68103_1যশোরের চৌগাছা মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী জহুরুল ইসলামকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী এসএম হাবিবের সমর্থকদের মারধর- ছবি: নুরুল ইসলাম ভিন্ন চেহারার ভোট দেখলো দেশবাসী। কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও জালভোটের রীতিমতো উৎসব হয়েছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের চোখের সামনেই সরকারদলীয় কর্মীদের হামলায় রক্তাক্ত হয়েছেন বিরোধী পক্ষের প্রার্থী। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর কর্মীদের হামলায় আহত হয়েছেন পুলিশসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও। লাঞ্ছিত করা হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের। ভোট কেন্দ্রে হামলা ও ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। কেন্দ্র দখল ও হামলার প্রতিবাদে দুপুরের মধ্যেই অন্তত এক ডজন উপজেলায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ায় নোয়াখালী সদর উপজেলার নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। গোলযোগের কারণে বিভিন্ন উপজেলায় নির্বাচন স্থগিত করা হয় ৪৩টি কেন্দ্রে। দিনভর বিক্ষিপ্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে ১১৪ উপজেলায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে গুলিতে এক শিবিরকর্মী নিহত হয়েছেন। বরিশালে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচনে কারচুপি, কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের বের করে দেয়া, জোর করে সিল মারার প্রতিবাদ জানিয়ে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়া হয়। একই সঙ্গে রোববার হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। সেখানে ৬ কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। মাদারীপুরের শিবচরে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তারা উপজেলা পরিষদের সামনে বিক্ষোভ করার সময় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। চাঁদপুরে কেন্দ্র দখলের প্রতিবাদে ফরিদগঞ্জের ৩ চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছে। যশোরের ঝিকরগাছায় দু’টি কেন্দ্রের ব্যালট পেপার ও ভোটের সরঞ্জাম ছিনিয়ে নিয়ে যায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী মনিরুল ইসলামের কর্মীরা। এতে করে দুটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। মাগুরায় শালিখা উপজেলার বয়রা-গোবরা পঞ্চপন্নি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া পুলিশের কাছ থেকে একটি চাইনিজ এসএমজি চুরি হয়েছে। এ ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ফেনী সদর ও পরশুরামের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র সকাল থেকেই দখলে নিয়েছে আওয়ামী লীগ কর্মীরা। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টকে বের করে দেয়া হয়েছে। একটি কেন্দ্রের ব্যালট বাক্স ও ৬০০ ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়েছে সন্ত্রাসীরা। গাংনীতে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের যেতে বাধা দেয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদ জানালে আওয়ামী লীগ কর্মীরা বোমা হামলা চালায়। শেরপুরের ঝিনাইগাতী মাঝিকান্দার আদর্শ কলেজ কেন্দ্র থেকে ৫টি রামদা উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। মুন্সীগঞ্জ ও শ্রীনগরে সকালেই কেন্দ্র দখল করে নেয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা। তারা প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে সিল মারে। বিএনপি সমর্থক নেতাকর্মীদের পিটিয়ে বের করে দেয়া হয়। বাগেরহাটের ফকিরহাটে বিজিবি ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ আহত হয়েছে ২০ জন। কক্সবাজারের চকরিয়ায় কেন্দ্র দখলের অভিযোগ করেছে বিএনপি প্রার্থী। এছাড়া, এজেন্টদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে গ্রামবাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে বিএনপি এবং জামায়াতের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়াও খোকসায় কারচুপির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিএনপি সর্মথিত প্রার্থী। এর প্রতিবাদে বিএনপি-জামায়াত শনিবার মিরপুরে অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান করেছে। গতকাল বিকাল সাড়ে ৩টায় মিরপুর বাসস্ট্যান্ডে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপি’র দলীয় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আবদুল হক। সংবাদ সম্মেলনে আবদুল হক অভিযোগ করেন মিরপুরের ১০৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৪০টি ভোটকেন্দ্র দখল করে নিয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী কামারুল আরেফিনের কর্মী-সমর্থকরা প্রকাশ্যে কেন্দ্র দখল করে ভোট কেটে নিয়েছে। আবদুল হকের অভিযোগ এ ব্যাপারে উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক অবহিত করার পরও ভোট কারচুপি প্রতিরোধে তারা কোন ব্যবস্থা নেননি। বিকাল ৪ টার সময় মিরপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন দারুস সালাম একাডেমী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের প্রার্থী মিরপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর আবদুল গফুর ভোটকেন্দ্র দখল এবং জোর করে ভোট কেটে নেয়ার অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। এর প্রতিবাদে আগামী শনিবার জামায়াতের পক্ষ থেকে মিরপুরে অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান করা হয়। বিএনপি সমর্থিত খোকসা উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী আমজাদ হোসেন বিকাল ৫টায় তার নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে ৪৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ২১টি কেন্দ্রের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন।

চাটখিল (নোয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ব্যালট পেপার ছিনতাই, ভোট কেন্দ্র দখলসহ ব্যাপক কারচুপির প্রতিবাদ ও পুনঃনির্বাচনের দাবিতে উপজেলায় রোববার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে ১৯ দলীয় জোট। গতকাল বিকাল ৪টায় উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আনোয়ার হোসেন সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেন।

স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার থেকে জানান, চকরিয়া উপজেলা নির্বাচনে প্রশাসনের সহায়তায় কেন্দ্র দখলের অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন ও আগামী ২রা মার্চ কক্সবাজার জেলাব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে জেলা বিএনপি। গতকাল বিকাল ২টায় কক্সবাজারের চকরিয়ায় বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরী খোকন মিয়া সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন বর্জন ও হরতালের ঘোষণা দেন। একই সময় চকরিয়ার জামায়াতের চেয়ারম্যান প্রার্থী আরিফুর রহমান মানিক ওই উপজেলার ৫০টি কেন্দ্রে ভোট কারচুপি করা হয়েছে বলে অভিযোগ এনেছে। তিনি চকরিয়া পৌর শহরে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে। তিনি ওই ৫০টি কেন্দ্রে পুনঃভোট দাবি করেন। গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গোপালগঞ্জ বনগ্রাম দক্ষিণ পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে সন্ত্রাসীদের মহড়ায় বাধা দেয়ায় এক পুলিশ কনেস্টবলকে পিটিয়ে আহত করেছে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল সকালে সদর উপজেলার করপাড়া ইউনিয়নের বনগ্রাম দক্ষিণ পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম পিপিএম জানান, আওয়ামী লীগ সমর্থক এক চেয়ারম্যান প্রার্থীর লোকজন সকালে বনগ্রাম দক্ষিণ পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র দখলে নেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা পুলিশ সদস্য সামিমুলকে পিটিয়ে আহত করে। গুরুত্বর আহত সামিমুলকে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ রিয়াজুল ইসলামসহ ৫জনকে আটক করেছে। কিছুক্ষণ বন্ধ থাকার পর ওই কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহনণ শুরু হয়। বেলা সাড়ে ১১টায় সদর উপজেলার গোবরা নিলামাঠ ভোট কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়া না দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিন চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছে তিনজন। ঘটনার পর ভোট কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা শুকতাইল সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র দখলে নেয়ার চেষ্টা করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আবেদ আলী। এ অভিযোগ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার গোলাম কিবরিয়ার। এদিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ও জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুল হামিদের এজেন্টদের বের করে দিয়ে প্রায় ৪০টি কেন্দ্র দখলের পর ভোট কেটে নিয়েছে প্রতিপক্ষরা। দুপুর ২টায় গোপালগঞ্জ প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন আবদুল হামিদ।

গাংনী (মেহেরপুর) প্রতিনিধি জানান, গাংনী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ১৯ দলের নেতা-কর্মীদের ভোট কেন্দ্রে হামলা, কেন্দ্র দখল ও ভোটারদের কাছ থেকে ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে মহাজোটের মনোনীত প্রার্থীর দোয়াত-কলম মার্কা প্রতীকে ভোট দেয়ার অভিযোগে ২২টি কেন্দ্রের ভোট বর্জন করেছেন ১৯ দল। গতকাল সকাল থেকে গাংনী উপজেলার ৮০টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের শুরুতেই মহাজোটের নেতাকর্মীরা ১৯ দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দেন। এ সময় ১৯ দলের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে ও ভোটারদের কাছে থেকে ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে মহাজোটের মনোনীত প্রার্থী মোখলেছুর রহমানের দোয়াত-কলম মার্কা প্রতীকে সিল মারে। ১৯ দলের নির্বাচন কমিটির গাংনী উপজেলা আহ্বায়ক ও মেহেরপুর জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি আবদুর রাজ্জাক লিখিত অভিযোগে জানান, আমরা ২২টি কেন্দ্রে ভোট বর্জন করছি।
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার হরিণমারী উচ্চ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র এলাকায় গ্রামবাসীর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের সংঘর্ষে ৪ বিজিবি সদস্য আহত হয়েছেন। আটক হয়েছে দু’জন। গতকাল বেলা ১২টায় ওই কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা জটলা সরাতে গেলে এ সংঘর্ষ ঘটে। আহত বিজিবি সদস্যরা হলেন ল্যান্স নায়েক রবিউল, সিপাহি ইব্রাহীম, মাসুম, আজিজুল। আটক দু’জন হলো থুকরাবাড়ি গ্রামের ক্ষিরেন (১৬) ও হরিণমারি গ্রামের জয়নাল (১৪)। বিজিবি সদস্যরা জানায়, ওই কেন্দ্রে জটলা পাকলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা গ্রামবাসীকে সরতে বললে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে গ্রামবাসী লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপর হামলা চালায়।
স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে জানান, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব, ভোট কারচুপি ও এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ এনে বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি রোববার নির্বাচনী এলাকায় আধাবেলা হরতালের ডাক দিয়েছে বিএনপিসহ ১৯ দলীয় জোট। গতকাল সাড়ে ১১টায় সাবেক সংসদ সদস্য ও বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবুর রহমান সরোয়ারের কাউনিয়াস্থ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ ঘোষণা দেয়া হয়। এতে বিএনপিসহ ১৯ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবুর রহমান সরোয়ার ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, সকাল থেকেই প্রায় সবক’টি কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্ট বের করে দিয়ে কেন্দ্র দখলে নিয়ে সিল মারার উৎসবে মেতে উঠে আওয়ামী লীগ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সকাল থেকেই ৬৬টি কেন্দ্রের সব কটিতেই চলেছে আওয়ামী ষড়যন্ত্রের নীলনকশা বাস্তবায়নের কাজ। ভোট গ্রহণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে এজেন্টদের বের করে দিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থত প্রার্থী সাইদুর রহমান রিন্টুর পক্ষে সিল মারা হয়। স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ক্যাডাররা প্রশাসনের সহায়তায় সন্ত্রাসের রাজ্য কায়েম করে। তাই বিএনপি ভোট ডাকাতির এ নির্বাচন বর্জন করতে বাধ্য হয়েছে।

সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার প্রত্যাহার: অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বরিশাল সদর উপজেলার কর্ণকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার সাজ্জাদ হোসেনকে প্রত্যাহার করে নিয়ে গেছে ভ্রাম্যমাণ। এ কারণে প্রায় এক ঘণ্টা ওই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে।
৬টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত: জেলা রিটার্নিং অফিসার মো. দুলাল তালুকদার বলেন, ‘একজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচন বর্জনের আবেদন পেয়েছি। ভোটকেন্দ্রে কিছু অনিয়মের মৌখিক অভিযোগ পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ৬য়টি কেন্দ্রের ভোট স্থাগিত করা হয়েছে।

মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ ৩ প্রার্থী। উপজেলা পরিষদের সামনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষনা দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া সংর্ঘষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। এ সময় পুলিশ ৪ জনকে আটক করেছে। নির্বাচন কেন্দ্রে এজেন্ট প্রবেশ করতে না দেয়া ও সমর্থকদের মারধর করার অভিযোগ এনে শিবচরে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী খলিলুর রহমান চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী শহীদ খান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সুহাদা বেগম নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দেন। পরে ১১টার দিক কর্মী সমর্থকদের নিয়ে উপজেলা পরিষদের সামনে মিছিল-সমাবেশ করতে থাকে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ২৪ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. খলিলুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেয় ও আমাদের সমর্থিত নেতা কর্মীদের মারধর করে ভোট দিতে বাধা দেয়। এর প্রতিবাদে আমরা নির্বাচন বর্জন করি।

চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখের সামনে সরকারদলীয় প্রার্থীর লোকজন বিভিন্ন কেন্দ্র দখল করে ভোট ডাকাতির অভিযোগ এনে ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৩ চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া একই অভিযোগে নির্বাচন বর্জন করেছে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। গতকাল দুপুর ১১টার পর থেকে চিংড়ি প্রতীকের এম এ হান্নান, বর্তমান চেয়ারম্যান টেলিফোন প্রতীকের হাজী মোজাম্মেল, আনারস প্রতীকের আবদুল মালেক বুলবুল উপজেলা প্রেস ক্লাবে পরপর সাংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এম এ হান্নান বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখের সামনে সরকারদলীয় প্রার্থীর লোকজন বিভিন্ন কেন্দ্র দখল করে ভোট ডাকাতি করছে। তাই আমি নির্বাচন বর্জন করতে বাধ্য হয়েছি। সহকারী রিটার্নিং অফিসার জানান, নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম হচ্ছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে প্রত্যাশীর দু’টি এবং সাহেবগঞ্জ, দেইচর ও বিরামপুরের একটি করে মোট পাঁচটি কেন্দ্রে নির্বাচন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এদিকে জালভোট ও অনিয়মের কারণে মতলবে ৮জন ও ফরিদগঞ্জ উপজেলায় একজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অপরদিকে মতলব দক্ষিণ উপজেলার মুন্সিরহাট কলেজ, মতলব ডিগ্রি কলেজ ও বরদিয়া কেন্দ্র দখল করে নিয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। এদিকে চাঁদপুরের দুই উপজেলায় অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। মতলব উত্তর উপজেলার বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নুরুল হক সরকার ওরফে নূরু সিআইডি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। মতলব দক্ষিণ উপজেলার বিএনপি-সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী শুক্কুর পাটোয়ারীর অভিযোগ ভোট শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর লোকজন অধিকাংশ কেন্দ্র দখল বা এজেন্টদের বের করে দিয়ে জাল ভোট দেয়। মতলব উত্তর উপজেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ৮৫টি। সব কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগ করেছেন বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী নুরুল হক সরকার। তিনি নিজেই ভোট দিতে পারেননি বলে দাবি করেছেন।

বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার ১টি ভোট কেন্দ্রে আচরণ বিধিভঙ্গ করার অপরাধে আসাদুজ্জামান নামের এক যুবলীগ কর্মীকে আটকের ঘটনায় বিজিবির সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার সাতশিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে বিজিবির দুই সদস্যসহ ২০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর ইসলাম, আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী সরদার নেয়ামত হোসেন, ২ বিজিবি সদস্য সেপাই এনামুল ও হাবিলদার মামুন শেখ রয়েছেন। এ সময়ে ঘটনাস্থল থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সরদার নেয়ামত হোসেনসহ ৪ জনকে আটক করে ১ ঘণ্টা পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। বিজিবি সদস্যরা নির্র্র্বাহী ম্যাজিস্টেট আরিফুল ইসলামের নির্দেশে ১০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এলাকাবাসীও পাল্টা ৪-৫টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনা সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বেলা পৌনে ১২টার দিকের এ ঘটনার পর ফকিরহাটের সাতশিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট প্রদান বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধরা দু’টি কক্ষে প্রবেশ করে ব্যালটভর্তি বাক্স নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ঘটনাস্থালে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম জানান, ভোটকেন্দ্রে আচরণবিধি ভঙ্গ করার কারণে আসাদুজ্জামান নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হলে চেয়ারম্যান প্রাথী সরদার নিয়ামত হোসেন লোকজন নিয়ে তার ওপর চড়াও হলে বিজিবি সদস্যদের ফাঁকা গুলি করার তিনি নির্দেশ দেন। এ সময়ে তাদের হামলায় বিজিবির হাবিলদার মামুন ও এনামুল আহত হয়। বর্তমানে চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান সরদার নেয়ামত হোসেনসহ আহতরা ফকিরহাট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, দিরাই পৌর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, সকাল থেকে উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চললেও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আলতাব উদ্দিনের নিজ কেন্দ্র চণ্ডীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের মোটরসাইকেল, উড়োজাহাজ ও হাঁস মার্কার এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। গতকাল দিরাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচন চলাকালে আওয়ামী লীগ কর্তৃক সুনামগঞ্জের দিরাই পৌরসভাস্থ চণ্ডীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছে দিরাই উপজেলা বিএনপি।
কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর ওপর হামলা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ককটেল বিস্ফোরণ, কেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবাদে শুক্রবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি। কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু পরপরই বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্ট বের করে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, সিল মারা ও ভোটারদের কেন্দ্র যেতে না দেয়াসহ নানা অভিযোগে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন ও নতুন তফসিল ঘোষণা করে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানান। সকাল ১১টায় চরএলাহী চরযাত্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী হুমায়ুন কবির পলাশের ওপর হামলা করে প্রতিপক্ষের কর্মীরা। এ সময় তার গায়ে থাকা পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ফেলে এবং শরীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। পরে চরফকিরা কবি জসীম উদ্‌দীন উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে ধাক্কা দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। পরে উপজেলা পরিষদের সামনে হুমায়ুন কবির পলাশ এক সাংবাদিক সম্মেলন করে। উপজেলা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের বরাবরে নির্বাচন স্থগিত ও পুনঃতফসিল ঘোষণা করে পুনঃনির্বাচনের দাবিতে আবেদন করেন। বসুরহাট আশরাফুল উলুম মাদ্‌রাসা কেন্দ্র, বসুরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, বসুরহাট এএইচসি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি কেন্দ্রের ভোট বাক্স ছিনতাই করে নিয়ে যায় প্রতিপক্ষের কর্মীরা।

ফেনী প্রতিনিধি জানান, কেন্দ্র দখল ও প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করে ফেনী সদর উপজেলা ও পরশুরাম উপজেলায় নতুন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়ে রোববার ফেনী জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছেন বিএনপিসহ ১৯ দলীয় জোট প্রার্থীরা। গতকাল দুপুর আড়াইটায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এ সময় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ছাড়াও দলীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ফেনী সদর উপজেলা বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী সৈয়দ মিজানুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবু তাহের, সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দিন, জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি একেএম সামসুদ্দিন প্রমুখ। সৈয়দ মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে কেন্দ্র দখলের জন্য জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে লোক আনা হয়। তারা গত বুধবার রাত থেকে সশস্ত্র অবস্থায় বিভিন্ন এলাকায় মহড়া দেয়। ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ভোট কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেন। সকালে ফেনী সদর উপজেলা ১১৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫-৭টি কেন্দ্র বাদ দিয়ে বাকি সবগুলো কেন্দ্র জোর করে দখল, বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেয় ও ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সে ঢোকায়। বিভিন্ন কেন্দ্রে অন্তত ২০ জন কর্মীকে মারধর ও কুপিয়ে আহত করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনকে বারবার এসব অনিময় ও কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনিয়ে সিল মারার বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে জানান, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের গুলিবর্ষণ, প্রার্থীর গাড়ি ভাঙচুর, ভোটকক্ষ ও বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুরসহ বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যদিয়ে কুমিল্লার লাকসাম, মনোহরগঞ্জ ও দেবিদ্বারসহ ৩টি উপজেলার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি-জামায়াত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পৃথক সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছে। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুর রহমান বাদল ও দলীয় ২ ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্র দখল এবং কর্মী-সমর্থকদের মারধর ও এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ এনে ওই উপজেলার ৩০টি কেন্দ্রে পুনঃভোট গ্রহণের দাবি জানান।
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর থেকে জানান, ব্যাপক সহিংসতা, ভোট কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, ভোটার ও প্রার্থীদের মারপিটের মধ্য দিয়ে যশোরের ৪টি উপজেলায় শেষ হয়েছে নির্বাচন। গতকাল সকাল থেকে জেলার বাঘারপাড়া, শার্শা, চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলার ৩৩৬টি ভোট কেন্দ্রে এক যোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে বড় ধরনের কোন সহিংস ঘটনা না ঘটলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব উপজেলায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা স্বমূর্তিতে আর্বিভূত হন। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বেলা সাড়ে ১০টার দিকে চৌগাছা উপজেলার চানপুর, চৌগাছা মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাসিলা, জগন্নাথপুর, নাইড়া, বল্লমপুর, সিংহঝুলি, জাহাঙ্গীরপুর, পাশাপোল, ধুলিয়ানি, কয়ারপাড়া, জামলতা, নারায়ণপুর, সুখপুকুরিয়া, হাকিমপুর, ইছাপুর, ফুলসারা, মাড়ুয়া, আড়কান্দিসহ প্রায় ৪৪টি ভোট কেন্দ্র দখল করে নেয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত নেতাকর্মীরা। এসব কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচনী এজেন্টদের। একই সঙ্গে কেন্দ্রের বাইরে জড়ো হওয়া বিএনপি জামায়াত সমর্থিত ভোটারদের ধাওয়া করে তাড়িয়ে দেয়া হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। সরেজমিন উপজেলার বেশ কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, কেন্দ্রগুলোতে ভোটার না থাকলেও ভোটগ্রহণ অব্যাহত গতিতে চলছে। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে সরকারি দল সমর্থিত নেতাকর্মীরা লাইন ধরে এসব কেন্দ্রের প্রতিটি বুথে ব্যালট পেপার নিয়ে ইচ্ছা মতো সিল মেরে বাক্সে ঢোকাচ্ছে। প্রশ্ন করলে অধিকাংশ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারগণ তাদের অপারগতা প্রকাশ করে বলেন প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় এ ব্যাপারে তাদের কিছু করার নেই। জাহাঙ্গীরপুর কেন্দ্রের ১০টি বুথে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জহুরুল ইসলামের কোন নির্বাচনী এজেন্ট না পেয়ে দায়িত্বরত একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সকালে সবাই এসেছিল। কিন্তু সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাদের মারপিট করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম হাবিবের ভাইপো এসএম বাবুলের নেতৃত্বে এসব কেন্দ্র ও বুথ দখল করে ব্যাপক জাল ভোট প্রদান করা হয়। এদিকে চৌগাছা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট কারচুপির প্রতিবাদ করায় বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী জহুরুল ইসলামকে বেধড়ক পিটিয়েছে আওয়ামী লীগ কর্মীরা। এ সময় মারপিটের ছবি তুলতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। হামলাকারীরা সাংবাদিকদের ক্যামেরা পর্যন্ত ছিনিয়ে নেয়। এদিকে গুরুতর আহত জহুরুল ইসলামকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময় চৌগাছার বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে বোমা হামলা ও গুলি বর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে বলে পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। এসব হামলার ঘটানায় বিএনপি প্রার্থীসহ কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছে। যাদের মধ্যে ৮ জনকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে এসব ঘটনায় চৌগাছা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়ে জেলা বিএনপির সেক্রেটারি এডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু আগামীকাল শনিবার চৌগাছা উপজেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছে।

এদিকে জেলার ঝিকরগাছাতেও ঘটেছে ব্যাপক ভোট কারচুপি ও জাল ভোটের ঘটনা। উপজেলার ৯৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৫টি কেন্দ্রই দখল করে নেয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মনিরুল ইসলাম ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী মুছা মাহমুদের কর্মী সমর্থকরা। প্রশাসনের নির্বিকার ভূমিকার কারণে এসব কেন্দ্র থেকে বিএনপি প্রার্থী সাবিরা নাজমুল মুন্নির নির্বাচনী এজেন্ট ও ভোটরদের বের করে দেয়া হয়। এই উপজেলার সোনাকুড়, ইস্তা, বিষ্ণুপুর, দেউলি, পাঁচপোতা, নিত্যানন্দকাটি, শিমুলিয়া, কাগমারী, গঙ্গানন্দপুর, পানিশারা, রঘুনাথপুর নগর, বল্লা, নির্ভাসকোলা, হাড়িয়া, বাইয়া, আকিজ কলেজিয়েটে, আটুলিয়া, ঝিকরগাছা দাখিল মাদরাসা, বিএম হাই স্কুল কেন্দ্রসহ প্রায় ৪০টি কেন্দ্র দখল করে নেয় মনিরুল ও মুসা মাহামুদের কর্মী সমর্থকরা। এসব কেন্দ্রে দফায় দফায় হামলা, ভাঙচুর, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও বোমাবাজির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় বিএনপি জামাতের কমপক্ষে ১৫জন কর্মী সমর্থক আহত হয়েছেন। আপরদিকে কেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী মনিরুল ইসলাম ও বিদ্রোহী প্রার্থী মুছা মাহামুদের কর্মী সমর্থকদের মধ্যেও ঘটেছে সংঘর্ষের ঘটনা। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের ১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছে। অপরদিকে শার্শা উপজেলাতেও ঘটেছে ব্যাপক ভোট কারচুপির ঘটনা। দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার ১০ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আবদুল মান্নান মিন্নু নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে সাংবাদিকদের জানান, পরিকল্পিতভাবে তার বিজয় ছিনিয়ে নিতেই গভীর রাতে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে একটি মহল। যা কোন মতেই গণতান্ত্রিক হতে পারে না। তিনি বলেন, বিপুল জন সমর্থন থাকা সত্ত্বেও দলীয় সভানেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য বোধের কারণে শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। এদিকে নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি, জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, কেন্দ্র থেকে নির্বাচনী এজেন্টদের বের করে দেয়াসহ প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে দুপুর ২টার সময় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী খায়রুজ্জামান মধু। এদিকে চৌগাছা থেকে আমাদের প্রতিনিধি জানান, যশোরের চৌগাছায় প্রতিপক্ষ প্রার্থীর হামলায় বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী জহুরুল ইসলাম ও তিন সাংবাদিকসহ ৪ জন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী এসএম হাবিবুর রহমানের সমর্থকরা এ হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে চৌগাছা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। আহত সাংবাদিকরা হলেন, সময় টেলিভিশনের যশোর প্রতিনিধি জুয়েল মৃধা, প্রথম আলো ফটো সাংবাদিক এহসান মিথুন ও দৈনিক সমাজের কথার ফটো সাংবাদিক পরাগ রহমান লোক সমাজের সাংবাদিক এম এ রহিম। বেলা ১২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিল।

বিএনপির সাংবাদিক সম্মেলন: এদিকে জেলার চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসতে বাধা প্রদান, ভোট কেন্দ্র থেকে নির্বাচনী এজেন্টদের বের করে দেয়া, সাধারণ নেতাকর্মীদের ওপরে সন্ত্রাসী হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর, প্রার্থীকে মারপিট, ব্যালট পেপার ছিনতাই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর রহস্যজনক নীরবতা পালনসহ নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে গতকাল বিকালে যশোর প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করেছে জেলা বিএনপি। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, প্রশাসনে নির্লিপ্ত ভূমিকার কারণে জেলার চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শায় তাদের দলীয় প্রার্থীদের বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। প্রশাসনের উপস্থিতিতে এই তিন উপজেলার প্রায় ১৬১টি ভোট কেন্দ্র দখল করে নিয়েছে আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী ও তার কর্মী সমর্থকরা। বিষয়টি নিয়ে জেলার রিটার্নিং অফিসার ও পুলিশ সুপারকে বারবার অবহিত করা হলেও কার্যত তারা কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।

রাস্তায় ব্যালট পেপার: এদিকে নির্বাচন চলাকালে গতকাল যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার বেশ কয়েকটি ভোট কেন্দ্রের বাইরে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে নির্বাচনী ব্যালট পেপার। ঝিকরগাছার পানিসারা, গদখালি, হাজিরবাগ, গঙ্গানন্দপুর, বাইশা, চৌগাছার মাশিলা, নারানপুর, গোয়াতলী, বল্লমপুরসহ শার্শা উপজেলার বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ব্যালট পেপার ও সিল ছিনতাই করে নেয়। পরে বাইরে থেকে এসব ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সে ভরা হয়। এ সময় তড়িঘড়ির কারণে বিভিন্ন রাস্তায় প্রায় শতাধিক সিল মারা ব্যালট পেপার পড়ে থাকতে দেখা যায়, যার কিছু অংশ স্থানীয় প্রশাসন ও কিছু অংশ বিএনপির কর্মী সমর্থকরা সংগ্রহ করেছে। প্রেস কনফারেন্সে জেলা বিএনপির সেক্রেটারি এডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু এ রকম বেশ কয়েকটি ব্যালট পেপার সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।

চাটখিল (নোয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, গতকাল চাটখিল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিভিন্ন স্থানে দফায় দফায় প্রার্থীদের সমর্থকদের মাঝে সংঘর্ষ ঘটে। হাটপুকুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্রের বাইরে পুলিশের গুলিতে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয় শিরিন আক্তার নামে এক মহিলা। গুলিবিদ্ধ শিরিনকে প্রথমে চাটখিল ও পরে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা হচ্ছে রেজ্জাকপুরে শাহ আলম, তুষার, রাসেল, খোরশেদ, বাবু, তানভীর, ইসলামপুরে মাহবুব, দেলোয়ার, মাইন উদ্দিন, রুবেল, খিলপাড়ার শাহপরান, স্বপন, সংকরপুরে মাহফুজ, আহত হয়। এ ছাড়া সাইফুল, তাজুল ইসলাম, মাইন উদ্দিন, মিজানুর রহমান, শাকিল, করিমসহ ৩০ জন আহত হয়।

স্টাফ রিপোর্টার, জামালপুর থেকে জানান, ২য় দফায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামালপুর জেলার মেলান্দহে জাল ভোট, ব্যালট পেপার ছিনতাই, দফায় দফায় সংঘর্ষ, পুলিশের গুলি বিনিময়ের মধ্যে নির্বাচন শেষ হয়েছে। সকাল ৮ টা থেকে শান্তিপূর্ন পরিবেশের মধ্যে ভোট গ্রহন শুরু হলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে প্রায় ১০ কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। দুপুরে মেলান্দহ সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয় সরকার দলীয় সমথর্করা। এছাড়া গাজীপুর শেখ সার্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, নয়ানগর, শ্রামপুর এবং নাংলায় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ বিএনপির সাথে সংঘর্ষ হয়েছে। বিকাল ৪টায় নাগরিক কমিটির প্রার্থী অ্যাডভোকেট ইশমত পাশা নির্বাচনে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ভোট ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ এনে পুনরায় নির্বাচন দাবি করে আজ মেলান্দহ উপজেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহবান করেছেন। মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার সাদিয়া জামান জানান, ভাবকী সরকারি প্রাথমিক কেন্দ্রে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হওয়ায় কেন্দ্র স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া ইসলামপুর এবং বকশিগঞ্জ উপজেলায় বিরামহীনভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া ইসলামপুর উপজেলা এবং বকশিগঞ্জে কয়েকটি ভোট কেন্দ্রে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

উৎসঃ   মানবজমিন
Advertisements