BNP & Jammate copyভাইস চেয়ারম্যান পদে বড় দুই দলকে ছাড়িয়ে জামায়াত
ভাইস চেয়ারম্যান পদে বড় দুই দলকে ছাড়িয়ে জামায়াতউপজেলা নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায়ও বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের ব্যাপক বিজয়কে রাজনৈতিক ময়দানে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে। বিরোধী দলের এ সাফল্য রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্তির যে ভারসাম্যহীনতা চলে আসছিল তার কিছুটা হলেও পূরণ করেছে বলে বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন। বিশেষ করে এ ফলাফল রাষ্ট্রীয় শক্তির বেপরোয়া প্রয়োগে ণিকের জন্য কোণঠাসা হয়ে পড়া বিরোধী দল সমর্থকদের উজ্জীবিত করবে। একই সাথে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বাকপটু রাজনীতিবিদদের ‘পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত’ হওয়ার ঘোষণার মুখে এ ফল পানি ঢেলে দিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি সমর্থন কিভাবে ধসে পড়েছে উপজেলা নির্বাচনে, তার কিঞ্চিৎ প্রমাণ মিলেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফা উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে। ৯৭টি উপজেলার মধ্যে চেয়ারম্যান পদে বিএনপি ৪৩, আওয়ামী লীগ ৩৪, জামায়াতে ইসলামী ১৩, জাতীয় পার্টি ১, স্বতন্ত্র ২ এবং অন্যান্য প্রায় তিনটিতে বিজয়ী হয়। ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএনপি ৩২, আওয়ামী লীগ ২৪, জামায়াতে ইসলামী ২৩, জাতীয় পার্টি ৩, স্বতন্ত্র ৬ এবং অন্যান্য ১০ টিতে বিজয়ী হয়। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএনপি ৩৪, আওয়ামী লীগ ৩৪, জামায়াত ১০ এবং জাতীয় পার্টি একটিতে জয়ী হয়।
প্রথম দফা নির্বাচনে অন্তত ২৫টি উপজেলায় সংর্ঘষ, জালভোট এবং ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় ১১৫টি উপজেলায় ভোট গ্রহণ করা হয়। প্রাথমিক বেসরকারি ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপি ৫২টিতে চেয়ারম্যান, ২৮টিতে ভাইস চেয়ারম্যান এবং ৪৪টি উপজেলায় মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা ৪৬টি উপজেলায় চেয়ারম্যান, ২৮টি উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২৬টিতে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামী ৮টি চেয়ারম্যান, ৩৪টিতে ভাইস চেয়ারম্যান এবং নয়টি মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছে।
জাতীয় পার্টি ১টি চেয়ারম্যান, ২টি ভাইস চেয়ারম্যান ও দুইটিতে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছে। বাকি উপজেলায় স্বতন্ত্র ও অন্যরা নির্বাচিত হয়েছেন।
দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে দেশজুড়ে সহিংসতায় অন্তত দুইজন মারা গেছেন। প্রার্থীদের ওপরে হামলা, কেন্দ্র দখল, ভোট কারচুপি ও জালভোটের ঘটনা ঘটেছে ব্যাপক। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী জালভোট, কারচুপি ও সহিংসতার সাথে সরকারি দলের লোকজন সরাসরি জড়িত। বিরোধী দলের প থেকে বলা হয়েছে, সরকার সহিংসতার আশ্রয় না নিলে কেন্দ্র দখল না করলে ও জালভোট না দিলে তাদের চরম ভরাডুবি হতো।
প্রথম দফা উপজেলা নির্বাচনে সহিংসতা হলেও দ্বিতীয় দফায় তা আরো তীব্র মাত্রায় ছড়ানো হয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার কেড়ে নেয়ায় উপজেলাপর্যায়ে স্থানীয় সরকারের নির্দলীয়-নিরপে নির্বাচন হওয়া সত্বেও সাধারণ মানুষ পূর্ণ মাত্রায় তার সদ্ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এমনকি এ নির্বাচনে সরকার প্রশাসনকে ব্যবহার করেও কাক্সিক্ষত সুবিধা আদায় করতে পারেনি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে ৭০ ও আশির দশকে ভোটারবিহীন কারচুপির নির্বাচনের যে ধারা চলে আসছিল নব্বই দশক থেকে তাতে গুণগত পরিবর্তন আসে। কিন্তু বর্তমান সরকারের অধীনে জনগণের স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সে আশা ফিকে হয়ে যায়। উপজেলা নির্বাচনে জনগণ তার জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছে। আওয়ামী লীগের ‘ইগো প্রবলেম’ সর্বজনবিদিত। প্রচলিত আছে, তারা যেমন উচ্ছ্বাস হজম করতে জানে না, তেমনি কারো বক্তব্য ধৈর্য ধরে শুনতেও চায় না। তাদের পরমত সহিষ্ণুতা নিয়েও বিস্তর অভিযোগ আছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠানের পেছনে ‘যুক্তির অভাব’ সরকারি দলের কম ছিল না। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাবনায় সেসব যুক্তি স্থান পায়নি। দলকানা বুদ্ধিজীবী, দলাসক্ত মিডিয়ার কল্যাণে সরকারি দল সব কিছু নিজেদের অনুকূলে নেয়ার যে পরিকল্পনা নিয়েছিল তা হোঁচট খেয়েছে।
গত পাঁচ বছরে অবিরাম প্রচারণার ফলে যে আওয়ামী লীগ পাহাড়সমান জনপ্রিয়তায় শিক্ত ছিল, এখন সেখানে ধস নেমেছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ গোটা জাতিকে বিভক্ত করায় উসকানি দিয়েছে। বিশ্বজনমত যেদিকে অবস্থান নিয়েছে সরকার চলেছে তার উল্টো। দেশের মানুষ নিজেদের চিন্তায় যা ধারণ করেছে, সরকার সেখানে আঘাত করেছে। মিডিয়ার একতরফা প্রচারণায় সরকার বুঝতেও পারেনি জনমত কোনদিকে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে।
আশ্চর্যজনক হচ্ছে যে জামায়াতে ইসলামী কোথাও দাঁড়াতে পারছে না, বছরের পর বছর ধরে তাদের অফিস বন্ধ, বেশির ভাগ নেতাকর্মী কারাগারে শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে, জামায়াতের নাম মুখে উচ্চারণ করলেও হয়রানি হতে হচ্ছে। উপজেলা নির্বাচনে তাদের সাফল্য সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। জনবিচ্ছিন্ন যেসব বামপন্থী আওয়ামী লীগের নৌকায় সওয়ার হয়ে দলকে ডোবানোর এজেন্ডা হাতে নিয়েছিল তারাই এখন আবার উল্টো কথা বলতে শুরু করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক ফেরানো ঘটনায় যুক্ত ঐতিহ্যবাহী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখন কোন দিকে যাবে সেটাই দেখার বিষয়।

সূত্র: নয়া দিগন্ত

Advertisements