983832_911713852175162_535642583081219257_nবাংলাদেশের চলচ্চিত্র যাদের হাত ধরে সসম্মানে বুক চিতিয়ে সামনে চলা শুরু করে, তাদের মধ্যে প্রথম যে দু’জনের নাম আসে, তাদের একজন সুচন্দা অন্যজন ববিতা। তারা দুই বোন। সুচন্দার আসল নাম কহিনুর আক্তার আর ববিতার আসল নাম ফরিদা আক্তার। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে তারা পুষ্ট ও উজ্জীবিত করে তুলেছেন তাদের সব ভালোবাসা, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে। বাংলাদেশে চলচ্চিত্রকে যেমন আন্তর্জাতিক বিশ্বে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি তারাও হয়েছেন চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে নন্দিত, তাদের ভালোবাসায় হয়েছেন অভিষিক্ত। অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি।

আন্তর্জাতিকভাবে হয়েছেন পুরস্কৃত। সেই সুচন্দা-ববিতা নিউইয়র্কে ঠিকানা পত্রিকাকে এক ব্যতিক্রমধর্মী সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ৮ ডিসেম্বর বুধবার বাজারে আসা চলতি সপ্তাহের ঠিকানায় তা ‘জহির ও যুদ্ধের অনেক কথা রেকর্ড করে যাবো মৃতুর পর সবাই জানবে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপ এখানে উপস্থাপন করা হলো।

‘যারা এখন বড় বড় কথা বলেন, নিজেদের বড় বড় নেতা মনে করেন, তাদের কীর্তি কাহিনী, কলকাতায় কে কী করেছিল, তার ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে। তাদের মুখোশ আমি খুলে দেবো: জহির রায়হান’

একই প্রশ্নে একজন আরেকজনের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেছেন সুচন্দা ও ববিতা। চলচ্চিত্রের একাল-সেকাল, পারস্পরিক সহমর্মিতা, ভালোবাসা, পারিবারিক বন্ধন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তারা। বলেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাণপুরুষ সুচন্দার স্বামী জহির রায়হানের রহস্যময় অন্তর্ধান নিয়ে অনেক অজানা কথা। সুচন্দা গভীর আবেগ নিয়ে বলেন, জহির যখন বেঁচেছিল তখন আমাকে পাশে বসাতো স্ক্রিপ্ট লেখার সময়। একটি পাতা লেখা হলে সাথে সাথে তা আমাকে দেখাত। আমি আবার মোটামুটি বাংলায় ভালো ছিলাম। আমার আম্মাও বাংলায় লেখালেখি করতেন। সেখান থেকেই আমার বাংলা লেখালেখির প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহের সৃষ্টি হয়। আমি যখন দু-একটি জায়গায় একটু পরিবর্তন করে দিতাম, তখন জহির বলত, তোমার তো ভালো আইডিয়া আছে, ভালো বুঝতে পার। বিশেষ করে ডায়ালগ ও স্ক্রিপ্ট। এক সময় জহির বলল (যুদ্ধের ঠিক আগে), ঠিক আছে আমি একটি কাজ করব, আমি দেবদাস গল্পটার চিত্রনাট্য করে দেবো তুমি পরিচালনা করবে। তখন আমার সন্তানরা ছোট, আমি বললাম, এত আগে আমি পরিচালনায় আসব না, আমার আরো অভিজ্ঞতা হোক। তার পরপরই যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জহিরের সাথে আমরা কলকাতা চলে গেলাম। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জহির আমাদের রেখেই স্পেশাল ফ্লাইটে বাংলাদেশে চলে এলো ছবি তৈরি করার কথা বলে। ছবিটি করার কথা দেশ স্বাধীনের ওপর ভিত্তি করে। তার কাছে অসংখ্য ক্লিপ ছিল। এর মধ্যে কিছু কিছু প্রচার করে সে সারা বিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছিল। যা-ই হোক, জহির আসার সময় বলেছিল আমাদের দুই দিন পর এসে নিয়ে যাবে। দুই দিনের কথা বলে এসে প্রায় ১৫ দিন তার কোনো খবর নেই। আমাদের ঘরে খাবার নেই, অর্থ নেই, খুবই করুণ অবস্থা। আমাদের পাশেই থাকতেন আলমগীর কবীর। তিনি আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এলেন সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলেন, আমাদের দেখাশোনা করেছিলেন। আমরা পরে শুনলাম জহিরের বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেছে। ভাইকে নিয়ে তিনি ব্যস্ত। বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করছেন, খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করছেন। ভাইকে খুঁজতে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের কথা তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন। ও তো কাজপাগল মানুষ ছিল, অনেকটা আত্মভোলার মতো। কাজের সামনে স্ত্রী-সন্তান তার কাছে বড় ছিল না। অবশেষে ১৬-১৭ দিন পর আলমগীর কবীর সাহেব আমাদের জন্য প্লেনের টিকিট কেটে দিলেন। আমরা বাংলাদেশে এলাম। আসার কয়েক দিন পর বাংলাদেশে থেকে আমরা আবার কলকাতায় গেলাম। কলকাতা থেকে আসার পর বাসায় মিথ্যা টেলিফোন করে, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে জহিরকে নিয়ে যাওয়া হলো। জহির কিন্তু আমাদের কিছুই বলত না। আমি উপরে থাকতাম, জহির নিচে লোকজনদের নিয়ে প্ল্যান করছে, কী করা যায়। জহিরকে নিয়ে যাওয়ার পর সে আর ফিরে আসেনি। এমনকি তার মৃতদেহও আমরা পাইনি।

ঠিকানাঃ কাউকে কি সন্দেহ হয় বা অন্য কিছু মনে হয়?

সুচন্দাঃ কিছু না কিছু মনে তো হয়ই। আজ পর্যন্ত আমি এ বিষয়টি বলিনি এবং এখনো বলতে চাই না। যে বিষয়টি আড়ালে রয়ে গেছে, আমি তাকে মনের অন্তরালেই রাখতে চাই। কারণ সব কথা সব সময় বলা যায় না, বললে অনেক সময় বিপদ এসে যায়। যে বিপদটা জহিরের জীবনে এসেছিল। জহির বেঁচে থাকা অবস্থায় সর্বশেষ প্রেস ক্লাবে দাঁড়িয়ে এক বক্তব্যে বলেছিল ‘যারা এখন বড় বড় কথা বলেন, নিজেদের বড় বড় নেতা মনে করেন, তাদের কীর্তি কাহিনী, কলকাতায় কে কী করেছিল, তার ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে। তাদের মুখোশ আমি খুলে দেবো।’ এ কথা জহির মুখ দিয়ে প্রকাশ্যে বলার পরই তার ওপর বিপদ নেমে আসে। এ বলাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।

ববিতাঃ (সুচন্দার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) জহির ভাইকে বলা হলো যে, তোমার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার জীবিত আছে, মিরপুর ১১ নম্বর সেক্টরে চিলেকোঠার একটি বাড়িতে রাখা হয়েছে, তার দুটো চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে, তবে সে জীবিত আছে। তুমি যে তোমার ভাইকে উদ্ধার করতে যাচ্ছ, এটি তোমার মা, স্ত্রী ও আত্মীয়দের বলবে না।

সুচন্দাঃ জহির যখন যায় তখন দু-তিনটি স্মৃতি আমার মনে এখনো গেঁথে আছে যেটি কোনো দিনই ভুলার নয়। ভুলতে পারব না। আমি বুঝতেই পারলাম না যে আমি আমার স্বামীকে হারিয়েছি। আমার মনে হচ্ছে এখনই সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে এসে আমাকে ডাকবে সুচন্দা, দরজা খোল, আমি এসেছি। এভাবেই কেটে গেল অনেক দিন। আমার মনেই হয় না জহিরকে কেউ মেরে ফেলবে, জহিরকে কে মারবে? জহির মরতেই পারে না। জহির রায়হানের মতো লোককে তো কেউ মারতে পারে না। কারণ বাংলাদেশের সবাই জহির রায়হানকে চেনে।

ববিতাঃ জহির ভাই যে দিন বাসা থেকে বের হয়ে যান সেই দিন একজন ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার জহির ভাইয়ের সাথে ছিল এবং সেই দিন রাতে আমাদের বাসায় ডিনার ছিল। ওই ব্রিগেডিয়ার আমাদের ফোন করে জানাল স্যরি, তোমাদের ডিনারে যাওয়া হচ্ছে না। আমি জহিরের সাথে যাচ্ছি।

সুচন্দাঃ এ রকম নয়। ঘটনার দিন সকালে আমাদের বাসায় একজন লোক এলো। খবরটি জহিরকে দিতেই সে তড়িঘড়ি করে নামাজ পড়ে নিচে নেমে গেল। সেই সময় আমি নাশতা তৈরি করে নিয়ে এলাম। জহিরকে নাশতা করতে বললাম। সে বললঃ আমার সময় নেই। জুতা পরছিল। আগেই বলেছি, জহির একটু আত্মভোলা ছিল। জামা-কাপড়ের প্রতি তার কোনো খেয়াল ছিল না, সব সময় তাকে আমার জামা-কাপড় দিতে হতো। বলতে হতো এটা পরো, ওটা পরো। জুতা পরার সময় আমি বললাম, তোমার মোজা তো ময়লা হয়ে গেছে, এটি খুলে রেখে যাও। সে আমার কথা শুনল না। বলল না না, আমি এখন যাই। আমি আসার পর তুমি এটি ধুয়ে দিও। জহির দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে চলে গেল, আমি তার পায়ের আওয়াজ পেলাম। ২ মিনিট পর সে আবার ফিরে এলো এবং আমাকে বলল সুচন্দা, আমাকে কিছু টাকা দাও তো। কারণ তার কাছে কখনো টাকাপয়সা থাকত না। টাকাপয়সা সে সব সময় তার ভাই বা তার ফ্যামিলি মেম্বারদের কাছে রাখত। আমাকে বলল আমার কাছে তো টাকা নেই। আমি তখন আলমারি খুলে তাকে টাকা দিলাম। ওই দিন বাংলাদেশে ভারতের বিখ্যাত অভিনেত্রী নার্গিস, ওয়াহিদা রহমান, লতা মুঙ্গেশকরসহ অনেক বড় বড় শিল্পী এফডিসিতে এসেছিলেন। হাসান ইমাম সাহেব ফোন করলেন। আমাকে ফোন করে বললেন ম্যাডাম, জহির ভাই কোথায়? আমি বললাম জহির নেই, সে বাইরে গেছে। তখন তিনি আমাকে বললেন, জহির ভাই না হলে তো হবে না। তবে উনি যেহেতু নেই, আপনাকে তো অবশ্যই আসতে হবে। এত বড় বড় শিল্পী এসেছেন আপনি ও জহির ভাই না এলে কেমন দেখায়? শহীদুল্লাহ কায়সারকে আমি বড়দা বলতাম। এ পরিস্থিতিতে আমারও খারাপ লাগছে বড়দা নেই। জোরাজুরি করার পর অগত্যাই আমি গেলাম। সেখান থেকে আসার পর আমি দেখলাম সবাই বসে আছে। টেলিফোন সামনে। আমি বাসার লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের মেজদা কোথায়? তারা বলল, মেজদা তো মিরপুরে গিয়েছিল, আমাদের তো সাথে নেয়নি। মেজদার তো এখন কোনো খোঁজ নেই। আমি বললাম মেজদার খোঁজ নেই মানে? তারা আমাকে ফোনে ধরিয়ে দিলো মিরপুর থানা। টেলিফোনের ওই প্রান্ত থেকে জানাল ধরুন, একজনকে দিচ্ছি। ফোনে মেজর মইন ও মেজর মতিউর রহমান দু’জন জানালেন আপনি একটু পর ফোন করেন। কারণ আমাদের দরকারি টেলিফোন এসেছে। আমি বললাম, ঠিক আছে। তার কিছুক্ষণ পর আমি আবার ফোন করলাম। তারা তখন জানাল উনি তো অপারেশনে আমাদের পুলিশ-আর্মির সাথে ভেতরে ঢুকেছেন, কিন্তু ওইখানে একটু গণ্ডগোল হয়েছে, গুলিগালা হয়েছে, উনাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি বললাম কী বলেন? উনাকে পাওয়া যাচ্ছে না মানে? তারা আরো জানাল আমাদের অনেক লোক উন্ডেড হয়েছে এ কথা বলেই টেলিফোন রেখে দিলো। আমি পরে মেজর মইন ও মতিউর রহমানের সাথে দেখা করতে যাই। তাদের কাছে জানতে চাই জহির কোথায় গেল, কীভাবে গেল? উনারা এসব প্রশ্নের কোনো সঠিক উত্তর আমাকে দিতে পারেননি। আমি খুব মনোক্ষুণ্ন হয়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে আসি। তখন আমার অবস্থা পাগলের মতো। এক দিকে শহীদুল্লাহ কায়সার চলে গেলেন, আমার অনেক আত্মীয়স্বজন মারা গেলেন। যুদ্ধের সময় কলকাতায় অমানুষিক কষ্ট করেছি। খাওয়ার অর্থ ছিল না। ডাল চচ্চড়ি, আটার রুটি, কোনো রকম নিজের হাতে বানিয়ে খেয়েছি। এমন ঘরের মধ্যে ছিলাম যেখানে নিঃশ্বাস নেয়াও কষ্ট ছিল, ভাড়া করে তো ভালো ঘরে থাকার মতো অবস্থা ছিল না। অনেক কষ্ট করে দেশ স্বাধীন হলো। কত ভালো লেগেছে দেশ স্বাধীন হয়েছে, কষ্টটা সার্থক হবে সেই আনন্দটুকু আমি আর পেলাম না। কাঁদতে কাঁদতে চলে এলাম। কেউ মারা গেলে যেমন মানুষ চিৎকার করে কাঁদে, হাউমাউ করে কাঁদে, কিছুটা হলেও হালকা হয়, আমি সেটি করতে পারিনি, আমি বুঝতে বা কল্পনাই করতে পারিনি জহির যে আর ফিরে আসবে না। সে এভাবে নিখোঁজ হবে এবং তার মরদেহ পাবো না। তার ১৫ দিন পর বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে মিরপুরে গেলাম। মিরপুরে যাওয়ার পর সেই সময় যাদের জবাই করে, গুলি করে, নির্যাতন করে হত্যা করা হয়, তাদের যেখানে কবর দেয়া হয় সেসব জায়গায় অনেকের সহযোগিতায় মাটি খুঁড়ে দেখলাম। নাকে কাপড় দিয়ে দুর্গন্ধের মধ্যে লাশ খোঁজার চেষ্টা করলাম, কিন্তু লাশগুলো পচেগলে এমন অবস্থা হলো যে তা চেনার কোনো উপায়ই ছিল না। কোনো লাশের গায়েই কাপড় ছিল না। সে এক বীভৎস দৃশ্য। এগুলো যুদ্ধের পরের ঘটনা। জহির মারা যাওয়ার সময়ের।

——-
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতীম তারুণ্যমন্ডিত নির্মাতা লেখক জহির রায়হান মুক্ত, স্বাধীন স্বদেশে অগ্রজ কথাশিল্পী শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুরে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারিতে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

১৯৩৫ এর ১৯ আগস্ট এদেশের প্রবাদপ্রতীম চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক জহির রায়হান জন্মেছিলেন বর্তমান ফেনির মাজুপুর গ্রামে। দেশ বিভাগের পরে বাবা মা ও পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে জহির রায়হান ফিরে এসেছিলেন তার পৈত্রিক ভিটেতেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স জহির রায়হান প্রথমে সুমিতা দেবী এবং পরবর্তীতে অভিনেত্রী সুচন্দার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।

বি:দ্র: জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে নিউইয়র্কে ঠিকানাকে একান্ত সাক্ষাৎকারে সুচন্দা ও ববিতা

এ সম্পর্কে অন্যান্য সূত্র: ekush.wordpress.com,  bdmonitor.net, এনা নিউইয়র্ক, ঠিকানা

Advertisements