1922105_756344027712146_724583614_nমো হা ম্ম দ জ য় না ল আ বে দী ন:

যে কোনো খুন-খারাবির মতো লোমহর্ষক ঘটনায় জড়িত আধিপত্যাবাদী মূল হোতার পরিচিত প্রায়ই গোপন থেকে যায়। এটা কেবল যুগ যুগ ধরেই নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দীর পরেও জানা যায় না। বহু ঐতিহাসিক গুপ্ত, এমনকি প্রকাশ্য হত্যা সামরিক অভ্যুত্থান, অস্বাভাবিক মৃত্যু প্রভৃতির মূল উদ্যোক্তা বা চক্রান্তকারী সাধারণত অজানা বা অচিহ্নিত রয়ে গেছে। কেননা এসব ঘটনা এমন দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে ঘটানো হয়েছে যে, তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের কোনো সূত্রই পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মাধ্যমে এসব ঘটানো হয়। ফলে মূল হোতাকেই শনাক্ত করা দুরূহ হয়ে পড়ে। ঘটনার জন্য এমন সব হেতু ব্যবহার করা হয় যে, ঘটনার মূল উদ্দেশ্য ও নায়ক আড়ালে চলে যায়। মানুষ কেবল তাত্ক্ষণিক কারণ ও সরাসরি জড়িতদের নিয়ে টানাটানি করে। পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নায়করা তেমন পদ্ধতি ব্যবহার করলেও তাদের তাত্ক্ষণিক তত্পরতা, প্রকাশ্য মন্তব্য, অতীত অপকর্ম প্রভৃতি তাদের সংশ্লিষ্টতাকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করেছে। তাছাড়া বাংলাদেশ এবং এর সেনাবাহিনীর প্রতিপক্ষ কে, কারা ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের অস্তিত্ববিরোধী, এই হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত সুবিধাপ্রাপ্ত (বেনিফিশিয়ারি) কে, কে এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই অতিমাত্রায় তত্পরতা দেখিয়েছে ইত্যাদি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ওই অপশক্তিকে শনাক্তকরণ অতি সাধারণ মানুষের পক্ষেও দুরূহ নয়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষও পিলখানার নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাকে চিহ্নিত করতে এক মিনিট সময়ও ব্যয় করেনি। কেননা তারা জানে, ঐতিহাসিকভাবে কারা তাদের শত্রু, কারা ১৯৭২ সাল থেকে তাদের জ্বালাচ্ছে, তাদের সুখ-সমৃদ্ধিকে বার বার বাধাগ্রস্ত ও ব্যাহত করছে।
নানাবিধ চক্রান্তের মাধ্যমে আমাদের দরিদ্র করে রাখার কারণে আমাদের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে আমাদের অস্তিস্ববিরোধী অপশক্তির সেবাদাসদের উপস্থিতির ফলে, সর্বোপরি কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারিভাবে ওই অপশক্তির নাম ঘোষিত হচ্ছে না। পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার ব্যাপারে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো মূল অপশক্তিকে আড়াল করে পরস্পরকে দোষারোপ করছে। ক্ষমতাসীন সরকারের বক্তব্য হলো, সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যই এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। বিরোধী দলের অভিযোগ, প্রতিবেশী ভারত সরকারের ভেতরে অবস্থানকারী তার মিত্রদের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে, দেশে গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করতে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারতীয় সৈন্য পাঠিয়ে এদেশকে ছায়ারাষ্ট্রে পরিণত করতে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। অন্যদিকে ভারত তার অপরাধ ঢাকার উদ্দেশ্যে এই ঘটনার পরপরই এর জন্য পরিকস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে দায়ী করেছে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কতিপয় মন্ত্রী এবং ভারতীয় সাহায্যপুষ্ট সংবাদ মাধ্যম ভারতীয় অভিযোগের অনুকূলে তত্ত্ব প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে জনৈক বিদগ্ধ প্রাবন্ধিক লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার এই নারকীয় ঘটনার তদন্ত করলেও সরকারকে তাদের মূল শত্রু ভারতের চক্রান্ত খতিয়ে দেখতে হবে যে, নবনির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে ভারত ট্রানজিট ও বন্দর সুবিধা, জয়েন্ট টাস্কফোর্স প্রভৃতি দাবি করছে। মূল সত্য হলো, ভারত যে কোনো মূল্যে বাংলাদেশের সম্পদ লুটে নিতে চায়। যেহেতু শেখ হাসিনা ওয়াজেদ ভারতপন্থী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা, তাই ভারতীয় গোয়েন্দা চক্রের হোতারা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত সেনা কর্মকর্তাদের মনস্তত্ত্বে ভীতির সঞ্চার করে ভারতীয় বার্তা অনুধাবনার্থে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ওপর অপূরণীয় ক্ষতি চাপিয়ে দেয়। বিডিআর বিদে্রাহ ও কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড ভারতের উদ্দেশ্যমূলক চক্রান্তবিশেষ, যা আড়াল করার পন্থা হিসেবে সন্দেহের তীর পাকিস্তানের ‘আইএসআই’র দিকে ছুড়ে দেয়।
সম্ভবত বহু অব্যক্ত জটিল কারণে শেখ হাসিনা সরকার বিডিআর গণহত্যার মূল চক্রের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্তানুষ্ঠান থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তুু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সরকারের উচিত জাতীয় স্বার্থে কমপক্ষে সরকারি রেকর্ডে সংরক্ষণের জন্য পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালিয়ে আমাদের সেই শত্রু চিহ্নিত করা উচিত যে এই বিপর্যয় ঘটিয়েছে, যাতে বর্তমান সরকার এবং তার উত্তরসূরিরা, সার্বিকভাবে দেশের সমুদয় জনগণ, এ ধরনের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ব্যর্থ করতে ওই শত্রু সম্পর্কে সজাগ থাকে। বিডিআর সদর দফতরের এই বিপর্যয় এত স্পষ্ট ও খোলামেলা যে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা কিংবা অন্য যে কোনো স্থানের পথচারীকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য চক্র কে, সে অতি সহজেই বলবে—‘এটা হলো ভারত’। ভারত এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যূহকে দুর্বল করে তা ভেঙে দিতে, গৃহযুদ্ধ শুরু করতে যাতে যুদ্ধরত যে কোনো পক্ষের আমন্ত্রণে ভারত বাংলাদেশ দখল করে নিতে পারে।
এটা স্বাভাবিকভাবে বিশ্বাস করার সঙ্গত কারণ রয়েছে যে, যে দেশটি আাামাদর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, আমাদের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রত্যাশা করে না এবং আমাদের পঙ্গু ও অচল করার জন্য অবিরাম চক্রান্তে লিপ্ত, সে-ই বিডিআর সদর দফতরে এ অমানবিক কাণ্ড ঘটিয়েছে।
বিডিআর সদর দফতরে গণহত্যার মূল হোতাদের পরিচয় উন্মোচন করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদে বলেছিলেন, তারাই এই ঘটনার চক্রান্ত পাকিয়েছে যারা বাংলাদেশকে একটি করদ রাজ্যে এবং প্রধানমন্ত্রীকে মুখ্যমন্ত্রীতে নামিয়ে আনতে চায়। তারা আমাদের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীকে নির্মূল করতে চায়।
ভারতের সংশ্লিষ্টতা
রাজনৈতিক-সামরিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, বহুবিধ কূট-চক্রান্ত ও উদ্দেশ্যকে সামনে লেখে পিলখানায় এ হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। বিদ্রোহের নারকীয় রূপ এই সত্যকে উদ্ঘাটিত করে যে, এটা কেবল বিডিআর জওয়ানদের সমস্যা-সংশ্লিষ্ট দাবি কিংবা সেনা কর্মকর্তাবিরোধী মানসিকতা বা অনুভূতির জন্যই ঘটেনি, ওই অজুহাতগুলোকে বরং সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিডিআর সদর দফতরে যা ঘটেছে, তা স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ছিল না। এটা ছিল আমাদের সেনাবাহিনী নিশ্চিহ্ন করার আমাদের শত্রুদের পূর্বপরিকল্পিত চক্রান্তের অংশবিশেষ। কারা এ শত্রু?
পর্যবেক্ষক মহল, এমনকি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করে যে পিলখানায় সেনা কর্মকর্তা নিধনের মূল হোতা হলো ভারত। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মন্তব্য ও বক্তব্য এবং সমরপ্রস্তুতি, বিশেষত ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর বাংলাদেশে তথাকথিত ভারতীয় শান্তি-মিশন পাঠানোর প্রস্তাব এবং ইসলামী জঙ্গিদের এ ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে ভারতীয় প্রচার মাধ্যমের প্রচারণা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে।
অপরাধ বিজ্ঞানে অতি প্রচলিত একটি প্রবাদ রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী কৃত অপরাধের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কিছু প্রমাণ রেখে যায়। বিডিআর বিদ্রোহ তথা হত্যাকাণ্ডের হোতারাও তাদের সংশ্লিষ্টতা গোপন রাখতে পারেনি। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পরই ভারতের অযাচিত স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রস্তাব এ ঘটনার সঙ্গে ভারতের জড়িত থাকার সাক্ষ্য বহন করে। এসব প্রস্তাব যদি গ্রহণ কিংবা বাস্তবায়িত হয়, তা কেবল বাংলাদেশকে ভারতের গোলামে পরিণত করার প্রক্রিয়াকেই জোরদার করবে। এই প্রস্তাবগুলো হলো : (১) বিডিআরের জন্য অর্থ প্রদান, (২) বাংলাদেশে যে কোনো ধরনের সাহায্য প্রদান, (৩) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভারতীয় সেনা প্রেরণ, (৪) বিডিআর পুনর্গঠনে সহযোগিতা প্রদান।
পিলখানা গণহত্যায় ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার প্রতি ইঙ্গিত করে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করা জনৈক সেনা কর্মকর্তা একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে সাক্ষাত্কারকালে এই বিপর্যয়ের সঙ্গে বিদেশি শক্তি জড়িত ছিল অভিযোগ করেছেন। তার মতে, এটা ছিল বেশ সুচিন্তিত সুসংবদ্ধ পরিকল্পনা। এটা কোনোভাবেই বঞ্চনার প্রতিক্রিয়া বা বিডিআর সদস্যদের বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়। পশুবত্ নির্মমতার ব্যাপকতা কিংবা মৃত সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি অপমানজনক অশোভনীয় নির্দয় আচরণ এই ইঙ্গিত দেয় যে, কোনো বিডিআর সদস্যই তাদের নিহত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনোভাবেই এমন কুিসত ব্যবহার করতে পারে না। এমন বর্বর নির্দয়তা কেবল বিদেশি হত্যাকারীরাই উদ্দেশ্যমূলকভাবে করতে পারে। নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিলেই এই গণহত্যার সঙ্গে ভারতের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগটি পরিষ্কার হয়।
ভারতীয় সৈন্য মোতায়েন : কলকাতার প্রধান দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার (ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০০৯) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জী টেলিফোনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাপকালে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে বিস্ময়কর প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ভারত বিডিআরের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বাংলাদেশকে প্রদান করতে প্রস্তুত রয়েছে। একই দৈনিক একই সংখ্যায় জানিয়েছে, ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে প্রণব মুখার্জী জানিয়েছেন,পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় যে কোনো সাহায্য প্রদানে ভারত প্রস্তুত রয়েছে। ‘যে কোনো ধরনের সহযোগিতা’ বলতে বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য পাঠানোর ভারতীয় ইচ্ছার প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন। এই দুটো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রস্তাবই এ অভিযোগ প্রমাণে স্বব্যাখ্যীয়, ভারত এই বিপর্যয় থেকে ফায়দা লোটার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। কারণ ভারতই এ বিপর্যয় ঘটিয়েছে, যা বাংলাদেশকে সুনামির মতো ঝাঁকুনি দিয়েছে। বাংলাদেশ এ সমস্যা সমাধানে কোনো দেশ থেকে আর্থিক কিংবা অন্য কোনো ধরনের সহযোগিতা চায়নি। তাহলে প্রণব মুখার্জী কেন ‘বিডিআর’-এর জন্য অর্থ প্রদানের আকস্মিক এবং এককভাবে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বিশ্বে এমন বহু দেশ রয়েছে যারা ভারতকে কয়েক শতবার কিনতে পারে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তাদের কেউই এমন অবাক করা প্রস্তাব প্রদান করেনি। ভারত বাস্তবে বাংলাদেশের মতোই দরিদ্র। প্রায় ৩৩ শতাংশ ভারতীয় এখনও অনেক বাংলাদেশীর তুলনায় দরিদ্রতর। এমন একটি ফকির-রাষ্ট্র কেন বিডিআরের জন্য অর্থ প্রদানে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে? এটা কি স্বার্থবিহীন? এমন সহযোগিতা প্রদানের আগ্রহের পেছনে কি কোনো গোপন মতলব নেই?
পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ‘যে কোনো ধরনের সহযোগিতা’ দরকার তা প্রদানে তার দেশ প্রস্তুত, এ কথা বলে প্রণব মুখার্জী কিসের ই্ঙ্গিত দিয়েছেন? এ ধরনের প্রস্তুতি কি বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য প্রেরণের ইঙ্গিত বহন করে না? সৈন্য ছাড়া একটি সশস্ত্র বিদে্রাহ দমনের জন্য অন্য আর কোন ধরনের সাহায্য প্রয়োজন? পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও গণহত্যার সুযোগ ব্যবহার করে সাহায্যের নামে প্রণব মুখার্জী স্পষ্টভাবে বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য মোতায়েনের গোপন কুমতলব ও চক্রান্ত প্রকাশ্যে নিয়ে এলেন। প্রণব মুখার্জী প্রকাশ্যে ভারতীয় ইচ্ছে খোলাসা করতে দ্বিধাবোধ করেননি যে, শেখ হাসিনা বিব্রতকর অবস্থায় পড়লে ভারত তাকে উদ্ধার না করে অলস বসে থাকবে না। আসল কথা হলো, ভারত ১৯৭২ সালে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছে। চাপের মুখে বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে বাধ্য হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি জৈল সিং কলকাতা থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত ‘সানডে’ (২৭ জুলাই ১৯৮৭) সাময়িকীর সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ থেকে দ্রুত ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার সুবিবেচনাপ্রসূূত ছিল না। এ ধরনের প্রত্যাহার ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “We could not protect the interest of country withdrawing troops hurriedly.” (দ্রুত সৈন্য প্রত্যাহার করে আমরা দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারিনি।)
ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা মনে করে, বাংলাদেশকে ভারতের হাতের মুঠোয় রাখতে হলে এদেশে ভারতীয় সৈন্য স্থায়ীভাবে মোতায়েন রাখতে হবে। এই লক্ষ্যার্জনের জন্য ভারত বিভিন্ন ধরনের চক্রান্ত এঁটে যাচ্ছে। আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও সন্ত্রাস দমনে দক্ষিণ এশীয় ‘যৌথ টাস্কফোর্স’, ‘যৌথ সীমান্ত পাহারা’ প্রভৃতির আড়ালে ভারত বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ভারতীয় সৈন্য মোতায়েনের চেষ্টা করছে। কলকাতার দৈনিক ‘টেলিগ্রাফ’ (২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯) এক প্রতিবেদনে ভারতের আসল মতলব আরও স্পষ্ট করেছে। নতুন দিল্লিকেন্দ্রিক ভারতীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানিয়েছে, ভারত বাংলাদেশে ‘শান্তি মিশন’ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশ সম্মত হলে ঢাকা-কলকাতার মধ্যে চলাচলকারী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী ট্রেন পাহারা দেয়ার জন্য ভারত তার সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ (সিআরপি), রেলওয়ে প্রটেকশন ফোর্স বা বিএসএফ পাঠানোর প্রস্তাব বিবেচনা করবে। বাংলাদেশে তথাকথিত শান্তি মিশন পাঠানোর কারণ ব্যাখ্য করে পত্রিকাটি লিখেছে, আগে বিডিআর মৈত্রী ট্রেনের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। এখন বিডিআর সদস্যদের ওপর সেনাবাহিনীর কোনো আস্থা নেই। আবার বিডিআরও সেনাবাহিনীকে বিশ্বাস করে না। পত্রিকাটি জানায়, এই কারণেই মৈত্রী ট্রেনের যাত্রী, ইঞ্জিন, মালামাল প্রভৃতি রক্ষার জন্য ভারত কমপক্ষে মৈত্রী ট্রেনের নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে ভারতীয় সৈন্য পাঠাতে চায়।
সর্বপ্রথম খবর প্রচার : রয়টার, এপি, এএফপি, বিবিসি, ভয়েজ অব আমেরিকা, সিএনএন, আল-জাজিরা, এমনকি বাংলাদেশী টিভি চ্যানেলগুলোকে পেছনে ফেলে ভারতীয় ব্যক্তি মালিকানাধীন টিভি চ্যানেল সিএনএন-আইবিএন বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা ১৩ মিনিটে (২৫ ফেব্রুয়ারি) সর্বপ্রথম বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমদের নিহত হওয়ার খবর প্রচার করে। বাংলাদেশী কোনো টিভি বা রেডিও চ্যানেল তাদের ঘরের ভেতরে ঘটা এমন লোমহর্ষক নারকীয় ঘটনার খবর পায়নি। এমনকি পরবর্তী দিন অর্থাত্ ২৬ ফেব্রুয়ারি (২০০৯) বাংলাদেশের কোনো দৈনিক এমন খবর প্রকাশ করেনি। অর্থাত্ তারা এমন খবর পায়নি। তাহলে এই স্বাভাবিক কিন্তু জটিল প্রশ্ন জাগে, কার মাধ্যমে ভারতীয় টিভি চ্যানেলটি এমন স্পর্শকাতর অথচ যথার্থ খবরটি তাত্ক্ষণিক সংগ্রহে ও প্রচারে সক্ষম হয়েছিল। এর সহজ উত্তর হলো, জেনারেল শাকিল ও তার সহকর্মীদের হত্যার সময় বিডিআর সদর দফতরে ভারতীয় কিলার কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত ছিল, যারা বিডিআর মহাপরিচালকের নিহত হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ভারতীয় সংশ্লিষ্টতা গোপন করার উদ্দেশ্যে ভারতীয় টিভি চ্যানেল সিএনএন-আইবিএন, এনটিভি এবং টেলিগ্রাফ, হিন্দুস্তান টাইমস, আনন্দবাজার পত্রিকা প্রভৃতি পিলখানা হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রধান দুটি বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াত চক্রকে দায়ী করে। কীভাবে ভারতীয় টিভি চ্যানেল বা পত্রিকার সাংবাদিকরা ভারতে বসে তাত্ক্ষণিক জানতে পারে যে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জড়িত ছিল? ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের এমন আচরণ থেকে বোঝা যায়, তারা কী বলবে তা আগে থেকেই প্রস্তুত করা ছিল।
একমাত্র সুবিধাভোগী : সাধারণত মনে করা হয়, কোনো দেশে সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনা-দুষ্কর্ম থেকে যে দেশটি সুবিধা কুড়ায়, সে দেশটিই ওই ঘটনার মূল অনুঘটক। পিলখানা হত্যাকাণ্ডসহ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যে কোনো দুর্যোগের তাত্ক্ষণিক ও একমাত্র সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ হলো ভারত। বাস্তব পরিস্থিতি এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে তথ্যাভিজ্ঞমহল দাবি করেন যে, পিলখানা বিপর্যয় ভারতই ঘটিয়েছে। তাদের মতে, ভারতীয় নীতিনির্ধারক ও সংবাদ মাধ্যমের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, তাদের উদ্দেশ্যেমূলক অবাঞ্ছিত ও কুিসত প্রস্তাব এই গণহত্যার সঙ্গে ভারতের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করছে। ঢাকার অভিজাত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য বাংলাদেশ অবজারভার’ তার সম্পাদকীয় মন্তব্যে লিখেছে :
“Now here is a conspiracy, if ever there was one, the mutiny was staged by the Indian intelligence agencies in order to create an abnormal situation for sending Indian troops. But this theory is based on facts that in November 1971 the Bangladesh government in exile had to sign a precondition that said Bangladesh would not raise any regular professional Armed forces. On his return, Sheikh Mujibur Rahman defied the precondition and went ahead and raised the Armed forces. So was the BDR mutiny a part of this longstanding Scheme.”
[এখন এখানে একটিই চক্রান্ত, যদি তেমনটি কখনও থেকে থাকে, তা হলো ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (বাংলাদেশে) ভারতীয় সৈন্য প্রেরণের উদ্দেশ্যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য বিডিআর বিদ্রোহ ঘটিয়েছে। এই তত্ত্ব এই বাস্তব সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকারকে এমন পূর্বশর্ত (যুক্ত চুক্তি) স্বাক্ষর করতে হয়, যাতে বলা হয়, বাংলাদেশ কোনো পেশাদার নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলবে না। (পাকিস্তান থেকে) ফিরে এসে শেখ মুজিবুর রহমান ওই পূর্বশর্ত অগ্রাহ্য করে সশস্ত্র বাহিনী গঠনে এগিয়ে যান। সুতরাং বিডিআর বিদ্রোহ ওই দীর্ঘ সময় ধরে লালিত চক্রান্তের অংশবিশেষ]।
দৈনিক অবজারভার তার সম্পাদকীয় মন্তব্যে বাংলাদেশের সর্বশ্রেণী-পেশার মানুষের অনুভূতি, আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং সুন্দরবন থেকে সিলেট পর্যন্ত যে কোনো বাংলাদেশীকে যদি এমন প্রশ্ন করা হয় যে, কারা বাংলাদেশের ওপর এমন বজ্রাঘাতসম আঘাত হেনেছে। উত্তরে অভিন্ন ধ্বনিই বেরিয়ে আসবে— ভারত এবং তার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং তাদের স্থানীয় সেবাদাসরা এই মর্মান্তিক ঘটনার নেপথ্য নায়ক।
‘দৈনিক অবজারভার’ যার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত মিত্র, প্রশ্ন রেখেছে, বিডিআর বিদ্রোহ কি বিডিআর এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নেতৃত্বশূন্য করার অংশবিশেষ, যাকে ভারত তার জন্য মাথাব্যথা ও বিপদ বলে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে বিবেচনা করার পেছনে ভারতের পক্ষে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। ‘অবজারভার’-এর মতে, পাকিস্তান আমলে ভারত পূর্ব পাকিস্তান সংলগ্ন সীমান্ত পাহারা দেয়ার জন্য বার্ষিক ৩৫ হাজার কোটি রুপি ব্যয় করত। এটা ব্যাপকভাবে প্রত্যাশিত ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় বন্ধ হবে। এই উদ্দেশ্যেই ভারত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো পেশাদার নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী গঠন করা হবে না, এমন প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করে। এই প্রচেষ্টার বহুবিধ উদ্দেশ্য ছিল : এর পূর্ব সীমান্তে ভীতির অবসান ঘটানো, বাংলাদেশকে ভারতীয় থাবার নিচে রাখা, যখনই ভারত চাইবে সে সময় বাংলাদেশ দখল করা। ঢাকা থেকেই প্রকাশিত সাময়িকী ‘সাপ্তাহিক’ (৫, মার্চ ২০০৯) বাহ্যত-অজ্ঞাত এই হোতার প্রতি ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুর্বলতা আরও ব্যাপকতর করে কে উপকৃত হবে? সেনাবাহিনীকে অপেশাদারি বিপজ্জনক কাজের দিকে ঠেলে কে সুবিধা লুটে নিতে চায়? সেনা কর্মকর্তা ও বিডিআর জওয়ানদের মধ্যে শত্রুতা ও দ্বন্দ্বের সুবিধা কে পাবে? পূর্বপরিকল্পিত চক্রান্ত-সৃষ্ট লোমহর্ষক গণহত্যার কারণে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমর্যদা ক্ষুণ্ন করে কারা সুবিধাপ্রাপ্ত হবে? জনগণ, রাজনীতিবিদ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে এবং দেশকে অরক্ষিত ও পাহারাহীন রেখে কাদের স্বার্থসিদ্ধি হবে? আমাদের সশস্ত্র বাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। সশস্ত্র বাহিনীকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত করে কার স্বার্থ অর্জিত হচ্ছে?
পিলখানা গণহত্যার প্রকৃত সুবিধাভোগী হলো ভারত। দেখা যাক এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ভারত কীভাবে লাভবান হচ্ছে? পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ভারতের কমপক্ষে দুটো সমান্তরাল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়েছে : সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন ও অবমূল্যায়নের পরিবেশ এবং তাদের ওপর মানসিক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা। তাছাড়া এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশেষত ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্তে নজরদারিতে ভীষণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সাবেক বিডিআর মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেন দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের প্রায় সবটাই ভারতের সঙ্গে। এই সীমান্ত অরক্ষিত ও নজরদারিহীন থাকলে কে উপকৃত হবে?
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর ভারতীয় দুষ্কৃতকারীদের বাংলাদেশী গরু, ছাগল, মহিষ, শস্য ইত্যাদি লুটের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশীদের মধ্যে যারা এর আগে ভারতীয় দুষ্কৃতকারীদের অপকর্মের প্রতিবাদ করেছিল তাদের হত্যা করা হয়। যেসব বাংলাদেশী একদা বিডিআর জওয়ানদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিএসএফের হামলা এবং চোরাচালানিদের প্রতিহত করেছে, এখন আত্মরক্ষায় শঙ্কিত হয়ে তারা একেবারে নীরব হয়ে গেছে। নির্যাতন ও হয়রানির ভয়ে এখন সীমান্তবাসী বাংলাদেশীরা ভারতীয় সন্ত্রাসী বা বিএসএফের গুলিতে নিহত স্বজনদের লাশ দাবি করে না।
বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে কোনো প্রতিরোধ না থাকায় ভারত এখন স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বস্তিবোধ করছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণরূপে যে ভারতীয় স্বার্থের অনুকূলে গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিডিআরের সিংহসম অবস্থান এখন মেষ শাবকের পর্যায়ে নেমে এসেছে। ভারত পিলখানা বিপর্যয়ের একমাত্র সুবিধাভোগী। কেউ জানে না বিডিআর এবং সেনাবাহিনী তাদের পূর্বেকার মনোবল, সাহস, কর্মপ্রেরণা, ক্ষিপ্রতা ও দক্ষতা কবে ফিরে পাবে? কবে তারা আমাদের সীমান্ত ও দেশ রক্ষার শক্তি, দৃঢ়তা অর্জন করবে? কোনো কোনো বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন, বিডিআর বিদ্রোহের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মূল কারণ পদুয়া-বড়াইবাড়ীতে ভারতীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ হলেও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল যে কোনো অজুহাতে, এমনকি ঢাকা-কলকাতার মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী ট্রেন পাহারার আবরণে হলেও শান্তি মিশনের নামে বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য গ্রহণে বাংলাদেশকে রাজি করানো। কথিত শান্তি মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই বাহিনী দখলদার বাহিনী হিসেবে কাজ করবে এবং বিডিআর জওয়ান ও সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরোধ ও দ্বন্দ্বের আরও অবনতি ঘটিয়ে ভারতীয় বাহিনীর অবস্থানকে চিরস্থায়ী করবে। এর মাধ্যমে ভারত দ্বিবিধ সুবিধাপ্রাপ্তির অপেক্ষায় ছিল। এগুলো হলো : ভারতের করিডোরপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পঙ্গু করে ধ্বংস করা। এটা ছিল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেয়া জবরদস্তিমূলক চুক্তির বাস্তবায়ন মাত্র, যাতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের কোনো নিয়মিত পেশাদার সেনাবাহিনী থাকবে না, বরং বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ভারতীয় বাহিনীই নিশ্চিত করবে। ভারতে গঠিত প্রবাসী সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ৭ দফা চুক্তির সামান্য অংশই স্বাধীনতার পর বাস্তবায়িত হয়েছিল।
সমর প্রস্ততি : বাংলাদেশে বিডিআর বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে ভারতের সমর প্রস্তুতি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে, বিদ্রোহ থেকে ফায়দা লোটার চক্রান্ত থেকেই ভারত এ বিদ্রোহ ঘটিয়েছিল। বিডিআর বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে ভারতের সমর প্রস্তুতির বিবরণ ‘হিন্দুস্তান টাইমস’, ‘দ্য টেলিগ্রাফ’সহ অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রচার করে। ২ মার্চ, ২০০৯ ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ এক প্রতিবেদনে লিখেছে, বাংলাদেশে মানবিক কারণে হস্তক্ষেপ করার জন্য ভারতীয় সৈন্যদের প্রস্তুত রাখা হয়। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন আসামের জোড়াহাট বিমান ঘাঁটিতে বেশ কিছু যুদ্ধ বিমান প্রস্তুত ছিল। সেখানে রেড অ্যালার্ট (সর্বোচ্চ সর্তকতা) জারি করা হয়। আগ্রা থেকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এক ব্রিগেড প্যারাস্যুট বাহিনী কলকাতার নিকটবর্তী কালাইকুণ্ডায় আনা হয়। বাংলাদেশে একটি অভ্যন্তরীণ গোলযোগ চলাকালীন ভারতের এই সমর প্রস্তুতির রহস্য কি পিলখানার খুনিদের, বিশেষত মুখোশ পরিহিতদের উদ্বার করা, যারা রহস্যজনকভাবে বিডিআর সদর দফতরে প্রবেশ করে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। উল্লেখ্য, সাত বছর ধরে নেপালে মাওবাদী বিদ্রোহ কিংবা ২৬ বছর ধরে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় ভারত কখনোই এমন সমর প্রস্তুতি নেয়নি। এ সমর প্রস্তুতি এই সত্যতা উদঘাটন করেছে যে, বিডিআর বিদ্রোহকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ভারত বাংলাদেশে সৈন্য প্রেরণের চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। এই কারণে ভারত তার সেনাবাহিনীকে সতর্কাবস্থায় প্রসু্তত রেখেছিল। ভারত সুনিশ্চিত ছিল যে কোনো মুহূর্তে ভারতীয় সৈন্য প্রেরণের জন্য বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রণ বা অনুরোধ আসবে। তথ্যাভিজ্ঞমহল জানিয়েছেন, ৫০তম ইনডিপেন্ডেন্ট প্যারাস্যুট বিগ্রেডের এক ব্যাটালিয়ন (এক হাজারের বেশি সদস্যবিশিষ্ট) রোববার (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯) আগ্রা থেকে বিরাটাকারের বিমানঘাঁটি কালাইকুণ্ডায় রাতারাতি বিমানযোগে আনা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে আরও সৈন্য আনার প্রস্তুতি ছিল। বিডিআর জওয়ানদের কাছ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের চৌকিগুলো ক্রমাগতভাবে দখল করে নেয়ার প্রেক্ষাপটে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই উদ্যোগ নেয়া হয়। (চলবে)

সূত্র: আমারদেশ

Advertisements