্রেফতার-পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তকাজ শেষ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আবার মামলায় এজাহার দায়েরের পর ১২০ দিনের মধ্যে তদন্তকাজ শেষ না হলে যে ক্ষেত্রে সাজা ১০ বছরের ঊর্ধ্বে নয়, সে ক্ষেত্রে একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং যে ক্ষেত্রে সাজা সর্বোচ্চ দণ্ড সে ক্ষেত্রে একজন দায়রা আদালতের বিচারক তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে জামিন মঞ্জুর করতে পারেন।
জামিন বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধিসহ অন্যান্য দণ্ডআইনে যে বিধান রয়েছে, তা অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তির দ্রুত বিচারকাজ শেষ করার ব্যর্থতায় দীর্ঘ কারাবাস অনুমোদন করে না। আর তাই যেকোনো আদালত যখন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলায় আনা অভিযোগগুলোর বিচার বিশ্লেষণপূর্বক সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে জামিন মঞ্জুর করেন, সে ক্ষেত্রে এ জামিনকে নিষ্ফল করার প্রয়াসে যখন এ ধরনের জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অন্য মামলায় আটক দেখিয়ে কারাগার থেকে বের হতে দেয়া হয় না অথবা কারাফটক থেকে পুনঃ আটক করা হয়; তা আদালতের মর্যাদা ও বিচারকের ক্ষমতাকে ম্লান করে দেয়।
জামিনের মতো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তির বিষয়ে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ রিমান্ড চাইলেও তা অনুমোদন করা ও না করা আদালতের এখতিয়ার এবং একজন বিচারকের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। একটি মামলায় একজন অভিয্ক্তু ব্যক্তিকে আটকের পর যদি তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে প্রতীয়মান হয়, মামলায় অপ্রতুল সাক্ষ্যের কারণে অভিয্ক্তু ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় আটক রেখে জিজ্ঞাসাবাদের আবশ্যকতা রয়েছে, এরূপ ক্ষেত্রে অথবা অভিয্ক্তু ব্যক্তি কারাগারে আটকাবস্থায় তাকে সেখান থেকে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের হেফাজতে এনে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রাপ্তির অভিপ্রায়ে রিমান্ডের আবেদন করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে অপরাধী ছাড়াও রাজনৈতিক রোষানলের কারণে মামলার সম্পৃক্তদের ঢালাওভাবে রিমান্ড চাওয়া ও মঞ্জুর অনেকটা প্রথায় পরিণত হয়েছে। অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তিকে রিমান্ডে নেয়ার পর তার ওপর কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নিপীড়ন সংবিধানসহ দেশের কোনো আইন অনুমোদন করে না। কিন্তু আমাদের দেশে তদন্তকারী সংস্থা ছাড়াও যৌথ জিজ্ঞাসাবাদের নামে অপরাধী ও রাজনৈতিক নেতাদের শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নসহ নাজেহাল হওয়ার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। দেশের বড় দু’টি দলের শীর্ষপর্যায়ের অনেক নেতার একদল ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় অপর দলের অথবা সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় বিরোধী সব দলের নেতাদেরকে এ ধরনের নিপীড়ন ও নাজেহালের শিকার হতে হয়েছে।
আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক জাতীয়তাবাদী চেতনা ও ভাবধারার মতাদর্শে বিশ্বাসী হলেও তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নন। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকায় উচ্চাদালতের জনৈক বিচারকের দুর্নীতির বিষয় উন্মোচন করে সংবাদ প্রকাশিত হলে তিনি এ বিচারকের রোষানলে পড়েন এবং তৎপরবর্তী ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে প্রায় তিন বছর তিনি কারাগারে আটক আছেন। কারাগারে আটকাবস্থায় একে একে তাকে ৭০টি মামলায় আসামি করা হয়। দীর্ঘ আইনি পথ পাড়ি দিয়ে এ ৭০টি মামলায় জামিন লাভ-পরবর্তী যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথ্যপ্রযুক্তি আইনে হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক তাকে প্রদত্ত জামিন বহাল রাখে, তখন তার আত্মীয়স্বজনসহ অগণিত শুভানুধ্যায়ী ও দেশের সচেতন জনমানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল যে অচিরেই তার কারামুক্তি ঘটবে। উল্লেখ্য, তাকে আটক-পরবর্তী কোনো ধরনের বৈধ কারণ ব্যতিরেকে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকাটির প্রেস তালাবদ্ধ করে দেয়ার কারণে এর প্রচার দীর্ঘ দিন বন্ধ আছে। পত্রিকাটি অন্যায়ভাবে বন্ধের কারণে এটিতে কর্মরত অনেক সংবাদকর্মী ও প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট অনেকে বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় বেতন-ভাতা ছাড়া গভীর সঙ্কটের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন। সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তার মুক্তি ঘটলে এদের দুঃখকষ্টের লাঘব ঘটত।
মাহমুদুর রহমানের আত্মীয়স্বজন, শুভানুধ্যায়ী ও দেশের সচেতন জনমানুষ যখন তার মুক্তির প্রহরের অপেক্ষায়, তখন অকস্মাৎ জানা গেল তাকে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে শাহবাগ থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের অধীন দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
আমাদের দেশে মামলর এজাহারে নাম না থাকা সত্ত্বেও কারাগার থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে এ ধরনের মামলায় আটক দেখানো এবং রিমান্ডের আবেদনের কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে দীর্ঘ দিন কারাগারে আটক ব্যক্তিদের দুর্ভোগ, যন্ত্রণা ও হয়রানির ইতি টানতে গিয়েও বাধার মুখে পড়ছে। আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে সব মামলায় জামিন-পরবর্তী পুনঃ আটক দেখানোর দু’একদিন আগে ঢাকার মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে বলতে শোনা গেছেÑ জামিন-পরবর্তী অন্য মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্তকরণ ও আটক দেখানো ঘটনার যাতে অবসান হয় সে বিষয়ে তিনি সচেষ্ট থাকবেন। কিন্তু মাহমুদুর রহমানের ঘটনা দিয়ে প্রমাণ হয় সচেষ্ট থাকার ব্যাপারে তার ঐকান্তিক আগ্রহ থাকলেও অন্য কোনো স্থান থেকে সুতার টানের কারণে তার সে আগ্রহের প্রতিফলন অন্তত মাহমুদুর রহমানের ক্ষেত্রে ঘটেনি।
আমাদের দেশে যেকোনো ব্যক্তির মামলা সংশ্লেষে গ্রেফতার-পরবর্তী তাকে যদি সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত যেতে হয়, তাতে প্রতিকার লাভের আশায় কী পরিমাণ কাঠখড় পোড়াতে হয় সে বিষয়ে এ দেশের মানুষের সম্যক ধারণা রয়েছে। এর পরও একজন ব্যক্তির কারান্তরীণ থেকে মুক্তি লাভ যদি দূরের কোনো সুতার টানে অন্য মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্তি ও আটক দেখানোর কারণে বাধগ্রস্ত হয় তা সমগ্র বিচার ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে ন্যায়ের বিপক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করে।

ইকতেদার আহমেদ
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

iktederahmed@yahoo.com
সূত্র: নয়াদিগন্ত

Advertisements