Garments Labor copyগার্মেন্টস কর্মীর ছদ্মবেশে রাজধানীতে সক্রিয় আছে একটি পাচারকারী চক্র। নারী পোশাক শ্রমিকদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে পতিতা পল্লীতে। সম্প্রতি এরকম একটি চক্রের কয়েকজনকে আটকের পর উšে§াচিত হয় এদের ছদ্মাবরণ। মিরপুরের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক পপিকে তার সহকর্মী পিয়াসী গত ১৮ ফেব্র“য়ারি পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে ভারতে পাচারের চেষ্টা করে। শুধু ভাগ্যগুণে পপি ফিরে আসতে পেরেছেন বাংলাদেশে। পরে তার সহযোগিতায় ওই চক্রের কয়েকজনকে আটক করে শাহআলী থানা পুলিশ। পপি মানবকণ্ঠকে জানান, অল্প কয়েক দিন আগে পরিচয় হয় সহকর্মী পিয়াসীর সঙ্গে। গত ১৮ তারিখ মায়ের সঙ্গে রাগ করে রাতে পিয়াসীদের বাসায় গিয়ে থাকি। পরদিন পিয়াসী আমাকে বলে সে ভালো চাকরি পেয়েছে। তুমি চাকরি করলে আমার সঙ্গে চল। দু’জন একসঙ্গে চাকরি করব, একসঙ্গে থাকব। কোথায়, কি চাকরি জিজ্ঞেস করলে পিয়াসী জানায় ঢাকাতেই। গার্মেন্টস, কসমেটিকসসহ (সুপার মার্কেটের প্রসাধনীর সেলসগার্ল) বিভিন্ন ধরনের কাজ আছে, ভালো বেতন। আমি রাজি হলে সন্ধ্যার পর আমাকে শাহআলীর এইচ ব্লকের ১২ নম্বর সড়কের একটি ৬ তলা ভবনের ২২ নম্বর বাসায় নিয়ে যায় পিয়াসী। ওখানে সে শান্তা নামে এক মহিলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এ সময় শান্তা আমাদের বলেন, রাতেই যেতে হবে। ১৯ ফেব্র“য়ারি রাত ১০টার দিকে শান্তা ও পিয়াসীর মা ছবি, পিয়াসীসহ আমরা গাবতলী বাস টার্মিনালে যাই। রাত ১২টার দিকে বাস ছাড়লে আমরা কোথায় যাচ্ছি জিজ্ঞেস করলে শান্তা ও পিয়াসী আমাকে চিন্তা না করতে বলে। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকালে বাস থামলে পিয়াসী বলে আমরা বেনাপোল এসেছি।
পপি বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে বেনাপোল বাসস্ট্যান্ড থেকে ট্যাক্সি নিয়ে একটি বাসায় যাই। বসাটি পুকুরপাড়ে, ওই বাসায় আরো লোকজন ছিল। বিকেলে কালা মিয়া নামে এক ব্যক্তি এসে আমাকে বলেন, তোমাকে একটি ভালো কাজ দেব ইন্ডিয়াতে। ভালো বেতন পাবে। কাজটি কি প্রশ্ন করলে উত্তরে তিনি বলেন, ওখানে বিভিন্ন ধরনের লোকজন আসে তাদের সঙ্গে মেলামেশা, আনন্দ ফুর্তি করবে। আমি এ কাজ করব না অসম্মতি জানালে তিনি বলেন, তোমাকে মোবাইল নম্বর দিব কোনো অসুবিধা হলে আমাকে জানাবে। তাতেও আমি রাজি না হলে তিনি বলেন, ঠিক আছে তোমাকে গার্মেন্টস বা কসমেটিকস ব্যবসার ভালো কাজ দেব।
এরপর কালা মিয়া আমার সামনে শান্তাকে ১৬ হাজার টাকা দেন। তিনি বলেন, তার লোক আসবে আমাদের নিতে। এরপর পিয়াসী, শান্তা ও ছবি আমাকে রেখে চলে আসে। কালামিয়া আমাকে ইন্ডিয়ার আনিস ও জাহাঙ্গীর নামে দু’জন লোকের মোবাইল নামার দেন। আনিসের মোবাইল নম্বর- ৯৩৩২৭৭১৪১৭ ও জাহাঙ্গীরের মোবাইল নম্বর- ৯৭৩৪৪৩৬০৬১। তিনি বলেন, বর্ডার পার হলে এরা এসে নিয়ে যাবে। এ কথা বলে তিনি চলে যান। পরে সন্ধ্যায় দুটি মোটরসাইকেলে তিন যুবক এসে আমাকেসহ অন্য এক মহিলাকে নিয়ে রওনা হয়। রাতে এক মহিলার বাসায় থাকি।
২১ ফেব্র“য়ারি ভোর বেলা আমরা ৫ জন হেঁটে ও নদী পার হয়ে একটি বাজারের কাছে আসি। পরে জেনেছি সেটি ভারতে। এখানে প্রায় দেড়/দুই ঘণ্টা একটি বাঁশঝাড়ের ভেতরে বসে থাকি। পরে দুই যুবক এসে আমাকে ও অন্য মহিলাকে একটি ট্যাক্সিতে উঠিয়ে রওনা হয়। প্রায় ৮/১০ মিনিট যাওয়ার পর আমরা বিএসএফের হাতে ধরা পড়ি। তারা আমাদের বাংলা কথা শুনে বুঝতে পারে আমরা বাঙালি। তখন তারা আমাদের ৪ জনকে আবার নদীর পাড়ে নিয়ে আসে এবং যুবক দু’জনকে মারধর করে। ওই মহিলা ও আমাকে লাঠি দিয়ে বাড়ি মেরে সবাইকে গলা পানিতে নামিয়ে ঘণ্টাখানেক রাখে। পরে একটি নৌকা দিয়ে এ পাড়ে পাঠিয়ে দেয়। এ সময় বিজিবি আমাদের ধরে। পরে আমার কান্নাকাটি দেখে ল্যান্স নায়েক ইমরুল কায়েস নামে এক কর্মকর্তা আমার মা-বাবার নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করেন। পরে আমার স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন।
পপির বড় ভাই রেজাইল কবির বলেন, সেদিনই রাত ১১টার দিকে মাকে নিয়ে পুটখালী সীমান্ত চেকপোস্টে যাই। বিজিবির ইমরুল কায়েস নামে এক কর্মকর্তা আমাকে বলেন, পাচারকারীরা পপিকে পতিতালয়ে পাচার করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিল। পরে তিনি আমাদের লিয়াকত মেম্বারের বাড়ি নিয়ে যান। তার জিম্মায় পপিকে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে পপিকে ঢাকায় নিয়ে আসি। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, আঞ্জু নামে এক মহিলা ও আতিক ওরফে কসাই আতিকসহ আরো কয়েকজন এ চক্রের সক্রিয় সদস্য। এলাকার প্রভাবশালী কয়েক নেতা ও নেত্রীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এ চক্রটি মিরপুরে দীর্ঘদিন নির্বিঘেœ নারী ও শিশু পাচারের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আগে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে এলেও নেতা-নেত্রীদের চাপে তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহ আলী থানার ওসি সেলিমুজ্জামান জানান, তদন্ত করা হচ্ছে। পাচারকারী চক্রের সবাইকে গ্রেফতার করা হবে।
২৩ তারিখ রাতে পপির মা রহিমা বেগম শাহআলী থানায় অভিযোগ করেন। তখনই ওসির দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) শাহআলম এসআই জাহিদকে নিয়ে অভিযানে নামেন। কিন্তু পিয়াসী ও শান্তার বাসায় গিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। শাহআলী থানার পরিদর্শক শাহ আলম মানবকণ্ঠকে বলেন, তাদের না পেয়ে খোঁজ নিয়ে মোবাইল নম্বর পাই। পরে মোবাইল ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করি। গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে এসআই জাহিদুল ইসলামকে নিয়ে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে অভিযান চালাই। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পিয়াসী পালিয়ে গেলেও শান্তা ও ছবিকে গ্রেফতার করি। পরে থানায় এসে পপি শান্তা ও ছবিকে পাচারকারী হিসেবে সনাক্ত করেন। গত বুধবার সকালে শান্তা ও ছবিকে আদালতে পাঠিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠায়। পিয়াসীকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
উৎসঃ   মানবজমিন
Advertisements