P1_appealer-juktitorkoজামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলে ডিফেন্সের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে, শুরু হয়েছে প্রসিকিউশনের যুক্তি উপস্থাপন। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের যে সময়ে পিরোজপুরে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে সে সময় তিনি যশোরে ছিলেন। ডিফেন্স পক্ষের পাঁচজন সাক্ষী এবং প্রসিকিউশনের তিনজন সাক্ষী বিষয়টি সমর্থন করলেও ট্রাইব্যুনালের রায়ে এসব কিছু বিবেচনা করা হয়নি। এছাড়া সাঈদী সাহেবের নাম পূর্বে দেলোয়ার শিকদার ছিল এ মর্মে একটি ডকুমেন্টও প্রসিকিউশন দেখাতে পারেনি। বরং তাদের জমা দেয়া ডকুমেন্টেই উল্লেখ আছে সাঈদী সাহেবের নাম সবসময়ই সাঈদী ছিল।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে আল্লামা সাঈদীর পক্ষে এডভোকেট এস এম শাহজাহান এসব যুক্তি উপস্থাপন করেন। বেলা ১২টার দিকে আদালত বসলে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম আইনগত যুক্তি উপস্থাপনের অনুমতি চাইলে আদালত বলেন, সেটা লিখিতভাবে দিতে হবে এবং পরবর্তীতে বিবেচনা করা হবে। এরপর ১২টা ১০ মিনিটে প্রসিকিউশন পক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন।

শুনানী শেষে এডভোকেট এস এম শাহজাহান সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে আমাদের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। আমরা ফ্যাক্টচুয়াল বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেছি। এখন প্রসিকিউশন পক্ষে যুক্তি শুরু হয়েছে। তারপর আমরা জবাব দেব। তখন আইনগত যুক্তি তুলে ধরবো। তিনি বলেন, এই মামলায় দালিলিকভাবে সাক্ষ্যপ্রমাণ তেমন নেই। সাক্ষ্যপ্রমাণও নির্ভরযোগ্য নয়। আমরা আশাবাদী মামলাটিতে সাঈদী সাহেবের সাজা হবেনা।

এর আগে শুনানীতে এডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, যশোরে অবস্থান বিষয়ে ডিফেন্স পক্ষে পাঁচজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছে। তাছাড়া প্রসিকিউশনের ১৫, ১৬ এবং ২৪ নম্বর সাক্ষীও যাশোরে অবস্থান বিষয়ে সমর্থন করেছে। কিন্তু যশোরে অবস্থানের কোন কিছুই ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিবেচনায় করা হয়নি। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ৫টি পুলিশ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তার একটিতে উল্লেখ আছে স্বাধীনতার পর সাঈদী সাহেব খুলনা থাকতেন।

এডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সত্য হলে তার পালিয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু তিনি দেশের ভেতরেই প্রকাশ্যে স্বাভাবিক জীবন যাপন করেছেন।

প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে শুনানীতে এডভোকেট এস এম শাহজাহান এসব যুক্তি উপস্থাপন করেন। বেঞ্চের অপর চার বিচারপতি হলেন- বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা, বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

এডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের যে সময়ে সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে পিরোজপুরে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে সে সময় তিনি যশোরে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই তিনি যশোরে বাড়িভাড়া করে থাকতেন এবং সেখানে ওয়াজ করতেন।

শুনানীতে শিকদার প্রসঙ্গ :

এডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, প্রসিকিউশন দীর্ঘ সময় নিয়ে সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে এবং অনেক নথিপত্র জমা দিয়েছে। কিন্তু সাঈদী সাহেবের নাম পূর্বে শিকদার ছিল এ মর্মে একটি ডকুমেন্টও তারা দেখাতে পারেনি। বরং তাদের জমা দেয়া ডকুমেন্টেই উল্লেখ আছে সাঈদী সাহেবের নাম সবসময়ই সাঈদী ছিল। প্রসিকিউশন তার ১৯৫৭ সালের দাখিল সনদ জমা দিয়েছে। সেখানে তার নাম দেলোয়ার হোসেন সাঈদী লেখা রয়েছে। পিতার নামের শেষেও সাঈদী লেখা রয়েছে। তাছাড়া সাঈদী সাহেবের আলিম সনদ জমা দিয়েছে এবং সেখানেও তার নামের শেষে সাঈদী লেখা রয়েছে। তার পিতার নামের শেষেও সাঈদী রয়েছে।

প্রসিকিউশনের ১ নম্বর সাক্ষী মামলার বাদী মাহবুবুল আলম হাওলাদার এবং ৬ নম্বর সাক্ষী মানিক পসারী ২০০৯ সালে পিরোজপুরে যে মামলা করেছে তাতেও তারা উল্লেখ করেছে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। সেখানে তাদের কেউ লেখেনি যে, তার নাম পূর্বে শিকদার ছিল। তাছাড়া তদন্ত কর্মকর্তাও জেরায় স্বীকার করেছেন দেলোয়ার হোসেন শিকদার পিতা রসুল শিকদার নামে আলাদা একজন ব্যক্তি ছিল।

এরপর দুপুর ১২টায় এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। তিনি ৬ নম্বর অভিযোগ পাড়েরহাটে লুটপাট বিষয়ে যুক্তি উপস্থান শুরু করেন। অনেকটা এলোমেলো ভাবে এটর্নি জেনারেল শুনানী করলে তখন প্রধান বিচারপতি মো.মোজাম্মেল হোসেন বলেন, আপনিও প্রস্তুতি ছাড়াই এসেছেন? আপনি আমাদের সময় নষ্ট করছেন। এটর্নি জেনারেল বলেন, আমি পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, দানেশ মোল্লা, মোসলেম মাওলানা প্রমুখ এদের নেতৃত্বে শান্তি কমিটি গঠিত হয় পাড়েরহাট। পরে তারাই রাজাকার বাহিনী গঠন করে ওখানে। ৬ নম্বর সাক্ষীও এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছে।

তখন একজন বিচারপতি বলেন, আসামী পক্ষ দাবি করেছে সাঈদী সাহেবের নাম পূর্বে শিকদার ছিল এ মর্মে আপনারা একটি ডকুমেন্টও দাখিল করতে পারেননি। জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, আমরা তার দাখিল ও আলিম সনদ জমা দিয়েছি। সেখানে তার নাম শুধু দেলোয়ার হোসেন ছিল। পরে সাঈদী নাম যোগ করেছে। এসময় একজন বিচারপতি বলেন, সাঈদীর নাম শিকদার ছিল এটি আপনারা ডকুমেন্ট দিয়ে দেখাতে পারেননি।

৬ নং অভিযোগ প্রমাণের জন্য ১৯ (২) ধারায় যেসব সাক্ষীদের জবানবন্দী বিবেচনা করা হয়েছে তাদের মধ্যে  আবদুল লতিফ হাওলাদার এর জবানবন্দী থেকে পড়ে শোনানোর সময় একজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন তাকে সাক্ষী হিসেবে কেন আনা হয়নি। এটর্নি জেনারেল তদন্ত কর্মকর্তার একটি প্রতিবেদন থেকে বলেন, সাক্ষীদের আনা ছিল ব্যায়বহুল এবং অনেকক্ষেত্রে অসম্ভব।

তখন তিনি ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৯ (২) ধারা পড়ে শোনান যাতে রয়েছে সাক্ষী মারা গেলে বা তাকে আনতে সময় সাপেক্ষ ব্যয়বহুল এবং অসম্ভব হলে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত তার জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়।

তখন একজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন পিরোজপুর থেকে ঢাকায় আসতে কতক্ষণ লাগে। পিরোজপুর তো বিদেশ নয়। লঞ্চে করে আসা যায়। আরেক বিচারপতি প্রশ্ন করেন কেন তাকে হাজির করা অসম্ভব।

তখন ১৯ (২) ধারায় ১৫ জনের জবানবন্দী গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল যে আদেশ দিয়েছিল তা পড়ে শুনিয়ে এটর্নি জেনারেল বলেন, সাক্ষীদের একটি মহল থেকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। তারা বাড়িছাড়া। তাদের বাড়ি পাওয়া যাচ্ছেনা। আইয়ুব আলী হাওলাদারের মেয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছে তার পিতাকে যেন সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় না নেয়া হয়। তাদের বাড়িতে দুই জন লোক এসে হুমকি দিয়ে গিয়েছিল।

এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে বলেন, আগামীকাল পইড়া দেইখা আইসেন। না হলে আপনাকে বসিয়ে দেয়া হবে।

এডভোকেট এস এম শাহজাহানকে সহযোগিতা করেন ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন। উপস্থিত ছিলেন এডভোকেট গিয়াসউদ্দিন মিঠু।

সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম

Advertisements