Iftekharuzzamanবাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অবশ্যই একটা  উদ্বেগজনক জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। মানুষের মৌলিক অধিকার এবং ন্যায় বিচার পাওয়ার যে অধিকার তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে দেশ এমনই মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র প্রধান নির্বাহী পরিচালক ড.ইফতেখারুজ্জামান। রেডিও তেহরানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো এটি সরকারের একধরণের চাপিয়ে দেয়া অবস্থা।

পুরো সাক্ষাতকারটি উপস্থাপন করা হলো।

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ারে বেশ কিছু মানুষ নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের আসামী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতারা পর্যন্ত রয়েছেন। ক্রসফায়ারের বিষয়টি কিন্তু এখন হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে এবং একেবারে বোকা লোকটিও এখন আর ক্রসফায়ারের ঘটনাকে বিশ্বাস করে না।

তারপরও সরকারের পক্ষ থেকে অব্যাহতভাবে বলা হচ্ছে দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটছে না। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড.ইফতেখারুজ্জামান: দেখুন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে যেভাবে নাটকীয়তার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় তাকে আমি হাস্যকর বলে মনে করি না। আমি এটাকে একধরনের প্রতারণা বলব। একটি রাষ্ট্রীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশেষ করে যারা দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত তারা এভাবে আইনের লঙ্ঘন করে সীমাহীনভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে এবং তা মিথ্যাচারের মাধ্যমে অপপ্রচার করছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। আর আমাদের দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নতুন নয়। এর আগের চারদলীয় জোট সরকারের সময় হয়েছে, তারপরের সরকারের সময় হয়েছে এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও এ ধরণের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে। তবে সাম্প্রতিককালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অবশ্যই একটা  উদ্বেগজনক জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। আমি মনে করি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং ন্যায় বিচার পাওয়ার যে অধিকার তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আইনকে হাতে তুলে নিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে মেনে নেয়ার একটা মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। আর সেটিকে  আবার সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে অর্থাত মন্ত্রীরা যখন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে প্রত্যাখ্যান করেন তখন বিষয়টি নিয়ে আমরা আরো বেশি হতাশার মধ্যে পড়ে যাই। এ অবস্থায় আমাদেরকে বিষয়টি শঙ্কিত করে যে আমরা কি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতামুলক সরকার ব্যবস্থায় যাওয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছি নাকি পেছনের দিকে যাচ্ছি! কাজেই  ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করি।

রেডিও তেহরান: সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে। সেইসঙ্গে এই মুহূর্তে উপজেলা নির্বাচনের জন্য সেনাবাহিনী মাঠে রয়েছে এবং যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে। এতকিছুর মধ্যেও প্রিজনভ্যান থেকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জেএমবির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদেরকে ছিনতাই করে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। কীভাবে এটি সম্ভব হলো? এ ঘটনায় কি বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগের সক্ষমতা নিয়ে  প্রশ্ন উঠতে পারে না?

ড.ইফতেখারুজ্জামান: জ্বি আপনি ঠিকই বলেছেন প্রিজন-ভ্যান থেকে আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগের সক্ষমতা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠতে পারে। দেখুন এখানে কতগুলো বিষয় রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল বলে সরকারের পক্ষ থেকে যে কথা বলা হয় তার ব্যাখ্যা বিভিন্নভাবে হতে পারে। নির্বাচনের সময় বা নির্বাচনের আগে যেভাবে হরতাল অবরোধ, সহিংসতা, হত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছিল সেটা এখন নেই; সে অর্থে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলা চলে। তবে সেটাও চাপিয়ে দেয়া একধরণের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বলে আমি মনে করি। এর পেছনে গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। জনগণের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সরকার হওয়ার কথা কিন্তু বাস্তবে এখানে সেটা নেই। আর এ কথাটি সরকারের উচ্চমহল থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে। তারা বলেছেন সরকার জনগণের ম্যাণ্ডেট নিতে পারেনি। কাজেই দেশে যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার কথা বলা হচ্ছে সেটিই জনগণের প্রত্যাশার বিষয় কিন্তু সেটি আসলে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া শান্তি শৃঙ্খলা।

অন্যদিকে আপনি যে দৃষ্টান্তের কথাগুলো বললেন, জেলখানা থেকে গুরুতর আসামীকে আদালতে নেয়ার সময় প্রিজন-ভ্যান থেকে তাদেরকে ছিনতাই করা হয়। আর ওই ঘটনায় একজন পুলিশ নিহত হয়। এঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেল কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। অন্য সবকিছু বাদ দিলে এ সম্পর্কে মিডিয়ায় যা এসেছে সেটি হলো দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত একটি বিষয়। এ ঘটনায় যোগসাজসের কথা উঠেছে এবং একটি মাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়েছে। আর সেটি হচ্ছে টেলিফোন বা মোবাইল ফোন। তো এক্ষেত্রে আমরা শুনেছি সাধারণ মানুষেরও মোবাইল ফোন ট্যাপিং করা হয়। অথচ একজন গুরুতর অপরাধি মোবাইল ব্যবহার করবে সেটিকে ট্যাপ করা হবে না তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে সেটিকে মেনে নেয়া যায় না। তাছাড়া সরকারের গোয়েন্দা বিভাগসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী  যাদের দায়িত্ব এ ধরণের অপরাধীদের প্রতি দৃষ্টি রাখা তারা  এটি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন না সেটিও বিস্ময়ের ব্যাপার। তাছাড়া এ ধরণের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও যেসব সিস্টেম আছে তার মাধ্যমে তথ্যগুলো বের করা সম্ভব যে, কারসাথে কবে কিভাবে কতক্ষণ কথা বলেছে এবং কি কথা হয়েছে। এই কাজগুলো কেন গোয়েন্দা বাহিনী বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করতে পারবে না; তা আমাদের বোধগম্য নয়।

কাজেই সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর  শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব এবং জনগণের অধিকার রক্ষা ও আইনের শাসন রক্ষার দায়িত্ব সেখানে তারা ক্রমাগতভাবে সাফল্যের ঘাটতি দেখাচ্ছেন। আর এজন্য যারা দায়ি তাদেরকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে না পারলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজে আরো বাড়তেই থাকবে।

রেডিও তেহরান: এখনও কিন্তু জেএমবির ছিনতাই হওয়া দুই আসামীকে উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সরকারের পক্ষ থেকে জেএমবি’র আসামী ছিনতাইয়ের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপিকে দায়ী করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি’র পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে জঙ্গিবাদের ধুয়া তুলে পশ্চিমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আসামী ছিনতাইয়ের নাটক সাজিয়েছে সরকার। এই দুই পরস্পরবিরোধী অভিযোগকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড.ইফতেখারুজ্জামান: দেখুন আমাদের দেশের রাজনীতি সবসময় নেতিবাচক এবং দোষারোপের। শুধু তাই নয় আমাদের রাজনীতির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো- সবকিছুতে দলীয়করণ করা। আর এসব বিষয় আমাদের গণতান্ত্রিক ভিত্তিগুলোকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয় গণতান্ত্রিক আচরণ চর্চাকে আমাদের সমাজ থেকে বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আমার দৃষ্টিতে এখানে মূল বিষয়টি হচ্ছে দলীয়করণ বা রাজনৈতিক অর্জনের প্রচেষ্টা সরকারি দল বিরোধী দল – উভয়পক্ষ থেকে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। আর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে বা দায়িত্ব প্রাপ্ত তাদেরকে দলীয়ভাবে ব্যবহার করার কারণে সবাই পার পেয়ে যাচ্ছে। আর এই দলীয়ভাবে ব্যবহারের কাজটি শুধু আজকের সময়ের চলছে তা নয় যারা  বর্তমান সরকারের সমালোচনা করছেন তাদের সরকারের সময়ও তাই হয়েছে। সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে যখন দলীয় বিবেচনায় ব্যবহার করা হয় তখন যারা ক্ষমতায় রাষ্ট্র ক্ষমতার সবকিছু তাদের বলে  ধরে নেয়া হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পেশাদারিত্ব এবং তাদের ওপর আইনগতভাবে অর্পিত দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারে না। যারফলে দলীয় এজেন্ডাকে তাদের বাস্তবায়ন করতে দেখা যায়। এবং এসব প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে যায়। পেশাগত দুর্বলতার সাথে রাজনৈতিক দুর্বলতার যোগসাজস মিলে ক্রমাগতভাবে আইনের শাসন,মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ব্যাপারে আমরা প্রতিনিয়ত  ব্যর্থ হই।

রেডিও তেহরান: জেএমবি’র আসামী ছিনতাইয়ের মাত্র কয়েকদিন আগে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক আইমান আল-জাওয়াহেরির একটি কথিত অডিও বার্তা প্রকাশিত হয়। সেটি নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হলেও বিষয়টির কিন্তু কোনো নিস্পত্তি হয়নি। আপনার কি মনে হয়, বাংলাদেশ কি সত্যি সত্যিই আল-কায়েদার পরবর্তী টার্গেট হতে যাচ্ছে?

ড.ইফতেখারুজ্জামান:  আমি প্রথমেই বলব আইমান আল-জাওয়াহেরির যে ভিডিও বা অডিও বার্তাটির কথা বলা হচ্ছে সে বিষয়টিকে কোনো অবস্থাতেই অবমূল্যায়ন করা ঠিক না।  এটাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এর ক্রেডিবিলিটি কতখানি রয়েছে তা গোয়েন্দার খুঁজে বের করতে হবে। আজকের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার যুগে এটি আসল নাকি নকল তা প্রমাণ করা খুবই সহজ বলে আমি মনে করি। তবে এ ধরনের একটা বিষয়কে গুরুত্ব না দেয়ার কোনো যুক্তি নেই বলে আমি মনে করি।  যারা এর পেছনে দায়ি তাদেরকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। এরপর তাদেরকে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত।

আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমি একটু গভীরতার দিকে যেতে চাই। আমি বলব বাংলাদেশের স্বাধীনতার গত ৪২ বছরে আমাদের মৌলিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো এবং গণতান্ত্রিক চেতনার জায়গায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সহবস্থান আছে। আর আমাদের আইডেনটিটির যে প্রকাশ তার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে রাজনীতির উর্ধ্বে ধর্মের অবস্থান। এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেই আমাদের স্বাধীনতার চেতনা উজ্জীবিত। তাছাড়া সকল ধর্মের সহবস্থান। আর এগুলোর সবই আমাদের সমাজে জোরালো অবস্থানে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এর ওপর বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এসেছে। আর সেই চ্যালেঞ্জ শুরু হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতা থেকে। আর সেই সহিংসতা বর্তমানে নুতন রূপ নিয়েছে। আর সেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের বিরুদ্ধে ধর্মীয় পরিচয়টাকে রাজনীতিক বিবেচনায় নিয়ে এসে  এক ধরণের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। আর এটার জন্য আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল সবকিছুতে তাদের দলীয় এজেণ্ডা প্রমোট করার প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ। যুদ্ধাপরাধের পক্ষের এবং বিপক্ষের  উভয় শক্তিই মূল ধারার রাজনীতিকে দলীয়করণ করে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের  চেষ্টা চালাচ্ছে। যার ফলে আজকে অগণতান্ত্রিক শক্তি ও ধর্মভিত্তিক শক্তির উত্থান ঘটেছে। আর তাদেরকে সুযোগ করে দিয়েছে দুটো বড় রাজনৈতিক দল। আর এফলে আমাদের মূল্যবোধের জায়গাগুলো তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সূত্র: রেডিও তেহরান

Advertisements