67829_1ওরিয়ানা ফ্যালাচি ইটালীর বিখ্যাত মহিলা সাংবাদিক। রোম থেকে প্রকাশিত ‘এল ইউরোপিও’পত্রিকার সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন। সত্তুর দশকের প্রায় পুরো সময় জুড়ে বিশ্বের বিতর্কিত বহু রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার গ্রহন করে তিনি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। এসব সাক্ষাৎকার বিশ্বের প্রধান সকল ভাষায় অনূদিত ও পুনঃ প্রকাশিত হয়েছিল। ফ্যালাচির আক্রমণাত্মক প্রশ্ন সাংবাদিকতার নিয়ম নীতি অনুসারে বস্তুনিষ্ঠতা থেকে বহু দূরে এবং সেজন্যে তাকে সমালোচনার শিকার হতে হয়েছিল বহুবার। তিনি যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তাদের অবস্থান ও মর্যাদার প্রতি তিনি ভ্রুক্ষেপ না করে অনেক ক্ষেত্রে সীমা লংঘন করে ফেলেছিলেন। কিন্তু যে সাহসিকতার সাথে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একনায়কদের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং প্রশ্নবানে জর্জরিত করেছিলেন তা বহুল প্রশংসিত হয়েছিল। পাঠকরা যেন তার সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সরাসরি সংশ্লষ্ট রাষ্ট্রনায়ক বা রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বের কাছে উপনীত হয়েছেন এমন একটি অনুভূতি ও আবহ সৃষ্টি করতে পারাই ওরিয়ানা ফ্যালাচির কৃতিত্ব। সেজন্যে তার নেয়া সাক্ষাৎকারগুলো বিগত প্রায় চার দশক ধরেই সমান আবেদন নিয়ে টিকে আছে।

ওরিয়ানা ফ্যালাচি যাদের সাক্ষাৎকার গ্রহন করেছেন তাদের অধিকাংশই আজ আর বেঁচে নেই। কেউ অভ্যূত্থানে নিহত হয়েছেন। দেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ক্ষমতা হারানোর পর উত্তরাধিকারী সরকারের আমলে আদালতের রায়ে মৃত্যুদন্ড লাভ করে পৃথিবী ত্যাগ করেছেন, এমনও আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ফ্যালাচি স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে ও বিপক্ষে জড়িত চার ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। তারা হচ্ছেন স্বধীনতার প্রধান নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান, সার্বিক সমর্থন ও সহযোগিতা দানকারী ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী পাকিস্থানের জুলফিকার আলী ভূট্টো ও যুক্তরাষ্ট্রের হেনরী কিসিঞ্জার। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত গৃহীত ফ্যালাচির সাক্ষাৎকারগুলো ‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরী’ নামে একটি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এটিও ফ্যালাচির মূল গ্রন্থ ইতালী ভাষায় রচিত (ওহঃবৎারংঃধ পড়হ খধ ংঃড়ৎরধ)-এর ইংরেজি অনুবাদ। গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ ১৯৮৯ সালে ধারাবাহিকভাবে মাসিক নতুন ঢাকা ডাইজেস্টে প্রকাশিত হয়েছিল। তখন পাঠকদের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগে, বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাসঙ্গিকতার কারণে এবং উপমহাদেশের তিন প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকারের জন্য যাদের প্রত্যেককে হত্যাকান্ডের শিকারে পরিণত হতে হয়েছে। ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরীর মত গ্রন্থ রাজনীতি সচেতন পাঠকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনাগত দিনগুলোতেও এর রাজনৈতিক মূল্য সমান থাকবে। ইতিহাসের স্রষ্টা ও উৎসের গুরুত্ব কখনো কমে না। — অনুবাদক

রোববার সন্ধ্যা: আমি কোলকাতা হয়ে ঢাকার পথে যাত্রা করেছি। সত্যি বলতে কি, ১৮ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী তাদের বেয়োনেট দিয়ে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা প্রত্যক্ষ করার পর পৃথিবীতে আমার অন্তিম ইচ্ছা এটাই ছিল যে, এই পাপিষ্ঠ নগরীতে আমি আর পা ফেলবো না। আমি এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলাম। কিন্তু আমার সম্পাদকের ইচ্ছা যে, আমি যেন মুজিবের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। ভূট্টো তাকে মুক্তি দেয়ার পর আমার সম্পাদকের এই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তিনি কি ধরনের মানুষ? আমার সহকর্মীরা স্বীকৃতি দিলো, তিনি মহান ব্যক্তি, সুপারম্যান। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি একটি দেশকে সমস্যা থেকে মুক্ত করে গণতন্ত্রের পথে পরিচালিত করতে পারেন। আমার মনে আছে, ১৮ই ডিসেম্বর আমি যখন ঢাকায় ছিলাম, তখন লোকজন বলছিল, “মুজিব থাকলে সেই নির্মম, ভয়ংকর ঘটনা কখনোই ঘটতোনা। মুজিব ফিরে আসলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না” কিন্তু গতকাল মুক্তিবাহিনী কেন আরো পন্চাশ জন নিরীহ বিহারীকে হত্যা করেছে? ‘টাইম’ ম্যাগাজিন কেন তাকে নিয়ে বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে হেডলাইন করেছে? আমি বিস্মিত হয়েছি যে, এই ব্যক্তিটি ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে সাংবাদিক অ্যালডো শানতিনিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার দেশে আমি সবচেয়ে সাহসী এবং নির্ভীক মানুষ, আমি বাংলার বাঘ, দিকপাল…….. এখানে যুক্তির কোন স্থান নেই…..।” আমি বুঝে উঠতে পারিনি, আমার কি ভাবা উচিত।

সোমবার বিকেল: আমি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এবং আমার দ্বিধাদ্বন্দ্ব দ্বিগুণের অধিক। ঘটনাটা হলো, আমি মুজিবকে দেখেছি। যদিও মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। সাক্ষাৎকার নেয়ার পূর্বে তাকে এক পলক দেখার সুযোগ আমি পেয়েছি। কিন্তু এই কয়েকটা মুহূর্তই আমার চিত্তকে দ্বিধা ও ধাঁধায় পূর্ণ করতে যথেষ্ট ছিল। যখন ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করি, কার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল? তিনি আর কেউ নন, মিঃ সরকার। আমার শেষবার ঢাকা অবস্থানকালে এই বাঙ্গালি ভদ্রলোক আমার দোভাষী ছিলেন। তাঁকে দেখলাম রানওয়ের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে। আমি ভাবিনি, কেন? সম্ভবত এর চেয়ে ভালো কিছু তার করার ছিল না। আমাকে দেখামাত্র জানতে চাইলেন যে, আমার জন্যে তিনি কিছু করতে পারেন কিনা? তাকে জানালাম যে, তিনি আমাকে মুজিবের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন কিনা। তিনি সোজা আমাকে নিয়ে রওনা হলেন এবং মিনিট পনেরের মধ্যে আমরা একটি ফটক দিয়ে প্রবেশ করলাম। ফটকে মেশিনগানধারী মুক্তিবাহিনীদের কড়া প্রহরা। আমরা খাওয়ার ঘরে প্রবেশ করে দেখলাম মুজিবের স্ত্রী খাচ্ছেন। সাথে খাচ্ছে তার ভাগনে ও মামাত ভাইবোনেরা। একটা থালায় ভাত-তরকারী মাখিয়ে আঙ্গুল দিয়ে সকলে মুখে পুরে নিচ্ছে। এদেশে খাওয়ার পদ্ধতি বুঝি এরকমই। মুজিবের স্ত্রী আমাকে আ›তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানালেন। ঠিক তখনই মুজিব এলেন। সহসা খাবার ঘরের মুখে তার আবির্ভাব হলো। তার পরনে এক ধরনের সাদা পোশাক, যাতে আমার কাছে তাকে মনে হয়েছিল একজন প্রাচীন রোমান হিসেবে। পোশাকের কারণে তাকে দীর্ঘ ও ঋজু মনে হচ্ছিল। তার বয়স একানড়ব হলেও তিনি দেখতে সুপুরুষ। ককেশীয় ধরনের সুন্দর চেহারা। চশমা ও গোঁফে সে চেহারা হয়েছে আরো বুদ্ধিদীপ্ত। যে কারো মনে হবে, তিনি বিপুল জনতাকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতাসম্পনড়ব একজন ব্যক্তি। তিনি সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী। আমি সোজা তার কাছে গিয়ে আমার পরিচয় পেশ করলাম এবং আমার উদ্দেশ্য তাকে ব্যক্ত করলাম। মি. সরকার ভূলুন্ঠিত হয়ে মুজিবের পদচুম্বন করলেন। আমি মুজিবের হাতে হাত মিলিয়ে করমর্দন করে বললাম, “এই নগরীতে আপনি ফিরে এসেছেন দেখে আমি আনন্দিত, যে নগরী আশঙ্কা করছিল যে আপনি হয়তবা আর কোনদিন এখানে ফিরবেন না।” তিনি আমার দিকে তাকালেন একটু উষ্মার সাথে। একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, “আমার সেক্রটারীর সাথে কথা বল।”আমার দ্বিধা ও সন্দেহের কারণ উপলব্ধি করা সহজ। মুজিবকে আমি জেনে এসেছি একজন গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী হিসেবে। যখন আমি দম নিচ্ছিলাম, একজন যুবক আমার কাছে এসে বললো, সে ভাইস সেক্রটারী। বিনয়ের সাথে সে প্রতিশ্র“তি দিলো, বিকেল চারটার সময় আমি ‘সরকারী বাসভবনে’ হাজির থাকতে পারলে আমাকে দশ মিনিট সময় দেয়া হবে। তাঁর সাথে যারা সাক্ষাৎ করতে চায় তাদের সাথে সেখানেই তিনি কথা বলেন। বিকেল সাড়ে তিনটায় নগরী ক্লান্ত, নিস্তব্ধ, ঘুমন্ত মধ্যহ্নের বিশ্রাম নিচ্ছে। রাস্তায় কাঁধে রাইফেল ঝুলানো মুক্তিবাহিনী টহল দিচ্ছে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে একমাসেরও বেশি সময় হলো। কিন্তু এখনো তাদের হাতে অস্ত্র আছে। তারা রাতদিন টহল দেয়। হাওয়ায় এলোপাথাড়ি গুলী ছুঁড়ে এবং মানুষ হত্যা করে। হত্যা না করলে দোকানপাট লুট করে। কেউ তাদের থামাতে পারছিল না-এমন কি মুজিব নিজেও না। সম্ভবত তিনি তাদের রুখতে সক্ষম নন। তিনি তৃপ্ত এজন্যে যে, নগরীর দেয়ালে দেয়ালে তার পোষ্টার সাইজের ছবিতে একাকার। মুজিবকে আমি আগে যেভাবে ভেবেছিলাম, তার সাথে আমার চাক্ষুস দেখা মুজিবকে কোনভাবে মিলাতে পারছিলাম না। সোমবার সন্ধ্যা: আমি যে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি এটা ছিল একটা দুর্বিপাক। তার মানসিক যোগ্যতা সর্ম্পকে আমার সন্দেহ ছিল। এমন কি হতে পারে যে, কারাগার এবং মৃত্যু সম্পর্কে ভীতি তার মস্তিষ্ককে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে? তার ভারসাম্যহীনতাকে আমি আর কোনভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারিনা। একই সাথে আমি বলতে চাচ্ছি, কারাগার এবং মৃত্যুর ভয় ইত্যাদি………..সম্পর্কে কাহিনীগুলো……..আমার কাছে এখনো খুব সুস্পষ্ট নয়। এটা কি করে হতে পারে যে, তাকে যে রাতে গ্রেফতার করা হলো, সে রাতে সকল শ্রেনীর মানুষকে হত্যা করা হলো? কি করে এটা হতে পারে যে তাকে কারাগারের একটি প্রকোষ্ঠ থেকে পলায়ন করতে দেয়া হলো, যেটি তার সমাধি সৌধ হতো? তিনি কি গোপনে ভূট্টোর সাথে ষড়যন্ত্র করেছিলেন? আমি যত তাকে পর্যবেক্ষণ করেছি, ততই মনে হয়েছে, তিনি যেন কিছু একটা লুকাচ্ছিলেন। এমন কি তার মধ্যে যেসার্বক্ষণিক আক্রমণাত্মক ভাব, সেটাকে আমার কাছে তার একটি আত্মরক্ষার কৌশল বলে মনে হয়েছে। ঠিক চারটায় আমি সেখানে ছিলাম। ভাইস সেক্রটারী আমাকে করিডোরে বসতে বললেন, যেখানে কমপক্ষে পঞ্চাশজন লোকে ঠাসাঠাসি ছিল। তিনি অফিসে প্রবেশ করে মুজিবকে আমার উপ¯ি’িতর কথা জানালেন। আমি একটা ভয়ংকর হুংকার শুনলাম এবং নিরীহ লোকটি কম্পিতভাবে পুনরায় আবির্ভুত হয়ে আমাকে প্রতীক্ষা করতে বললেন। আমি প্রতীক্ষা করলাম-এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা, চার ঘণ্টা – রাত আটটা যখন বাজলো, আমি সেই সংকীর্ন করিডোরে তখনো অপেক্ষামান। রাত সাড়ে আটটায় আমাকে প্রবেশ করতে বলা হলো। আমি বিশাল এক কক্ষে প্রবেশ করলাম। একটি সোফা ও দুটো চেয়ার সে কক্ষে। মুজিব সোফার পুরোটায় নিজেকে বিস্তার করে বসে আছেন এবং দু’জন স্থুলকায় দেহের মন্ত্রী চেয়ার দুটো জুড়ে বসে আছেন। কেউ দাঁড়ালো না। কেউ আমাকে অভ্যর্থনা জানালো না। কেউ আমার উপস্থিতিকে গ্রাহ্যই করলো না। মুজিব আমাকে বসতে বলার সৌজন্য প্রদর্শন না করা পর্যন্ত সুদীর্ঘক্ষণ নীরবতা বিরাজ করছিল। আমি সোফার ক্ষুদ্র প্রান্তে বসে টেপ রেকর্ডার খুলে প্রম প্রশড়ব করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু আমি সে সময়ও পাচ্ছিলাম না। মুজিব চিৎকার শুরু করলেন, ‘হ্যারি আপ, কুইক, আণ্ডারষ্ট্যাণ্ড? নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?…..পাকিস্তানীরা ত্রিশ লক্ষ লোক হত্যা করেছে, ইজ দ্যাট ক্লিয়ার’Ñআমি বললাম, “মি. প্রাইম মিনিষ্টার…..।” মুজিব আবার চিৎকার শুরু করলেন, “ওরা আমার নারীদেরকে তাদের স্বামী ও সন্তানদের সামনে হত্যা করেছে। স্বামীদের হত্যা করেছে তাদের ছেলে ও স্ত্রীর সামনে। মা বাপের সামনে ছেলেকে, ভাইবোনের সামনে ভাইবোনকে…. “মি প্রাইম মিনিষ্টার….আমি বলতে চাই…..” “তোমার কোন কিছু জিজ্ঞেস করার অধিকার নেই, ইজ দ্যাট রাইট?” “আমার প্রম প্রতিμিয়া হলো। কিন্তু একটা বিষয় সম্পর্কে আমি আরো কিছু জানতে চাই।”বিষয়টা আমি বুঝতে পারছিলাম না। “মি. প্রাইম মিনিষ্টার, গ্রেফতারের সময় কি আপনারউপরে নির্যাতন করা হয়েছিল?” “নো, ম্যাডাম নো। তারা জানতো, ওতে কিছু হবে না। তারা আমার বৈশিষ্ট্য, আমার শক্তি, আমার সম্মান, আমার মূল্য, বীরত্ব সম্পর্কে জানতো, আণ্ডারষ্ট্যাণ্ড?”

তা বুঝলাম। কিন্তু আপনি কি করে বুঝলেন যে তারা আপনাকে ফাঁসিতে ঝুলাবে? ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়?”

“নো, নো ডেথ সেণ্টেন্স।”

এই পর্যায়ে তাকে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলো এবং তিনি গল্প বানাতে শুরু করলেন, “আমি এটা জানতাম। কারণ ১৫ই ডিসেম্বর ওরা আমাকে কবর দেয়ার জন্য একটা গর্ত খনন করে।”

“কোথায় খনন করা হয়েছিল সেটা?”

“আমার সেলের ভেতরে।”

“আমাকে কি বুঝে নিতে হবে যে গর্তটা ছিল আপনার সেলের ঠিক ভিতরে?”

“ইউ মিস আণ্ডারষ্ট্যাণ্ড।”

“আপনার প্রতি কেমন আচরণ করা হয়েছিল মি. প্রাইম মিনিষ্টার?”

“আমাকে একটা নির্জন প্রকোষ্ঠে রাখা হয়েছিল। এমনকি আমাকে সাক্ষাৎকারের অনুমতি দেয়া হতো না, সংবাদপত্র পাঠ করতে বা চিঠিপত্রও দেয়া হতো না, আণ্ডারষ্ট্যাণ্ড?”

“তাহলে আপনি কি করেছেন?”

“আমি অ-নে-ক চিন্তা করেছি, পড়াশুনা করেছি।”

“আপনি কি পড়েছেন?”

“বই এবং অন্যান্য জিনিস।”

“তাহলে আপনি কিছু পড়েছেন।”

“হ্যাঁ, কিছু পড়েছি।”

“কিন্তু আমার ধারণা হয়েছিল, আপনাকে কোনকিছুই পড়তে দেয়া হয়নি।”

“ইউ মিস আণ্ডারষ্টুড।”

“তা বটে মি. প্রাইম মিনিষ্টার। কিন্তু এটা কি করে হলো যে, শেষ পর্যন্ত ওরা আপনাকে ফাঁসিতে ঝুলালো না।”

“জেলার আমাকে সেল থেকে পালাতে সহায়তা করেছেন এবং তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন।”

“কেন, তিনি কি কোন নির্দেশ পেয়েছিলেন?”

“আমি জানি না। এ ব্যাপারে তার সাথে আমি কোন কথা বলিনি এবং তিনিও আমার সাথে কিছু বলেন নি।”

“নীরবতা সত্ত্বেও কি আপনারা বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ, আমাদের মধ্যে বহু আলোচনা হয়েছে এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, আমাকে সাহায্য করতে চান।”

“তাহলে আপনি তার সাথে কথা বলেছেন?”

“হ্যাঁ, আমি তার সাথে কথা বলেছি।”

“আমি ভেবেছিলাম, আপনি কারো সাথেই কথা বলেননি।”

“ইউ মিস আণ্ডারষ্টুড।”

“তা হবে মি. প্রাইম মিনিষ্টার। যে লোকটি আপনার জীবনরক্ষা করলো আপনি কি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন না?”

“এটা ছিল ভাগ্য। আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি।”

এরপর তিনি ভূট্টো সম্পর্কে কথা বললেন। এসময় তার কথায় কোন স্ববিরোধিতা ছিল না। বেশ সতর্কতার সাথেই বললেন তার সম্পর্কে। আমাকে মুজিব জানালেন যে, ২৬শে ডিসেম্বর ভূট্টো তাকে খুঁজতে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য তাকে রাওয়ালপিণ্ডিতে নিয়ে আসা। তার ভাষায়, “ভূট্টো একজন ভদ্রলোকের মতই ব্যবহার করলেন। তিনি সত্যিই ভদ্রলোক।” ভূট্টো তাকে বলেছিলেন যে, একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য মুজিব ব−্যাক আউট ও যুদ্ধ বিমানের গর্জন থেকে বরাবরই যুদ্ধ সম্পর্কে আঁচ করেছেন। ভূট্টো তার কাছে আরো ব্যাখ্যা করলেন যে, এখন তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং তার কাছে কিছু প্রস্তাব পেশ করতে চান। আমি তাকে প্রশড়ব করলাম, “কি প্রস্তাব মি. প্রাইম মিনিষ্টার?”

তিনি উওর দিলেন, “আমি কেন তোমাকে সেটা বলবো? এটা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। প্রাইভেট অ্যাফেয়ার।”

“আমার কাছে বলার প্রয়োজন নেই মি. প্রাইম মিনিস্টার, আপনি বলবেন ইতিহাসের কাছে।” মুজিব বললেন, “আমিই ইতিহাস। আমি ভূট্টোকে থামিয়ে বললাম, যদি আমাকে মুক্তি দেয়া না হয়, তাহলে আমি আলাপ করবোনা। ভূট্টো অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উত্তর দিলেন, আপনি মুক্ত| আপনাকে শীঘ্রই ছাড়ছিনা। আমাকে আরও দুই বা তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। এরপর ভূট্টো পশ্চিম পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সম্পর্কে তার পরিকল্পনা তৈরী করতে শুরু করলেন। কিন্তু আমি অহংকারের সাথেই জানালাম, দেশবাসীর সাথে আলোচনা না করে আমি কোন পরিকল্পনা করতে পারি না।”এই পর্যায়ে তাকে আমি প্রশড়ব করলাম, “তাহলে তো যে কেউ আন্দাজ করতে পারে যে আপনাদের দুজনের আলোচনা খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে হয়েছিল।”তা তো বটেই। আমরা পরস্পরকে ভালোভাবে জানি। খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা ছিল। কিন্তু তা হয়েছিল আমার জানার আগে যে, পাকি¯তানীরা আমার জনগনের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত নিপীড়ন করেছে। আমি জানতাম না যে, তারা বর্বরোচিতভাবে আমার মা বোনকে হত্যা করেছে।”

আমি তাকে থামিয়ে বললাম, “আমি জানি মি. প্রাইম মিনিস্টার, আমি জানি – – -।” তিনি

গর্জে উঠলেন, “তুমি কিছুই জানো না; আমি তখন জানতাম না যে, তারা আমার স্থপতি, আইনবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, আমার চাকরকে হত্যা করেছে এবং আমার বাড়ি, জমি, সম্পত্তি সবকিছু ধ্বংস করেছে, আমার……।”তিনি যখন তার সম্পত্তির অংশে পৌঁছালেন, তখন তার মধ্যে এমন একটা ভাব দেখা গেল, যা থেকে তাকে এই প্রশড়বটা আমি করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলাম যে, তিনি সত্যিই সমাজতন্ত্রী কি না? তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ…….।” তার কন্ঠে দ্বিধা। তাকে আবার প্রশড়ব করলাম যে, সমাজতন্ত্র বলতে তিনি কি বোঝেন? তিনি উত্তর দিলেন, “সমাজতন্ত্র।” তাতে আমার মনে হলো, সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আদতে তার যথার্থ কোন ধারণা নেই।

এরপর ১৮ই ডিসেম্বর হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে তার প্রতিμিয়া জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। নিচের অংশটুকু হুবহু আমার টেপ থেকে নেয়া:

“ম্যাসাকার ? হোয়াট ম্যাসাকার ?”

“ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত ঘটনাটি।”

“ঢাকা স্টেডিয়ামে কোন ম্যাসাকার হয়নি। তুমি মিথ্যে বলছো।”

“মি. প্রাইম মিনিস্টার, আমি মিথ্যাবাদী নই।

সেখানে আরো সাংবাদিক ও পনেরো হাজার লোকের সাথে আমি হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছি। আপনি চাইলে আমি আপনাকে তার ছবিও দেখাবো। আমার পত্রিকায় সে ছবি প্রকাশিত হয়েছে।”

“মিথ্যেবাদী, ওরা মুক্তিবাহিনী নয়।”

“মি. প্রাইম মিনিস্টার, দয়া করে ‘মিথ্যেবাদী শব্দটি আর উচ্চারণ করবেন না। তারা মুক্তিবাহিনী। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আবদুল কাদের সিদ্দিকী এবং তারা ইউনিফর্ম পরা ছিল।”

“তাহলে হয়তো ওরা রাজাকার ছিল যারা প্রতিরোধের বিরোধিতা করেছিল এবং কাদের সিদ্দিকী তাদের নির্মূল করতে বাধ্য হয়েছিল।”

মি. প্রাইম মিনিস্টার, কেউ প্রমান করেনি যে, লোকগুলো রাজাকার ছিল এবং কেউই প্রতিরোধের বিরোধিতা করেনি। তারা ভীতসন্ত্রস্ত ছিল। হাত পা বাঁধা থাকায় তারা নড়াচড়াও করতে পারছিল না।”

“মিথ্যেবাদী।”

“শেষবারের মত বলছি, আমাকে “মিথ্যেবাদী” বলার অনুমতি আপনাকে দেবো না।”

“আচ্ছা সে অবস্থায় তুমি কি করতে?”

“আমি নিশ্চিত হতাম যে, ওরা রাজাকার এবং অপরাধী। ফায়ারিং স্কোয়াডে দিতাম এবং এভাবেই এই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড এড়াতাম।”

“ওরা সেটা করেনি, হয়তো আমার লোকদের কাছে তখন বুলেট ছিলনা।”

“হ্যাঁ তাদের কাছে বুলেট ছিল। প্রচুর বুলেট ছিল। এখনো তাদের কাছে প্রচুর বুলেট রয়েছে। তা দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গুলী ছোঁড়ে। ওরা গাছে, মেঘে, আকাশে, মানুষের প্রতি গুলী ছোঁড়ে শুধু আনন্দ করার জন্য।” এরপর কি ঘটলো: গোটা সাক্ষাৎকারের সময়টায় যে দুইটা স্থুলকায় দেহের মন্ত্রী ঘুমুচ্ছিলেন, তারা হুড়মুড়িয়ে জেগে উঠলেন। আমি বুঝতে পারলাম না মুজিব কি বলে হুংকার করছেন। কারণ কথাগুলো ছিল বাংলায়।

সোমবার রাত: গোটা ঢাকা নগরী জেনে গেছে যে মুজিব ও আমার মধ্যে কি ঘটেছে। শমশের ওয়াদুদ নামে একজন লোক ছাড়া আমার পক্ষে আর কেউ নেই। লোকটি মুজিবের বড় বোনের ছেলে। এই যুবক নিউইয়র্ক থেকে এসেছে তার মামার কাছে। তার মতে মুজিব ক্ষমতালোভী এবং নিজের সম্পর্কে অতি উচ্চ ধারণা সম্পনড়ব অহংকারী ব্যাক্তি। তার মামা খুব মেধা সম্পনড়ব নয়। বাইশ বছর বয়েসে মুজিব হাইস্কুলের পড়াশুনা শেষ করেছেন। আওয়ামী লীগ সভাপতির সচিব হিসেবে তিনি রাজনীতিতে প্র ম প্রবেশ করেন। এছাড়া আর কিছু করেননি তিনি। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে মুজিব একদিন প্রধানমন্ত্রী হবেন। ওয়াদুদের মতে, আত্মীয়স্বজনের সাথে দুর্ব্যবহারের কারণ এটা নয়। আসলে একমাত্র ওয়াদুদের মাকেই মুজিব ভয় করেন। এই দুঃখজনক আচরণের জন্য তিনি পারিবারিকভাবে প্রতিবাদ জানাবেন। সে আরো জানালো যে আমার সাথে যে র্দুব্যবহার করা হয়েছে তা সে তার মাকে বলবেন, যাতে তিনি এ ব্যাপারে মুজিবের সাথে কথা বলেন। সে আমাকে আরও বললো যে, সরকারী দফতরে গিয়ে এ ব্যাপারে আমার প্রতিবাদ করা উচিত এবং প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলা উচিত। কারণ প্রেসিডেন্ট খাঁটি ভদ্রলোক। মুজিব সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্যাবলী তার জন্যে বিপর্যয়কর। ১৯৭১ এর মার্চে পাকিস্তানীদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকান্ডের কিছুদিন পূর্বে ইয়াহিয়া খান ও ভূট্টো ঢাকায় এসেছিলেন। ইয়াহিয়া খান তড়িঘড়ি ফিরে যান। কিন্তু ভূট্টো থেকে যান ঢাকায়। তাকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রাখা হয়। তার রুম নম্বর ছিল ৯১১-৯১৩। ইন্টারকন্টিনেন্টালের সর্বোচ্চ তলায় তখন ভূট্টোর ভূমিকা ছিল নিরোর মতো। নগরী যখন জ্বলছিল এবং এলোপাথাড়ি গুলীবর্ষণ চলছিল, ভূট্টো তখন শরাব পান করছিলেন আর হাসছিলেন। পরদিন সকাল ৭টায় তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। আমি দেখেছি, যারা একসময় পাকিস্তানীদের ভয়ে ভীত ছিল, তারা এখন মুজিবকেই ভয় করে। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রচুর কথাবার্তা চলে এদেশে। কিন্তু সবসময়ই তা বলা হয় ফিসফিসিয়ে, আতংকের সঙ্গে। লোকজন বলাবলি করে যে, এই সংঘাতে মুজিব খুব সামান্যই খুইয়েছেন। তিনি ধনী ব্যাক্তি। অত্যন্ত ধনবান। তার প্রত্যাবর্তনের পরদিন তিনি সাংবাদিকদেরকে হেলিকপ্টার দিয়েছিলেন। কেউ কি জানে কেন? যাতে তারা নিজেরা গিয়ে মুজিবের সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি অবলোকন করে আসতে পারে। এখনো তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেন, জাতীয়তাবাদের কথা বলেন। তিনি কি তার জমিজমা, বাড়ি, বিলাসবহুল ভিলা, মার্সিডিজ গাড়ি জাতীয়করণ করবেন? ভূট্টোর সাথে মুজিবের প্র ম সাক্ষাৎ হয় ১৯৬৫ সালে, যখন তিনি ভারতের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তকে অরক্ষিত রাখার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেন। একজন নেতা হিসেবে তার মূল্য ছিল খুবই কম। তার একমাত্র মেধা ছিল মূর্খ লোকদের উত্তেজিত করে তোলার ক্ষেত্রে। তিনি ছিলেন কথামালার যাদুকর ও মিথ্যের যাদুকর – কিছুদিন আগে এক জনসভায় বক্তৃতাকালে তিনি বলেছিলেন, করাচীর রা¯তাগুলো সোনা দিয়ে মোড়া। তা দিয়ে হাঁটলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। অর্থনীতির কিছুই বুঝতেন না তিনি। কৃষি ছিল তার কাছে রহস্যের মতো। রাজনীতি ছিল প্রস্তুতিবিহীন। কেউ কি জানে ১৯৭০ এর নির্বাচনে তিনি কেন বিজয়ী হয়েছিলেন? কারণ সব মাওবাদীরা তাকে ভোট দিয়েছিল। সাইক্লোনে মাওবাদীদের অফিস বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং তাদের নেতা ভাসানী আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দেয়ার সিদ্বান্ত নিয়েছিলেন। জনগণকে যদি এখন পুনরায় ভোট দিতে বলা হয়, তাহলে মুজিবের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিনড়বতর হবে, যদি তিনি বন্দুকের সাহায্যে তার ইচ্ছাকে চাপিয়ে দিতে না চান।

সেজন্যেই তিনি মুক্তিবাহিনীকে অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ দিচ্ছেননা এবং আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, রক্তপিপাসু কসাই, যে ঢাকা স্টেডিয়ামে হত্যাযজ্ঞ করেছিল, সেই আবদুল কাদের সিদ্দিকী তারই ব্যক্তিগত উপদেষ্টা। ভারতীয়রা তাকে গ্রেফতার করেছিল; কিন্তু মুজিব তাকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এখন আমরা গণতন্ত্রের কথায় আসতে পারি। একজন মানুষ কি গণতন্ত্রী হতে পারে, যদি সে বিরোধিতা সহ্য করতে না পারে? কেউ যদি তার সাথে একমত না হয়, তিনি তখনই তাকে রাজাকার” বলে আখ্যায়িত করেন। বিরোধিতার ফল হতে পারে ভিনড়বমত পোষণকারীকে কারাগারে প্রেরণ। তার চরিত্র একজন একনায়কের, অসহায় বাঙ্গালীরা উত্তপ্ত পাত্র থেকে গনগনে অগিড়বকুণ্ডে পতিত হয়েছে। বাঙ্গালী রমণীদের প্রতি সম্মান জানিয়েই (আমি) বলছি, তাদের সম্পর্কে কথা না বলাই উত্তম। তিনি নারীদের পাত্তাই দেন না……।

বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আমাকে আবার মুজিবের সাথে দেখা করতে বললেন। সব ব্যবস্থা পাকা। প্রেসিডেন্ট যে প্রচেষ্টা করেছিলেন তা খুব একটা সফল হয়নি। তিনি দুজন কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছিলেন, যাতে তার নির্দেশ পালন করা হয়। মুজিবের কাছে একটা হুংকার ছাড়া তারা আর কিছু পায়নি। তবে এবার একটা করিডোরের বদলে একটা কক্ষে অপেক্ষা করার অনুমতি আমি পেলাম। আমি বিকেল ৪টা থেকে রাত নটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। একজন বয় আমার চায়ের কাপ পূর্ণ করে দিচ্ছিল এবং এভাবে আমি আঠার কাপ চা নিঃশেষ করলাম। উনিশ কাপের সময় আমি চা মেঝে ছুঁড়ে ফেলে হেঁটে বেরিয়ে এলাম। আমাকে অনুসরণ করে হোটেলে এলো মুজিবের সেμেটারী ও ভাইস সেμেটারী। তারা বললো, মুজিব অত্যন্ত μুদ্ধ হয়েছেন এবং আগামীকাল সকাল সাড়ে সাতটায় আমার সাথে দেখা করতে চান। পরদিন সকালে ঠিক সাতটায় আমি হাজির হলাম এবং সকাল সাড়ে নটায় মার্সিডিজ যোগে মুজিবের আগমন পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হলো। একটা কথাও না বলে তিনি অফিসে প্রবেশ করলেন। আমিও অফিসে ঢুকলাম। আমার দিকে ফিরে তিনি উচ্চারণ কররেন, “গেট আউট”। আমি কক্ষ ত্যাগ করতে উদ্যত। তিনি বললেন, “গেট ইন হিয়ার।” আমি ফিরলাম এবং তখনই তিনজন লোক পোষ্টার আকৃতির একটি ছবি (তার কাছে) নিয়ে এলো। দেখে তিনি বললেন, “চমৎকার।” এরপর তিনি বললেন, এই মহিলা সাংবাদিককে দেখাও। আমিও ‘চমৎকার’ শব্দটি উচ্চারণ করলাম। এ ছিল এক মারাত্মক ভুল। তিনি বজ্রের মতো ফেটে পড়লেন। তিনি ক্ষিপ্ত। ছবিটি ফ্লোরে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, “এটা চমৎকার নয়।” আমি কিছু না বুঝে নিঃশ্চুপ থাকলাম।

আমি তার উত্তেজনা হ্রাস করতে সক্ষম হলাম। যেহেতু আমি ভূট্টোর সাথে তার সত্যিকার সম্পর্কটা খুঁজে পেতে চাই, সেজন্য ভূট্টো সম্পর্কে প্রশড়ব করলাম। নামটা বলার মুহূর্তেই তিনি জ্বলে উঠলেন এবং বললেন যে, তিনি শুধুমাত্র বাংলাদেশের ভবিষ্যত সম্পর্কে প্রশেড়বর উত্তর দিতে চান। আমি প্রশড়ব করলাম, “বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গকে যুক্ত করার সম্ভাবনা আছে কিনা?” খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়ে তিনি বললেন, “এ সময়ে, আমার আর কোন আগ্রহ নেই।” এই বক্তব্যে ইন্দিরা গান্ধীকেও বিস্মিত হতে হবে যে, মুজিব কোলকাতা করায়ত্ত করতে চায়। আমি বললাম, তার মানে আপনি বলতে চান, অতীতে আপনার আগ্রহ ছিল এবং ভবিষ্যতে পুনঃবিবেচনা করার সম্ভাবনা আছে।” ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করলেন যে, আমি তাকে একটা ফাঁদে ফেলতে চাচ্ছি। নিজের ভুল সংশোধন করার বদলে তিনি টেবিলে মুষ্টাঘাত করে বলতে শুরু করলেন যে, আমি সাংবাদিক নই বরং সরকারী মন্ত্রী, আমি তাকে প্রশড়ব করছিনা দোষারোপ করছি। আমাকে এখনই বের হয়ে যেতে হবে এবং পুনরায় আমি যেন এদেশে পা না দেই। এই পর্যায়ে আমি নিজের উপর সকল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম এবং আমার মাঝে উত্তেজনার যে ¯ূ—প গড়ে উঠেছিল তা বিস্ফোরিত হলো। আমি বললাম যে, তার সবকিছু মেকি, ভূয়া। তার শেষ পরিণতি হবে খবুই শোচনীয়। যখন তিনি রোষান্বীত মুখে আমার দিকে তাকালেন আমি দৌড়ে বেরিয়ে এলাম এবং রাস্তায় প্রম যে রিকশাটা পেলাম তাতেই চাপলাম। হোটেলে গিয়ে তড়িঘড়ি বিল পরিশোধ করলাম। সুটকেস্টা হাতে নিয়ে যখন বেরুতে যাচ্ছি, ঠিক তখন দেখতে পেলাম মুক্তিবাহিনী নিচে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। তারা একথা বলতে বলতে আমার কাছে এলো যে, আমি দেশের পিতাকে অপমান করেছি এবং সেজন্য আমাকে চরম মূল্য দিতে হবে। তাদের এই গোলযোগের মধ্যে পাঁচজন অস্ট্রেলিয়ানের সাহায্যে শেষমেষ আমি পালাতে সক্ষম হলাম। তারা এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে প্রবেশ করছিল। এয়ারপোর্টে দুজন ভারতীয় কর্মকর্তা আমাকে বিমানে উঠিয়ে নিলেন এবং আমি নিরাপদ হলাম।

অনুবাদ: আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
সূত্র: বিডিটুডে

Advertisements