Goutom Dasগৌতম দাস:
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে জামাতের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশের ইসলামী ছাত্রশিবিরকে দুনিয়ার এই মুহূর্তে শীর্ষ দশ অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গ্রুপের তালিকার (Top 10 most active non-state armed groups in 2013) মধ্যে তিন নম্বরে রেখে এই সংগঠনটি একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এটা নাকি কেবল গত বছরের প্রবণতা লক্ষ্য করে বানানো তালিকা। কিন্তু কিসের, কোন ফ্যাক্ট বা ফিগারের ভিত্তিতে বা কোন মানদণ্ডে তাদের এই সিদ্ধান্ত তার কোন হদিস জানা যায় না। ফলে এই নাম অন্তর্ভুক্তি পক্ষপাতদুষ্ট বা খামখেয়ালিপনা বলে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এতে পরিষ্কার। কিন্তু যেটা বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হোল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের এই যুগে এই ধরনের তালিকার মধ্যে নাম ঢোকানোর পেছনকার কারসাজি। এই ক্ষেত্রে এক ধরনের জবরদস্তি কাজ করেছে, সন্দেহ নেই।দুনিয়াতে বহুবার বহু ধরনের গ্লোবাল সশস্ত্র রাজনৈতিক ফেনোমেনার জোয়ার উঠতে দেখা গিয়েছে। আবার সময়ে তা ভাটা পড়তেও দেখা গিয়েছে। তবে গত ২০০১ সালের ৯/১১ এর পর থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে রাষ্ট্র নয় এমন গ্লোবাল সশস্ত্র রাজনৈতিক ফেনোমেনাটা হচ্ছে আল কায়েদা। সশস্ত্র সংগঠনের তালিকায় তারা নিজেদের অবস্থান সব সময়ই পাকাপোক্ত রেখেছে। এখনও অবধি এর রাজনৈতিক কেন্দ্র এক জায়গায়। কিন্তু কাজের ক্ষেত্র ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো কেন্দীভূত নয়। সেটা করা হয় আলাদা সংগঠনের মাধ্যমে, মাঠে শত্রু নির্বাচন ও দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মোকাবিলার মধ্য দিয়ে। যারা আল কায়েদার তৎপরতার ওপর নজর রাখেন তারা একটি বিষয়ে একমত যে নীতির বদল না হলেও আল কায়েদার কর্ম তৎপরতার কৌশলে পরিবর্তন ঘটেছে। সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

গত তের বছরের পশ্চিমা বয়ানে ‘সন্ত্রাস’ (Terrorism and Insurgency) শব্দটি আলকায়েদা ধরনের তৎপরতা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। পশ্চিমা প্রপাগান্ডার জন্য এতে সুবিধার দিক হোল ‘আল কায়েদা’ যতোটা নয়, তার চেয়েও অনেক বেশী ইসলামকে বিশেষভাবে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচারের সুবিধা। বলার অপেক্ষা রাখে না চলতি সময়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ‘সন্ত্রাস’ এর এক নম্বর অবস্থান দখল করছে আল কায়েদা। তফাত খালি এটুকুই যে এটা আর কোনো আল কায়েদা কেন্দ্র না থেকে সিরিয়ার ‘সন্ত্রাস’, ইরাকের ‘সন্ত্রাস’, পশ্চিম আফ্রিকার ‘সন্ত্রাস’  এভাবে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। দেশের নামে হলেও দুনিয়াব্যাপী বিচারে এখনও শীর্ষ অবস্থান আলকায়েদার, বিভিন্ন দেশীয় তৎপরতারই কোনো একটা। এই মুহূর্তে এর শীর্ষ নাম সম্ভবত সিরিয়া, সিরিয়ান জাবেত আল নুসরাত গ্রুপ নামে যা পরিচিত।

২. দশ শীর্ষ বলে সাজানো হয়েছে কিন্তু শীর্ষকে রাখা হয়েছে নবম স্থানে
জেনস সেন্টারের এই রিপোর্টের শুরুতেও স্বীকার করে বলা হয়েছে ‘Terrorism spike seen in Arab Spring countries; Attacks in Syria almost double in one year’। অর্থাৎ গত এক বছরে টেররিজমের কামড় দেখা গিয়েছে আরব স্প্রিং ঘটা দেশগুলোতে, আর সিরিয়ার সন্ত্রাসী হামলার বৃদ্ধি ঘটেছে দ্বিগুণ। এই হিসাবে সিরিয়ান গ্রুপ জাবাত আল-নুসরা’র নাম থাকার কথা শীর্ষ দশ সংগঠনের নামের প্রথমে। কিন্তু রাখা হয়েছে নয় নম্বরে। নিচে দেখুন। অর্থাৎ নিজেই নিজের রিপোর্টের শুরুতে যা বলেছে এর উল্টাটা করেছে তালিকা সাজানোর সময়। দেখুন: Top 10 most active non-state armed groups in 2013 ২০১৩ সালের শীর্ষ দশ অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গ্রুপ;

1. Barisan Revolusi Nasional (Thailand)
2. Taliban
3. Islami Chhatra Shibir (Bangladesh)
4. Communist Party of India – Maoist
5. Al-Qaeda in Iraq
6. Harakat al-Shabaab al-Mujahideen (Al-Shabaab)
7. FARC (Colombia)
8. New People’s Army (Philippines)
9. Jabhat al-Nusra (Syria)
10. Unified Communist Party of Nepal – Maoist

৩. হামলার প্রধান নির্দেশিকাতে (Key Attack Index) দক্ষিণ এশিয়াই নেই অথচ সংগঠনের তালিকা করার সময় আছে বাংলাদেশ
ওই রিপোর্টেই একটু পরে আছে, Key highlights from the IHS Jane’s 2013 Global Terrorism & Insurgency Attack Index। অর্থাৎ চোখে পড়ার মত সন্ত্রাসী আক্রমণের নির্দেশিকা বা সূচক বলে যে পাঁচটা ফেনোমেনাকে উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো;

ক। Global: Significant rises in global militant and non-militant fatalities

খ।  Arab Spring countries see attacks spike

গ।  Syria: Attacks almost double between 2012 and 2013

ঘ। Iraq: Suicide attacks quadruple and Al-Qaeda in Iraq re-enters the top five most active non-state armed groups in the world

ঙ।  Sub-Saharan Africa: Terrorism fatalities rise

এই পাঁচটার প্রথমটা গ্লোবাল বা সামগ্রিক দিক থেকে, আর বাকি চারটা দেশ বা অঞ্চল হিসাবে; আঞ্চলিক ভাগ হল, ‘সন্ত্রাস’, আরব স্প্রিং এর দেশগুলো, এরপর সিরিয়াকে আলাদা করে, এরপর ইরাক আর সবশেষে সাব-সাহারান আফ্রিকা অর্থাৎ, সোমালিয়া থেকে শুরু করে মালি, নাইজিরিয়া পর্যন্ত দেশগুলো। তাহলে দেখা যাচ্ছে গত এক বছরের মুখ্য তৎপরতার স্থানের নির্দেশিকায় দক্ষিণ এশিয়ার নাম গন্ধ নাই, ফলে আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের নামও নাই। অর্থাৎ অন্যগুলো বা যা আছে তাদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য নয়।

তাহলে বাংলাদেশের ইসলামী ছাত্রশিবিরের নাম আসল কোথা থেকে? বোঝাই যাচ্ছে একটা ভুইফোঁড় ঘটনা ঘটেছে এখানে, বাইরে থেকে একটা নাম এনে জবরদস্তি ঢুকানো হয়েছে।

সার কথায়, এই রিপোর্ট নিজের Key Attack Index এর সাথে Top 10 most active non-state armed groups -এর তালিকার সঙ্গে কোন সামঞ্জস্য রাখেনি। যদি সন্ত্রাসী আক্রমণের নির্দেশিকাকে বিভিন্ন দেশ ও সংগঠনের ভূমিকার বিচারের মানদণ্ড ধরি তাহলে তালিকায় বাংলাদেশ বা শিবির অন্তর্ভুক্ত করারা কোনো যুক্তিই নাই। দক্ষিণ এশিয়া বা বাংলাদেশ ঘটনা হিসাবে না থাকলেও দশ শীর্ষ সংগঠনের তালিকায় বাংলাদেশ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নাম ঢুকানো নিছকই একটা জবরদস্তি। রাজনৈতিক বদ মতলব ছাড়া এর আর অন্য কোন তাৎপর্য নাই।

৪. শীর্ষ দশ সংগঠনের তালিকা বানাবার ক্রমিক নির্ণয়ের মানদণ্ডটাই ভিত্তিহীন
এই তালিকায় শীর্ষে রাখা হয়েছে থাইল্যান্ডের বরিসন গ্রুপের নাম। কোন ক্রম মেনে কার পরে কে হতে পারে তা ঠিক করার মানদণ্ড যে এখানে নাই, কাজ করেনি, তা স্পষ্ট।
কিছু অবিশ্বাস্য ও অসামঞ্জস্যপুর্ণ দিক এখানে তুলে ধরছি-

ক. একথা প্রতিষ্ঠিত এবং এই রিপোর্টও স্বীকার করে, দুনিয়া জুড়ে সন্ত্রাসী তৎপরতার শীর্ষে আছে আল কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত কোন না কোন দেশীয় গ্রুপ; যেমন, Jabhat al-Nusra (Syria), Al-Qaeda in Iraq, আফ্রিকার আল-শাবাব (Al-Shabaab) অথবা পাক বা আফগান তালিবান Taliban। এই চার সংগঠনের মধ্যে কোনটা গত বছর তৎপরতায় শীর্ষে ছিল তা নিয়ে তর্ক থাকতে পারে। এই রিপোর্টই সে তর্ক মিটিয়ে বলছে সিরিয়ার আল নুসরা শীর্ষে। তাহলে থাইল্যান্ডের বরিসন গ্রুপকে শীর্ষ স্থানে রাখা হচ্ছে কোন যুক্তিতে? আবার গত বছরের সক্রিয়তার দিক থেকে তালেবানের চেয়েও সক্রিয় ছিল সিরিয়ান আল নুসরা। এবং এখনও তাই। অথচ তালিবানের ভাগ্যে জুটেছে দ্বিতীয় অবস্থান আর আল নুসরার নবম স্থান।

খ. আবার এক তালিবান ছাড়া আলকায়েদা সংশ্লিষ্ট বাকি তিন সংগঠন জাবাত আল-নুসরা ( Jabhat al-Nusra – Syria, ইরাকের আল কায়দা (Al-Qaeda in Iraq) , আফ্রিকার আল শাবাব (Al-Shabaab)। অথচ দশ শীর্ষ তালিকায় এদের স্থান যথাক্রমে নবম, পঞ্চম ও ষষ্ঠ। ওদিকে ছাত্র শিবিরের স্থান নাকি তৃতীয় !!! অর্থাৎ এই রিপোর্ট দাবি করছে, গত বছর সংগঠন হিসাবে জাবাত আল নুসরা, ইরাকের আল কায়েদা ও আফ্রিকার আল শাবাবের চেয়েও ইসলামি ছাত্র শিবিরের তৎপরতা ভয়ংকর ছিল। এই ধরনের মূল্যায়ন দিবাস্বপ্ন কিম্বা উন্মাদ কল্পনাতেও আঁকা সম্ভব না।

গ. এই জাতীয় মৌলিক তথ্যের গরমিলে ভরা এই রিপোর্ট। এ রকমই আর একটা: সপ্তম নম্বরে রাখা হয়েছে কলম্বিয়ার FARC (Colombia) গেরিলাদের। ল্যাটিন আমেরিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বামপন্থী তবে ‘লিবারেশন থিওলজি’ অনুসরণ করা এই সশস্ত্র গ্রুপ বহু পুরানা, তাদের উত্থান আশির দশকে। কিন্তু সাম্প্রতিক খবর হল এরা কিউবার মধ্যস্থতায় গত প্রায় দুবছর ধরে বর্তমান কলম্বিয়া সরকারের সাথে আলোচনা নিগোশিয়েশন চালাচ্ছে। সামরিক তৎপরতা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত।

যারা আল জাজিরা টিভি ফলো করেন তারা কমবেশি এ ব্যাপারে আপডেটেড, অবগত। এখন এই গ্রুপের গত বছরের তৎপরতাকে কেন শীর্ষ সন্ত্রাসী তৎপরতায় আনা হল? শুধু তাই না, একে সপ্তম অবস্থানে রাখা হয়েছে। আর জীবন্ত জাবাত আল নুসরার (সিরিয়া) অবস্থান হল নবমে। কী মানে দাঁড়াল? সিরিয়ার আল নুসরার চেয়েও সক্রিয় ও জীবন্ত তৎপরতায় গত বছর জড়িত ছিল কলম্বিয়ার ফার্ক গেরিলারা! এটা কি বিশ্বাসযোগ্য একটা তথ্য?

কমবেশি ঠিক একই কাণ্ড করা হয়েছে নেপালের মাওবাদীদের প্রসঙ্গে। যদিও একে দশম স্থানে রাখা হয়েছে। কিন্তু এটা তো আদতে সামরিক দিক থেকে এখন সক্রিয় সংগঠনই না। গত চার বছর ধরে তাদের মূল অংশটাই আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সারেন্ডার করেছে, কর্মীরা সমাজে পুনর্বাসিত হয়েছে, দলের নেতারা নেপালে সরকার চালিয়েছে প্রায় একবছর, প্রাক্তন যোদ্ধাদের সামরিক বাহিনীতে নেয়া হবে কি না এ নিয়ে বিরাট রাজনৈতিক বিতর্ক উঠেছে ইত্যাদি। এরপর দল দুভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন অংশই সশস্ত্র তৎপরতায় ফিরে যাবে বা গিয়েছে এমন কোন খবর আমরা এখনও দেখিনি, জানা নাই। তারা আবার সামরিক কর্মকাণ্ডে তারা ফিরতে পারে কি? অবশ্যই পারে। কিন্তু জেনস সেনটারের এ তালিকা তো পটেনশিয়ালিটির তালিকা নয়, গত বছরের সামরিক তৎপরতায় কারা সক্রিয় ছিল তাদের তালিকা। এই তালিকায় নেপালের মাওবাদীদের নাম আসায় পাঠক নিজেই বিচার করতে পারেন এটা কতটা বেমানান।

৫. গণ-সাংগঠনিক তৎপরতা বনাম সশস্ত্র তৎপরতা
গণ-সাংগঠনিক কথার অর্থ হল যেখানে রাজনীতি হচ্ছে জনগণকে নিয়ে, অর্থাৎ রাজনৈতিক তৎপরতা হবে প্রকাশ্যে। তার চেয়ে বড় কথা, হবে দিনের প্রকাশ্য আলোয়, জনগণের সমাবেশ ও মিছিলে, সরব শ্লোগানে। কোন ধরণের ফায়ার আর্মস (বন্দুক , পিস্তল বা এর চেয়ে বড় গুলির ছোঁড়ার অস্ত্র অথবা গ্রেনেড) এখানে ব্যবহারের কথা চিন্তাও করা যাবে না। কারণ এখানে মূল লক্ষ্য শুধু জনমতকে প্রভাবিত করে নিজের গণদাবির পক্ষে আনা নয়, বরং জনগণ যেন নিজের তাগিদে মিছিল সমাবেশ মিটিংয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পূর্ব শর্ত হিসাবে এই প্রক্রিয়া গণশক্তি পরিগঠনের জন্যও অতি আবশ্যিক একটি প্রক্রিয়া। আর ফায়ার আর্মস আর জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ দুটো জিনিস পরস্পর বিরোধী। এই দুটো জিনিষ কখনও একসাথে এক পাত্রে থাকতে চায় না, স্বস্তিবোধ করে না। অতএব গণ-আন্দোলনের সীমা বা মাত্রার মানদণ্ড হোল, যতই পুলিশী বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন আসুক, ফায়ার আর্মস ছাড়া রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হবে। এজন্যই এটা মাস মুভমেন্ট। গণ আন্দোলন ও গণ সংগ্রাম। এটা কোন নৈতিক তর্ক নয়, রাজনৈতিক কৌশলের তর্ক নয়। এর মানে এই নয় যে সশস্ত্র সংরাম নিন্দনীয়। আন্দোলন শানিতিপূর্ণ ও অহিংস না হলে তাকে নিন্দা করতে হবে। রাজনৈতিক প্রশ্নকে নৈতিক প্রশ্নে রূপান্তর মুলত গণবিরোধী ও নিপীড়কের পক্ষাবলম্বন। যে কারনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি গান্ধির অহিংসাবাদ সমর্থন করতেন না।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির কথা ভেবে অনেকের মাথায় ককটেল বা ঘরে বসে বানানো বোমা প্রসঙ্গে বিভিন্ন প্রশ্ন কাজ করছে, তাই কিছু কথা বলা জরুরী মনে করছি। রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাস বিচার করলে প্রত্যেক দেশের গণ আন্দোলন গণ সংগ্রামের একটা নিজস্বতা বা ভিন্নতা থাকে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পক্ষাবলম্বনকারী কয়েকটি গণমাধ্যমের কারনে এ বিষয়ে ধোঁয়াশা তৈরী হয়েছে। মলোটভ ককটেল বা ঘরে বসে বানানো বোমা ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ধোঁয়া আর শব্দ সৃষ্টি করে পুলিশের সরাসরি গুলির বিরুদ্ধে পুলিশকে ভয় দেখিয়ে কিছুক্ষণ নিবৃত্ত রাখা। বাংলাদেশের গণ আন্দোলন, গণ আন্দোলনের সংস্কৃতির মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বাকশালি শাসনামলে জনগণ বাধ্য হয়ে এই ধরণের কৌশল অবলম্বন করেছিল। সেটা জিয়ার আমলেও চলেছে। এরশাদ যখন বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের দেখা মাত্রই গুলি করবার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারপর থেকে বাংলাদেশের গণ আন্দোলন গণ সংগ্রামে মলোটভ ককটেল ও ঘরে তৈরী বোমা অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে মোকাবিলার একমাত্র পথ হচ্ছে কথা বলা, মত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সভাসমাবেশে নিশ্চিত করা। কিন্তু কিছু গণমাধ্যম ক্ষমতাসীনদের হত্যাযজ্ঞের কোন সমালোচনা না করে ক্রমাগত গণ আন্দোলন গণ সংগ্রামকে ‘তাণ্ডব’, ‘সহিংসতা’,’সন্ত্রাস’ ইত্যাদি নানান ট্যাগ দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে আমরা ককটেল বা বোমাবাজির বিরুদ্ধে। কিন্তু, আগেই উল্লেখ করেছি, এটা আদর্শিক বা নৈতিক প্রশ্ন নয়, একান্তই রাজনৈতিক কৌশল। অভিজ্ঞতায় দেখা যায় গণ আন্দোলন গণ সংগ্রামে ককটেল বা ঘরে তৈরী বোমা ব্যবহার করলেও ন্যায়সঙ্গত দাবি দাওয়ার পক্ষে জন সমর্থন হ্রাস পাবার রাজনৈতিক বিপদ তৈরী হয়। অথচ গণ আন্দোলনের রাজনৈতিক ন্যায্যতা অর্জন করা জরুরী। আন্দোলন-সংগ্রামের দাবি দাওয়ার পক্ষে জনগণের ইচ্ছা ও সংকল্প প্রতিনিধিত্ব করবার ওপর এই ন্যায্যতা অর্জন নির্ভর করে। একই সঙ্গে যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যও এই বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যথাসম্ভব সহিংসতা পরিহার করা আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক চরিত্র দান করবার কর্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। চ্যালেঞ্জের দিক হোল আন্দোলনের চরিত্র ও মাত্রার গুণগত পরিবর্তনের মুহুর্তগুলো শনাক্ত করতে সক্ষম হওয়া। কারন একটা পর্যায়ে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তথাকথিত অহিংস, নিয়মতান্ত্রিক বা অহিংস আন্দোলনও রাজনৈতিক ন্যায্যতা হারায়। এই মুহূর্ত নির্ণয়ের কোন সাধারণ ফর্মূলা নাই। ক্ষেত্র বিশেষের বিচার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভজ্ঞতাই এই ক্ষেত্রে নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করে। একইভাবে আন্দোলনের জয় পরাজয়ও বটে।

অর্থাৎ তার মানে এই নয় যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন অহিংস থাকলেই তা গণতান্ত্রিক হবে, সহিংস হলে হবে না। একাত্তরে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম সশস্ত্র মুক্তি যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। আমরা কেউ নিশ্চয় বলি না যে একাত্তর সশস্ত্র ছিল বলে সেটা গণতান্ত্রিক আন্দোলন ছিল না। অর্থাৎ আন্দোলন সশস্ত্র হবে কি হবে না সেটা ক্ষমতাসীন শাসক ও রাষ্ট্রের চরিত্রের ওপরই প্রধানত নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত নির্ভর করে জনগণকে মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের প্রশ্নে সচেতন করে তোলার ওপর।

বাংলাদেশের এখনকার বাস্তবতা আমাদের আমলে নিতে হবে। মিছিলে পুলিশ মাথা ও বুক লক্ষ্য করে গুলি চালাবে, আর জনগণ অকাতরে প্রাণ দেবে এটা আশা করা যায় না। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সহযোগী গণ মাধ্যমগুলো ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন ও গণসংগ্রামকে অপদস্থ করবার জন্য পুলিশী বর্বরতার সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকে, অথচ গণ আন্দোলনকে ক্রমাগত দোষারোপ করে। এই দিকটা আমাদের নজরে রাখতে হবে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর যখন জনগণের কাছে রাজনৈতিক লক্ষ্য হয়ে উঠেছে, তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর জনগণের আস্থা বাড়ায় না, কমায়।

গণ আন্দোলনের নিজস্ব গতি ও অভিমুখের কারণে তার সশস্ত্র পরিণাম আর শুরু থেকেই রাজনৈতিক আন্দোলনকে সশস্ত্র আন্দোলন হিসাবে আরম্ভ করার মধ্যে পার্থক্য আছে। বিভিন্ন দেশের বাস্তব পরিস্থিতির কারণে তা হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে এই ধরণের সশস্ত্র আন্দোলন শুরু থেকেই রাষ্ট্রের বা আইন শৃংখলা বাহিনীর সশস্ত্র বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পালটা অস্ত্রের বলপ্রয়োগ। আধুনিক রাষ্ট্র চরম নিপীড়ক হলেও দাবি করে যে সশস্ত্রতা একান্তই রাষ্ট্রের একচেটিয়া। কিন্তু গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে তর্কের ক্ষেত্রে এই দাবি টেকে না। যে কারণে অস্ত্র বহনের অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘন বলে অনেকে বিবেচনা করেন। একে নাগরিক অধিকার বিরোধী বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও জোর অভিমত রয়েছে। নিপীড়ক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ন্যায় সঙ্গত এই গণতান্ত্রিক চিন্তার পক্ষেও বিপুল জনমত রয়েছে।

রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকে গণ আন্দোলন ও গণ সংগ্রামে জনগণ কিভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে, তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় কোন একটি কৌশল কতোটা কাজ করেছে ইত্যাদি প্রশ্নের বিচার ছাড়া আলাদা বা বিচ্ছিন্নভাবে সশস্ত্র আন্দোলনের বিচার পদ্ধতিগত ভাবে ভুল। নেপালে মাওবাদিদের সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া রাজতন্ত্রের উৎখাত অসম্ভব ছিল। সহিংসতা মাত্রই খারাপ এই নৈতিক অবস্থান মূলত নিপীড়িতের বিরুদ্ধে নিপীড়কদেরই পক্ষাবলম্বন। নিপীড়িত অতীষ্ঠ হয়ে নিপীড়কের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতেই পারে। আব্রও বলি, এটা আসলে নৈতিক তর্ক নয়, বরং একান্তই কৌশলগত প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এটা পরিহার করতে পারা বিচক্ষণতার কাজ। শুরু থেকেই আন্দোলন সশস্ত্র হলে জনগণের অংশগ্রহণ আশা করা কঠিন হয়। তবে সব কিছুতেই রাষ্ট্র ও পুলিশের বলপ্রয়োগে অতিষ্ঠ জনগণ পুলিশ ও রাষ্ট্রের বলের পাল্টা জবাব দিতে পারে, ওভার পাওয়ার করতে পারে, এমন পালটা বলপ্রয়োগে কাউওকে সক্ষম দেখতে পেলে তাকে আপন মনে করে। ফলে নিরব সমর্থক হয়ে উঠে।

আন্দোলনের এই দুই পথ পদ্ধতির মধ্যে কোনটা ভাল বা শ্রেষ্ঠ এটা অবান্তর প্রশ্ন। দুটোর ভিতরেই সুবিধা এবং একইসাথে মারাত্মক অসুবিধার দিক দুটোই আছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় এখানকার রাজনীতি দুটোই দেখেছে। এখন পর্যন্ত একমাত্র ৭১ এর যুদ্ধ বাদ রাখলে সফলতার দিক থেকে মাস মুভমেন্টের রেকর্ড ভাল। মাস মুভমেন্টে সংগঠনের আইনী স্বীকৃতি থাকে ফলে কিছু সাংবিধানিক আইনী সুবিধা পাওয়া যায়। যদিও কোন কোন সময় এটাই বিরাট অসুবিধার দিক হয়ে হাজির হয়।

জেনস সেন্টারের শীর্ষ দশ সংগঠনের যে তালিকা বানিয়েছে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ওর মধ্যে একমাত্র ইসলামি ছাত্র শিবিরই সামাজিক গণ-সংগঠন। ইসলামী ছাত্রশিবির হাসিনার রাষ্ট্রের বিবেচনায় এখনও নিষিদ্ধ সংগঠনও নয়। গত এক বছরের আন্দোলনে এই সংগঠনের কোন ফায়ার আর্মসের ব্যবহারের উদাহরণ আমরা দেখিনি। যদিও ককটেলের ব্যবহার সময়ে মাত্রারিক্ত হতে দেখা গিয়েছে। আইনী গণ-আন্দোলনের ফরম্যাটের মধ্যে তারা বরাবরই নিজেদের রাখার চেষ্টা করেছে, ফলের অকাতরে অনেক প্রাণ ঝরেও গিয়েছে।। তুলনায় বাকি নয়টা সংগঠন ফায়ার আর্মস ব্যবহার ভিত্তিক সংগঠন। সুবীর ভৌমিকের ভাষায় “গাড়িবোমা” বাংলাদেশের রাজনৈতিক তৎপরতার প্রবণতা এখনও নয়। কিন্তু এরপরেও কোন বিবেচনায় ইসলামী ছাত্রশিবির ওই নয় সংগঠনের সাথে তালিকায় উঠল এবং তিন নম্বরে তাকে জায়গা দেয়া হল তা সত্যিই বিস্ময়কর। জেনস সেন্টার এই রিপোর্ট কি খোদ জেনস প্রতিষ্ঠানের সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না!

৬. জেনসের গ্রাহক বা ভোক্তারা
জেনস ১৯৫৯ সালে চালু হয়েছিল মুলত একটা ক্যাটালগ তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসাবে। সেটা মাইক্রোফিল্ম টেকনোলজি আসার যুগ। ফলে তথ্যের মাইক্রোফিল্মিং ডকুমেন্টেশন আর যার অনুষঙ্গ হল ক্যাটালগিং। এখান থেকে কালক্রমে কোন দেশের সামরিক সম্ভার বাড়ানোর অভিমুখ কোনদিকে, নতুন কি কিনছে, নীতি কি, নীতির বদল কোনদিকে — এসব তথ্যের স্বাধীন উৎস হবার দিকে মনোযোগ দেয় এই সংগঠন। সবার বেলায় যেটা ঘটে -শেষ বিচারে গ্রাহক চাহিদাই ঠিক করে দেয় দোকানটা কেমন হবে, কি পাওয়া যাবে বা কি বেচবে। জেনসের মূল গ্রাহক হল ছোট বড় বিভিন্ন দেশের ইনটেলিজেন্স সংস্থা। বুঝা যায় ব্যাপারটা আবার এমনও নয় যে তাদের সবার তথ্যের একক উৎস সে।

ইনটেলিজেন্স বা মিলিটারী ষ্ট্রাটেজিক তথ্য নানান উৎস থেকে সংগ্রহ করে ক্রসচেক করে যতটা সম্ভব সঠিক করে নেবার একটা দরকার থাকে। সে বিবেচনায় জেনস একমাত্র না, একটা উৎস। এখন খোদ জেনসের খবর যদি বায়াসড বা কান্নি মারা হয়, কোন দেশের ইনটেলিজেন্সের অর্থ পরামর্শের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয় – পোলাপানি আনপ্রফেশনল রিপোর্ট তৈরি করে- তার পরিণতি কোথায় গিয়ে পৌছাবে জেনসকে তা আমলে নিতে হবে। সেতটা তাদের ব্যাপার। জেনস নিউইয়র্ক ষ্টক এক্সচেঞ্জ নিবন্ধিত একটা কোম্পানী। তাই শেয়ারের দাম পড়তে সময় বেশি লাগবে না। তবে এটা পরিস্কার যে এই রিপোর্ট জেনসের ব্যবসা খারাপ যাবার লক্ষণ।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছেলেখেলা করার বিষয় নয়। এটা নিয়ে হৈ হল্লা বড় করে বলার বেকুবির সুযোগ নাই, আবার নাই খাটো করারও। কিন্তু গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে সরকার সে কাজটাই করছে। গত ২০০১ সাল থেকে দুনিয়া জুড়ে সব দেশেই আল কায়েদা ফেনোমেনা দেখা দিয়েছে বা এর প্রভাব পড়েছে, একটা পটভুমি তৈরি হয়েছে। পশ্চিমের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর কাছে বিষয়টা অতিমাত্রায় সেনসেটিভ হয়ে উঠেছে। ‘সন্ত্রাস’ বা ‘টেররিজম’ নামে শব্দ দিয়ে তা ধরার ও ব্যাখ্যা করার চল শুরু হয়ে তা এমন অবস্থা হয়েছে যে শুধু ‘টেররিজম’ শব্দটা ব্যবহার করে কেউ কেউ আলকায়েদা ফেনোমেনা বা এর তৎপরতাকে বুঝাচ্ছে। আমেরিকাসহ পশ্চিমাদেশগুলোর আভ্যন্তরীণ আইন ও কাঠামো বদলিয়ে কঠোর করা হয়েছে, নিরাপত্তা ধারণাটাই বাস্তব চর্চায় নতুন করে সাজানো হয়েছে। সেই সুত্রে আমাদের মত দেশগুলোতেও এর প্রভাব পড়েছে। রাষ্ট্রের কাঠামো, আইনেও পরিবর্তন ঘটেছে।

গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম লেনদেনের ফলে দুনিয়াব্যাপী রাষ্ট্রগুলোকে আগের চেয়ে অনেক অনেক বেশি পস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ। একে অন্যের উপর কারও চাওয়া না চাওয়ার ওপর নির্ভর না থেকে নৈর্ব্যক্তিক কারনেইও আরও গভীর সম্পর্কে জড়িত হয়ে পড়েছে। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর তৈরি ও অনুভুত সমস্যা ও সংকট আমাদের নয় বলে তাদ্র আধিপত্যের বলয় ও কর্মকাণ্ডের পরিণতি থেকে বাইরে থাকার সুযোগ সীমিত হচ্ছে। আলকায়েদা বাঘ আসছে বলে একটা ভয়ের যুগ শুরু হয়েছে। ভয়টা মূলত পশ্চিমের হলেও সম্পর্কসূত্রে আমাদের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনরা তা হামেশাই ব্যবহার করছে। আর শ্রেণি হিসাবে যত গভীর স্বার্থে যে সকল শ্রেণি পশ্চিমের সাথে সম্পর্কিত তাদের ভয়টাই তত বেশি। এ কারনে শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে আল কায়েদা ভীতি ভালই কাজ করে। ক্ষমতাসীনরা এই ভীতিটাই কাজে লাগায়।

আল কায়েদা ফেনোমেনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে নতুন বিষয়টা হল, ‘বাঘ আসতে পারে’ এই ভয়কে বিক্রি করে নিজের সংকীর্ণ লাভ হাসিল করার সুযোগ হিসাবে একে কাজে লাগানোর প্রাণপণ চেষ্টা। হাসিনার গত পাঁচ বছরের সরকার এটাই করে এসেছে, যদিও তার ইচ্ছাটা পিছনের আরও পাঁচ বছরের পুরানা। আর গত ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের পর থেকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য শেখ হাসিনা আরও মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাঁর ফর্মুলাটা সোজা। নিজ রাজনৈতিক নীতির বিরোধীদের দমনের জন্য গুম খুন হত্যা টর্চার ইত্যাদির অত্যাচার নিপীড়ন চালানোটাকে ‘জঙ্গি বা সন্ত্রাস’ দমন বলে চালিয়ে দেয়া।
কাকে টেররিজম বলব এর কোন সংজ্ঞা এখন পর্যন্ত নির্ধারিত নাই। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো অথবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সভায় যেখানে পাশ্চাত্য শক্তিই অধিপতি – তারা যেসব গোষ্ঠি বা প্রতিষ্ঠানের তৎপরতাকে সন্ত্রাসবাদী বলে মনে করবেন, একমত হবেন, তালিকায় তুলবেন, তারাই সন্ত্রাসী, তাদের তৎপরতাই সন্ত্রাসবাদ। তবু, এখন যদি ধরেও নেই কথিত এই টেররিজমের বিরুদ্ধে লড়াই করা রাষ্ট্রের বা তার জনগণের নিরাপত্তার জন্য জরুরী এরপরেও ‘বাঘ আসার ভয় বিক্রি করা’ -এটা কোনভাবেই রাষ্ট্রের বা তার জনগণের নিরাপত্তার বিষয়ই নয়, ফলে জরুরী হবার তো প্রশ্নই আসে না।

শেখ হাসিনা আর ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা আর আমলারা বাংলাদেশে ক্রম গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শেখ হাসিনার ক্ষমতাকে জোর করে ধরে রাখার জন্য ‘বাঘ আসার ভয় বিক্রি করার’ রাজনীতি করে চলেছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে এ ধরনের ভয় বিক্রি করার খেলা আসলে অপরাধ। আর তার চেয়েও মারাত্মক হোল, এটা আত্মঘাতী। এতে সত্যি সত্যি বাঘ আসলে অথবা কে যে বাঘের বেশে আসছে– এসব হুঁশিয়ারিগুলোকে এলোমেলো করে রাখা যায়। জাতীয় নরাপত্তার জন্য প্রস্তুতি মারাত্মক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে কেউ ক্ষমতার স্বাদ নেয়, তার রাষ্ট্রের নগদ স্বার্থ লাভ ঘটে। কিন্তু কিছু রাষ্ট্র ও জনগণ হেরে যায়। ঠিক যেমন ২০০৮ সালে হাসিনা ক্ষমতা পেয়েছিলেন। কিন্তু দল হিসাবে আওয়ামি লীগ আর বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণ হেরে গিয়েছিল। এই মারাত্মক বিপদের মধ্যে আমরা সকলে আছি। একটি অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামি লিগের যে ভাবমূর্তি সেখানে দিল্লীর স্থানীয় বরকন্দাজ হওয়া রীতিমতো অপমানজনক। এই কলংক আওয়ামি লিগের পক্ষে ঘোচানো কঠিন।

ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সন্ত্রাসী প্রমাণ করে এই কলংক ঘোচানো যাবে বলে মনে হয় না। এই প্রচার আগে কাজ করেছে। এখন করবে বলে মনে হয় না।

লেখক: গবেষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
১ মার্চ ২০১৪

Advertisements