বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কী রাজনীতিতে ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে? প্রথম ও দ্বিতীয় দফা উপজেলা নির্বাচনে দলটির নজিরবিহীন সাফল্যের পর এখন চারদিকেই এই প্রশ্ন।

তবে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বিতর্কেরও শেষ নেই। জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে বিতর্ক হয়, তীব্র বিতর্ক আছে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে দলটির ভূমিকা নিয়েও।

১৯৭১ সালে জামায়াতের অবস্থানের কারণে এখন দলটির প্রায় সব শীর্ষ নেতাই হয় দণ্ডিত, না হয় বিচারের মুখোমুখি। তবে জামায়াত নেতাদের দাবি, উভয় ক্ষেত্রেই তারা বৈরী প্রচারণার শিকার।

বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী একমাত্র দল যেটি কখনো ক্ষমতায় না থাকলেও সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয় এই দলটিকে নিয়ে। একবার এক গবেষক তো  পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে, এদেশে কখনো সরকারি বা প্রধান বিরোধী দলে থাকার সুযোগ না পেলেও জামায়াতের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি হরতাল হয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতির ময়দান কখনোই মসৃণ ছিল না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরই জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়। স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান দলটির কয়েক শীর্ষ নেতা। এরপর রাজনীতির পট পরিবর্তন হলে জামায়াত রাজনীতি করার সুযোগ পায়। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর আবার জামায়াতের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

তখন জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রচারণা কার্যত তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। মূলত ঘাদানিকের প্রচারণার কারণেই অনেক লোক জামায়াত সম্পর্কে আগ্রহী হয় এবং জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তিও বেশ খানিকটা মজবুত হয়। যেমনটা হয়েছে পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণার ক্ষেত্রে। ইসলামের বিরুদ্ধে ক্রুসেড পরিচালনা করতে গিয়ে এখন পশ্চিমা বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যাদের একটা বড় অংশই ধর্মান্তরিত মুসলমান।

এভাবে দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকার পর জামায়াত প্রথম সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে। এর আগে জামায়াতের পরিচিত ছিল শুধু দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থি দল হিসেবে। কিন্তু ওই নির্বাচনের পর দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের স্বীকৃতি পায় জামায়াত। তখন জামায়াত ১৭টি আসনে জয়ী হয়। এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসন পেয়ে বসে চতুর্থ স্থানে।

এই নির্বাচনের পর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মত সরকারের শরিক হয় জামায়াত। তখন অনেকেই মন্তব্য করেন যে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজের আসন মজবুত করে নিচ্ছে জামায়াত।

তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর জামায়াতের রাজনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসে। তখন মাত্র ২টি আসন পায় জামায়ত। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবার নিজের জায়গা দখল করে জাতীয় পার্টি।

২০০৮ সালের পর থেকেই জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসে সবচেয়ে দুঃসময় নেমে আসে। গত ৫ বছর কার্যত রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা হয় জামায়াতকে। সর্বশেষ হাইকোর্ট এক রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে।

গত ৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সাঁড়াশি আক্রমণের শিকার জামায়াত আর মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন অনেকে। যারা জামায়াতকে  ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন তাদেরও অনুমান ছিল যে, এই দলটি অন্তত ১০ বছর পিছিয়ে গেছে।

তবে সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচনে বিশ্লেষকদের সেই অনুমান ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচনে অকল্পনীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে জামায়াত। জামায়াতের সাফল্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগকেও ছাড়িয়ে গেছে।

দুফায় ৫৮টি উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী দিয়ে জামায়াত জিতেছে ২১টিতে। এক্ষেত্রে তাদের সাফল্যের হার আওয়ামী লীগের  প্রায় সমান (আওয়ামী লীগের সাফল্য ৩৭% এবং জামায়াতের ৩৬%) ।

অন্যদিকে, ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ) পদে জামায়াতের সাফল্য আওয়ামী লীগকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম দফায় জামায়াত আওয়ামী লীগের চেয়ে মাত্র একটি কম উপজেলায় জয়ী হয়েছে (আওয়ামী লীগ পেয়েছে ২৪টি, জামায়াত ২৩টি)। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় আওয়ামী লীগকে ছাড়িয়ে গেছে জামায়াত। জামায়াত জিতেছে ৩০টিতে কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জিতেছে ২৮টি করে উপজেলায়।

নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদেও ভাল করেছে জামায়াতে ইসলামী- যে দলটিকে নারীবাদীরা নারীবিদ্বেষী এবং মৌলবাদী বলতেই বেশি ভালোবাসে।

দ্বিতীয় দফার উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের ৩০ জন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে, ৫৩ জন প্রার্থী ভাইস চেয়ারম্যান পদে এবং ১৬ জন প্রার্থী সংরক্ষিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

কোন জাদুর কাঠিতে জামায়াত এই সাফল্য পেয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে যেটা নিয়ে দৃশ্যত কোনো বিতর্ক নেই তা হলো অগ্নিপথ পাড়ি দিতে দিতেই দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে উত্থান হচ্ছে জামায়াতের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জামায়াতের এই সাফল্য নিয়ে বিশ্লেষণে রাজি নয়। তবে অধ্যাপক আসিফ নজরুল কিংবা সম্পাদক নুরুল কবিরের মত স্পষ্টভাষী বিশ্লেষকরা জামায়াতের এই সাফল্যের জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করেছেন।

আফিস নজরুলের মতে, নির্বাচনে জামায়াতের ভালো করার কারণ দলটির ওপর সরকারের নির্যাতন। আর নুরুল কবিরের মতে, ইসলাম ধর্ম এবং ইসলামী রাজনীতি সম্পর্কে আওয়ামী লীগের ভ্রান্তনীতি।

জনমত জরিপে যেমনটা হয়, হাজার দুয়েক লোকের মতামত নিয়ে তা ২০ কোটি, ৫০ কোটি কিংবা ১০০ কোটি মানুষের মতামত বলে চালিয়ে দেয়া হয়। জামায়াতের ব্যাপারটি কিন্তু ঠিক তেমন নয়। প্রায় পৌনে চার কোটি ভোটারের ভোটেই জামায়াত এখন দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল।

দেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি বলে একটা কথা দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত আছে। একটি তৃতীয় বিকল্প চাচ্ছেন অনেকেই। কিছুদিন আগে এরশাদ দাবি করেছিলেন, তার দলই তৃতীয় শক্তি। তখন তার এই দাবি কেউ বিশ্বাস করেনি। এখন তো গাণিতিকভাবেই প্রমাণিত যে জামায়াতই দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বা তৃতীয় শক্তি, জাতীয় পার্টি নয়।

নুরুল কবির যেমনটা বলছেন, জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ বলে আর কিছু নেই। ফলে রাজনীতিতে জামায়াত যে তৃতীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে সেটি নিয়ে সম্ভবত খুব বেশি বিতর্ক নেই।

কার্টুন: আমার দেশ অনলাইনের সৌজন্যে

সূত্র: আরটিএনএন

Advertisements