Forhad Mozharফরহাদ মজহার:
বাংলাদেশে লেখালেখি করাটা কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেখার জন্য যে কোনো সময় মামলা হওয়ার ভয় বেড়েছে। এমনকি আদালত স্বপ্রণোদিত হয়েও আদালত অবমাননার অভিযোগে অনেককে তলব করছেন। একসময় যারা মাহমুদুর রহমানকে যেভাবেই হোক গ্রেফতার ও শাস্তি দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়েছিলেন, আজকাল দেখছি তারাও ঝামেলায় পড়েছেন। যারা অন্যের কথা বলার অধিকার হামেশা হরণ করে, পক্ষপাতদুষ্ট মত প্রচার করে, বিরোধী চিন্তাকে গরহাজির রাখে ও নিঃশব্দ করে দেয়, বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থ বলে চালায়, আজ আদালত তাদের তলব করেছেন। এতে পুলকিত হওয়ার কারণ নেই। এক্ষেত্রে নিঃশর্তভাবে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোই আমাদের কর্তব্য। ঝামেলায় যে কেউই পড়তে পারেন। তারা আরও পড়বেন বলেই মনে হয়।

নীতিগতভাবে কীসে আদালতের অবমাননা হয় আর কীসে হয় না, এই তর্ক গণতান্ত্রিক রীতিনীতি নির্ণয়ের তর্ক। নিছকই আইন-আদালতের ব্যাপার নয়। গণতন্ত্রে আইনি প্রক্রিয়ায় ও সুবিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কেউ সরাসরি বাধা তৈরি না করলে আদালতের যে কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা যে কোনো বিচারকের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা-পর্যালোচনা হতে পারে। এটা ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল’ বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১(১) অনুচ্ছেদের অধীনে স্বীকৃত অধিকার। আদালত এই অধিকার হরণ করতে পারেন না। অন্যদিকে মাহমুদুর রহমানের জন্য এক আইন আর অন্যদের জন্য আরেক আইন- এই বৈষম্যও আদালত চর্চা করতে পারেন না। দৈনিক আমার দেশের মতো প্রকাশ বা লেখালেখি কারও পছন্দ নয় বলে সেটা ‘উস্কানি’ আর প্রথম আলো ও দৈনিক ডেইলি স্টারের মিথ্যাচার আর উস্কানি ধর্তব্য নয়, এটা হতে পারে না। এসব গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যে পড়ে না। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রত্যক্ষ সহযোগী কিছু গণমাধ্যমের কথা নাই বা বললাম।

নাগরিকদের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী অপরাধের চরিত্র ও মাত্রা অনুযায়ী পূর্ব নির্দিষ্ট শাস্তি দেয়ার এখতিয়ার আদালতের আছে, কিন্তু নাগরিকদের মর্যাদাহানি করে তিরস্কারের অধিকার আদালতের নেই। এটা যত তাড়াতাড়ি আমরা বুঝতে পারি, তত তাড়াতাড়ি আমরা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অর্থ বুঝব। যে পত্রিকাটিকে আদালত তলব করেছেন, তারা মাহমুদুর রহমানকে দেয়া আদালতের অভিধা ‘বাইচান্স এডিটর’ কথাটা নিয়ে মশকরা কম করেনি। মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা, কারাগারে পাঠানো, এবং দৈনিক আমার দেশকে বে-আইনিভাবে বন্ধ রেখে ধ্বংস করার পেছনে এই পত্রিকাগুলোর ভূমিকা রয়েছে। কারণ দৈনিক আমার দেশ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিরোধী চিন্তা ও রাজনীতির প্রধান মুখপত্র শুধু নয়, পাশাপাশি বিপুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই জনপ্রিয়তা বাংলাদেশে গণতন্ত্রবিরোধী করপোরেট স্বার্থের সংরক্ষক শ্রেণী ও তাদের মুখপত্রের কাছে গ্রহণীয় ছিল না।

নাগরিক হিসেবে আমরা যদি নাগরিক ও মানবিক অধিকারের পক্ষে দাঁড়াই, তখন অন্যের মর্যাদার হানি না ঘটিয়ে চিন্তা ও বিবেকের পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষেই আমাদের দাঁড়াতে হবে। ‘মানবিক মর্যাদা’ রক্ষা স্বাধীনতা ঘোষণার তিন নীতির প্রধান একটি নীতি। স্বাধীনতার ঘোষণাই মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিল। অতএব গণতান্ত্রিক রীতিনীতির দিক থেকে দৈনিক আমার দেশ কিংবা দৈনিক প্রথম আলোর চিন্তা বা মতের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ানোর অধিকার নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে। কারও চিন্তা বা লেখালেখির সঙ্গে আমাদের একমত হওয়ার কোনোই কারণ নেই। একমত না হলে সমালোচনা, পর্যালোচনা বা প্রতিবাদ হতে পারে। অবশ্যই। কিন্তু বিরোধী পক্ষকে ব্যক্তি হিসেবে হেয়প্রতিপন্ন করে, তার ব্যক্তিমর্যাদা ক্ষুণ্ন করার জন্য গালাগালি করাকে মতপার্থক্য বলে না, গালিগালাজই বলে। যদি আমরা আসলেই গণতন্ত্র চাই, ফ্যাসিবাদ না, তাহলে নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে পরস্পরের মতের ঘোর বিরোধীদের মধ্যেও অবশ্যই ন্যূনতম নীতিগত ঐক্য দরকার, যে ঐক্য ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব। সেই ঐক্যের জায়গাটা হচ্ছে চিন্তা ও বিবেকের পূর্ণ স্বাধীনতা, প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। অপরের মর্যাদা ক্ষুণ্ন না করে এই তর্ক-বিতর্কের জায়গা মজবুত ও সম্প্রসারণের সঙ্গে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান বলছে চিন্তা ও বিবেকের পূর্ণ স্বাধীনতা আমাদের নেই। তার নিশ্চয়তা দেয়া দূরে থাকুক, সংবিধান মূলত তা হরণ করেছে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী চিন্তা, বিবেক, বাক ও ভাব প্রকাশ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অধিকার থেকে রাষ্ট্র আমাদের বঞ্চিত করতে পারে। সংবিধানের ভাষা অনুযায়ী রাষ্ট্র বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আইনের দ্বারা ‘যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ’ আরোপ করতে পারে। সেগুলো হচ্ছে : ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃংখলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে’ (দেখুন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ)। কিন্তু কোন ধরনের বাধানিষেধ যুক্তিসঙ্গত আর কোনটি নয় সেটা নির্ধারণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ‘আইনের দ্বারা আরোপিত’ মানে এই বাধা নিষেধের আইন প্রণয়নের এখতিয়ার জাতীয় সংসদের। কিন্তু জাতীয় সংসদ ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার বিরোধী হলেও যে কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধান গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার বিরোধী এই বিচিত্র ক্ষমতা জাতীয় সংসদকে দিয়েছে। যার ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে শেখ হাসিনা পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়ন করেছেন। এর আগে বিএনপি ও জাতীয় পার্টিও গণবিরোধী আইন প্রণয়ণ করেছে। সারমর্ম হচ্ছে- বাংলাদেশের সংবিধান অর্থাৎ বাহাত্তরের মহান ও পবিত্র সংবিধানের মধ্যেই মৌলিক অধিকার এবং নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণের ক্ষমতা রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে। এই হোল অবস্থা!
এরপরও আদালত অবমাননা নিয়ে কথা থাকে। বলা হয়েছে, চিন্তা, বিবেক, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ‘যুক্তিসঙ্গত’ আইন প্রণয়ন করে হরণ করা যাবে। ‘আদালত অবমাননা’ সম্পর্কে কি কোনো আইন আছে? ইংরেজ আমলে ঔপনিবেশিক শাসক ও শাসন ব্যবস্থাকে রক্ষার জন্য একটি আইন আছে যেটা ১৯২৬ সালের আইন নামে পরিচিত। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সুপারিশে প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন ২০০৮ সালে একটি নতুন হুকুম জারি করেন। এটা আদালত অবমাননা সংক্রান্ত ২০০৮ সালের হুকুম। ‘হুকুম’ এ কারণে যে, প্রেসিডেন্টের হুকুমে জারি করা হয়েছিল। এটা সম্ভব হয়েছিল এ কারণে যে, সেনা সমর্থিত সরকার মূলত সুশীল সমাজেরও সরকার ছিল, এই সত্য ভুলে গেলে চলবে না। সুশীলরা অগণতান্ত্রিক সরকারের আমলে আদালতের ক্ষমতা হ্রাস করার একটা উদ্যোগ নেয় এবং সাময়িক সফলও হয়।

কিন্তু ২৪ জুলাই ২০০৮ তারিখে আদালত অবমাননা সংক্রান্ত আইন আদালতে একটি রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে বাতিল হয়ে যায়। বিচারপতি খায়রুল হক ও বিচারপতি আবু তারিক আদালত অবমাননা সংক্রান্ত আইন বাতিল করে দেন। তাদের যুক্তি ছিল এই আইন ‘অবৈধ’ (illegal) এবং প্রেসিডেন্ট সংবিধানে দেওয়া তার ক্ষমতা অতিক্রম (ultra vires) করে গিয়েছেন। এরপর থেকে আদালত অবমাননা সংক্রান্ত কোনো আইন আদৌ বহাল আছে কিনা এটাও প্রশ্নাত্মক বা বিতর্কিত রয়ে গিয়েছে। ফলে কী ধরনের লেখালেখিতে ‘আদালত অবমাননা’ হয় আর কীসে হয় না, এটা নির্ধারণ করার একচ্ছত্র এখতিয়ার আদালতের হাতে ঘনীভূত হয়েছে। এক্ষেত্রে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণের ক্ষেত্রে আদালতকে নিরস্ত করা যায় এমন কোনো আইন নেই। তদুপরি কাকে কিভাবে কোন মাত্রায় শাস্তি দেওয়া হবে সেই অসীম ক্ষমতাও আদালতের হাতেই ন্যস্ত। আদালত এই ক্ষমতার জায়গায় দাঁড়িয়েই প্রথম আলোর সম্পাদক ও একজন প্রতিবেদককে তলব করেছে।

তাহলে এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার থাকা উচিত যে, সংবিধান বললেও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ দ্বারা আদালত অবমাননা সংক্রান্ত কোনো আইন ‘আরোপিত’ হয়নি। সেই আরোপ যুক্তিসঙ্গত নাকি অযৌক্তিক সেই তর্কেরও কোনো সুযোগ, আফসোস আমাদের নেই। আমরা সকলেই মাহমুদুর রহমান থেকে মতিউর রহমান সকলেই মহামান্য আদালতের কাছে জিম্মি হয়ে আছি। এই হল আমাদের আদালত, এই আমাদের গণতন্ত্র।
প্রতিটি নাগরিককে নির্বাহী বিভাগ ও জাতীয় সংসদের অন্যায় ও নির্যাতন থেকে রক্ষা বিচার বিভাগের প্রধান দায়িত্ব। এই অর্থেই বিচার বিভাগ অন্য দুই বিভাগ থেকে ‘আলাদা’। এই ভিন্নতা ও পার্থক্য ফাংশানাল, সেটা কাজের ক্ষেত্রের পার্থক্য। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গেরই ক্ষমতার উৎস জনগণ। সেই ক্ষমতা অখণ্ড ও অবিভাজ্য। অতএব বিচার ব্যবস্থার ‘স্বাধীন’ কোনো ক্ষমতা নাই। গণতন্ত্রে বিচার বিভাগ অবশ্যই জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। এই জবাবদিহিতার ওপর বিচার বিভাগের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মাত্রা নির্ভর করে। বিচার বিভাগ সেটা প্রদর্শন করে জনগণের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে দৃঢ় ও অবিচল থেকে। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই জাতীয় সংসদ ও নির্বাহী বিভাগের বিপরীতে বিচার বিভাগ সরাসরি জনগণের গণতান্ত্রিক ইচ্ছা ও সংকল্পের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। বিচার বিভাগকে জাতীয় সংসদের মতো নির্বাচিত হয়ে দাবি করতে হয় না যে, বিচারকরা মূলত জনগণেরই প্রতিনিধি। তাদেরই রক্ষক। যদি বিচার বিভাগ জনগণের সঙ্গে এই সম্পর্কের জায়গাটায় ক্ষয় ঘটায়, রাষ্ট্রের নির্বাহী কিংবা আইন প্রণয়নী সংস্থার দাসানুদাস হয়ে যায়, তখন সেটা রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ বিপদ তৈরি করে। বিচার বিভাগ যদি নাগরিক ও মানবিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে, রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, যদি নাগরিকের মর্যাদার হানি ঘটায়, তাহলে বিচার বিভাগ একই সঙ্গে বৈচারিক কর্তৃত্ব হারায়। বিচার বিভাগের ক্ষমতা নামক কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। তাকে নির্বাহী বিভাগের হুকুম তামিল করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

ক্ষমতার দিক থেকে রাষ্ট্রের কোনো বিভাগই নিজেকে ‘স্বাধীন’ দাবি করতে পারে না। ‘স্বাধীন’ বিচার বিভাগ কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নামক অশ্বডিম্ব দুনিয়ার কোত্থাও কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাই। আমরা বাংলা ভাষায় ইংরেজি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ কথাটিকে ‘স্বাধীন’ অনুবাদ করি বলে এই বিপদ ও বিপর্যয় তৈরি হয়। ইংরেজি Independent মানে ‘স্বাধীন নয়, অন্যের ওপর ডিপেন্ডেন্ট বা নির্ভরশীল নয়, এই অর্থে বিচার বিভাগ নিজের অধীন। তাকে নির্বাহী বিভাগ বা জাতীয় সংসদের হুকুম তামিল করতে হয় না। রাষ্ট্রের অন্য দুই অঙ্গের ওপর বিচার বিভাগ নির্ভরশীল নয়, এই অর্থে অনেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কথাটা বলেন। কিন্তু ‘স্বাধীনতা’ বলতে আমরা যা বুঝি তাতে একটা গোলমাল লেগে যায়। পাশ্চাত্যেও ইন্ডিপেন্ডেন্ট কথাটা গোলমাল পাকায়, তাই কথাটা পরিষ্কার করার জন্য রাষ্ট্রের অন্য দুই বিভাগ থেকে ‘আলাদা’ বা ‘পার্থক্য’ কথাটার ওপর জোর দেওয়া হয়। যেমন separation of judiciary বা ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় অর্থে separation of power কথাটা বলা হয়। এই অর্থেই কাজের দিক থেকে রাষ্ট্রের অন্য দুটি বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ স্বাধীন। কিন্তু জনগণের গণতান্ত্রিক ক্ষমতা কিংবা গণতান্ত্রিক ইচ্ছা ও সংকল্পের অধীন থেকেই বিচার বিভাগকে কাজ করতে হবে। বিচার বিভাগ কোনো আসমানি প্রতিষ্ঠান নয় এবং কোনো বিচারকই ঐশ্বরিক গুণাবলীর অধীন নন। কেউই ফেরেশতা নন। যদিও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ত্রিদলীয় জোটের রূপরেখা এবং পরবর্তী কালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বিচারকদের রীতিমতো ফেরেশতাদের সমতুল্য করে ফেলা হয়েছিল। তারা ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবার যোগ্যতা যেন আর কোনো নাগরিকের নাই বা থাকে না। বাংলাদেশে বিস্ময়কর রাষ্ট্রচিন্তা ও বিচারকদের সম্পর্কে মিথ বা ধারণা নিয়ে চমৎকার নৃতাত্ত্বিক গবেষণা হতে পারে। ভাগ্য ভালো যে, ইহলৌকিক সত্তাগুলো মাটির পৃথিবীতেই নেমে আসছে। আমরা তত্ত্ব দ্বারা না বুঝলেও এতদিনে অভিজ্ঞতা দ্বারা সেটা বুঝেছি, আশা করি।

আদালত অবমাননা নিয়ে আমাদের অবশ্যই তর্ক-বিতর্ক আলাপ-আলোচনা দরকার। কিন্তু সেটাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে, এটাই হচ্ছে বিপদের জায়গা। এখন আদালত এমন এক সাংবাদিককে তলব করেছেন, যার লেখা পড়লে মনে হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যার সকল মূল বুঝি আইন ও আদালতের মধ্যে। বিচার বিভাগই আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে। বাংলাদেশে সঠিক রাজনৈতিক চিন্তার দরকার নাই, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সমাজে আন্তরিক তর্ক-বিতর্কেরও দরকার নাই। গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার পক্ষে লড়াই-সংগ্রামেরও কোনো প্রয়োজন নাই। সব কিছুরই সমাধান হবে আইন ও আইনের শাসনের দ্বারা। আইনের শাসন কথাটা তখনই অর্থপূর্ণ হতে পারে, যদি রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয় এবং নাগরিক ও মানবিক অধিকারের ওপর রাষ্ট্র গঠিত থাকে। যেখানে খোদ ভিত্তিটাই ঘুণে ধরা সেখানে আইন মানে কালো আইন। আইনের শাসন মানে কালো আইনের শাসন। এই পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগকে দোষ দিয়ে কী হবে? কারণ রাস্তার লড়াই-সংগ্রাম তো বিচার বিভাগ করবে না। কিন্তু এই সকল পত্রিকা এবং সুশীল সমাজের প্রধান অংশই রাজনীতি বিরোধী, রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম বিরোধী। তাদের ধারণা, পাশ্চাত্যে গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক বিচার বিভাগ ভদ্রলোকদের শান্তির পতাকা হাতে কায়েম হয়েছিল। বহু রক্তে ও বহু শহীদের প্রাণের বিনিময়ে তা অর্জন করতে হয়েছে। আমরা যে পর্যায় এখন পেরুচ্ছি।

শান্তি চাইলেও শান্তিতে থাকা যায় না, আদালত অবমাননার তলব পেয়ে যদি ‘আইনের শাসন’ নামক ধারণা সম্পর্কে আমাদের হুঁশ হয়, তাহলে আমরা সম্ভবত কিছুটা এগিয়ে যাব। আইনের শাসনের মধ্যে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের ধারণা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। রাজনীতি বাদ দিয়ে আইনের অস্ত্র প্রয়োগ করে এবং বিচার বিভাগকে দিয়ে গণতন্ত্র কায়েম হয় না।
অন্যায়ভাবে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখনও অন্যায়ভাবে তাকে বিনা বিচারে আটকে রাখা হয়েছে। আমরা সকলেরই মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা প্রথম আলোর মত প্রকাশের স্বাধীনতারও পক্ষে। অবশ্যই। কোনো শর্ত ছাড়াই। তারা যেহেতু তারা সাংবাদিকতায় মিথ্যাচার করে, প্রোপাগান্ডা চালায়, বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থের তারা রক্ষক, নিজের উস্কানি নিজে চোখে না দেখলেও অন্যের মত প্রকাশকে তারা ‘উস্কানি’ বলে চিহ্নিত করে এবং একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদককে তারাও ‘বাইচান্স এডিটর’ বলতে দ্বিধা করে না সত্ত্বেও আমরা দৈনিক প্রথম আলোর মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিপক্ষে নই। স্বাধীনতার ঘোষণায় মানবিক মর্যাদা আমরা কায়েম করতে চেয়েছি। অতএব অন্যের বা অন্য কোনো নাগরিকের মর্যাদা ক্ষুণ্ন না করে প্রত্যেক নাগরিক চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিতভাবে উপভোগ করুক, আমরা এটাই চাই।
যুগান্তর, ০৪/০৩/২০১৪

Advertisements