Egypt-Women-Protest-Arab-Springরীমা মাজেদ
তথাকথিত আরব বামপন্থীরা আরব স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে বুঝতে ভেবাচেকা খেয়ে যায়। ২০১০ সালের শেষের দিকে শুরু হওয়া এই ‘আরব বসন্ত’ যেন আরবে এক ভীতিকর ‘শীত’ নিয়ে এসেছে। এই শীতে শুধু আরবরাই কাঁপছে না, কাঁপছে পুরো বিশ্ব। আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বৈপ্লবিক আন্দোলনকেই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে বিপ্লবী আন্দোলন করার কাণ্ডারী দাবিদার বামদলগুলো!

এই আরব বিপ্লব বামদেরকে তাদের আন্দোলনের সংজ্ঞা পাল্টে দিতে এবং আন্দোলনের কর্মসূচি পরিবর্তনে বাধ্য করছে। সামাজিক এবং রাজনৈতিক মুক্তি এ এলাকার প্রধান সংকট। বিশেষ করে মিসরীয় ও সিরীয় বিপ্লব বামদের আন্দোলনের সংজ্ঞা পরিবর্তন এবং বিস্তৃত করতে বাধ্য করছে। এখন নতুন মত নতুন পথ সময়ের দাবি। নতুন প্রজন্মের বামপন্থীদের মনে হয় এই দায়িত্বটা নিতে হবে।

বামদলগুলো শ্রমিক আন্দোলন এবং ইউনিয়নগুলো নিয়ে সাধারণত দুপথে এগিয়ে যায়। হয় রাষ্ট্রের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করে অথবা রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের মাঝখানে থেকে কাজ চালিয়ে যায়। এর ব্যতিক্রম হলে ভয়ানক শাস্তির মুখোমুখি হয় অথবা রাজনীতি থেকে বহিষ্কৃত করা হয়। যেমন গামাল আবদেল নাসের ও বাথ পার্টির শাসনামলে সব কমিউনিস্ট দলগুলো নিষিদ্ধ করা হয়। যারা ওই রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে আপোস করতে রাজি হয়নি, তাদের সবার জন্যই এটা করা হয়। সিরিয়াতে কমিউনিস্ট পার্টিকে কাজ করতে দেয়া হয়, যখন তারা ‘ন্যাশনাল প্রোগ্রেসিভ ফ্রন্টে’র সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়। এটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হাফিজ আল আসাদ। বহুত্ববাদের নামে সব দলগুলোকে একদলে নিয়ে আসা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে ১৯৫০ এর পর থেকেই সব ধরনের বাম আন্দোলন এবং শ্রমিক শ্রেণীর উত্থান দমন করা হয় কঠোর হাতে।

২০১১ সালের আরব উত্থান কয়েকটা কারণে বিস্ফোরণ আকারে দেখা দেয়। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা একনায়কতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসনের প্রতি বিরক্ত ও ভীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল আরব জনগণ। তারা এটা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছিল।

আনোয়ার আল সাদাতের নব্য-উদারতাবাদ নীতির ধাক্কা সিরিয়াতে লেগেছে ২০০০ সালে বাশার আল আসাদের ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে। বাশার আল আসাদের ক্ষমতায় আসাটা অভিজাত, শাসক শ্রেণী এবং তার আশেপাশে থাকা গোষ্ঠীর জন্য লাভজনক হয়েছে। কিন্তু এই বলয়ের বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীর অবস্থা খুব খারাপ হতে শুরু করলো। অধিকাংশ সিরিয়ান নাগরিক মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ বেকারত্ব বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এবং তীব্র দারিদ্র্য এসবে আক্রান্ত হতে শুরু করলো। দারিদ্র্য সীমার নীচে (যারা দিনে ১ ডলারেরও কম আয় করে) বসবাস করছে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২০০০ সালে ছিল ১১ শতাংশ। কিন্তু ২০১০ সালে এটা দাড়ায় ৩৩ শতাংশ।

এরকম আর্থ-সামজিক পরিস্থিতিতে এটা আশা করা যায় বামরা সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংগঠিত হবে, আন্দোলন করবে। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি। আরব বসন্ত পুরো আরব বিশ্বে বিস্ফোরণ আকারে দেখা দিল। তথাকথিত সীমানা ও জাতীয়তাবাদের ধারণার বাইরে গিয়ে পুরো আরব বিশ্ব এই বসন্তে টালমাটাল হয়ে উঠল। এটা আরেকটা জিনিস চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখালো যে শোষণ ও অসাম্যের বিপক্ষে একটা বিশাল আঞ্চলিক ঐক্য গড়ার সম্ভাবনা ছিল।

কিন্তু প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক: এই গণবিস্ফোরণে বামরা কি ভূমিকা পালন করেছিল?

ভিন্ন ভিন্ন উত্তর পাওয়া যায়। ২০১০ সালের আগ পর্যন্ত বামরা শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় এবং শাসক শ্রেণীর অংশ হয়ে যায়। এর মধ্যে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে শুধু তিউনিশিয়াতে। ওখানে তিউনিশিয়ার জেনারেল লেবার ইউনিয়ন বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পেরেছে কারণ তারা সরকার থেকে স্বাধীন ছিল, যেখানে এ অঞ্চলের সব বাম দলগুলো সরকারের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। ফলে এসব গণঅভ্যুত্থানে আসলে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেনি সেখানকার বাম দলগুলো।

খুব হাস্যকর ব্যাপার হলো যে সিরিয়া (বাকদাশ ব্রাঞ্চ) ও লেবাননের কমিউনিস্ট দলগুলো এই গণঅভ্যুত্থানের বিরোধিতা করছিলো প্রথম থেকেই। তারা এর স্বপক্ষে যা বলতো তা হচ্ছে, ‘সিরিয়াতে যা হচ্ছে এটা পরিস্কার যে তা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদদ ও পরিকল্পনাতেই হচ্ছে।’

তবে তথাকথিত ওই বামদেরকে রাস্তায় বিক্ষোভরত মানুষগুলোকে আমলে নেয়নি। কারণ তারা অনেক আগেই শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যাওয়ার ফলে পঁচে গিয়েছিল।

অবশ্য এখন নতুন ধারার বামপন্থী রাজনীতি শুরু হয়েছে এ কয়েক বছরে। মিশরের ‘রেভুল্যুশনারি সোস্যালিস্টস্’, সিরিয়ার ‘রেভুল্যুশনারি লেফট্ কারেন্ট’ এবং লেবাননের ‘সোস্যালিস্ট ফোরাম’ একটু ভিন্ন ধারার কর্মতৎপরতা দেখানোর চেষ্টা করেছে। যদিও এই গ্রুপগুলো তুলনামূলকভাবে তরুণ এবং তাদের জনসমর্থন খুব কম কিন্তু আরব বিপ্লব নিয়ে তাদের বুঝাপড়া এবং ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আরব বামদের ‘রাজনৈতিক পরিপক্কতার’ খানিকটা নিদর্শন দেখাচ্ছে। আরব বামদের নিয়ে এটা নিয়ে অনেক প্রক্যাশা ছিল অনেক আগে থেকেই।

আজকের আরব বামরা
যেখানে ঐতিহ্যগত বাম দলগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘স্টালিনিস্ট টপ-ডাউন’ পদ্ধতি অনুসরণ করতো সেখানে আজকের তরুণ বাম কর্মীরা ‘ট্রটস্কাইস্ট’ পদ্ধতি অনুসরণের কথা বলছে। স্টালিনিস্ট পন্থায় বামরা একটি জাতীয় মুক্তি, স্বাধীনতার কথা বলে এবং রাষ্ট্রীয় সংহতির কথা বলে এবং স্বৈরশাসকের পকেট দল হয়ে যায়। তাদের স্বার্থ রক্ষাই নিজের স্বার্থ রক্ষা এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে যায়। কিন্তু তরুণ ‘ট্রটস্কাইট’ বামদের কথা হলো তৃণমূল পর্যায় থেকে জন-সংশ্লিষ্ট আন্দোলন করতে হবে। নীচ থেকে উপরে আসতে হবে। স্টালিনিস্টদের টপ-ডাউন এর পরিবর্তে বটম-আপ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

আরব বিশ্বে বামদের মধ্যে প্রধান যে পার্থক্যটা আছে সেটা হলো পুরনো বামরা মনে করে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে তরুণরা মনে করে তাদের প্রধান ফোকাস হওয়া উচিত সামাজিক মুক্তি। কারণ এই পুঁজিবাদী এবং দমনমূলক ব্যবস্থায় আসলে সত্যিকারের স্বাধীনতা আসতে পারে না, যদি না সামাজিক সাম্য ও স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়।

অন্যান্য তথাকথিত বাম দলগুলো তাদের পার্থক্য হলো- পুরনো বাম দলগুলো ভূ-রাজনীতি বা ‘জিও-পলিটিক্স’ এর নাম করে ইরান ও রাশিয়াকে সমর্থন দিয়ে যায় এই গোলকধাধায় পরে যে, এই দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে আছে। তারা বাইরের সাম্রাজ্যবাদী ও জায়োনিস্ট হুমকির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েই নিজেদের দায়িত্ব খতম হয়েছে বলে মনে করে। আর অভ্যন্তরীণ বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে কর্মতৎপরতাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে নতুন ধারার বাম আন্দোলনগুলো। এটা করতে গিয়ে তারা বিস্তৃত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভুলে যায় না এবং ইসরাইল যে একটি দখলদার শক্তি এটাও তাদের মনে থাকে।

এছাড়া ট্রটস্কাইস্ট বামপন্থা স্থায়ী বিপ্লবে বিশ্বাস করে যেখানে জাতীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যও সংগ্রাম করার কথা বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লেবানিজ কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি আসলে আসাদের পতনের মাধ্যমে এ অঞ্চলে ইসরাইলের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য করা হয়েছে। অন্যদিকে, লেবানিজ সোস্যালিস্ট ফোরাম মনে করে, এখন সিরিয়াতে যা ঘটছে তা হচ্ছে একজন স্বৈরশাসকের বিপক্ষে বীরত্বপূর্ণ গণবিপ্লব। যদিও এ বিপ্লবকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্রস্বরূপ ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এবং দ্য লেভান্ত (আইএসআইএল) এর মতো প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠিকে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। নির্মম আসাদ সরকার কঠোর হাতে বিরোধীদের উপর দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।

এর সাথে যুক্ত আছে তথাকথিত পুরনো বামদের সেই পুরনো বিপরীতমুখী নীতি যেখানে এক গোষ্ঠী কোনোটাকে সমর্থন করলে, তত্ত্ব কপচিয়ে আরেক গ্রুপ এটার বিরোধিতা করবে। এর ফল হয়েছে এমন এই বাম দলগুলোর জনসমর্থন বলতে তেমন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এদিকে নতুন বাম দলগুলো সেই পুরনো, কঠিন এবং বিপরীতমুখী তত্ত্বকথা এবং রিডাকশনিস্ট (reductionist) পন্থার বাইরে গিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখছে।

উদাহরণস্বরূপ- মিসরের রেভ্যুলুশনারি সোস্যালিস্ট প্রথম থেকেই পুরনো মোবারক শাসনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তার সঙ্গে সেনাবাহিনী (আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি যার প্রতিনিধিত্ব করে) এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের বিপক্ষেও দাঁড়িয়ে থাকে। একই ধরনের পন্থা গ্রহণ করে সিরিয়ার বিপ্লবী বাম দলগুলো। তারা আসাদ সরকারের বিপক্ষে অবস্থান করছে আবার প্রতিক্রিয়াশীল আইএসআইএল বা আল নুসরা ফ্রন্টের বিপক্ষেও অবস্থান করছে।

সবশেষে বলতে গেলে বলতে হয়, এই আরব গণঅভ্যুত্থান থেকে পুরনো এবং তরুণ বামপন্থী সংগঠনগুলো যেটা শিখতে পেরেছে বলে মনে হয়, সেটা হলো বিপ্লব নিয়ে তাদের রোমান্টিক আইডিয়াগুলো সঠিক নয়। বিপ্লব যেমন শক্তিশালী এবং প্রয়োজনীয় কিন্তু বিপ্লবকালীন সময়গুলো তত সহজ ও মনোহর নয়, যেমনটা তারা কল্পনা করেছিল।

আরব বিপ্লবকে বুঝতে হলে এটাকে একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। এটা সফল করতে হলে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পালা-পরিবর্তনের উঠা-নামার মধ্য দিয়ে যে যেতে হবে এটা পরিষ্কার। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে অনেক সামাজিক ট্যাবু ভেঙে যাবে, অনেক আচার-আচরণ, মূল্যবোধ পরিবর্তন হয়ে যাবে। অনেক আন্দোলন ও সংগ্রাম ধানা বাঁধবে। আবার তার সঙ্গে সঙ্গে অনেক জীবন নষ্ট হবে, অনেক মানুষ কষ্ট ভোগ করবে। কোনো কোনো শহর পুরো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কারণ নির্মম শাসকগোষ্ঠী শুধু বর্তমানকেই মুছে দিতে চায় না তারা অতীতকেও মুছে দিতে চায়।

রীমা মাজেদ: একজন গবেষক। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিটিক্যাল স্যোশিওলজিতে পিএইচডি প্রার্থী।

তরজমা: সাবিদিন ইব্রাহিম।

সূত্র: আরটিএনএন

Advertisements