নির্বাচন চলাকালীন সময় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। দ্বিতীয় দফায় অনুষ্ঠেয় দেশের ১১৫ উপজেলায় সকাল ৮টায় ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়ম শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীদের ক্যাডাররা প্রতিপক্ষের প্রার্থীদের এজেন্টদেরকে কেন্দ্র থেকে বের করে ব্যালট পেপারে সিল মারার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জাল ভোট দিতে বাধা দেওয়ায় বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে বিএনপি-জামায়াতের সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্টদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ভোটাররা যাতে ভোট কেন্দ্রে না আসে সেজন্য ভোট কেন্দ্রে বোমা নিক্ষেপ করেছে দুর্বৃত্তরা। তাছাড়া পুলিশের অস্ত্র চুরি ও পুলিশ প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটেছে। এসব এলাকায় ভোটাররা আতঙ্কে রয়েছে।

জানা গেছে, মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ভোলাডাঙ্গা কেন্দ্রের বাইরে দুর্বৃত্তরা বোমা হামলা করেছে। এ ঘটনায় বশির উদ্দিন, মোমিন, শফি ও গিয়াস নামের চারজন আহত হয়েছেন। তাদের গাংনী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গাংনীর ষোলটাকা ইউনিয়নের কৃষকনগর গ্রামের শত শত ভোটার দলবেঁধে ভোলাডাঙ্গা কেন্দ্রে ভোট দিতে যাচ্ছিলেন। এ সময় সরকারি দলের ক্যাডাররা ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়।  ভোটাররা বাধা উপেক্ষা করে যেতে চাইলে তাদের লক্ষ্য করে ৮-১০টি বোমা হামলা চালানো হয়। এতে চারজন আহত হন।

ফেনীর পরশুরাম এবং পশ্চিম সোনাপুরের পাঁচটি কেন্দ্র থেকে ১৯ দল সমর্থিত প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদেরকে বের করে দিয়েছে সরকার সমর্থিত প্রার্থীর নেতা-কর্মীরা। সকাল সাড়ে ৯টায় এ ঘটনা ঘটে। কেন্দ্রগুলো হচ্ছে- পরশুরাম উপজেলার ধনীকুণ্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর কেতরাঙ্গা মাদ্রাসা, দক্ষিণ কেতরাঙ্গা জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়, দক্ষিণ গোথুমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব ভোট কেন্দ্র থেকে জোরপূর্বক ১৯ দল সমর্থিত প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদেরকে বের করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ কর্মীরা।

সকাল সাড়ে ৮টায় কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় পাঁচটি ভোট কেন্দ্র সম্পূর্ণ দখলে নিয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী জাফরের বাহিনী। কেন্দ্রগুলো হচ্ছে, পালাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেতুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহ ওমারাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়, শাহ আজমত উল্লাহ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চকরিয়া কেন্দ্রীয় মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব কেন্দ্রের বাইরে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো হয়। ভোটাররা জানিয়েছেন, উল্লেখিত কেন্দ্রে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা জালভোট দিচ্ছে। এ ব্যাপারে ১৯ দল সমর্থিত প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরী খোকন মিয়া নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।

আমাদের সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, বরিশালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাইদুর রহমান রিন্টুর পক্ষে তার সমর্থকরা সিল মারছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম শাহীন। তিনি বলেন, ৬৬টি কেন্দ্রের সবক’টিতেই চলছে আওয়ামী ষড়যন্ত্রের নীল নক্সা বাস্তবায়নের কাজ। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ প্রশাসনের সহায়তায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

মুন্সিগঞ্জ সদরের মালিরপাথর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ৯টার দিকে কেন্দ্রের সামনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোশাররফ হোসেনের লোকজনের ওপর হামলা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনিসুজ্জামান আনিসের সমর্থকরা। এ সময় তারা বিএনপি’র সমর্থকদের ওপর গুলি বর্ষণ করে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় বিএনপি কর্মী আয়াত আলী দেওয়ান এবং মামুন দেওয়ান গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

কেরানীগঞ্জের ভোট কেন্দ্র থেকে ১৯ দল সমর্থিত প্রার্থীর এজেন্টদেরকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

১৯ দলের প্রার্থী নাজিম উদ্দিন মোস্তান অভিযোগ করেছেন, কালিগঞ্জ ও কৈবর্তপাড়া কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টদের বের করে দিয়েছে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থীর ক্যাডাররা।

গোপালগঞ্জ বনগ্রাম দক্ষিণ পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে সন্ত্রাসীদের মহড়ায় বাধা দেওয়ায় এক পুলিশ কনস্টেবলকে পিটিয়ে আহত করেছে সরকার সমর্থকরা। পুলিশ জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সমর্থক এক চেয়ারম্যান প্রার্থীর লোকজন সকালে ভোট দিতে গেলে বনগ্রাম দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা পুলিশ সদস্য সামিমুলকে পিটিয়ে আহত করে। পরে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ রিয়াজুল ইসলাম নামে এক যুবককে আটক করেছে।

মাগুরার শালিখা উপজেলায় একটি ভোট কেন্দ্র থেকে পুলিশের একটি রাইফেল চুরি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সকালে শতখালী ইউনিয়নের গোবরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আব্দুল মান্নান খানের পক্ষে আগে থেকেই সিলমারা ব্যালট উদ্ধার করা হয়েছে। সকালে হাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। একইসঙ্গে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নুরুল ইসলাম আনসারের এজেন্টদের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও খুলনার দাকোপ উপজেলার নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ নুরুল হাফিজ সিলমারা অবস্থায় ১২টি ব্যালট পেপার উদ্ধার করে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার এনামুল হকের কাছে জমা দেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ কলেজের প্রভাষক আওয়ামী লীগ কর্মী আব্দুল হান্নান এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

আমাদের চরফ্যাশন প্রতিনিধি নূরুল আমিন জানিয়েছেন, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় ৫০টি কেন্দ্র থেকে ১৯ দল সমর্থিত প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোতাহের হোসেন আলমগীর মালতিয়া।

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় ভোট গ্রহণ শুরুর পূর্বেই চরফ্যাশনের ১১০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬০টি কেন্দ্রে যেতে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর এজেন্টদের বাধা দেয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর কর্মীরা। ৫০টি কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারলেও এক ঘণ্টার মধ্যে সকল কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ কর্মীরা কেন্দ্রের আশপাশের সড়কে পাহারা বসিয়ে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রের প্রবেশ পথে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে। তাদের হামলায় আহমদপুর, আবু বকরপুর, নীলকমল, জাহানপুর, আছলামপুরের আবুগঞ্জ, রসূলপুর, হাজারীগঞ্জ, চরকলমী, নজরুল নগর ইউনিয়নে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ৩৫ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। তারা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সূত্র: শীর্ষনিউজ, ২৭-০২-১৪
Advertisements