moinulজনগণের কাছে সরকারের বৈধতা থাক বা না থাক, জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা বিধানে তাকে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে সচেষ্ট হতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের ভেতরই যদি বিশৃংখলা থেকে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে সরকারকেই লড়তে হবে। ব্যাপক লুটপাট, দুর্নীতি আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সরকারের ভেতরকার বিশৃংখলার উদাহরণ। পুলিশের গুলিতে কিংবা ক্রসফায়ারে মৃত্যু ঘটলে তার দায় কোন সরকারই এড়াতে পারে না। ভালো রাজনীতির উদাহরণ নয় জেনেও সরকার অতিমাত্রায় পুলিশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং তাদের অনেক বেশি স্বাধীনতা দিয়েছে। এটা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে পুলিশের শৃংখলার জন্য যেমন ভালো নয়, তেমনি সাধারণভাবে সমাজের শৃংখলার জন্যও ভালো নয়। রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করতে গিয়ে পুলিশের হাতে যে অসীম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তার জন্য আমাদের বিচারব্যবস্থা পঙ্গু হতে বসেছে। দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনার পথ এটা নয়।
অবাধ দুর্নীতি ও অনিয়ন্ত্রিত পুলিশি ক্ষমতা যে বিশৃংখলা সৃষ্টি করছে, তা সহ্য করে নেয়ার যে চ্যালেঞ্জ জনগণের দিকে ছোড়া হচ্ছে তাকে জনগণ উসকানি হিসেবেই নিচ্ছে। যে কোনো রাজনীতিক ভালো করেই জানেন, ক্ষমতা কেমন করে দুর্নীতিগ্রস্ত করে এবং চরম ক্ষমতা চরম দুর্নীতিগ্রস্ত করে।

নির্বাচনে বিজয় লাভের ব্যাপারটিকে বিজয়ের গরিমা হিসেবে না দেখে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে যতটা সম্ভব চুপচাপ থেকে শাসনতান্ত্রিক নিয়ম রক্ষার নির্বাচন হিসেবে দেখাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক হবে। উপজেলা নির্বাচনে সাধারণ মানুষ কিন্তু যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছে যে, জাতীয় নির্বাচন তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। হতাশা থেকে মানুষ কী করতে পারে সেটা বোঝার জন্য সম্প্রতি ইউক্রেনে কোনোরূপ নেতৃত্ব ছাড়াই যে জনপ্রিয় উত্থান ঘটেছে, তার দিকে যে কেউ তাকিয়ে দেখতে পারেন। প্রেসিডেন্ট, তার পুলিশ অফিসাররা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাহিনীর কোনো হদিস নেই, তাদের খবর পাওয়া যাচ্ছে না। পলায়নকারী প্রেসিডেন্টকে আতংকিত দেখা গেছে, যখন তার নিরাপত্তাকর্মী পুলিশ অফিসাররা লাফিয়ে বাসে উঠে উধাও হয়ে যাচ্ছে। আল কায়দার মতো জঙ্গিদের খুঁজে বের করার সূত্রের সন্ধানে ব্যাপৃত থাকার পরিবর্তে সরকারের উচিত হবে পুলিশের বাড়াবাড়ি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত জন-অসন্তোষ কীভাবে এড়ানো যায় সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। সরকারি রাজনীতিতে যদি পুলিশকে ব্যবহার করা না হতো তাহলে পুলিশকে অনেকটাই নিন্দা, সমালোচনার বাইরে রাখা যেত।

দেশে শান্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার প্রশ্নে সন্তোষ প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। সরকারি ক্ষমতার ব্যবহার করে কিছু লোক দ্রুত অর্থ উপার্জন করছে। এটাকে আর্থিক প্রবৃদ্ধি বলা যাবে না। অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে আর্থিকভাবে পিষ্ট লোকজন বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। সর্বত্র দুর্নীতি থাকায় দুর্নীতির কাছে মানুষ সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছে।

নির্বাচন-পরবর্তী যে শান্ত অবস্থা আমরা দেখছি তা খুবই অনিশ্চিত, কারণ রাজনীতিতে সমঝোতা, সহনশীলতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উল্টো, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব অধিকতর আক্রোশ প্রকাশ করছেন এ বিশ্বাসে যে, বিপদ কেটে গেছে। তারা যেভাবেই হোক ক্ষমতায় বসে গেছেন। কিন্তু অসহিষ্ণুতা পরিবেশ শান্ত ও শান্তিপূর্ণ রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক কিছু নয়। হিংসা হিংসাকে আমন্ত্রণ করে। জনগণ যে নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, দারুণ আর্থিক অনটনের মধ্যে আছে তা বুঝতে হবে। সরকারের সাফল্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ ব্যবস্থার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। প্রতিটি বক্তৃতায় বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের ধোলাই দিলে দেশের নৈরাজ্যিক অবস্থার অবসান হবে না। সরকার পরিচালনায় দক্ষতা প্রমাণ করতে হবে। গত রোববার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন কয়েদিকে পুলিশের হেফাজত থেকে ভয়ংকর অপারেশনের মাধ্যমে ছিনিয়ে নেয়া হল। ওই একই দিনে ঢাকা কোর্ট চত্বর থেকে চারজন খুনের আসামিকে জামিন নামঞ্জুর করলে তারাও পালিয়ে যেতে সক্ষম হল। এ রকম উদাহরণ আরও রয়েছে যা উল্লেখ করে বলা যাবে সরকার কতটা অসংগঠিত এবং ভ্রুক্ষেপহীন।

গত রোববার বিকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পুলিশের সঙ্গে মারাত্মক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং সেই সংঘর্ষে ৩০০ ছাত্র-শিক্ষক আহত হয়, যার মধ্যে দুজন শিক্ষক ও একজন ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয় এবং ১৫ জন পুলিশ মারাত্মকভাবে আহত হয়। ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ, উত্তেজনা এখনও চলছে। পুলিশের শক্তি প্রয়োগের কি আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল – এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যে কেউ এ ব্যাপারে বলবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং শিক্ষামন্ত্রী যথাসময়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আসলে সঠিক সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে নেয়ার ক্ষেত্রটিতে সরকার সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার সাক্ষর রাখছে। সরকারকে তার শাসন দক্ষতার প্রমাণ রাখতে হবে। সব পর্যায়ে পুলিশের ওপর নির্ভরশীলতা সরকারি প্রশাসনের জন্য জটিলতাই সৃষ্টি করছে। বিচারবহির্ভূত হত্যার ব্যাপারে সরকার অসহায় এ কথা মেনে নেয়া যায় না। পুলিশের হেফাজতে আরও একটি জীবনের ইতি ঘটল এবং এহেন কাজের ন্যায্যতা দাবি করতে গিয়ে বলা হল, পুলিশের সঙ্গে গুলিবিনিময়কালে এ বন্দি নিহত হয়েছে। সে একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি ছিল, এটাও কোনো যুক্তি হতে পারে না। আইন না মেনে পুলিশি হত্যা আসলে নৈরাজ্যিক অবস্থার সবচেয়ে নিকৃষ্ট উদাহরণ। জনগণ ক্রসফায়ার নিয়ে আতংকের মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এর নিন্দা করা হলেও সরকারের মধ্যে কোনো উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা অগণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, এটা জনগণের ইচ্ছা বা অভিপ্রায় হতে পারে না।
কেউ কেউ এমন ধারণা দিচ্ছেন যে, যদি সরকার তার কিছু মিত্রকে বোঝাতে পারে যে, বাংলাদেশ হচ্ছে একটি মৌলবাদী ইসলামী দেশ তাহলে সে তার অদক্ষ, অগণতান্ত্রিক সরকার চালিয়ে একে একটি একদলীয় পুলিশি রাষ্ট্র করার সমর্থন পেয়ে যাবে।

অপরের শক্তি-সমর্থনের ওপর নির্ভর না করে জনগণের ওপর আস্থা রেখে শাসন করা বা সরকার পরিচালনা করা রাজনৈতিক নেতাদের জানতে হবে। সুশাসনের অভাব জনগণের প্রতিরোধ গড়ে ওঠার পূর্বশর্ত, তা বুঝতে হবে।
সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব পেলে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশের গৌরবদীপ্ত উদাহরণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। জনগণ একটা নিষ্ঠুর ও অনিরাপদ বাংলাদেশ চায় না।

নেতৃত্বহীন জন-অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটার সত্যিকার শংকা রয়েছে। এটা কাম্য নয়, কিন্তু তা অনিবার্য মনে হচ্ছে। পুলিশি দমন বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পথে রাজনৈতিক সংকট মীমাংসার ওপর আমি জোর দিতে বলি। গণতান্ত্রিক রাজনীতি আলাপ-আলোচনার বিষয়- কারও কাছে নাকে খত দেয়ার বিষয় নয়।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন
আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
যুগান্তর, ০১/০৩/২০১৪

Advertisements