Untitledবছরের পর বছর ভারতীয় রাজনীতিবিদরা গালাগাল করে আসছে, ‘গরীব বাংলাদেশিরা’ সীমান্তের কাটাতার অতিক্রম করে ভারতে অনুপ্রবেশ করছে, ওখানে কাজ করছে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করছে। তবে প্রকৃত তথ্য হচ্ছে, বাংলাদেশে কাজ করছে অন্তত ৫ লাখ ভারতীয়। তারা বছরে প্রায় ৩৭১ কোটি মার্কিন ডলার বা ৩০ হাজার কোটি টাকা ভারতে পাঠাচ্ছে। এশিয়ান ট্রিবিউনে ড. হাবিব সিদ্দিকীর লেখা Letter from America: Indian Expats in Bangladesh নিবন্ধে পড়ুন বিস্তারিত। ভাষান্তর করেছেন সাবিদিন ইব্রাহিম;

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে গিয়ে বিশ্বায়নের প্রকৃত রূপ দেখলাম। দেখলাম বাংলাদেশের বিখ্যাত সব বাড়ি নির্মাণ কোম্পানিগুলোতে কয়েকজন ভারতীয় প্রকৌশলীকে। আমার আরেক বন্ধু চট্টগ্রামে জাহাজ-নির্মাণ শিল্পে কাজ করছে এমন ভারতীয় প্রকৌশলীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এর আগে কয়েক বছরে আমি দেখেছি ভারতীয়রা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও এনজিওতে কাজ করছে। কিন্তু আমি জানতাম না কতজন ভারতীয় বাংলাদেশের ভেতর কাজ করছে এবং এরা যে খুব ভালোই উপার্জন করছে এটাও জানতাম না।

আপনি যদি আপনার মাতৃভূমি থেকে দূরে যান তাহলে দেখবেন যে কোন দেশের কর্মশক্তিতে অনেক বিদেশি যুক্ত থাকে। এটা পৃথিবীর সকল দেশের জন্যই সত্য। শুধু ব্যতিক্রম হচ্ছে মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়া। বিশ্বের কিছু অংশে বিশেষ করে আরব উপসাগরের সমৃদ্ধশালী দেশগুলোতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চেয়ে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। এ রকম একটি বৈশ্বিক চিত্র আমাদের বিস্মিত করা উচিত নয়। কারণ পৃথিবী এখন এমন বিশ্বায়নের শিকার হয়েছে, যা সমগ্র ইতিহাস একসাথে করলেও বেশি হবে।

আসলে মানুষ এখন তা-ই করছে যা তাদের পূর্ব পুরুষেরা শুরু করেছিল- সেই আদম-হাওয়া থেকে। মানুষ অসংখ্য কারণেই একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত হয়। এই গ্রহের প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ অর্থাৎ প্রতি সাতজনে একজন স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করে। এক্ষেত্রে যে বিষয়টা কাজ করে সেটা হলো ভালো সুযোগ-সুবিধা ও উন্নত জীবন যাপনের সন্ধান। এই দেশান্তরের ঘটনায় জন্মভূমি এবং কর্মস্থলের দেশ দুটোরই উন্নয়নের উপর প্রভাব পড়ে, দারিদ্র্য বিমোচন ঘটে।

পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা পৃথিবীর সেরা মেধাগুলোকে তাদের নিজের দেশে নিয়ে যায়। বিভিন্ন গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান বহুদূর। অধিকাংশ উদ্ভাবনের ব্যাপারই ঘটে এই সব দেশান্তরী মানুষগুলোর মাধ্যমে। এর মাধ্যমে এরা ওই দেশটির অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে।

জাতিসংঘের মতে, ২০১৩ সালে ২৩ কোটি মানুষ তার জন্মভূমি ছেড়ে অন্য দেশে বাস করছে। এটা বিস্ময়ের ব্যাপার নয় যে তারা তাদের মাতৃভূমিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠান। সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে আছে- ভারত (৭১ বিলিয়ন), চীন (৬০ বিলিয়ন), ফিলিপাইন (২৬ বিলিয়ন), মেক্সিকো (২২ বিলিয়ন), নাইজেরিয়া (২১বিলিয়ন), মিসর (২০বিলিয়ন)। এ তালিকায় আরও আছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ইউক্রেন।

বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলেও এই রেমিটেন্সের প্রবাহ বাড়তেই থাকবে। ২০১৪ সালে মোট রেমিটেন্স প্রবাহ ৫৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৪৪৯ বিলিয়ন ডলারই যাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। ২০১৬ সালেই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই রেমিটেন্সের প্রবাহ বেড়ে ৫৪০ বিলিয়ন ডলার হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেমিটেন্স সংগ্রহকারী দেশ। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১২ সালে ভারত ৬৯ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স সংগ্রহ করে।

আর যেটা বাংলাদেশিদের বিস্মিত করবে তা হলো বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতে পঞ্চম রেমিটেন্স সরবরাহকারী দেশ! অর্থাৎ ভারত যে দেশগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স সংগ্রহ করে থাকে তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। সবচেয়ে রেমিটেন্স সরবরাহকারী ১৫টি দেশের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব এবং যুক্তরাজ্যের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।

১. সংযুক্ত আরব আমিরাত: আরব আমিরাতে কয়েক মিলিয়ন ভারতীয় অবস্থান করছে। তারা প্রধানত দুবাই, আবুধাবী ও শারজাহতে অবস্থান করে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভারতীয়রা সংযুক্ত আরব আমিরাতে যেতে আগ্রহী কারণ ওখানে বিভিন্ন ধরনের কাজের সুব্যবস্থা আছে। বিশেষ করে তেল কোম্পানি, নির্মাণ ও অন্যান্য শিল্পে ভারতীয়রা কাজ করে থাকে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১৪.২৫৫ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স সংগ্রহ করেছে ভারত।

২. যুক্তরাষ্ট্র: ভারত ১০.৮৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স সংগ্রহ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

৩. সৌদি আরব: ১০ লাখেরও বেশি ভারতীয় সৌদি আরবে কাজ করেন। বছরে তারা ৭.৬২১ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠান নিজ দেশে।

৪. যুক্তরাজ্য: প্রবাসী ভারতীয়রা যুক্তরাজ্য থেকে বছরে ৩.৯০৪ বিলিয়ন ডলার পাঠান তাদের নিজ দেশে।

৫. বাংলাদেশ: বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ ভারতীয় অবস্থান করছে বলে খবরে প্রকাশ হয়েছে। এরা ভারতে ৩৭১.৬ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। এটা আগামী কয়েক বছরে আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

‘দি সিলিকন ইন্ডিয়া নিউজ’র প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, যেসব ভারতীয়রা বাংলাদেশে অবৈধভাবে বসবাস করছে তাদের বেশিরভাগই পশ্চিমবঙ্গ মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম থেকে আসা।

সরকারি তথ্যমতে, অধিকাংশই কাজের সন্ধানে আসে এবং তারা বেশিরভাগই কাজ করে এনজিও, গার্মেন্টস এবং টেক্সটাইল শিল্পে। এসব ভারতীয়রা তাদের নিজ দেশে ৩৭১.৬ কোটি মার্কিন ডলার রেমিটেন্স পাঠায় এবং এই রেমিটেন্স পাঠানোর পরিমাণটা আগামী কয়েকবছরে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

তার মানে হচ্ছে, অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থানকারী এই অর্ধ-মিলিয়ন ভারতীয় তাদের নিজ দেশে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছে। এটা খারাপ সংখ্যা নয়, ভারতের মোট রেমিটেন্সের প্রায় ৫ শতাংশ যাচ্ছে এই ‘পুওর বাংলাদেশ’ (গরিব বাংলাদেশ) থেকে!

আমার শৈশব থেকেই বাংলাদেশের অনেক হিন্দুকে দেখেছি যারা ভারতের প্রতি অনুগত এবং তারা তাদের সম্পদ ও কষ্টে উপার্জিত অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে তাদের পরিবারের কাছে পাঠাচ্ছে যারা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয় এবং আসামে থাকে।

সে যাই হোক, বিশ্ব ব্যাংকের রেমিটেন্স নিয়ে বিবৃতি দেখার আগ পর্যন্ত আমার কোনো ধারণাই ছিল না যে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাচ্ছে। খুব অদ্ভূত ব্যাপার হলো- এই যে বছরের পর বছর ভারতীয় রাজনীতিবিদরা এই গালাগাল করে আসছে যে ‘গরিব বাংলাদেশিরা’ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে অনুপ্রবেশ করছে, ওখানে কাজ করছে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

মনে হচ্ছে যেন বাংলাদেশে কাজের সুযোগ নেই। কিন্তু এটা খুব অবাস্তব চিত্রায়ন হবে। কারণ অধিকাংশ চাকরিতেই বাংলাদেশে সীমান্তবর্তী রাজ্যসমূহের চেয়ে বেশি মজুরি দেয়া হয়। তাছাড়া মানুষ প্রতিকূল পরিবেশে মাইগ্রেট করে না। আর যেখানে পূর্বের জায়গা থেকে বেশি টাকা পাওয়া যাবে না সেখানে যাওয়ার কোনো কারণই থাকার কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশে কতজন ভারতীয় অনুপ্রবেশ করছে সেটা সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানছি।

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীরা বেশ আনন্দের সাথে বাংলাদেশিদের উপর গুলি করছে। এমনকি নো ম্যানস ল্যান্ডেও গুলি করছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা ভারতে অনুপ্রবেশ করছে। এখন আমরা ভালোই বুঝতে পারছি কারা অনুপ্রবেশ করছে!

আমরা অনেকবারই দেখেছি নামে সেক্যুলার ভারত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অ-সেক্যুলারের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যালঘুদের রক্ষায় তাদের রেকর্ড ভালো নয়। দাঙ্গা-হাঙ্গামা এই বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশটির নিয়মিত চিত্র। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই দাঙ্গা-হাঙ্গামার নেতৃত্ব দেয় আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ যেগুলো বিজেপির পিতৃ-মাতৃ সংগঠন। বিজেপি এর আগেও ক্ষমতায় ছিল এবং ২০১৪ সালে এরা ক্ষমতায় আসছে এটা মোটামুটি নিশ্চিত।

গত বছর মোজাফফর নগরে আমরা ভারতের সংখ্যালঘু হত্যার ভয়ানক চিত্র দেখেছি। প্রায় ৪ ডজনের মত মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে এবং কয়েক হাজার মুসলমান তাদের গ্রামে ফেরত যেতে ভয় পাচ্ছে। উত্তর প্রদেশে শুধু এক বছরেই ১০০ টিরও বেশি দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছে।

একটি তদন্তে দেখা গেছে, বেশিরভাগ দাঙ্গাতেই বিজেপির হাত আছে। বিজেপির স্থানীয় নেতারা গ্রামগুলোতে ‘পঞ্চায়েত’ ও ‘মহা-পঞ্চায়েত’ আয়োজন করে এবং মুসলিম বিদ্বেষী কথা-বার্তা ছড়ায়। ওই গ্রামগুলোর বিভিন্ন সভাতে দেখা গেছে, বিজেপির নেতাকর্মীরা নরেন্দ্র মোদির নামে স্লোগান দিচ্ছে এবং ‘গো-হত্যা’র জন্য মুসলিমদের বিপক্ষে স্লোগান দিচ্ছে।

২০১২ সালে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী আসাম প্রদেশে ৫০ জনেরও বেশি মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে এ রকম হত্যাকাণ্ড বেড়ে যেতে পারে। কারণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে এ রকম দাঙ্গা রাজনীতিবিদদের ভোট ব্যাংকের হিসাব পরিবর্তন করে দেয়।

বাংলাদেশে ভারতীয়দের অনুপ্রবেশ এবং তাদের পাঠানো রেমিটেন্সের কথা পৌঁছিয়ে দিতে ভারতীয় রাজনীতিবিদরা ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশের সরকার ও রাজনীতিবিদদের এই খবরটি তাদের জনগণকে জানিয়ে রাখা উচিত। এই সত্য ছড়িয়ে দিলে সম্ভবত ভারতের ভেতরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা খানিকটা কমে যাবে।

সূত্র: এশিয়ারট্রিবিউন, আরটিএনএন

Advertisements