96503_222এক. ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা ট্র্যাজেডির সপ্তম বর্ষপূর্তি। ২০০৯ সালের এই দিনে বিদ্রোহের নাম দিয়ে গণহত্যা করা হয়েছিল ৫৭ সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে। এই ঘটনায় গত ছয় বছরে অসংখ্য মামলা করা হয়েছে। বিচার করে সাজা দেয়া হয়েছে অনেককে। খালাস পেয়েছে বহুসংখ্যক আসামি। জেলখানায় মারা গেছেন অনেকে। কিন্তু শুধু সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়ার কারণে পরিকল্পিতভাবে করা এই হত্যাযজ্ঞটি সাধারণ কোনো ফৌজদারি নরহত্যার অপরাধের সংজ্ঞাভুক্ত হতে পারে না। বরং এটা সুস্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক আইনের ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যার অপরাধ। অথচ আমরা এ গণহত্যাকে শুধু বিডিআর আইন এবং প্রচলিত ফৌজদারি আইনে বিচার করেছি। আর এটা করতে গিয়ে ন্যায়বিচারকেই যেন বন্দী করে ফেলেছি বিলম্বিত বিচারপ্রক্রিয়া এবং বিচারিক সীমাবদ্ধতার আইনি বেড়াজালে। অথচ ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজ্যুলেশন ২৬০(৩) বলছে, কোনো গোষ্ঠীকে সম্পূর্র্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াসের নামই হচ্ছে গণহত্যা। এই অনুচ্ছেদে পরিকল্পিতভাবে কোনো গোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য তাদের সদস্যদের হত্যা কিংবা শারীরিক বা মানসিক ক্ষতিসাধন করাকেও গণহত্যা বলা হয়েছে। তাই শুধু সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়ার অপরাধে তাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সংঘটিত এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি গণহত্যা কনভেনশন মতে সুস্পষ্টভাবে গণহত্যার অপরাধ। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে পিলখানার বর্বরোচিত গণহত্যাকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদলে ‘রেকট্রোস্পেকটিভ এফেক্ট’ বা ‘আইনের ভূতাপেক্ষা বলবৎকরণের’ মাধ্যমে ‘গণহত্যা ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের আইন আমাদের সংবিধান পরিপন্থী হবে না বলে সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে নিশ্চয়তা দেয়া আছে। সেই সাথে আমাদের সংবিধানের ৪৭ক অনুচ্ছেদ মোতাবেক এই আইনে আগের যেকোনো সময়ের সংঘটিত অপরাধের বিচার ’রেকট্রোস্পেকটিভ এফেক্টে’ করা যাবে। এমনকি এসব ঘাতক সংবিধানের অধীনে কোনো প্রতিকারের জন্য উচ্চ আদালতে কোনো ধরনের আবেদন করার যোগ্যতাও হারাবে বলে সংবিধানের ৪৭ক(২) অনুচ্ছেদে নিশ্চয়তা দেয়া আছে। তাই এসব গণহত্যাকারীর দ্রুত বিচার নিশ্চিত ও সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের একমাত্র বিকল্পই হচ্ছে ‘গণহত্যা ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা। অন্য আরো অনেক বিকল্প হয়তো আছে, তবে সেগুলোও বরাবরের মতোই দীর্ঘমেয়াদি আইনি অন্ধকারে হারিয়ে যাবে বলে দৃঢ় আশঙ্কা রয়েছে।

দুই. বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোনো সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য, বা অন্য কোনো ব্যক্তি, ব্যক্তি সমষ্টি বা সংগঠন কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক, ফৌজদারিতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান-সংবলিত কোনো আইন বা আইনের বিধান এই সংবিধানের কোনো বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা তাহার পরিপন্থী, এই কারণে তা বাতিল বা বেআইনি বলিয়া গণ্য হইবে না কিংবা কখনো বাতিল বা বেআইনি হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে না।’ যার ফলে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনকে সংশোধন করতে আমরা দেখেছি। এমনকি আবদুল কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার পরও ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে ১৯৭১ সালের সংঘটিত অপরাধকে ’রেকট্রোস্পেকটিভ এফেক্ট’ বা ভূতাপেক্ষা কার্যকারিতা দেয়া হয়। পরে এই আইন সংশোধন করে সংশোধিত বিধানের কার্যকারিতা ২০০৯ সাল থেকে বলবৎ করা হয়। আর এসবই করা হয়েছে সংবিধানের বর্ণিত ৪৭(৩) অনুচ্ছেদ বলে। যদিও আমাদের সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্টত বলা আছে, অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ আইনে দণ্ড ছাড়া কাউকে ভিন্ন কোনো দণ্ড দেয়া যাবে না। কিন্তু গণহত্যা কিংবা যুদ্ধাপরাধের কারণে সংবিধানের ৪৭ক(২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক এসব অপরাধীর সংবিধানের আওতায় কোনো প্রতিকার পাওয়া, এমনকি মৌলিক অধিকারপ্রাপ্তি পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা হলে প্রশ্ন জাগে, ঠিক একইভাবে পিলখানায় সংঘটিত সশস্ত্র, প্রতিরক্ষা বা সহায়ক বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপারে অর্থাৎ সহায়ক বাহিনী হিসেবে বিডিআরের সদস্যদের করা; সেনাকর্মকর্তাদের গণহত্যার অপরাধটিও বিদ্যমান আইনটির সংশোধন করে পেছনের দিকে কার্যকর বা বলবৎ করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা যাবে না কেন?

তিন. পিলখানার সেনাহত্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। পরিকল্পিতভাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শুধু সেনাবাহিনীর সদস্য ও তাদের পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে চালানো হয় এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিডিআর সদর দফতরে সকাল ৯টায় যখন দরবার বসেছিল তার আগেই পরিকল্পনামাফিক পিলখানার ভেতরে একদল বিডিআর সৈনিক ঢুকে পড়ে। তাদের একজন বিডিআর মহাপরিচালকের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে। এরপরই সব সেনাসদস্যকে নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করা হয়। পুরো পিলখানায় এক ভীতিকর বীভৎস নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। আক্রমণকারীরা পরিকল্পনামাফিক অস্ত্রগুদাম খুলে সদর দফতরের চারটি প্রবেশ গেটে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়তে থাকে। অথচ পরিকল্পিতভাবেই সেদিন নিরস্ত্র সেনা অফিসারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণকে বিদ্রোহের নাম দেয়া হয়েছিল, যা স্বল্প সময়ের মধ্যেই সদর দফতরের অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়ে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সুবাদে সেদিন স্পষ্টত দেখা গেছে, লাল কাপড় মাথায় বাঁধা হত্যাকারীরা কিভাবে দৌড়াদৌড়ি করেছে। সংবাদমাধ্যমে এমনও খবর বেরিয়েছে যে, এ ঘটনার সাথে ইউনিফর্ম পরিহিত নয় এমন কিছু মানুষও যোগ দিয়েছিল। বাইরে থেকে গাড়ি প্রবেশের কথাও বলা হয়েছে। রক্তাক্ত বিদ্রোহের নাম দিয়ে এভাবে গণহত্যা করা হয়েছিল ৫৭ সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে। পিলখানা মুহূর্তেই পরিণত হয় এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। আবিষ্কৃত হয় গণকবরের। এত লাশ আর ধ্বংসযজ্ঞ দেখে সমগ্র জাতি শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। সমাজের সর্বস্তর থেকে দোষীদের বিচারের দাবি ওঠে। বিদ্রোহের বিচারের এসব মামলায় অভিযুক্ত বিডিআর সদস্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। একই সাথে রহিত হয়ে যায় ১৯৭২ সালের বিডিআর আইন। নতুন আইনে বর্তমানে শৃঙ্খলাবিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ডে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আইনে বিচার করা হবে বাহিনীর সদস্যদের। আর আইন সংশোধন করে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এসবই করা হয়েছে ভবিষ্যতে অনুরূপ কোনো অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য। আর ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সদর দফতরে যা ঘটে গেছে তার জন্য করা হয়নি আইনের সংশোধন!

চার. বিডিআর ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে বিডিআরকে করা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বিডিআর নামেই পরিচিত ছিল বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। ২০০৯ সালের বিদ্রোহ ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর বিডিআর আইন পরিবর্তনের দাবি ওঠে। সংসদে এ নিয়ে বিল ওঠার পর কণ্ঠভোটে তা পাসও হয়। এর আগে পরিবর্তিত হয়েছে বাহিনীর পোশাক। নাম ও পোশাক পরিবর্তনের পাশাপাশি বিদ্রোহের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এ আইনে। ১১২ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে এক বা একাধিক বর্ডার গার্ড আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবে এবং তিন সদস্যবিশিষ্ট ট্রাইব্যুনালে একজন সভাপতি ও দু’জন সদস্য থাকবেন। মহাপরিচালকের অনুপস্থিতিতে ন্যূনতম উপমহাপরিচালক পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালের সভাপতি হবেন এবং পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা সদস্য হবেন। এ ছাড়া বাহিনীর কার্যাবলি, ক্ষমতা ও দায়িত্ব আরো বিস্তৃৃত ও সুস্পষ্ট করা হয়েছে। সুযোগ রাখা হয়েছে জুনিয়র কর্মকর্তাদের পদোন্নতির। বাকস্বাধীনতা, সংগঠন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বিধান আগে ছিল না, বর্তমান আইনে তা রাখা হয়েছে। কিন্তু ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সদর দফতরে সংঘটিত নৃশংসতম গণহত্যার জন্য সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদের আওতায় বিদ্যমান পেছনের ঘটনাকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। ফলে আইন-কানুনসহ সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করা হয়েছে ঠিকই; তবে এসবই করা হয়েছে শুধু ভবিষ্যতের কোনো অপরাধের জন্য। পিলখানার হতভাগা নিহত সেনাদের ভাগ্যে এসব আইনের কোনো সুফল জুটবে না কখনো!

পাঁচ. শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে একসাথে এত সেনাকর্মকর্তার হত্যার কোনো নজির নেই। পরিকল্পনামাফিক পিলখানার এই হত্যাযজ্ঞকে মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সারা দেশের ৫৭টি ইউনিটে। কোনোরকম পূর্বপরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র ছাড়াই কী করে বিডিআরের সাধারণ সৈনিকেরা আচমকা তাদের সাধারণ কিছু পেশাগত দাবি-দাওয়ার কারণে এভাবে বেছে বেছে সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারের লোকজনকে নিমর্মভাবে হত্যা করতে যাবে? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে? কারা এর পরিকল্পনাকারী, কারা ষড়যন্ত্রকারী, আর কারাই বা উসকানি বা মদদদাতা, এত দিনেও কেন আমরা তাদেরকে খুঁজে বের করলাম না? এদের বিরুদ্ধে কি কোনো তদন্ত করা হয়েছে এত দিনে? আইনের অপ্রতুল শাস্তি দিয়ে আর ৪০ হাজার পৃষ্ঠার নথি তৈরি করে কি আমরা এই গণহত্যার সুবিচার করতে পেরেছি? স্বয়ং আদালত তার রায়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, এখানে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ছিল চরমভাবে দৃশ্যমান। রায়ে আদালতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল গোয়েন্দা ব্যর্থতা। রায়ের পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হেয়প্রতিপন্ন করতে এবং সামরিক বাহিনীতে যোগদান নিরুৎসাহিত করতে এমনটি করা হয়েছে।’ তা ছাড়া মামলার তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দী-জেরায় প্রকাশ, এই বিদ্রোহ ও গণহত্যার মূল হোতারা পলাতক। এরা পরিকল্পনামাফিক দেশত্যাগ করেছে। এদের হদিসও কেউ জানে না।

ছয়. বকশীবাজারের আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতে রায় ঘোষণার পর নিহত সেনা পরিবারের স্বজনেরা নতুন করে তদন্তের দাবি করাতে এটা স্পষ্ট যে, সংক্ষুব্ধ পরিবার ন্যায়বিচার পায়নি। নিহত লে. কর্নেল লুৎফর রহমানের মেডিক্যালে পড়–য়া মেয়ে ফাবলিহা বুশরার আক্ষেপ ‘বাবা অফিসে গেলেন আর ফিরে এলেন না। মর্গে গিয়ে আমরা তার মৃতদেহ খুঁজে পেলাম। বিচার হলো, কিন্তু জানতে পারলাম না কারা, কেন তাকে খুন করেছে। আমার মতো সবার বাবাকে কিভাবে মারা হয়েছে, আমরা তা জানতে চাই।’ নিহত কর্নেল মুজিবুল হকের স্ত্রীর আকুতি ‘শহীদ সেনাকর্মকর্তাদের পরিবারের ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। ওরা খুঁজে বেড়াচ্ছে, কেন ওদের বাবাকে হত্যা করা হলো। সন্তানেরা হত্যাকারীদের সম্পর্কে জানতে চায়।’ নিহত সেনা পরিবারের দাবি, ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণার। দিনটিকে শহীদ সেনাদিবস ঘোষণা করার। পাঠ্যপুস্তকে এই ঘটনা যুক্ত করার। একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবিও উঠেছে। নিহত সেনা অফিসারদের মরণোত্তর বীরত্বের পদক দেয়ার জন্যও তারা সরকারকে অনুরোধ জানায়। কিন্তু সব দাবি ছাপিয়ে সবার যেন একটাই চাওয়া। তা হলো, এ ঘটনার পেছনের কুশীলব কারা তা উদঘাটন করা। এই জানতে চাওয়াটা শুধু শহীদ পরিবারের সন্তানদের একার নয়। দেশবাসীও জানতে চায় প্রকৃত অপরাধী কারা? এই গণহত্যার পেছনের রাঘব-বোয়ালদের উন্মোচিত মুখোশগুলোকে দেখতে চায় দেশের মানুষ।

সাত. জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান দেশপ্রেমিক সেনারা আমাদের গর্ব, অহঙ্কার আর সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ১৬ কোটি মানুষের চরম আস্থা, বিশ্বাস, সংহতি আর নিরাপত্তার প্রতীক। অথচ তাদেরকেই আমরা নিরাপত্তা দিতে পারলাম না! কিন্তু এখন যদি তাদেরকে ন্যায়বিচারও না দিতে পারি, তা হলে এর দায় বহন করবে কে? আর এখন তো দেখছি ন্যায়বিচারটাও গৌণ আর রাজনীতিটাই মুখ্য হয়ে পড়েছে। নিহতের অসহায় পরিবারকে জোর করে রাজনীতির খেলায় অংশ নিতে বাধ্য করা হলো, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেত্রীর উচ্ছেদ করা বাসভবনে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়ে। নিহতের প্রতিবাদী সহকর্মীদের অবস্থাও সবার জানা। অসংখ্য রাজনৈতিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। এর সাথে অনেক অনাকাক্সিক্ষত মিথ জন্ম নিয়েছে। সত্য-মিথ্যা-গুজব সব মিলিয়ে চাপা পড়ে আছে সহস্র্র প্রশ্নের উত্তর। অসংখ্য আঙুল তাড়া করে ফিরছে অনেকের সেই সময়কার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে। সাধারণ মানুষের মনেও হাজারো জিজ্ঞাসা। রাজনৈতিক বিভাজিত সমাজে একে অন্যের সম্পৃক্ততাও খুঁজে বেড়াচ্ছে। শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও রয়েছে চরম হতাশা। তবে অপরাধ বিজ্ঞানের সাধারণ সূত্র মতে, কোনো ঘটনার সুবিধাভোগীরাই সন্দেহের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তাই আমাদের সেনাবাহিনী, বিডিআর কিংবা আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী কিংবা আমাদের সীমান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হলে কারা সুবিধাভোগী সেই সমীকরণ খুঁজতে ব্যস্ত অনেকে। তবে সবার আগে পর্দার পেছনের নাটের গুরুদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাটাই হচ্ছে ন্যায়বিচারের প্রধান শর্ত। আর এই অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত ও সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের একমাত্র বিকল্পই হচ্ছে অবিলম্বে ‘গণহত্যা ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
e-mail : drtuhinmalik@hotmail.com

সূত্র: নয়াদিগন্ত

Advertisements