Hossein_Askari_2009_IMG_0982_460x200বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের ধারণা, পাশ্চাত্য এবং পাশ্চাত্যের মানুষেরা ইসলামের বড় শত্রু । আধুনিক এসব ক্রুসেডাররা ধর্মকে মুছে দিতে চায় এবং মুসলিমদের পাশ্চাত্যের অধীন করতে চায়। কিন্তু এরা ইসলামের আসল শত্রু নয়।

ইসলামের আসল শত্রু  হলো- যারা এ ধর্মের প্রকৃত শিক্ষাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে এবং নিজেদের ইচ্ছে অনুযায়ী ব্যবহার করে স্বার্থ উদ্ধার করে। এ শ্রেণী দুর্নীতিবাজ এবং শোষক মুসলিম শাসকদের পক্ষে কাজ করে থাকে।

অথচ সর্বজনীনভাবে গৃহীত ইসলামের কিছু শিক্ষা হলো- ১) শাসক নির্বাচিত হবেন সাধারণ মানুষের দ্বারা ২) শাসকদের কুরআন এবং নবীর সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে ৩) অত্যাচারী শাসক এবং শোষকের বিরুদ্ধে সব মুসলমানকে দাঁড়াতে হবে এবং তারা যদি এটা না করে তাহলে তারাও অপরাধী হবে ৪) সকল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সব জিনিসের একমাত্র মালিকানা আল্লাহর। সব সম্পদ মানুষের কল্যাণে মানুষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে ৫) দারিদ্র্যকে দূর করতে হবে যেখানেই পাওয়া যাবে ৬) অর্থ প্রাচুর্যকে ঘৃণা/অস্বীকার করতে হবে। বিশেষ করে যেখানে দারিদ্র্য আছে এবং ৭) আর্থ-সামজিক ন্যায়বিচার (স্বাধীনতা, সমান সুযোগ-সুবিধা এবং মৌলিক প্রয়োজনের সমান বণ্টন)

এগুলো হচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়কে এক সঙ্গে বেধে রাখার নৈতিক সুতো। শুধু বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে একটু তাকিয়ে দেখেন। কি দেখবেন? মুসলিম শাসকরা কি এই অতি সাধারণ শর্তগুলো মেনে চলে? কিছু কিছু দেশ এর কয়েকটা শর্ত মেনে চলে কিন্তু বেশিরভাগ দেশগুলোতেই এর অবস্থা ভয়াবহ। অবশ্য এ অবস্থা সৃষ্টির জন্য মুসলমানরা নিজেই দায়ী।

আরেকটু স্পষ্ট করে আমরা যদি বলতে চাইলে আমরা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে তাকাই। তারা তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ এবং ইসলামের এইসব মৌলিক সুবিধাগুলো খুব সহজেই পূরণ করতে পারে, শুধু একটু সদিচ্ছা থাকলেই।

পারস্য উপসাগরের আটটি দেশের মধ্যে তিনটি দেশ নিজেদের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার বলে পরিচয় দেয়। তারা হলো- ইরান, ইরাক ও কুয়েত। কিন্তু আসলেই কি এরা খুব সাহস নিয়ে এ কথা বলতে পারবে? সবগুলো দেশেই শোষণমূলক শাসন চলছে। কুয়েতকে হয়তো আমরা খানিকটা রেহাই দিতে পারি এ অভিযোগ থেকে।

যেসব দেশগুলোতে তেল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য আছে। এর প্রত্যেকটি দেশের শাসকই এ সম্পদগুলো নিজেদের জন্য, নিজেদের পরিবার ও সহযোগীদের ভবিষ্যত নিরাপদ রাখতে ব্যবহার করে থাকে। এ বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ঐসব শাসকগোষ্ঠীর হাতে।

এসব দেশগুলোর প্রত্যেকটিতেই দরিদ্রতার উপস্থিতি লক্ষণীয়। বিত্তশালীদের অগাদ সম্পদের সঙ্গে তাদের ভোগ-বিলাসী জীবন জানিয়ে দিচ্ছে যে, ওগুলো কেন ইসলামের মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি সাংঘর্ষিক। কারণ সব জায়গাতেই আর্থ-সামাজিক নৈরাজ্য লক্ষ্যণীয়। আসলে এ দেশগুলো নৈরাজ্য, শোষণ-বঞ্চনার স্বর্গ। স্বাধীনতা এবং সুযোগের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়নি কোন দেশেই।

যখন অমুসলিমরা এসব সমস্যার দিকে আঙ্গুল তোলে তখন মুসলিম শাসকরা বলে এরা ইসলামের শত্রু। এমনকি তারা তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বকে উস্কে দেয়। এ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য মুসলিম শাসকরাই দায়ী এবং এটা স্বীকার করতে হবে যে, কোন আশাব্যঞ্জক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য মুসলমানদেরই এদিকে নজর দিতে হবে আগে।

তবে এ দৃশ্য খুব শিগগিরই পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। শাসকরা যতই বলুক না কেন তারা ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত করবে না যেগুলো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দিবে। সহজ কথায় বলতে গেলে আইনের শাসন বা ইসলামের নীতিভিত্তিক শাসন তারা প্রতিষ্ঠা করবেন না। যদি ওই ব্যবস্থা চালু হয় তাহলে মুসলিম বিশ্বের সব দুর্নীতিবাজ, ভোগবাদী এবং শোষণমূলক শাসক গোষ্ঠীকে সরে যেতে হবে।

সবশেষে, আমাদের ওই ‘গণতান্ত্রিক’ পাশ্চাত্যকে ভুলে গেলে চলবে না। তারা পরিবর্তন এবং ‘pluralistic governance’ এর নাম করে ওই দুর্নীতিবাজ শাসকগোষ্ঠীকেই সমর্থন করে। ইরানও এ দলে যোগ দিয়েছে। পশ্চিমা কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চ পদস্থ কর্তা ব্যক্তিরা ওই দুর্নীতিবাজ শাসক গোষ্ঠীকেই সমর্থন ও মদদ দিয়ে থাকে। এর মাধ্যমে নিজেরাও লাভবান হয়ে থাকে।

এ রকম সহযোগিতামূলক সাম্রাজ্যবাদ খুব শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে এটা বলা যাচ্ছে না। অত্যাচারী শাসক গোষ্ঠীও খুব শিগগিরই হারিয়ে যাচ্ছে না। পাশ্চাত্য তাদের জাতীয় স্বার্থই দেখবে এবং অত্যাচারী শাসকদেরই সমর্থন দিয়ে যাবে। আর মুসলিমরা পশ্চিমাদের তাদের অবস্থার জন্য দোষ দিয়ে যাবে যে, পশ্চিমা ক্রুসেডাররা তাদের অধীন করে রাখবে।

মুসলিমদের এখন আয়নাতে নিজের মুখ দেখার সময় এসেছে এবং তাদের নবীজির (সা.) কথা মনে করতে হবে যিনি ওইদিনের কথা বলে দিয়ে গেছেন, যখন শোষণ ও অত্যাচারের জন্য মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। শোষকদের তাদের শোষণের জন্য, শোষিতদের প্রতিবাদ না করার জন্য এবং দর্শকদের শোষিতদের সাহায্যে এগিয়ে না আসার জন্য কঠোর জবাবদিহির মুখে দাঁড়াতে হবে।

(এশিয়া টাইমসে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির বিজনেস এন্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক হোসেইন আসকারির ‘The real enemies of Islam’ নামক নিবন্ধ থেকে অনূদিত)

সূত্র: আরটিএনএন

Advertisements